নির্যাতিত রোহিঙ্গা সম্প্রদায় ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শান্তিবর্ম-ফকির ইলিয়াস : কবি ও সাংবাদিক।

পোস্ট করা হয়েছে 03/12/2016-06:54pm:    যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ প্রতিনিধিঃ ==== মায়ানমারে কি হচ্ছে? কেন নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে? এটা কেমন অমানবিকতা? কেউ কিছু বলছেন না কেন? জাতিসংঘ দায়সাড়া গোছের একটি বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব খালাস করতে চাইছে? জাতিপুঞ্জের সংবিধান কি বলছে? আমাদের মনে আছে, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের গহীন অরণ্যে বন্দি শিবির ও গণকবরের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। তা নিয়ে কি কোনো তল্লাশি করেছিল বিশ্বসম্প্রদায়? না- করেনি। খবর বেরিয়েছিল, মায়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়কে নির্যাতন করে দেশ থেকে জোরপূর্বক সাগরে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায়কে নিজ দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতেও অস্বীকার করছে দেশটির ক্ষমতাসীনরা। তারপরও বিশ্বের মানবতাবাদী নেতারা পালন করছেন এক ধরনের নীরবতা। উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে, বর্তমান মায়ানমারের রোহিং (আরাকানের পুরনো নাম) এলাকায় এ জনগোষ্ঠীর বসবাস। ইতিহাস ও ভূগোল বলছে, রাখাইন প্রদেশের উত্তর অংশে বাঙালি, পার্সিয়ান, তুর্কি, মোগল, আরবীয় ও পাঠানরা বঙ্গোপসাগরের উপক‚ল বরাবর বসতি স্থাপন করেছে। তাদের কথ্য ভাষায় চট্টগ্রামের স্থানীয় উচ্চারণের প্রভাব রয়েছে। উর্দু, হিন্দি, আরবি শব্দও রয়েছে। রাখাইনে দুটি সম্প্রদায়ের বসবাস ‘মগ’ ও ‘রোহিঙ্গা’। মগরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। মগের মুল্লুক কথাটি বাংলাদেশে পরিচিত। দস্যুবৃত্তির কারণেই এমন নাম হয়েছে ‘মগ’দের। এক সময় তাদের দৌরাত্ম্য ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। মোগলরা তাদের তাড়া করে জঙ্গলে ফেরত পাঠায়।
রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে একটি প্রচলিত গল্প রয়েছে এভাবে- সপ্তম শতাব্দীতে বঙ্গোপসাগরে ডুবে যাওয়া একটি জাহাজ থেকে বেঁচে যাওয়া লোকজন উপক‚লে আশ্রয় নিয়ে বলেন, আল্লাহর রহমে বেঁচে গেছি। এই রহম থেকেই এসেছে রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গা আদিবাসী জনগোষ্ঠী পশ্চিম মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য নৃতাত্তি¡ক জনগোষ্ঠী। এরা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত। রোহিঙ্গাদের আলাদা ভাষা থাকলেও তা অলিখিত। মায়ানমারের আকিয়াব, রেথেডাং, বুথিডাং মংডু, কিয়ক্টাও, মাম্ব্রা, পাত্তরকিল্লা এলাকায় এদের বাস।
২০১২ সালেও একবার এই রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর হামলে পড়েছিল খুনিরা। কিছুদিন পরে তা কিছুটা স্তিমিত হলেও রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ চলছেই নীরবে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক কথা হচ্ছে, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা নিজেদের সবচেয়ে শান্তিপ্রিয় গোত্র দাবি করেন। অথচ সেই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী জাতির দেশ মায়ানমারে গণহত্যা চলছে। তারা ভুলে গেছে মহামতি বুদ্ধের অমর বাণী- প্রাণী হত্যা মহাপাপ। নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছেন রোহিঙ্গারা। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থা বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, সীমান্ত খুলে দেয়ার এবং অত্যাচারিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ মানবিক বিবেচনায় সীমান্ত খুলে দেয়ার কথা বললেও বাংলাদেশ মনে করে, মানবতার দায় বাংলাদেশের একার নয়। কথাটা বাংলাদেশের সরকার ঠিকই বলছে। কারণ মায়ানমারে কোনো যুদ্ধ চলছে না। একটি গোষ্ঠী অন্য একটি গোষ্ঠীকে নির্মমভাবে হত্যা করছে। বিশ্বের প্রভাবশালীরা কেন মায়ানমারের শাসকচক্রকে ডেকে তা জিজ্ঞাসা করছেন না? বিশ্ব সম্প্রদায়েরও রোহিঙ্গা ইস্যুতে দায় রয়েছে। তাদের উচিত, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা রোহিঙ্গা ইস্যুর স্থায়ী সমাধানে এগিয়ে আসা। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত রোহিঙ্গা কমিশনেরও কার্যকর তৎপরতা প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনী ও পুলিশের নৃশংস নির্যাতন চলছে। গত ৯ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সেনা অভিযানে এ পর্যন্ত ৩৫০ জনেরও বেশি রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র ও বিশ্ব গণমাধ্যমের খবর থেকে জানা গেছে। কেউ কেউ ধারণা করছেন, এই সংখ্যা অনেক বেশি। রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের চার শতাধিক বসতবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। রোহিঙ্গা মুসলিম-সমর্থিত ‘রোহিঙ্গা ভিশন’ নামে একটি ওয়েবসাইটে পোস্ট করা ভিডিওচিত্রে আগুনে পোড়া কিছু মৃতদেহ এবং এসব মৃতদেহ ঘিরে তাদের স্বজনদের শোকের মাতম দেখা গেছে। দেশটির সেনাবাহিনী বলছে, সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত ৬৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এ বিষয়ে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস তাদের সম্পাদকীয়তে লিখেছে- ‘মাত্র এক বছর আগে, ঐতিহাসিক নির্বাচনের পর দীর্ঘ সময়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী, নোবেলজয়ী অং সান সু চি মায়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হন। এতে আশার সঞ্চার হয়েছিল, তিনি রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ ভোগান্তির অবসান ঘটাবেন। সেপ্টেম্বরে ওবামা প্রশাসন মায়ানমারের ওপর থেকে অবশিষ্ট অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেয়। তখন মায়ানমারের অন্যান্য অর্জনের পাশাপাশি এ কথাও বলা হয়, নতুন সরকার ‘তার নাগরিকদের মানবাধিকারের প্রতি সম্মান দেখানোর ওপর’ জোর দিচ্ছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে এমন কথা বলাটা ছিল অপরিপক্ব। সু চি নিজেই রোহিঙ্গাদের ‘বিদেশি’ নাগরিক হওয়ার হাস্যকর দাবিকে জোরালো করেছেন। তাদের ‘বাঙালি’ বলেই এটা করেছেন এক সময় ‘বিবেকের দূত’ উপাধি পাওয়া সু চি। একই সঙ্গে হামলার জবাবে সরকারের দমন-পীড়নমূলক অবস্থানকে ‘আইনের শাসনের ওপর ভিত্তি করে’ বলে দাবি করেছেন তিনি। এদিকে নির্যাতনের শিকার মানুষের কাছে ওই এলাকায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর বেশিরভাগ পথও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, অপুষ্টির শিকার হাজার হাজার শিশু ক্ষুধা ও চিকিৎসা সেবার স্বল্পতার ঝুঁকিতে রয়েছে। সরকারকে অবশ্যই অভাবীদের কাছে অবিলম্বে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানোর অনুমোদন দিতে হবে। জাতিসংঘ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চলমান সহিংসতার নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানাচ্ছে।’ কিন্তু এতে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে না। বরং হত্যা অব্যাহত রয়েছে।
মায়ানমারের রোহিঙ্গা বিষয়ে ক্ষমতাসীনরা বলছে ভিন্ন কথা। তাদের বক্তব্য হচ্ছে এই এলাকায় বেশ কিছু মৌলবাদী-জঙ্গি গ্রুপ গড়ে উঠেছে। যে জঙ্গি গ্রুপ উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশে নিঃশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপালে বিভিন্ন জঙ্গি আস্তানার মদদ দিচ্ছে। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, মায়ানমারে রোহিঙ্গা হত্যার তীব্র প্রতিবাদ আমরা জানাচ্ছি, জানাব। কিন্তু সিরিয়া, ইয়ামেন, ইরাক, তুরস্ক, মরক্কো, আফগানিস্তান, পাকিস্তান প্রভৃতি দেশে প্রায় প্রতিদিন মুসলমানদের হাতে শত শত মুসলমান যে নিহত হচ্ছেন- এর তীব্র প্রতিবাদ কেন করা হচ্ছে না? কোনো কোনো মৌলবাদী নেতা বলছেন, সেগুলো ওসব দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। অথচ ১৯৭৮ সালে এরকম এক হামলার পর প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এরা এখনো বাংলাদেশেই আছে। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের পর যে বিহারিরা বাংলাদেশে থেকে গিয়েছিল- এদের প্রজন্মের সংখ্যা এখন প্রায় এক কোটি বলে বলা হচ্ছে। পাকিস্তান বাংলাদেশের কাছে অর্থ পাওনা দাবি করেছে সম্প্রতি। কিন্তু তারা তাদের ওই বিহারিদের ফিরিয়ে নেয়ার কথা একবারও বলেনি গেল ৪৫ বছরে।
ফিরে আসি রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে। আগেই জানানো হয়েছে মায়ানমারে রোহিঙ্গা সম্প্রদায় সম্পর্কিত একটি কমিশন গঠন করবে দেশটির সরকার। যার প্রধান হবেন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান। এই কমিশন মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রতি সহিংসতা ও তাদের ঘিরে দেশটিতে যে সংকট রয়েছে তার সমাধান খোঁজার জন্য কাজ করবে। তবে, নতুন এই কমিশন রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ মায়ানমারের মধ্যে চলমান সংকট নিয়েও কাজ করবে কিনা সেটি এখনো পরিষ্কার নয়। জাতিসংঘের ভাষায় রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষজন বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর একটি। মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের বাস, যারা পৃথিবীর কোনো দেশের নাগরিক নয়। দেশটি রোহিঙ্গাদের তার নাগরিক মনে করে না। বরং মায়ানমার মনে করে তাদের আদি আবাস বাংলাদেশ। এমনকি রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহারেও দেশটির সরকারের আপত্তি রয়েছে। এসব বিষয়গুলোর সুরাহা হওয়া দরকার। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, দেশটির গনতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সাং সুচি বহুদিন যাবৎ রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোনো মন্তব্য করেননি। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী এই নেত্রী রোহিঙ্গাদের সমস্যা সমাধানে কথা বলবেন সেটাই বিশ্ব প্রত্যাশা করেছিল। কারণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শান্তি চাইলে এই সমস্যার জোর সমাধান দরকার। সু চি কি তাহলে তার অবস্থানের পরিবর্তন করেছেন? কেন করেছেন? তিনি তো ‘শান্তির’ জন্যই নোবেল পেয়েছিলেন। এই বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত-চীন-নেপাল-শ্রীলঙ্কার যৌথ আলোচনা দরকার। মায়ানমারকে চাপ প্রয়োগ করা দরকার, বিষয়টি নিষ্পত্তি করার জন্য। কারণ রক্তাক্ত সহিংসতা আরো রক্তপাতের জন্ম দেয়। যা প্রতিবেশী দেশের শান্তি খুব সহজেই বিপন্ন করে তুলতে পারে।

সর্বশেষ সংবাদ
স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যেকোনো অনিয়ম দুর্নীতি অনুসন্ধান করা হবে: দুদক চেয়ারম্যান কক্সবাজার রেড জোন,শনিবার থেকে আবারো লকডাউন এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।