নাগরিক বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় অবিচার -ফকির ইলিয়াস : কবি ও সাংবাদিক।

পোস্ট করা হয়েছে 19/11/2016-07:02pm:    ফকির ইলিয়াস, যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ প্রতিনিধিঃ ==== গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানুষে মানুষে নাগরিক বৈষম্য থাকবে- তা ভাবা খুবই বেদনাদায়ক। বাংলাদেশে নাগরিকদের প্রতি অবিচারের বিষয়টি বারবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। গেল চার সপ্তাহে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর বারবার হামলে পড়েছে হামলাকারীরা। এর জের না কাটতেই গাইবান্ধায় সাঁওতালদের ওপর গুলি চালিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনা প্রসঙ্গে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছেন, চিনিকলের ওই জমি সাঁওতালদের না হলেও তাদের ব্যবহার করে ‘ভূমিদস্যুরা’ সেগুলো দখল করতে চেয়েছিল।
১৯৬২ সালে সাঁওতাল ও বাঙালিদের ১৮টি গ্রামের ১ হাজার ৮৪০ দশমিক ৩০ একর জমি অধিগ্রহণ করে রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ। সেখানে আখ চাষের জন্য সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার গড়ে তুলেছিল। চিনিকলটি বন্ধ হওয়ার পর সেই জমি ইজারা দিয়ে ধান ও তামাক চাষ করা হয়। এতে অধিগ্রহণের চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ তুলে সেই জমির দখল ফিরে পেতে আন্দোলনে নামে সাঁওতালরা। এরপর চিনিকলের জন্য অধিগ্রহণ করা ওই জমিতে কয়েকশ ঘর তুলে সাঁওতালরা বসবাস শুরু করেন। চিনিকল কর্তৃপক্ষ ওই জমি উদ্ধার করতে গেলে সংঘর্ষ বাধে। সংঘর্ষের সময় সাঁওতালদের বাড়িঘরে লুটপাট হয়। হত্যা ও লুটপাটের পর সেখানে সরকারি ত্রাণ পাঠানো হয়েছিল। প্রথমদিকে সাঁওতাল সম্প্রদায় সেই ত্রাণ নিতে রাজি হননি। এ ব্যাপারে সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার ভূমি উদ্ধার কমিটির সহসভাপতি ফিলিমন বাসকে বলেন, কাঁটাতার দিয়ে আমাদের বাপ-দাদার সম্পত্তি থেকে যখন বঞ্চিত করার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। নিহতদের ক্ষতিপূরণের যখন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের ফলে যে ব্যাপক ক্ষতি হয় তা পূরণের যখন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সেক্ষেত্রে সামান্য খাদ্য দিয়ে আমাদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসীরা তাই প্রশাসনের ওই ত্রাণ সামগ্রী প্রত্যাখ্যান করেছে।
মাদারপুর গ্রামে লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত ইলিখা মার্ডি বলেন, আমরা প্রশাসনের সাহায্য নেব না। তারা আমাদের গুলি করেছে, আমাদের হত্যা করেছে, আমাদের ঘরবাড়িতে আগুন দিয়েছে, তাদের দেয়া খাবার আমরা গ্রহণ করব না। আমরা আমাদের বাপ-দাদার জমি ফিরে পেতে চাই। সাঁওতাল পল্লীর বাসিন্দা পাওলুস মাস্টার বলেন, ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত করে যে ত্রাণ আনা হয়েছে এর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। তাই এটা গ্রহণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। একটি রাষ্ট্রের জনগণের এরচেয়ে বেশি ক্ষোভ আর কী হতে পারে? তারা কতটা অসহায় হলে এমন দ্রোহ দেখাতে পারে?
সাঁওতালদের ওপর পুলিশের গুলি চালানোর ঘটনার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছে। রিটে সাঁওতালদের জানমালের নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কোন কর্তৃত্ববলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুলি চালিয়েছে- এই প্রশ্নেও রুল জারির আবেদন জানানো হয়েছে। বেসরকারি সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), অ্যাসোসিয়েশন অব ল্যান্ড রিফর্ম এন্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) এবং ব্রতী সমাজকল্যাণ সংস্থা হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট শাখায় রিট দায়ের করে। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের ডিভিশন বেঞ্চে রিট আবেদনটি শুনানির জন্য উপস্থাপন করা হবে। রিটে স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের আইজি, রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি, গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার, খাদ্য ও চিনিশিল্প কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান ও সাহেবগঞ্জ সুগারমিলের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজারকে বিবাদী করা হয়েছে। রিটে বলা হয়, সাঁওতালরা বাংলাদেশের নাগরিক। হামলার পরে এখন তারা নিতান্তই অসহায়। এতটাই অসহায় যে, তারা খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। খাদ্য সংকটে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। সাঁওতালদের পূর্বপুরুষরা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এবং মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। আজ তাদেরই ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে।
একটি রাষ্ট্রে নাগরিকের যথাযথ মূল্য পাওয়া প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। মানুষের মৌলিক চাহিদা ও সুযোগ-সুবিধাগুলো অবারিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু রাষ্ট্র যখন কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর পক্ষাবলম্বন করে বা খপ্পরে পড়ে শ্রেণি বৈষম্যকে জিইয়ে রাখে বা বাড়িয়ে দেয়ার পক্ষে ভূমিকা নেয় তখন মানুষ হতাশ হয়।
লুটেরা শ্রেণিকে উসকে দিয়ে শ্রমিক শ্রেণির ওপর শোষণের পথ সুগম করে দেয়া হলে সমাজে নেমে আসে মানবতার সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। যুদ্ধ বিগ্রহের চেয়েও তা মানবতাকে অনেক বেশি ক্ষতি করে। কিন্তু সুচতুর প্রচারণা ও দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেয়ার কৌশলের মাঝে তা নিভৃতই থেকে যায়। যেকোনো সম্মুখ নির্যাতনের ঘটনা সামনাসামনি বুঝে ও মোকাবেলা করে নির্দিষ্ট ফলাফল অর্জন সম্ভব হয়। কিন্তু পুঁজিবাদ ও শ্রেণি শোষণের সূ², চাতুর্যপূর্ণ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাশ্রিত ও কৌশলী ক‚টকৌশলগুলো মোকাবেলা করা বড় কঠিন কাজ। নাসিরনগর কিংবা গাইবান্ধায় সেটাই করা হয়েছে। নীরবে-নিভৃতেই কতিপয় মানুষের দখলদারিত্বকে অবারিত করার জন্য অধিকাংশ মানুষকে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য করা হয়। সৌভাগ্যবান ওই শ্রেণিকুল, যারা নিজেদের সমাজের উচ্চশ্রেণি ভাবতে পছন্দ করেন, তাদের পক্ষেই দাঁড়ায় রাষ্ট্র। এর বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলেই তাকে শায়েস্তা করার জন্য রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও বিচারালয়গুলোকে নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করা হয়। ক্ষমতার অপব্যবহার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধে তখন রাষ্ট্রের চালিকাশক্তিকেই দোষী হতে হয়।
চাপা ক্ষোভ, অনাস্থাজনিত অস্থিরতা, অবিশ্বাস ক্রমশ রাষ্ট্রকেই মানুষের কাছে অনিরাপদ করে তোলে। সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য যে ন্যূনতম সম্প্রীতি প্রয়োজন এই বৈষম্যের কারণে তা অর্জিত হতে পারে না। ফলে এক ধরনের চাপা অস্থিরতা সব সময়ই ক্রিয়াশীল থাকে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল জেলাগুলোতে দরিদ্র ও গরিব মানুষের সংখ্যা বেশি। এসব অঞ্চলকে বলা হয় মঙ্গাপীড়িত অঞ্চল। উত্তরাঞ্চলের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ দারিদ্র্য। উত্তর জনপদে গ্রামীণ জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ লোক দারিদ্র্যসীমার ওপর বাস করে। তারাই ভোগ করে গ্রামীণ আয়ের ষাট শতাংশ। বিপরীতে ৮০ শতাংশ লোক বাস করে দারিদ্র্যসীমার নিচে। গ্রামের ৬০ ভাগের বেশি লোকই ভূমিহীন। গ্রামের আয় বৈষম্যের কারণসমূহের মধ্যে রয়েছে ভূমি মালিকানার বৈষম্য, কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকা, মজুরি কম ইত্যাদি। গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে যে বৈষম্য যে একটি বড় বাধা, এই উপলব্ধির ঘাটতি এ সমাজে প্রকট। এই বৈষম্যই মাঝে মাঝে দ্রোহে পরিণত হয়।
আর লুটেরা শ্রেণি ধর্মের দোহাই দিয়ে সাধারণ নাগরিকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সংবিধানে সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ নেই। বর্তমানে দেশে হিজড়া-যৌনকর্মী-প্রতিবন্ধীসহ অনগ্রসর লোকের সংখ্যা প্রায় এক কোটির কাছাকাছি। তারা সুবিধা বঞ্চিত। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও এদের দলিত হিসেবে আইনি স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য অনেক আন্দোলন করতে হচ্ছে। অথচ তারা এ দেশেরই নাগরিক কিন্তু বৈষম্যের শিকার। একটি স্বাধীন জাতির জন্য এরচেয়ে দুঃখের বিষয় আর কি হতে পারে?
গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত এক সেমিনারে আইনমন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক বলেছিলেন, বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনের জন্য এই দেশ স্বাধীন হয়েছে। এ দেশের সংবিধানও বৈষম্যকে সমর্থন করে না। তবে ‘বৈষম্য বিলোপ আইন’ হবে প্রচলিত আইনগুলোর সঙ্গে কিছুটা সাংঘর্ষিক। এই আইন পাস করে আমাদের যুগোপযোগী করতে হবে। আশা করি ২০১৫-এর ডিসেম্বরের মধ্যে এ আইন পাস হবে। তিনি বলেন, শুধু আইন পাস করে দলিত শ্রেণি ও অনগ্রসরদের সমান সুযোগ-সুবিধা দেয়া সম্ভব নয়। এর জন্য মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। নইলে এ আইনে বাধা আসবে। এ জন্য সে বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আলোচনা সভা, সেমিনার আয়োজন করতে হবে। মন্ত্রী বলেন, পুলিশ যদি কোনো মামলা না নেয় তাহলে কোর্টে মামলা করতে পারেন। কোর্টের ক্ষমতা আছে মামলা নেয়ার। কোর্ট মামলা নিতে বাধ্য। পরে মামলার তদন্ত কিংবা এজাহারের জন্য পুলিশকে তদন্তের জন্য নির্দেশ দেবে কোর্ট। আমার প্রশ্ন হচ্ছে- বাংলাদেশের মানুষ পুলিশকে বিগড়ে কি কিছু করার সাহস রাখেন? তারা কি গেল ৪৫ বছরে এই শক্তি অর্জন করতে পেরেছেন?
বাংলাদেশে এখন যা হচ্ছে- তা হওয়ার কথা ছিল না। মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায়। এই দেশে মনিপুরী, সাঁওতাল, চাকমা, মারমা, গারো, হাজং, টিপড়া, খাসি, মুরং, রাখাইন এবং সেন্ধুসহ প্রায় পঁয়তাল্লিশটি জাতিসত্তার বসবাস। বাংলাদেশের আদিবাসী, সংখ্যালঘু হবেন কেন? ধর্ম বিশ্বাস দিয়ে তাদের বিচার করা হবে কেন? সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে- সমাজের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একধরনের রাষ্ট্রীয় অবিচার বন্ধ করতে হবে। যারা ক্ষমতায় আছেন- তাদের মনে রাখা দরকার, সাধারণ মানুষ দ্রোহী হয়ে উঠলে যেকোনো কালো শক্তি তাদের মদদ দিয়ে মোড় ভিন্ন খাতে প্রবাহের চেষ্টা করতে পারে। এতে ক্ষতি হতে পারে রাজনীতির, ক্ষতি হতে পারে উন্নয়নের। না- বাংলাদেশে ধর্ম পরিচয়ে মানুষের ওপর নিপীড়ন চলতে পারে না। সংখ্যালঘু বলে কারো অধিকার হরণ হতে পারে না। রাষ্ট্রকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে সব সময়।

সর্বশেষ সংবাদ