সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও মানবিক প্রতিরোধ--ফকির ইলিয়াস : কবি ও সাংবাদিক।

পোস্ট করা হয়েছে 11/11/2016-08:30pm:    ফকির ইলিয়াস, যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ প্রতিনিধিঃ========= আমি যে দেশটিতে থাকি এখানে বহুজাতিক, বহুভাষিক মানুষের বাস। অনেক ধর্মাবলম্বী, মতাবলম্বী মানুষ। কারো সঙ্গে কারো কোনো মিল নেই। এরা চাইলে কিন্তু খুব সামান্য বিষয় নিয়েই প্রতিদিন দাঙ্গা করতে পারতো। না- তেমনটি এখানে হচ্ছে না। হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক- আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলছি। এটি এমন একটি দেশ, মানুষ মানুষের বুকের পাঁজর চিবিয়ে খেয়ে ফেলতো! যদি এ দেশে কঠোর আইন না থাকতো। না- তারা তা পারছে না। পারবে না। পারবে না এ জন্য, এমন কিছু করলে তাদের কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। তাই এ জীবনবাজি রেখে ‘রায়ট’ করবে কে?
পাক-ভারত উপমহাদেশ জন্ম নিয়েছে কিংবা বিভক্ত হয়েছে ‘রায়ট’-এর মধ্য দিয়ে। কী ঘটেছিল- তা আমাদের কারোরই অজানা নয়। এ জন্মইতিহাস নিয়েই জন্মেছে পাকিস্তান-ভারত, পরবর্তীকালে বাংলাদেশ। একটি ভূখণ্ডে ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’, ‘শত্রু সম্পত্তি আইন’ করা হয়েছে। মানুষে মানুষে ধর্মের বিভাজন করা হয়েছে সেভাবেই খুব পরিকল্পিতভাবে।
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় অসংখ্য হিন্দু তাঁদের ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। কারণ জিন্নাহ’র দ্বিজাতি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি নতুন দেশে তাঁদের অস্তিত্ব রক্ষা করা প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। এর পরে প্রথমে ১৯৫০ এবং তার পর ১৯৬৪ সালে পূর্বতন পূর্ব পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে আবার বহু হিন্দুকে নিরাপত্তার জন্য ভারতে পালিয়ে যেতে হয়। ১৯৭১ সালে হিন্দুরা আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে, এ বিশ্বাসে দখলদার পাক সেনা এবং তাদের সহযোগীরা প্রবল প্রতিশোধস্পৃহায় খুঁজে খুঁজে হিন্দু-নিধন চালিয়েছিল। বহু হিন্দু বুদ্ধিজীবী, সমাজসেবী, শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে থাকা সহস্রাধিক হিন্দু ছাত্রকে হত্যা করা হয়েছিল সে সময়ে।
১৯৭১ সালের ১ নভেম্বর তারিখে ইউএস সিনেট কমিটিকে দেওয়া একটি প্রামাণ্য প্রতিবেদনে সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি লিখেছিলেন, “সব থেকে বেশি আঘাত এসেছে হিন্দুদের উপর, যে সম্প্রদায়ের মানুষদের জমি কেড়ে নেওয়া হয়েছে, দোকান লুট হয়েছে, পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। কিছু জায়গায় তাদের শরীরে হলুদ রঙ দিয়ে ‘এইচ’ লিখে দেওয়া হয়েছে... আর এ সবই হয়েছে ইসলামাবাদের সামরিক শাসকদের আদেশ এবং অনুমতিক্রমে।” এরপরের বাংলাদেশের চিত্র কী বলে? ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রের জনক শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পরে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়কে আক্রমণের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। সেই সময় ধর্ষণসহ নানা পাশবিক অত্যাচার করে হিন্দু পরিবারগুলিকে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে, এ রকম অনেক উদাহরণ আছে।
একইভাবে ১৯৯০ সালে এরশাদের সামরিক সরকারের পতনের পর হিন্দুদের উপর আক্রমণ চালিয়ে জামায়াত কর্মীরা তাদের দেশ ছাড়তে অথবা ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করে। সেই সঙ্গে আগুন লাগিয়ে এবং ভাঙচুর চালিয়ে ধ্বংস করা হয় তাদের বাড়িঘর, ব্যবসার জায়গা এবং উপাসনাস্থল। এ সময়ে হিন্দুদের জমি ও অন্যান্য সম্পত্তিও লুট করা হয়েছিল।
এ ধারাবাহিকতা চলেছেই। একটি উদাহরণ দিতে পারি। ২০০১ সালের নির্বাচনোত্তর হিন্দু-বিরোধী হিংসাত্মক কাণ্ডকারখানার তদন্তে নেমে বিচারপতি এম সাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন বিচার বিভাগীয় কমিশন এ ধরনের অত্যাচার বন্ধ করার জন্য কিছু সুপারিশ করেছিল। সেই সুপারিশে যে সব দুষ্কৃতকারী ২০০১ সালের অক্টোবর এবং ২০০২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ৩৫৫ জনকে হত্যা করা ছাড়াও ৩২৭০টি নির্দিষ্ট অপরাধ করেছিল, তাদের ধরার জন্য দেশের প্রতি জেলায় একটি করে তদন্ত কমিটি অথবা কমিশন গঠন করার কথা বলা হয়েছিল। জেলাগুলিতে তদন্তকারী কমিটিগুলির কাজকর্মের উপর নজরদারি করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে আলাদা সেল খোলা এবং যাঁরা হিংসার শিকার হয়েছেন, তাঁদের আইনি সহায়তা দেওয়ার কথাও এতে বলা হয়েছিল। কিন্তু এ সুপারিশগুলি মানা হয়নি। এ ধরনের হিংসাত্মক ঘটনায় জড়িত ২২০০০ জনের নাম করে কমিশন প্রায় সমস্ত অপরাধীকে চিহ্নিত করলেও রহস্যজনকভাবে কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি সরকারের পক্ষ থেকে।
অথচ এ দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে সকল সম্প্রদায়ের মানুষের রক্তগঙ্গা বয়ে গিয়েছিল। সম্প্রতি বাংলাদেশে সেই ধারাবাহিকতায় কিছু আক্রমণ করা হয়েছে। নাসিরনগর, হবিগঞ্জ, ছাতক এমন অনেক স্থানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উপর আক্রমণ করা হয়েছে। তাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফেসবুকে ইসলাম অবমাননার অভিযোগ তুলে গত ৩০ অক্টোবর নাসিরনগরে ১৫টি মন্দির এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের দেড় শতাধিক ঘরে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের গাফিলতি ছিল বলে অভিযোগ ওঠেছে। নাসিরনগরের ইউএনও মোয়াজ্জেম ও ওসি আবদুল কাদেরের উপস্থিতিতে একটি সমাবেশে ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্যের পর ওই হামলা হয়। নাসিরনগরের দত্তবাড়ির বাসিন্দা নীলিমা দত্ত বিবিসিকে বলেছেন, ‘এক মুসলমান হামলা করেছে, আরেক মুসলমান বাঁচাইছে। ওরা যদি আমাদের রক্ষা না করতো, তাহলে এখানে লুটপাট হইতো’। তিনি বলছিলেন যে এ ধরনের সাম্প্রদায়িক আক্রমণ তিনি তার জীবনে কখনো দেখেননি। হামলাকারীরা পূজামণ্ডপ ভাঙচুর করলেও মুসলমান যুবকদের বাধার কারণে বাসস্থানের ঘরে ঢুকতে পারেনি। তবে বাইরে থেকে ঢিল ছুঁড়েছে। এমনকি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও দত্তবাড়িতে এ ধরনের আক্রমণ হয়নি বলে নীলিমা দত্ত উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়েও মুসলমানদের সহযোগিতায় হিন্দুরা দত্তবাড়িতে পূজার আয়োজন করেছিল বলে এখানকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন।
নীলিমা দত্ত বলেছেন, যে হিন্দু যুবকের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে কাবাঘরকে অবমাননা করে ছবি দেওয়া হয়েছিল, তার কঠোর শাস্তি হওয়া দরকার। কে এর নেপথ্যে ছিল তা দেখা দরকার। কিন্তু সে ছবির জের ধরে সব হিন্দুবাড়ি এবং মন্দিরে কেন হামলা চালানো হলো, সে প্রশ্নের উত্তরটাই খুঁজে পাচ্ছেন না নীলিমা দত্ত।
বাংলাদেশে এখন যা শুরু হয়েছে- এর নেপথ্য মতলব কী তা খুঁজে বের করা দরকার। কেউ কি সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এ সব করছে? কেউ কি মুছে দিতে চাইছে সরকারের সকল ভালো কাজের তালিকা?
এখন সময় এসেছে মানবিক বিবেক জাগ্রত করার। এই প্রত্যয়েই কথা বলেছেন দেশের বিশিষ্টজনরা। সংখ্যালঘুদের রক্ষা করা বাংলাদেশের পবিত্র সাংবিধানিক দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেছেন সেক্টরস কমান্ডারস ফোরামের নেতারা। ফোরাম নেতারা বলেছেন, আমরা কোনো ধর্মের জন্য যুদ্ধ করিনি। আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধ করেছি। আমরা মনে করি যারা যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে চায় এ হামলায় তাদের ইন্ধন রয়েছে। এর আগে রামু এবং উখিয়াতেও একই ঘটনা ঘটেছে। এখানে যে সহিংসতা হয়েছে তা সুপরিকল্পিত। দেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে একটি চক্র এ ঘটনা ঘটিয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব) কেএম শফিউল্লাহ, মহাসচিব হারুন হাবীব ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ম. হামিদ বক্তব্য রাখেন।
একই কথা বলেছেন দেশের তথ্যমন্ত্রীও। তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেছেন, বাংলাদেশে শান্তি বিনষ্টের চক্রান্ত এখনো অব্যাহত আছে। ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও মন্দির ভাঙচুর বাংলাদেশের শান্তি বিনষ্টের চক্রান্তের একটি অংশ। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সরকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী। যুদ্ধাপরাধী ও জঙ্গি-সন্ত্রাসীরা যেমন রেহাই পায়নি তেমনি বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণকারীরা রেহাই পাবে না।
ইনু বলেন, যেহেতু বাংলাদেশের সংবিধান ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে চক্রান্ত অব্যাহত আছে সেহেতু বিএনপি ও জামায়াতের ওপর সর্তক দৃষ্টি রাখা উচিত। প্রশাসন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থা গ্রহণ করেছে। এটাই সরকারের সিদ্ধান্ত। এর বাইরে বিচ্ছিন্ন মন্তব্যকারীদের সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই।
আমরা একটি কথা প্রায়ই শুনি- ‘দেশ আপনাকে কী দিলো, তা বড় কথা নয়। আপনি দেশকে কী দিলেন- সেটাই বড় কথা’।
কথাটি মেনে নিলাম। আচ্ছা, যারা দেশকে সামান্য কিছু না দিয়েই লুটেরা সেজেছে, যারা মুনাফাখোর, চোরাকারবারি, প্রতারক, দখলদার কিংবা রাজনীতিবিদদের পালিত দালাল- এদেরকে ক্ষমতাবানরা এ বাণী শোনাতে পারেন না?
আর যারা দেশকে দিতে দিতেই না খেয়ে মরে গেলো তাদেরকে কি দেশের কিছুই দেওয়ার ছিল না? বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ঐক্যকেও মশকরা করা হয়। তারা যাবে কোথায়? যারা দখলদার ওদের সঙ্গে তারা ঐক্য করবে? মানুষ এগোচ্ছে। তাই ধর্মের দোহাই দিয়ে যারা রাজনীতি করে কিংবা করছে- এদের কাছ থেকে প্রজন্মকে দূরে সরে থাকতে হবে। ভোট আর ধর্ম এক না। ধর্ম একটি পবিত্র আমানত আর রাজনীতি রাষ্ট্র পরিচালনার দালিলিক বিষয়। ধর্মের দোহাই দিয়ে কখনোই রাজনীতি চলতে পারে না। রাজনীতির মধ্যে যারা ধর্মকে টেনে আনে তারা ধর্মকে অপমান করে। ধর্ম ধর্মের জায়গায় থাকবে আর রাজনীতি রাজনীতির জায়গায় থাকা উচিত।
সকল অপশক্তি রোখার প্রধান হাতিয়ার হলো মানুষের ঐক্য। এবং তা হতে হবে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে। তা ছাড়া একটি দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। বাংলাদেশে একটি কালোশক্তি সবসময় সোচ্চার আছে- থাকবে। এদের বিষদাঁত ভেঙে দিতে হবে। এলাকায় এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে ন্যায্যতা-সত্যের পক্ষে।
এ জন্য তরুণদের ভূমিকা হতে হবে প্রখর ও সাহসী।

সর্বশেষ সংবাদ