আওয়ামী লীগ বদলালে বাংলাদেশ বদলাবে-কামরুল হাসান বাদল-কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 21/10/2016-12:56pm:    কথাটি আমার নয়, ২০১০ সালে কোনো এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এই মন্তব্যটি করেছিলেন। এ নিয়ে এবং একই শিরোনামে দু’কিস্তির একটি উপসম্পাদকীয়ও লিখেছিলাম এই কাগজে। কথাটি আমার মনে ধরেছিল। শুধু মনে ধরেনি অনেকের মতো আমিও বিশ্বাস করি সত্যি সত্যি আওয়ামী লীগ বদলালে বাংলাদেশও বদলাবে।
পৃথিবীটাই পরিবর্তনশীল। কাজেই পরিবর্তনের মধ্যে কোনো দোষ খোঁজার কথা নয়। তবে পরিবর্তনটি যেন ইতিবাচক হয়, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আরও আধুনিক, আরও কল্যাণকর যেন হয়। এই দলটির জন্মও হয়েছিল পরিবর্তন বা বদলে যাওয়ার তাগিদে। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন (স্মর্তব্য ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম বাগানে মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় ইংরেজদের কাছে বাংলার পতন হয়েছিল এবং এর পথ ধরেই পরে পুরো ভারতবর্ষে ১৯০ বছর রাজত্ব করে ইংরেজরা) পুরান ঢাকার কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে একটি নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশের তাগিদে যাঁরা একত্রিত হয়েছিলেন তাদের অধিকাংশই দু’বছর আগেও ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ োগান দিয়েছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই-সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু সেই তথাকথিত স্বাধীনতার মাত্র দু’বছরের আগে তাঁরা ঠিকই অনুধাবন করেছিলেন যে একটি পরিবর্তন দরকার। মুসলিম লীগের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানিদের স্বার্থ রক্ষা হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির কোনোরূপ স্বার্থরক্ষা হবে না। ফলে মুসলিম লীগ প্রভাবিত রাজনীতিকে বদলে দেওয়ার, জনগণকে বদলে দেওয়ার, দেশকে বদলে দেওয়ার অভিপ্রায় থেকে সেদিন জন্ম নিল ‘পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। এই রাজনৈতিক দল গঠন এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এই দলের প্রতিষ্ঠার এক বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বাঙালি ছাত্রদের মধ্যে প্রবল অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ভাষা রক্ষার দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলন দিন দিন জনপ্রিয়, বিস্তৃত ও শক্তিশালী হচ্ছে। তাই এই দলের আত্মপ্রকাশ ভাষা সংগ্রামকে তখন উজ্জীবিত ও বেগবান করেছিল। ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত ঘটনার পর পাকিস্তান সরকার বেকাদায় পড়ে। বাংলাভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে দেশ ও বিদেশে প্রবল জনমত তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানি জান্তাও নমনীয় হতে শুরু করেছে। এই রাজনৈতিক দলটি গঠিত হওয়ার মাত্র ছয় বছরের মাথায় যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে অংশ নেয় এবং সে নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে। যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভায় এই দলের কয়েকজনকে নেওয়া হয় তার মধ্যে তৎকালীন তরুণ রাজনীতিক শেখ মুজিবুর রহমান অন্যতম। অবশ্য তিনি তখন দলের সাধারণ সম্পাদক। ১৯৫২ সালে ভারপ্রাপ্ত ও তার পরের বছর...‘মুকুল’ প্রেক্ষাগৃহে সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি পূর্ণ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি এই পদের দায়িত্ব পরিচালনা করেন। শুরুতে দলটির নামের সঙ্গে মুসলিম শব্দটি যুক্ত থাকলেও ১৯৫৫ সালের কাউন্সিলে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত ঘটনা এবং এর মধ্য দিয়ে মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলার মধ্য দিয়ে নব উন্মেষ ঘটে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার। যে চেতনা বাঙালির আদি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার দ্ব্যর্থহীন প্রকাশ। সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তান যে সকল ধর্ম-বর্ণ ও ভাষাভাষির মাতৃভূমি নয় তা পাকিস্তানি শাসক দল তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে প্রকাশ করা অব্যাহত রেখেছিল। ফলে তৎকালীন পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষের মধ্যেও জাগ্রত হতে থাকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা। এটি বুঝতে পেরে এবং দেশে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও চেতনার প্রসারের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ নিজেদের বদলে ফেলে এবং দলকে একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল হিসেবে গঠন করার প্রত্যয়ে দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়। ততদিনে এই দল পাকিস্তানের অন্যতম বিরোধীদলে পরিণত হয়ে ওঠে। ১৯৬২ সালে হামদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরোধীতা করে এই দল তাদের নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে তোলে।
১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সে যুদ্ধে পাকিস্তানি শাসক দল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত রেখে শুধু পশ্চিম পাকিস্তানেই পূর্ণ সামরিক শক্তি নিয়োজিত করে। শেখ মুজিবুর রহমান, তখনো বঙ্গবন্ধু হননি, দলের সভাপতি নির্বাচিত হয়েই যুদ্ধ পরবর্তী রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পাকিস্তানের শাসন-শোষণ ও বঞ্চনার প্রতিবাদে তিনি প্রণয়ন করেন ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি। যেখানে আলাদা মুদ্রা ব্যবস্থাসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আলাদা আধা সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার দাবি সংযুক্ত করেন। এভাবে পাকিস্তানের শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলনকে স্বাধীকার আন্দোলনে পরিণত করেন। এখানেও আওয়ামী লীগ নিজেদের বদলে দেবার চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। এর পরের ইতিহাস সকলের জানা ইতিহাস। স্বাধীকার আন্দোলনকে কীভাবে বঙ্গবন্ধু তার দলের নেতৃত্বে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে পরিণত করে তোলেন।
দল ছাড়া বাকি সবদল ও গণমানুষের অংশগ্রহণে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয় এবং দেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। স্বাধীনতার পর দেশ গঠনের প্রাক্কালে বেশ কিছু অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় দেশে। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ও কিছু উগ্র কমিউনিস্ট দলের কারণে দেশ পরিচালনায় সরকারকে বিভিন্ন সময় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের পর তাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সে সময়ের দুটি অন্যতম রাজনৈতিক সংগঠন কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি’র সাথে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গড়ে তোলা হয় ত্রিদলীয় জোট। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষও তাকে কেন্দ্র করে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করা এবং দেশকে সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় পুরোপুরি পরিচালিত করার অভিপ্রায়ে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ তথা বাকশাল গঠন করেন। প্রশাসনকে বিকেন্দ্রিকরণ ও জনপ্রতিনিধিদের আরও বেশি জনসম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে তিনি প্রতিটি জেলায় একজন গভর্নর নিয়োগ করেন। (যাঁরা জাতীয় সংসদের সদস্য)। বাকশাল কর্মসূচিটি একটি যুগান্তকারী আন্দোলন। শুধুমাত্র পূর্ণ প্রয়োগ ও এর সুফল পাওয়ার আগেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর একটি ভুল ব্যাখ্যা রয়ে গেছে রাজনীতি ও সমাজে। আমি লক্ষ করেছি আওয়ামী লীগ বা এর কোনো নেতাকে বাকশালি বলে সম্বোধন করলে তিনি অপরাধবোধে সংকুচিত হয়ে পড়েন। এটি ঘটে কারণ এঁদের বেশিরভাগই বাকশাল কর্মসূচিটি পূর্ণাঙ্গভাবে অধ্যয়ন করেননি। তিনি এ বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান রাখেননি। ফলে বাকশাল একটি রাজনৈতিক গালিতে পরিণত হয়েছে দেশে। আওয়ামী লীগ বিরোধীরা এর রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে, যেখানে একটি মাত্র জাতীয় দলের কথা বলা আছে, আওয়ামী লীগকে কোনঠাসা করার চেষ্টা করে। কিন্তু বাকশালের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে কিছুই বনে না। বাকশালের গ্রাম সমবায় নিয়ে কিছু বনে না, সবুজ বিপ্লব নিয়ে কিছু বণে না, কৃষি বিপ্লব নিয়ে কিছু বলে না। শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে বলে না। পরবর্তী সময়গুলো প্রশাসনিক বিন্যাসে বাকশালকে অনুসরণ করলেও মুখে তা বলে না। বঙ্গবন্ধুর বাকশাল কর্মসূচির গ্রাম সমবায় ধারনাকে অনেকে বিভিন্ন প্রকারে কাজে লাগালেও মুখে তা বলেনি কখনো। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে যে শক্তির উত্থান হয়েছে দেশে তারা বাকশালের বিরুদ্ধে এত অপ্রচার চালিয়েছে যে অল্প জানা আওয়ামী লীগ নেতারাও বাকশালকে খারাপ বলে মেনে নিয়েছেন। জিয়াউর রহমানের আমলে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন নেওয়ার সময় তাই সঙ্গত কারণে দলটি পুনরায় আওয়ামী লীগ নাম নিয়ে নিবন্ধিত হয়। এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে নিজেদের মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। যেহেতু বাকশাল নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নেতিবাচক ধারণা আছে এবং এর বিরুদ্ধে প্রচুর প্রপাগান্ডা চালানো হয়েছে সেহেতু দলটি আর বাকশালের দায় নিতে আগ্রহী হয়নি। অবশ্য সে সাথে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পরিবর্তনও বিষয়টিকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে। গত শতকের আট দশক জুড়েই আওয়ামী লীগকে টিকে থাকার পুনর্গঠিত করার এবং একই সাথে এরশাদের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হয়েছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে দলটিকে ক্ষমতায় আসতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের রাজাকার তোষণ নীতি গোলাম আজমের নাগরিকত্ব বিষয়ক মামলা, আন্দোলন এবং শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলন ইত্যাদিতে আওয়ামী লীগ স্বতস্ফূর্ত সমর্থন প্রদান করে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন সফল হওয়ার পর দেশের তরুণ সমাজে রাজাকারবিরোধী আন্দোলন জনপ্রিয় হতে শুরু করে। সে ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ২১ বছর পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে। তবে সে সংসদে দলের অবস্থান খুব বেশি জোরালো না হওয়ায় অনেক সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে সক্ষম হয়নি সে সময়ের শেখ হাসিনার সরকার। তারপর খালেদা-নিজামীর শাসন। এক এগারোর মতো ঘটনা। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ধস নামানো বিজয়। ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম যে আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন তা পত্রপল্লবে বর্ধিত হয়ে সারা দেশে গণআন্দোলনে রূপ নেয়। কোটি কোটি তরুণ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে। নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ এই আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বিজয় লাভ করলে বিচারের প্রতিশ্রুতি দেয়। ফলে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এবং সর্বশেষ জামায়াত ইসলামীর শীর্ষ নেতা মীর কাশিমের ফাঁসির রায় কার্যকর করার মধ্য দিয়ে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করে আওয়ামী লীগ সরকার।
আওয়ামী লীগের এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় আমরা লক্ষ করব। প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই এই দলটি জনগণের কথা বলতে চেয়েছে। জনগণের অধিকার স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য লড়াই করেছে। সময়ের প্রয়োজনে, জনগণের কল্যাণের প্রয়োজনে দলটি বারবার নিজেদের বদলে নিয়েছে, সময়- উপযোগী করে নিয়েছে। সংগ্রাম-আন্দোলনের দল আওয়ামী লীগ। নির্বাচনমুখী দল আওয়ামী লীগ। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রথমে পাকিস্তানি শাসকশ্রেণি কর্তৃক এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পাকিস্তান প্রেমীদের কর্তৃক বারবার হত্যা-ষড়যন্ত্রের শিকার হলেও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি, হত্যার রাজনীতি আওয়ামী লীগ কখনো করেনি। রাজনীতি নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার নিয়ে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের কোনো কর্মীর হাত অন্য কোনো দলের নেতা-কর্মীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু প্রাসাদ ষড়যন্ত্র করে, হত্যা ও ক্যু করে কাওকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিরোধীদলের কোনো শীর্ষ নেতাকে হত্যা করার মতো ষড়যন্ত্র আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে দেখা যায়নি, যদিও একই ঘটনার শিকার হতে হয়েছে এই দলকে বারবার। ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা করে এদেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে নির্বাসনে পাঠাতে চেয়েছিল যারা তাদের ষড়যন্ত্রেই ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল জেলের অভ্যন্তরে চার জাতীয় নেতা, ময়েজউদ্দিন, শাহ এম এস কিবরিয়া, শ্রমিক নেতা আহসানউল্লাহ মাস্টারসহ আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতা-কর্মীকে হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পর এখন পর্যন্ত, বিএনপি-জামাত-জাপাসহ অন্যান্য দল ও গোপন দলের হাতে আওয়ামী যুব ও ছাত্রলীগের যত নেতা-কর্মী হত্যা হয়েছে বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক দলের এত কর্মী-সমর্থকও নেই। অর্থাৎ এই দেশকে স্বাধীন করতে এবং এই পর্যন্ত বাংলাদেশকে বাংলাদেশ করে রাখতে এই দলের চেয়ে বড় ত্যাগ অন্য কোনো দল করতে পারেনি। তবে আওয়ামী লীগ যে ধোয়া তুলসি পাতা তা কিন্তু নয়। এই দলের বহু স্খলন আছে, বহু দোষ আছে। এই দলের অনেকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আছে। এই দলের যুব ও ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অভিযোগের শেষ নেই। দুর্নীতি, টেন্ডারবাজী, চাঁদাবাজীর মতো অসৎ কর্মকাণ্ডে এই দলের অসংখ্য নেতাকর্মী জড়িত। গৌরবোজ্জ্বল ছাত্রলীগের মহিমা কালিমালিপ্ত করেছে ছাত্রলীগের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড। দেশের অধিকাংশ টেন্ডারবাজীর সাথে এই দলের যুব সংগঠন যুবলীগের নাম জড়িত। অনেক মন্ত্রী এমপির বিরুদ্ধে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ আছে। অনেকে স্থানীয়ভাবে মাস্তানী গুণ্ডাবাজী ও খুনের ঘটনায় জড়িত। এদের কর্মকাণ্ডে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ। এদের কাছে আওয়ামী লীগ একটি আতঙ্কের নাম। শেখ হাসিনার ক্যারিসমেটিক নেতৃত্বকে ম্নান করে দিচ্ছে অনেক নেতাকর্মীর অপকর্ম ও ভূমিকা।
বর্তমানে শেখ হাসিনা তাঁর অসাধারণ নেতৃত্ব দূরদর্শি চিন্তাধারা অকুতোভয় সাহসের গুণে দেশের বা উপমহাদেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছেন। তাঁর রাজনৈতিক কূটনীতি, কিংবা কূটনৈতিক রাজনীতি তাঁকে এক সফল রাষ্ট্র নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ভারত, চীন, জাপান রাশিয়ার সাথে কূটনৈতিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে জঙ্গিবাদকে মোকাবেলা করে যাচ্ছেন। অর্থনৈতিক, সামাজিক বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ অনেক অগ্রসর হয়েছে। এসবের বিবরণ তুলে না ধরলেও পাঠকরা বিভিন্নভাবে তা জানেন বলেই আমার বিশ্বাস। চীনের সাথে বৃহত্তম অর্থনৈতিক চুক্তি, ব্রিকস-বিমসটেক আউটরিচ সম্মেলন ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের সফরের পরপরই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সম্মেলন। আগামী ২২ ও ২৩ অক্টোবর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যোনে অনুষ্ঠিত হবে এই দলের ২০তম জাতীয় সম্মেলন। এই সম্মেলনকে ঘিরে সারাদেশে নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রবল উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। সম্মেলনের আগে বিভিন্ন স্থানে শেখ হাসিনা নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের তাগিদ দিলেও নেতা-কর্মীদের চাপে এবারও তাঁকে সভাপতির পদে থেকে যেতে হবে। সাধারণ সম্পাদকের বেলায়ও তাই ঘটতে পারে। দলের নেতৃত্বে থেকে শেখ হাসিনা অবসর নিতে চাইলেও এই মুহূর্তে দল ও জাতির স্বার্থে তা সম্ভব নয়। সভাপতি সম্পাদক পদে রদবদল না হলেও দলে এবার অনেক নতুন মুখের আবির্ভাব ঘটবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ দলের নেতৃত্বে আধুনিক শিক্ষিত ও তরুণদের দায়িত্ব দিতে শেখ হাসিনার আগ্রহ আছে। সময়ের প্রয়োজনেই তা দরকার। বর্তমানে যে বিশ্ব পরিস্থিতি এবং বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশ দিনদিন যে ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে তাতে শিক্ষিত আধুনিক, সৎ, নিবেদিতপ্রাণ নেতৃত্ব না থাকলে কাঙ্খিত ফল লাভ হবে না।
মনে রাখতে হবে, দেশের জনগণ উন্নয়নের স্বার্থে সীমিত গণতন্ত্র হয়ত মেনে নেবে কিন্তু দুর্নীতি ও অপশাসনকে কখনো মেনে নেবে না। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ যে পর্যায়ে গেছে এবং ২০২১ ও ২০৪১ যে দুটো ভিশন নির্ধারণ করেছে তার কাছে পৌঁছাতে, তাকে সফল করে তুলতে একটি ‘ডাইনামিক’ নেতৃত্বের দরকার। অর্থাৎ শেখ হাসিনা যদি ১০০ মাইল বেগে ছোটেন তো তার দলের অন্যদেরও সেই গতিতে ছুটতে হবে।
টেকসই গণতন্ত্র বা টেকসই উন্নয়ন যাই বলি না কেন তার জন্য প্রয়োজন যোগ্য, সৎ ও আদর্শবান নেতৃত্ব। কাজেই দেশের এই বৃহত্তম দলটির সম্মেলন দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দলের নেতৃত্বে যেন উদার, অসাম্প্রদায়িক সৎ ও নিবেদিত প্রাণ নেতা-কর্মীদের স্থান হয় সে প্রত্যাশা স্বাধীনতাকামী জনগণের।
বিএনপির মহাসচিব এক প্রতিক্রিয়ায় সম্মেলনের সাফল্য কামনা করে বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের সম্মেলন গণতন্ত্র ফেরাতে ভূমিকা রাখবে।” তাঁর কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে কথা হলো কোনো একক দলের পক্ষে একটি দেশে গণতন্ত্র সমুন্নত রাখা সহজ নয়। এখানে অন্যান্য দল, বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির মতো অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলেরও ভূমিকা আছে। তাদের গণতান্ত্রিক আচরণ তথা রাজনীতি করা দরকার। জামায়াতের মতো একটি ফ্যাসিস্ট, জঙ্গি ও সরাসরি স্বাধীনতা-বিরোধীদলকে নিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন যে মানায় না তা বিএনপিকে বুঝতে হবে। বিএনপিকে ষড়যন্ত্র, হত্যা, ক্যু’র রাজনীতির বাইরে এসে প্রকৃত গণতান্ত্রিক চর্চা ও আচরণ করতে হবে। বিএনপিকে বুঝতে হবে আওয়ামী লীগের বিরোধীতা করার অর্থ মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ও গৌরবের বিরোধীতা করা নয়। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অনেক ভুল-ত্রুটি ও স্খলন আছে তার অর্থ এই নয় যে, তা মুক্তিযুদ্ধের ব্যর্থতা। বিএনপিকে বুঝতে হবে যে, যে শক্তি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, হত্যা, ধ্বংস আর জিহাদের নামে নিজেদের মনগড়া মতাদর্শ জনগণের উপর চাপিয়ে দিতে চায় তাদের সঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্রের আন্দোলন হবে না। বিএনপিকে সময়ের সাথে, বিশ্ব রাজনীতির সাথে তাল মিলিয়ে রাজনীতির চর্চা করতে হবে। হত্যা, ষড়যন্ত্র ইত্যাদির মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার ইচ্ছা পরিত্যাগ করতে হবে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক আবহের সাথে মিল রেখে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নিজেদের পরিবর্তন করেছে। বাংলাদেশকে যে পরিবর্তনের মহাসড়কে উপনীত করেছেন শেখ হাসিনা তার সাথে তাল মেলাতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ও বদলাতে হবে। কারণ এটি সত্যি যে, আওয়ামী লীগ বদলালেই বাংলাদেশ বদলাবে।
Email : [email protected]

সর্বশেষ সংবাদ
এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।  তথ‌্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি মহোদয়ের শুভ জন্মদিন আজ করোনায় পোশাক কারখানায় ৫৫ শতাংশ কাজ কমে গেছে: রুবানা হক