আমাদের প্রকৃত উন্নয়ন কোনটি- কামরুল হাসান বাদল-কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 27/10/2016-08:49pm:    ১। শিশুটির বয়স মাত্র ৫ বছর। বলতে হবে কোলের শিশু। নিখোঁজ হওয়ার একদিন পরে... বাড়ির পাশে একটি হলুদ ক্ষেতে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় পাওয়া যায় তাকে। তার গাল, গলা, হাত ও পায়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন। শরীরে কামড়ের দাগ। উরুতে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়ার মতো ক্ষত। দিনাজপুরে ধর্ষণের শিকার শিশুটিকে গত মঙ্গলবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি করা হয়। শিশুটির এই অবস্থা দেখে ওসিসিতে কর্মরত ব্যক্তিরাও মুষড়ে পড়েছেন। তাদের একজন বিলকিস বেগম বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন বিভিন্ন ভিকটিম দেখি, বলতে গেলে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
কিন্তু এই শিশুটিকে দেখার পর স্বাভাবিক থাকতে পারছি না। চিকিৎসক হয়েও নিজেকে সামলাতে পারছি না’। চিকিৎসকরা বলেছেন, ‘শিশুটি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, তার কতটুকু ক্ষতি হয়েছে বা অস্ত্রোপচার করে কতটুকু ভালো করা সম্ভব তা আজ (বৃহস্পতিবার) বলা যাবে।’
গত মঙ্গলবার শিশুটি নিখোঁজ হয়। মাইকিং, মসজিদে ঘোষণা দেওয়াসহ নানাভাবে শিশুটির খোঁজ করে পরিবার। পরের দিন গুরুতর অবস্থায় পাওয়া গেলে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতাল, তারপর রংপুর মেডিকেল এবং শেষে ঢাকা মেডিকেলের ওসিসিতে ভর্তি করা হয়। শিশুটি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। বাবা একজন পিকআপ চালক। এই ঘটনার নায়ক ৩৮ বছর বয়স্ক সাইদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শিশুটির বাবা বলেছেন যে ধর্ষণ করেছে শিশুটিকে তাকে শিশুটি জ্যাঠা বা বড় আব্বা বলে ডাকতো। আর তিনি নিজেই সাইফুলকে বড় ভাই হিসেবে দেখতেন।
২। চট্টগ্রাম শহরের ষোলশহর তালতলা বস্তি এলাকায় একটি ছয় বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে ৩০ বছরের এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শিশুটিকে গত সোমবার রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি)তে ভর্তি করা হয়েছে। শিশুটির মা সংবাদ মাধ্যমে বলেছেন, শুক্রবার তাঁরা মেয়েকে বাসায় রেখে জরুরি কাজে বাইরে যান। এ সুযোগে প্রতিবেশি এক যুবক তাঁর মেয়েকে ধর্ষণ করে। কিন্তু ভয়ে প্রথমে শিশুটি কাউকে কিছু বলেনি। ৩। চট্টগ্রামে বাসা থেকে আশামনি নামে ২৫ বছরের এক পোশাককর্মীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নগরের ইপিজেড থানার ওয়াসা গলির একটি বাসা থেকে লাশ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় আশামনির স্বামী দিনমজুর খালেক শাহকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ‘দাম্পত্য কলহের জেরে’ এই ঘটনা ঘটতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
৪। ঝিনাইদহ শহরের উপশহর পাড়ায় বখাটে যুবকের খুরের আঘাতে পূজা বিশ্বাস নামে নবম শ্রেণির এক ছাত্রী আহত হয়েছে। প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় সোমবার সন্ধ্যায় লিটু নামে ওই বখাটে যুবক খুর দিয়ে আঘাত করে পূজাকে। পূজার বাবা মামলা করলে পুলিশ লিটুর সহযোগী বলে এক দম্পতিকে আটক করে।
৫। নির্যাতনের শিকার নয় বছরের শিশু জান্নাতুল ফেরদৌসের মাথায় গত মঙ্গলবার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। জান্নাতুল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন। একটি পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে তার চিকিৎসক বলেছেন, ‘জান্নাতুলের মাথার মাঝখানে চামড়াসহ কিছু জায়গায় মাংস নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। অস্ত্রোপচার না করলে সংক্রমণে তার হাঁড় নষ্ট হয়ে যেত। ভবিষ্যতে আর চুল গজাতো না। মাথার খুলি থেকে চামড়া আলাদা করে অস্ত্রোপচার করতে প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় লাগে।’ গাজীপুরের জয়দেবপুরে এক বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতো জান্নাতুল। জান্নাতুল ফেরদৌস, বেহেস্তের নামে যার নাম সেই মেয়েটির জন্য এই বাসাটি দোযখ হয়ে উঠেছিল গৃহকর্তা ওমর ফারুক ও তার স্ত্রী মনি বেগমের অত্যাচারে। গরম ইস্ত্রি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়ার কারণে তার মাথার তালুর অনেক জায়গা জুড়ে ঘা ছিল। খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়ায় তার শরীরেও ছিল অসংখ্য দাগ। ৬। প্রিয় পাঠক, আমাকে ক্ষমা করবেন। কিছু নিষ্ঠুর, হৃদয় বিদারক ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আজকের লেখাটি শুরু করেছি। আপনার সুন্দর সকাল উদযাপনের ক্ষণটিকে বিষাদময় করে তুলেছি। এটুকু লেখার পরে আমি নিজেও বিমর্ষ হয়ে পড়েছি। আমি বিপন্নবোধ করছি। লেখার স্বার্থে, কোনো বিষয় জানতে সংবাদটি বিস্তারিত পড়তে হয়। কিন্তু আমি দিনাজপুরের পাঁচ বছরের শিশুটির ঘটনাটি পুরো এবং বিস্তারিত পড়তে পারিনি। ভাবছি ‘এটা কী করে সম্ভব?’ পাঁচ বছরের শিশুটি যাকে বড় আব্বা বলে ডাকে সেই লোক, ৩৮ বছর বয়সের লোক, শিশুটির পিতা যাকে বড় ভাই হিসেবে দেখে ও সম্বোধন করে তার পক্ষে এই শিশুটিকে এমন করে নির্যাতন করা সম্ভব হলো কীভাবে? কী হয়েছে আমাদের সমাজের? গৃহকর্মী শিশু জান্নাতুলের মাথায় আঘাত করে করে তালুতে পচন ধরিয়ে দিয়েছে গৃহকর্তা ও তার স্ত্রী। তেমনি করে কি আমাদের সমাজের মাথায়ও পচন ধরেছে? জরুরি কোনো অপারেশনের প্রয়োজন কি হয়েছে তবে? আমরা পচে গেছি? বিনষ্ট হয়ে গেছি? সমাজটাকে কি খুব দ্রুত ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস (ওসিসি) সেন্টারে ভর্তি করা দরকার? আমরা কি কেউ দেখছি সমাজটাকে। ভাবছি সমাজ নিয়ে? আমাদের পচে যাওয়া গলে যাওয়া বিকৃত হয়ে যাওয়া মূল্যবোধ নিয়ে? নিষ্ঠুরতা নিয়ে বীভৎসতা নিয়ে?
হ্যাঁ আমরা দেখছি না। দেখার চেষ্টা করছি না। পাছে সেখানে নিজের মুখও দেখতে পাবো বলো। নিজের কুৎসিত, কদর্য চেহারা ভেসে উঠবে বলে আমরা সেদিকে তাকাতেও ভয় পাচ্ছি। আমরা প্রতিনিয়ত প্রতারণা করছি। নিজের সাথে, সমাজের সাথে, নিজের সন্তান-সন্ততির কাছে। এই দীনতা, এই ভীরুতা, এই লুকোচুরি, এই ব্যর্থতা ঢাকতে আমরা ঝলমলে কিছু গল্পের অবতারণা করি। সে গল্প রাষ্ট্রের এগিয়ে চলার গল্প। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির গল্প, পদ্মা সেতুর গল্প।
কর্ণফুলী টানেলের গল্প, সিক্স লেনের গল্প, নতুন পাঁচ তারকা হোটেলের গল্প, হাতির ঝিলের গল্প, অ্যালিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ের গল্প, ফ্লাইওভারের গল্প, আলো ঝলমলে ফোয়ারার গল্প, শপিং মলের গল্প, আন্তর্জাতিক খাদ্য উৎসবের গল্প, প্রতিযোগিতা দিয়ে নিজেদের সাফল্য তুলে ধরার গল্প। যেখানে জান্নাতুলদের জন্য কোনো জান্নাতের বিধান থাকে না। হাজার বাতির আলোর নিচে পড়ে থাকে মানুষের প্রকৃত ইতিহাস।
একটি জাতি বা রাষ্ট্রকে ততটুকু সভ্য বলা হয় যতটুকু সভ্য আচরণ সে জাতি তার শিশু ও নারীদের সাথে করে থাকে। সে হিসেবে আমরা যে সভ্যতার স্পর্শও পাইনি তা নিশ্চিত করে বলা যায়।
প্রশ্ন হলো অবকাঠামো উন্নয়নই কি একটি জাতি বা রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন? মানব সভ্যতার উন্নয়ন না করে, মানব সম্পদের উন্নয়ন না করে, মানবিক উন্নয়ন না করে শুধু শুধু দৃশ্যমান উন্নয়নই কি সবকিছু? সমাজের ভিতরে যে অনাচার, অত্যাচার, নিষ্ঠুরতা, বীভৎসতা গেড়ে বসেছে তা থেকে উত্তরণের উপায় কি খুঁজতে হবে না?
মাত্র কিছুদিন আগে বদরুল নামের এক বখাটে প্রকাশ্যে কুপিয়েছে খাদিজাকে। সে সময় আমরা লক্ষ্য করেছি সমাজের ভিতরে এই বদরুলদের চিহ্নিত করার চেয়ে, এই পৈশাচিকতার মূল খুঁজে বের করার চেয়ে বদরুল কোন দল করতো তা নিয়েই আলোচনা করেছি বেশি। বদরুলদের বিচার কীভাবে সহসা হবে, দৃষ্টান্তমূলক হবে সে আলোচনা আড়াল হয়ে গেছে। বদরুলের এই ঘটনা শেষ ঘটনা নয়। একইভাবে প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে লিটু খুর দিয়ে আঘাত করেছে পূজাকে। সৌভাগ্যক্রমে হয়ত বেঁচে গেছে পূজা। হয়ত বেঁচে যেতে পারে খাদিজাও। কিন্তু ঘটনাতো এখানে শেষ হবে না। আবার কোথায় না কোথায় কোনো না কোনো খাদিজা বা পূজা আক্রান্ত হবে কোনো বদরুল বা লিটুর মতো বখাটের হাতে। এটিই কি চলতে থাকবে সমাজে?
বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে যদি বেরিয়ে আসতে না পারি তাহলে এসব ঘটনা সমাজে ঘটতেই থাকবে। এখানে একটি কথা মনে রাখা দরকার বিচারের দীর্ঘসূত্রতা বিচারহীনতারই নামান্তর। এখন বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন আসলে সেখানে বিচার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন আসবে। বিচারক সংকটের কথা আসবে। বিচারক সংকটের প্রশ্ন আসবে। বিচার ব্যবস্থার সামর্থ্যের প্রশ্ন আসবে। কিন্তু একটি জাতির উন্নয়নের জন্য শুধু ফ্লাইওভার, টানেল, আর হোটেল-মোটেল শপিংমলই যথেষ্ট নয়। সরকারের এখন সামর্থ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য সরকার টাকা নিয়ে বসে আছে। শুধু প্রকল্প দাখিল করলেই হলো। প্রয়োজন ১০০ ভাগ থাকুক বা না থাকুক, বরাদ্দ হয়ে যাচ্ছে ঠিকই। কিন্তু সমাজে ন্যায় বিচারের জন্য, সমাজকে বাসযোগ্য ও মানবিক করে তোলার জন্য বরাদ্দ কত? এবং তা কোন কোন খাতে তা বুঝতে পারছি না।
বিচারের বাণী নীরবে কেঁদেছে অনেককাল। এবার তার ক্রন্দন থামাতে হবে। বিচার প্রাপ্তির অধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে আদালতের সংখ্যা বাড়াতে হবে। বিচারকের সংখ্যা কয়েকগুণ বৃদ্ধি করতে হবে। বিচারে সুবিধা জনগণের নাগালের মধ্যে আনতে হবে। প্রয়োজনে প্রতিটি বিভাগে উচ্চ আদালতের সেশন কোর্ট বসানোর ব্যবস্থা করতে হবে এবং বিচার দ্রুত করতে হবে।
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা নতুন কিছু নয়। সবদেশেই কমবেশি আছে। আমাদের দেশের সমস্যা হচ্ছে এসব ঘটনার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয় না। যে কারণে এমন অপরাধ সংঘটিত করতে অন্যরা উৎসাহিত হচ্ছে। ৭। বিশ্বের এক নম্বর গণতন্ত্রের (!) দেশ বলে খ্যাত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। আর সে সাথে নির্বাচনে অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনেক কীর্তিকলাপ সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। নারীদের নিয়ে অমার্যাদাকর ও বিতর্কিত কথাবার্তার কারণে ট্রাম্প ইতিমধ্যেই নিন্দিত হচ্ছেন বিভিন্ন স্তরে।
বাংলাদেশে কোনো ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে কিছু কিছু উগ্র নারীবাদীরা এমনভাবে পুরুষদের আক্রমণ করেন তা দেখে, তাদের শব্দ ও ভাষা প্রয়োগ দেখে মাঝেমধ্যে ভীষণ আহত হই। তাদের জ্ঞাতার্থে সবিনয়ে জানাতে চাই, বিশ্বের সকল পুরুষ সাইফুল বা ট্রাম্প নন। নির্যাতিত, অপমানিত নারীর পাশে দাঁড়ানো পুরুষের সংখ্যা এখনো বহুগুণ বেশি।

সর্বশেষ সংবাদ
সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয়ে মুজিববর্ষে একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনেরও আহ্বান:প্রধানমন্ত্রীর বিএনপির গণতন্ত্র হচ্ছে ‘মুখে শেখ ফরিদ আর বগলে ইট:সেতুমন্ত্রী আইসিটির সমন্বয়ক হান্নান খানের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক সবাই মিলে দিব কর, দেশ হবে স্বনির্ভর:রাষ্ট্রপতি রেল সেতুটির নির্মাণ সম্পন্ন হলে আমাদের দেশ এগিয়ে যাবে:প্রধানমন্ত্রী একুশে পদকপ্রাপ্ত ওস্তাদ শাহাদাত হোসেন চলে গেলেন না ফেরার দেশে আজ বহু প্রতীক্ষিত বঙ্গবন্ধুর রেল সেতুর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী ব্রেকিং নিউজ »আজ থেকে শীতের প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা সরকারের সরলতাকে দুর্বলতা ভাববেন না:সেুতুমন্ত্রী মিরসরাইয়ে যুবলীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত