বঙ্গবন্ধুর নামে, কিংবা লীগের নামে কত হাজার সংগঠন ?- কামরুল হাসান বাদল-কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 01/12/2016-12:01pm:    চট্টগ্রামে এই মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের কয়টি শাখা আছে তা এই সংগঠনের কেন্দ্রীয় পরিষদ বা দেশের কোনো গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষেও বলা সম্ভব নয়। এই অবস্থা শুধু চট্টগ্রামে কিংবা বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের ক্ষেত্রেই নয়। সারাদেশের চিত্র এটি। বঙ্গবন্ধুর নামে, জয় বাংলার নামে, শেখ হাসিনার নামে, আওয়ামীলীগের নামে কিংবা লীগের নামে কত হাজার সংগঠন এখন বাংলাদেশে সক্রিয় তা বলা সম্ভব নয়। আগেও বলেছি গোয়েন্দা বিভাগের পক্ষে বলাও সম্ভব নয়।
চট্টগ্রাম বন্দর এলাকার বাড়ি এমন একজন মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আমার লেখা পছন্দ করেন। প্রতি বৃহস্পতিবার প্রকাশিত আমার কলাম পাঠ করে আমাকে ফোন দেন। ভালো-মন্দ নিয়ে আলোচনা, এর মধ্যে প্রশংসাই বেশি। লেখার কোনো অংশের সাথে একমত না হলে তা কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। আমি বুঝতে পারি তিনি আমাকে বিব্রত করতে চান না। তিনি সেই পাকিস্তান আমল থেকেই আওয়ামী লীগ করে এসেছেন। এখনও এই দল করেন। তাই এই দলের ভালো মন্দ নিয়ে তাঁর দুর্ভাবনার শেষ নেই। দল থেকে কোনোদিন কোনো সুবিধা নেননি। বরং দলের লোকদের দ্বারা অনেক সময় হয়রানির শিকার হয়েছেন। দল ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও তার একটি জায়গা নিয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাথে ঝামেলা মিটমাট করতে পারেননি। তাঁর আলোচনায় প্রতিবারই দলে অনুপ্রবেশকারী, সুবিধাবাদী ও মুখচোরাদের নিয়ে আক্ষেপ করেন। অনুপ্রবেশকারী, দালাল ও মেকি দলবাজদের কারণে তাঁর মতো হাজার হাজার প্রকৃত মুজিবপ্রেমী ও আওয়ামী সমর্থকদের জন্য আফসোস করে থাকেন।
দলের এই পরিস্থিতি নিয়ে শুধু তিনিই যে আফসোস করেন তা নয়। আমি যখন কথা বলি তখন প্রায় নেতাদের কক্তেই এ বিষয়ে রাগ, ক্ষোভ ও হতাশার চিহ্ন দেখতে পাই। শুধু তাই নয় পত্র-পত্রিকায় শীর্ষ নেতাদেরও এই সব ফার্মের আওয়ামী লীগারদের বিরুদ্ধে বিরক্তি প্রকাশ করতে শুনি। কিন্তু কাজের বেলা কাজ কিছুই হয় বলে শুনি না। বরং নব্য আওয়ামী লীগার ও নব্য বঙ্গবন্ধু প্রেমীদের কনুইয়ের ঠেলায় নিবেদিত প্রাণ কর্মী সমর্থকদের প্রাণ যায় যায় অবস্থা। নব্যদের তাফালিংয়ে প্রবীণ ও পরীক্ষিত ব্যক্তিরা অনেক দূরে সরে আছেন এখন। প্রায় প্রতিদিন ‘জয় বাংলা’ ‘বঙ্গবন্ধু’ , ‘শেখ হাসিনা’ ‘শেখ রাসেল’, ‘লীগ’ এই শব্দগুলোকে রেখে জন্ম নিচ্ছে শত শত ধান্ধাবাজির সংগঠন। যাদের প্রধান কাজই হচ্ছে চাঁদাবাজি, ধান্ধাবাজী, জায়গা দখল, মাদক ব্যবসা, টেন্ডারবাজী আর মাস্তানি করা। এদের দাপটে অনেক জায়গায় মূল দল আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মীরা পাত্তা পান না।
অথচ দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আওয়ামীলীগের স্বীকৃত সহযোগী সংগঠনের সংখ্যা-৭টি।
এগুলো হচ্ছে মহিলা আওয়ামীলীগ, কৃষক লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, তাঁতী লীগ, যুব মহিলা লীগ। এছাড়া ছাত্রলীগ, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ, (স্বাচিপ) এবং শ্রমিকলীগ ভাতৃপ্রতিম সংগঠন হিসেবে স্বীকৃত। এর বাইরে অন্য সংগঠনের সাথে আওয়ামীলীগের কোনো রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকার কথা না হলেও আমরা দেখতে পাই আওয়ামী ওলেমা লীগ, তরুণ লীগ, পেশাজীবী লীগ, বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদ, আওয়ামী প্রজন্ম লীগের মতো বহু সংগঠন আওয়ামীলীগের অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন হিসেবে সংগঠন পরিচালনা করছে। আওয়ামীলীগের বহু কর্মসূচিতে অংশগ্রহণও করছে।
পূর্বেও উল্লেখ করেছি, এর বাইরে ‘বঙ্গবন্ধু’ ‘আওয়ামীলীগ’ ‘শেখ হাসিনা’ ‘শেখ রাসেল’ ‘জয় বাংলা’ ইত্যাদি শব্দগুলো রেখে যে হাজার হাজার সংগঠন এখন বাংলাদেশে তাদের কর্মকান্ড পরিচালনা করছে তাদের কোনো জবাবদিহিতা নেই। এই সংগঠনগুলোর কর্মকান্ডের কোনো আগা-মাথাও নেই। এছাড়া সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধু তাঁর পরিবার ও দলের নাম ব্যবহার করে অনেক সংগঠন কার্যক্রম চালাচ্ছে। এই ধরনের সংগঠনের সংখ্যা এখন এত বেশি যে এদের নিয়ন্ত্রণ করাতো দূরের কথা এদের সম্পর্কে সঠিক তথ্য উপাত্তও নেই মূল দলের কাছে।
দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে যা হয় আওয়ামী লীগের মধ্যে এখন তাই হচ্ছে। দলের মধ্যে স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে। দলীয় কোন্দল বাড়ছে। দলে সুবিধাবাদীদের জন্ম হচ্ছে। এবং তারা ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে। বিরোধী দলে থাকলে আওয়ামীলীগের মধ্যে যে জোয়ার, উদ্দীপনা, জোশ থাকে ক্ষমতায় গেলে তা ক্ষমতা-অর্থবিত্তের কাছে হারিয়ে যায়। নেতারা থাকেন অধিকাংশই নিজেদের নিয়ে। কর্মীরা নেতাদের দেখা না পেতে পেতে এক সময় হতাশ হয়ে পড়েন। বিরোধী দলে থাকাকালীন জমজমাট দলীয় কার্যক্রম এখন (ফাঁকা) পড়ে থাকে অধিকাংশ সময়। হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া অন্যদের সেখানে দেখা পাওয়া যায় না। তারপরও বলতে হয় বিশাল দল হওয়া সত্ত্বেও মূল দল আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও সদ্য বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নেতৃত্বে অনেক ওয়ার্ড তুলনামূলকভাবে অনেকটা গোছানো। কিন্তু সমস্যা, অন্তহীন সমস্যা হলো তার সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে।
চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামীলীগ মূলত দুধারায় বিভক্ত। এর প্রতিক্রিয়ায় দলের অন্যান্য সহযোগী সংগঠনও দুধারায় রাজনীতি করে থাকেন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হচ্ছে দলের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। আওয়ামী লীগের গত আট বছরের শাসনামলে দলের লাভ করার চেয়ে ক্ষতিই করেছে বেশি এই সংগঠনটি। এই ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠনের কতিপয় নেতাকর্মীর বিতর্কিত কর্মকান্ডের ফলে মূল দলের শীর্ষ নেতারাও বিব্রত ও বিরক্ত। অতি সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের এক মেধাবী নেতার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ, উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। সে সাথে লালদীঘির মাঠে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠান শেষে জেলার এক শীর্ষ নেতার ওপর ছাত্রলীগের কতিপয় নেতা-কর্মীর হামলার পর স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও চরম বিরক্তি প্রকাশ করেছেন এইসব কর্মকান্ডের জন্য।
আওয়ামী লীগের মতো একটি ‘মাল্টি ক্লাস’ রাজনৈতিক দলের পক্ষে এত বিশাল কর্মীবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখা একটি কঠিন কাজ তা স্বীকার করে নিয়েও বলতে হয়, এসব ক্ষেত্রে দল বা দলের নেতৃত্বকে আরও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে দলের সুসময়ে যারা কাছে ভেরেন তারা দলের প্রকৃত বন্ধু নয়। তারা আদর্শের জন্য আসেন না, মতলবের জন্য আসেন। মতলব শেষে, দল বিপদে পড়লে তাদের দেখা পাওয়া মুশকিল হয়ে যাবে।
বর্তমানে দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন আছে যেখানে ঢুকতেই চোখে পড়বে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার বড় বড় ছবি। অনেক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সামনে দেখা যাবে বঙ্গবন্ধুর বিশাল ম্যুরাল। দেখে মনে হতে পারে এই প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের নেতাদের সবাই বুঝি (মুজিব) অন্তপ্রাণ, শেখ হাসিনা বা তার দলের মহান সমর্থক। কিন্তু একটু খোঁজ নিলে বা একটু অতীতের দিকে ফিরে তাকালে দেখতে পাওয়া যাবে আজকের এই মুজিব-হাসিনা বা আওয়ামীভক্তরা অতীতে কী নিষ্ঠুর আওয়ামী বিরোধী ছিলেন। এদের কারো কারো গায়ে মুজিবকোট, ভাষণে শেখ হাসিনার গুণকীর্তন দেখে ১৯৭৫ পূর্ববর্তী ঘটনাপ্রবাহের কথা মনে পড়ে। বঙ্গবন্ধু যখন জাতীয় দল বাকশাল গঠন করেছিলেন তখন ওদের মতো মানুষগুলোই বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধু বলে মুখে ফেনা তুলতে তুলতে বাকশালে যোগ দিয়েছিলেন আর বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের পর জাতির জনক ও তার পরিবার নিয়ে অশ্লীল, আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন। আওয়ামলীগের প্রবীণ নেতা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সফল নায়ক। বর্তমানে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এক স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, বাকশালে যোগদানের জন্য তৎকালীন উপ সেনা প্রধান জিয়াউর রহমান কীভাবে তোফায়েল আহমেদের কাছে সুপারিশের জন্য গিয়েছিলেন। আর ’৭৫ এর পর এই জিয়াউর রহমানই কীভাবে বাকশাল তথা আওয়ামীলীগ নিধনে নেমেছিলেন।
ইতিহাসের শিক্ষা হলো, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না। আওয়ামী লীগ যদি সতর্ক হতো। দলের নেতারা যদি কঠোর হতেন তাহলে দলে বসন্তের কোকিলদের ঠেকানো খুব কঠিন কিছু হতো না। আজ দলে দলে বিএনপি-জামায়াতিরা আওয়ামী লীগে ঢুকে পড়ছে। দলের নেতারা হাসিমুখে তাদের বরণ-করে নিয়ে নিজেদের জন্য, দলের জন্য যে কী ভারী বিপদ ডেকে আনছেন তা অনুধাবন করতে পারছেন না। দলের বিপদে বা ক্ষমতা থেকে দল দূরে সরে গেলে এরাই যে বিষধর সাপ হয়ে উঠবে তা এখনো কেউ কেউ হয়ত অনুধাবন করতে পারছেন না।
একটি ছোট্ট উদাহরণ দিই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কয়েকদিন আগে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। আহত সাঁওতালদের কয়েকজনকে হাতে, কোমরে রশি দিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা প্রদান আর তার পাশাপাশি এজলাসের দরজা থেকে ঢাকায় গারো তরুণী ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামী পালিয়ে যাওয়া নিয়ে ওই স্ট্যাটাসে আমি মূলত পুলিশের ভুমিকার সমালোচনাই করেছিলাম। বাকলিয়া থানা যুবলীগ নামে আমার ফেসবুক বন্ধু তালিকার একজন একদিন পর মন্তব্যে লিখলেন, আমি শুধু আসামী পালিয়ে যাওয়া নিয়ে লিখলাম কিন্তু পুলিশ যে কয়েক ঘন্টার মধ্যে আসামীকে আবার গ্রেফতার করেছে তা লিখলাম না। এই অ্যাকাউন্ট হোল্ডার হয়ত আমাকে চেনেন বলে আমার স্ট্যাটাসের মন্তব্যে কোনো অশোভন শব্দ ব্যবহার করেননি। কিন্তু তার কয়েক ঘন্টা পর তিনি বা তাঁরা (বাকলিয়া থানা যুবলীগ) এর এক স্ট্যাটাসে অত্যন্ত অশোভন ও অশালীন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে প্রকারান্তরে আমার স্ট্যাটাস বা আমার মতো যারা লিখেছিলেন তাদের উদ্দেশ্যে।
আমি আমার স্ট্যাটাসে মূলত (আবার বলছি) পুলিশের একদিকে বাড়াবাড়ি (সাঁওতালদের ব্যাপারে) অন্যদিকে দায়িত্বে অবহেলা (ধর্ষণ মামলার আসামির বিষয়ে) নিয়ে সমালোচনা করেছিলাম। এটাকে বাকলিয়া থানা যুবলীগ নামের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হোল্ডার দলের সমালোচনা হিসেবে নিয়েছে। অর্থাৎ তিনি বা তাঁরা (একাধিক হতে পারেন, যেহেতু সংগঠনের নামে) পুলিশকেও আওয়ামী পুলিশ লীগ হেসেবে ধরে নিয়েছেন। মুশকিলটা হলো সেখানে। ক্ষমতায় থাকলে সবকিছুই নিজেদের মতো দেখি। সবাইকে নিজেদের মতো মনে হয়। ক্ষমতার পালা বদল হলে সাঁওতালদের এই দড়ি যে তাদের হাতে-কোমরেও লাগানো হবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়। শেষকরার আগে মিনতি করে বলতে চাই, অতি আগ্রহে যারা আজ যেন তেনভাবে জাতিরজনকের ছবি বা ম্যুরাল স্থাপন করছেন ক্ষমতার পালাবদল হলে তারা তা রক্ষা করবেন তো? নাকি সেখানে রাতারাতি ইতিহাসের কোনো খল নায়কের ছবি স্থাপন পাবে? ‘বঙ্গবন্ধু হলের নাম রাতারাতি বদলে গিয়ে অন্য কারো নামে হবে না তো? জাতির জনকের প্রকৃত মর্যাদা রক্ষায় আজকের অতি উৎসাহীরা ভূমিকা পালন করবেন তো?

সর্বশেষ সংবাদ