সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং বিপন্ন মানবতা- কামরুল হাসান বাদল-কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 06/11/2016-07:49pm:    আমার বন্ধুভাগ্য ভাল। আমার বন্ধুর তালিকায় কোন চাঁদাবাজ, অসৎ, দুর্নীতিবাজ ও সাম্প্রদায়িক এমন কেউ নেই। তেমন একজন বন্ধু, যিনি যতটা হিন্দু তার চেয়ে বেশি একজন পরিপূর্ণ মানুষ, যিনি একটি শহীদ পরিবারের সন্তান, তিনি কয়েকদিন আগে তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘দেশের সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দুদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক ঘোষণা করা হোক। তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হোক’। তার কারণ হিসেবে তিনি লিখেছেন, ‘কোন না কোন উসিলায় হিন্দুদের নির্যাতন করা কেন? তারা ভোট দেয় বলে তো। এবং স্পষ্ট করে বললে বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলকে ভোট দেয় বলে। এখন তাদের যদি ভোট দেয়ার ক্ষমতাই না থাকে। তারা যদি ভোটই না দেয় তাহলে আর নির্যাতনের প্রশ্নটি হয়ত আসবে না’। এর বাইরে আমাকে বেশ ক’জন বলেছেন, বাবা আমরা ভোটও দিতে চাই না নির্যাতনের শিকারও হতে চাই না। তবুও যেন একটু শান্তিতে বাপ-দাদার ভিটায় পূজা অর্চনা করে জীবন কাটাতে পারি।
এই প্রস্তাব হয়ত গৃহীত হবে না। হলে তো আমাদের নেতানেত্রী সমাজপতিদের মুখোশ একেবারে ল্যাংটা হয়ে যাবে। তবে আমার মতে প্রস্তাবটি মন্দ নয়। কারণ এই লেখাটি যখন লিখছি তখনও দেশের কোথাও না কোথাও মন্দির ভাঙা হচ্ছে। হিন্দুরা নিগৃহীত হচ্ছে। দু’তিন দিন আগে ইন্ডিপেনডেন্ট টিভিতে খালেদ মহিউদ্দিনের সাথে সাক্ষাৎকার দেখছিলাম দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি দায় নিয়ে বললেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিসে পুলিশের অভিযান যৌক্তিক ছিল এবং তার অনুমতি বা নির্দেশ তিনিই দিয়েছিলেন। আমি গত সপ্তাহের কলামে লিখেছিলাম কোন দলের কেন্দ্রীয় অফিসে পুলিশি অভিযান নজিরবিহীন নয়। এই কাজটি বিএনপিও করেছিল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অফিসে তাদের শাসনামলে। আমি এজন্যে সেদিনের পুলিশি অভিযানকে নজিরবিহীন না বলে খারাপ নজির হিসেবে উল্লেখ করেছিলাম। তা যাক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিসে পুলিশি অভিযানের বাহবা নেয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাঁশখালীতে শিবিরের বিরুদ্ধে অভিযানে গিয়ে জামায়াত-শিবিরের প্রতিরোধের মুখে এক প্রকার পালিয়ে এসেছে পুলিশ। এই বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় কী বলবেন? দেশের যেসব অঞ্চলে জামায়াত-শিবির- বিএনপি তাণ্ডব চালিয়েছিল সেসব এলাকায় দু’চার- পাঁচ দশজনের নামের বাইরে হাজার হাজার মানুষকে আসামি করা হয়েছে। এর ফলে প্রকৃত আসামি ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে আর মাঝখানে মামলা বাণিজ্য করতে গিয়ে পুলিশ কিছু নিরীহ মানুষকে হয়রানি করছে। এর ফলে জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলো আওয়ামী লীগের প্রতি দুর্বল না হয়ে বিরক্ত হচ্ছে এই দলের প্রতি, অভিশম্পাত দিচ্ছে আওয়ামী লীগের চৌদ্দ গোষ্ঠীকে। এর দ্বারা বিচার ব্যাহত হবে। প্রকৃত দোষীরা টাকা পয়সা বা আত্মীয়তার জোরে পার পেয়ে যাবে। কাজের কাজ কিছুই হবে না। যেমন বিগত ৪২ বছর হয় নি। স্বাধীনতার পরে বিশেষ করে ’৭৫ সালে জাতির জনককে হত্যার পরে বাংলাদেশে যে সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ রোপণ করা হয়েছিল দিন দিন পত্রপল্লবে তার বিস্তৃতি ঘটেছে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত যতগুলো সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে তার একটিরও সুষ্ঠু বিচার হওয়াতো দূরের কথা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের চিহ্নিত পর্যন্ত করা হয় নি। এবারও হবে বলে আমি মনে করি না।
সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের পরপরই দোষীদের নিয়ে পরস্পরের প্রতি দোষারোপের খেলা চলে দেশে। এই দল বলে ঐ দলের লোকেরা করেছে, ঐ দল বলে এই দল করে আমাদের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। অথচ যারা নির্যাতিত, যাদের ঘর-মন্দির ভাঙা হয়েছে তাদের কথা কেউ শুনছে না। তারা কাকে দায়ী করছে তার প্রতি কেউ কর্ণপাত করছে না। এবারও যেমন। সাঈদীর রায় ঘোষণার পরপরেই বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নৃশংসভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছে জামায়াত- শিবিরের ক্যাডাররা। তারা নির্মমভাবে হিন্দুদের বাড়িঘর জ্বালিয়েছে। মন্দির ভাঙচুর ও তাতে অগ্নি সংযোগ করেছে। থানা আক্রমণ করেছে, পুলিশ হত্যা করেছে। ট্রেন জ্বালিয়েছে। রেল স্টেশন পুড়িয়েছে। বাস-ট্রাক তথা যানবাহন ভাঙচুর ও পুড়িয়ে দিয়েছে, এক কথায় নারকীয় কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। কিন্তু এই ঘটনার পরপরই জামায়াত-শিবির এবং তাদের সাথে গলা মিলিয়ে বিএনপি এবং তার নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলছেন এই কাজ করেছে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের কর্মীরা। অথচ বাঁশখালীর ঘটনার পরপর দলের গ্রেফতারকৃত নেতাদের মুক্তি দেয়ার ৪৮ ঘন্টায় আল্টিমেটাম দিয়ে জামায়াতের নেতা শামসুল ইসলাম বলেছেন, না হলে বাকলিয়াকে বাঁশখালীর পরিণাম ভোগ করতে হবে। বাঁশখালীর হিন্দুরা বলছে তাদের বাড়িতে কারা কারা আগুন দিয়েছে, জামায়াতের নেতা বাঁশখালীর দায় নিয়ে বলছেন বাকলিয়াকে বাঁশখালীতে পরিণত করা হবে তখনও মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রীসহ তাঁর অনুসারীরা রেকর্ড বাজিয়ে যাচ্ছেন এই কাজ আওয়ামী লীগের বলে। আমি একজন অতি সাধারণ মানুষ হিসেবে বলতে চাই এইসব কাজ জামায়াত-শিবির-বিএনপি-আওয়ামী লীগ যেই করে থাকুক মুসলমানরা করেছে তো! তাহলে প্রশ্ন হলো দেশের সংখ্যাগুরু মুসলিমরা এই কাজ করলো কিভাবে। এবং আস্তিকতার সার্টিফিকেট প্রদানকারী মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী এই বিষয়ে কি বলবেন। বা দেশের আলেম সমাজরা কি জবাব দেবেন। এই দায় তো দেশের সংখ্যাগুরু মুসলিমদের। না কি আবার এও শুনতে হবে এই আগুন ভাঙচুর হিন্দুরা নিজেরা নিজেরা করে মুসলিমদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দিচ্ছে। আমি পুনরাবৃত্তি করে বলছি, যে দলই করুক তা কোন না কোন মুসলিমের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে তো। তাহলে দেশের আলেম-মাশায়েখদের কাছে বিনীতভাবে প্রশ্ন রাখতে চাই এই কাজ একজন মুসলিম করতে পারে কি না? করলে তার সাজা হওয়া উচিৎ কি না? সাজা হওয়া উচিৎ হলে এত বছর কারো সাজা হলো না কেন? শুনেছি পুলিশ বাঁশখালীতে মাত্র ২০ জনের নামে চার্জশীট দিয়েছে। তাহলে এত বড় একটি উপজেলায় মাত্র ২০ জনই এমন ধ্বংসযজ্ঞ ঘটিয়েছিল? এরশাদ তাঁর শাসনের শেষ দিকে ক্ষমতায় টিকে থাকার উদ্দেশ্যে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়েছিল। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত-ক্ষমতায় এসে নির্মমভাবে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়েছিল। সে সব ঘটনাতো ধামা চাপা পড়ে গেছে কত আগে। এরপরে বর্তমান সরকারের আমলেই শুধু চট্টগ্রামের পাথরঘাটা, নন্দির হাট, রামু, পটিয়া ও অনেক স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ পরিচালিত হয়েছে তার খবর কি, সে মামলাগুলো এখন কি অবস্থায় আছে তাও তো আমরা জানি না। আমারতো মনে হয় সময়ের সাথে সাথে বর্তমানে সংঘটিত ঘটনাগুলোও তলিয়ে যাবে অন্যকোন ডামাডোলে। এ দেশের মুসলিমরা যখন অন্যকোন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ করে তখন কি তারা একটুও ভাবে না অন্যদেশের সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর হামলা হলে বা যখন হামলা চলে বা মুসলিমরা নিগৃহিত হয় সে সময়ের পরিস্থিতির কথা। যারা নিজ দেশের সংখ্যালঘুদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে পারে না তারা অন্যদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতনের নামে মুসলিমদের নিগ্রহের বিরুদ্ধে বলার নৈতিক শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলেন। একথা কে কাকে বোঝাবে? আমার অনেক হিন্দু বা ধর্মীয় সংখ্যালঘু বন্ধু আছেন। যাঁদের সামনে দাঁড়াতে আমি কুক্তিত হই এখন। তাঁদের স্ত্রী-সন্তানের সামনে আমার মাথা হেট হয়ে যায়। আমার সন্তানতুল্য ওদের সামনে আমার নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হয়। যখন আমি ভাবি আমি কিংবা আমার মতই কেউ না কেউ ওদের বিশ্বাসের ঘর, পুজোর ঘর, প্রতিমার ঘর, উপাসনালয় ভেঙেছি, আগুন দিয়েছি এবং কোথাও কোথাও নিষ্পাপ নারীদের শরীরে হাত দিয়েছি।
মানুষ হিসেবে তখন প্রচণ্ড বিপন্ন বোধ করি।
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কলাম লেখক

সর্বশেষ সংবাদ