চে’র মতো রাগী, চেরাগী ও অন্যান্য--কামরুল হাসান বাদল-কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 12/09/2016-01:13pm:   
প্রচলিত আছে পীর বদর শাহ চট্টগ্রাম নগরীর মাঝখানে পাহাড়ের একপাশে একটি স্থানে কুপি বা চেরাগ জ্বালিয়ে মানুষের বসবাসের গোড়াপত্তন করেন। তার আগে এসব জায়গা ছিল দৈত্য-দানো, জ্বীনদের আস্তানা। বদর শাহের চেরাগের আলো যতদূর গেছে ততদূর থেকে জ্বীন-ভূতেরা পালিয়ে গেছে। এভাবে এখানে মানববসতি গড়ে ওঠে। মানুষের জ্বালানো আলোয় অন্ধকারের প্রাণীরা পালিয়ে যেতে থাকে আর চারদিকে বাড়তে থাকে মানুষের কোলাহল। সে থেকে এ স্থানের নাম চেরাগী পাহাড়। সংস্কারের বিকৃতি নিয়ে পাহাড়টি এখনো টিকে আছে জামালখানের কাছে। এখনো অনেকে সন্ধ্যায় এখানে ধূপকাঠি জ্বালায়, মোমবাতি জ্বালায়।
জ্বীন-ভূত, দৈত্য-দানোয় অনেকের বিশ্বাস নেই। সে প্রসঙ্গে আমি যেতেও চাই না, তবে আলো জ্বালিয়ে এ অঞ্চলে প্রথম মানববসতির সূচনা করার কাহিনীটি আমার কাছে খুব তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়। মনে হয় হাজার বছর আগে এই স্থানে আলো জ্বালিয়ে অন্ধকার দূর করে যেমন মানুষের উত্থান ও জয়গান ঘোষিত বা রচিত হয়েছিল সে ধারা এখনও বহমান। এই চেরাগী পাহাড় এখনও অবিরাম আলো বিতরণ করে আসছে মানুষকে। অন্ধকার থেকে, অমঙ্গল থেকে, কুসংস্কার ও অসভ্যতা থেকে মানুষকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে চেরাগী পাহাড়।
হাজার বছর আগে একজন পীর কিভাবে চেরাগ জ্বালিয়েছিলেন সে দৃশ্য দেখেনি কেউ হয়ত তবে এখন এ সময়ে চেরাগী পাহাড়ে কিভাবে আলো জ্বলে, কারা জ্বালায় আর কেমন করে জ্বালায় তা দেখতে হলে গভীর রাতের শেষে এখানে আসতে হবে। এলে দেখা যাবে জেগে থাকা চেরাগী পাহাড়কে। ঝুপড়ির চায়ের দোকানের সামনে চা-পিপাসু কয়েকজনের আড্ডা। একটু ভিতরে গেলে মুদ্রণ শিল্পের অবিরাম শব্দ আর সেখানে কর্মরতদের চরম ব্যস্ততা। মধ্যরাতের পরপর মেশিন থেকে পত্রিকা নামছে। কোনো কোনো পরিবহনে তা চলেও যাচ্ছে গন্তব্যে। আর অন্ধকার ভেদ করে আলো ফুটবার আগে থেকে শত শত পত্রিকার হকার আসতে থাকে তাদের সাইকেল নিয়ে। চেরাগী পাহাড়ে চট্টগ্রামের অন্যতম দুটো দৈনিক আজাদী ও সুপ্রভাত বাংলাদেশ ছাপা হয়। পত্রিকা দুটির অফিস ছাড়াও আরও প্রায় ৫০টি পত্রিকারও টিভি মিডিয়ার অফিস আছে এখানে। এখানে আছে হকার ইউনিয়ন ও তাদের বিভিন্ন সংগঠনের অফিস। মধ্যরাত থেকে সকাল দশটা এগারোটা পর্যন্ত বিরতি দিয়ে দিয়ে এখান থেকে পত্রিকা চলে যাচ্ছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায়। আরেকটি পত্রিকা দৈনিক পূর্বকোণ এখানে ছাপা না হলেও তাদের বিক্রয়কেন্দ্র আছে এখানে একটি। চেরাগী পাহাড়ে দুটি বইয়ের দোকান ছাড়াও চট্টগ্রামের উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যালয়ও আছে। সঙ্গত কারণে এখানে সকাল থেকে মধ্যরাত অবধি লেখক-কবি-সাংবাদিক ও সংস্কৃতি কর্মীদের আনাগোনা লেগেই থাকে।
এখানে চে’র মতো রাগী ও স্বপ্নবাজ তরুণরা যেমন আসে তেমনি আসে রোমান্টিক কবি কিংবা সঙ্গীত শিল্পী। সৃষ্টির মোহে, সৃজনশীলতার মোহে যেমন অনেকে আসে তেমনি আবার অনেকে আসে স্বপ্নভঙ্গের যাতনা নিয়ে। চরম হতাশা আর সবার ওপর বিরক্তি নিয়ে। কেউ এখানে জীবন জাগাতে আসে কেউ জীবনের ওপর নিরীক্ষা চালাতে আসে। কেউ আসে ফিউশনের আশায়। কেউ এসে দেখেন কনফিউশন। কেউ আসেন জীবনের আহবানে কেউ বা মৃত্যুর স্বরূণ অবলোকনের আশায়।
অনেকে সন্ধ্যায় এখানে এলে বিস্মিত হন। প্রশ্ন করেন কি হচ্ছে এখানে? এত লোক কেন? জবাব একটাই এটি চেরাগী পাহাড়। এখানে সবাই আসে বিশেষত তরুণরা। কয়েকবছর আগে এখানে যারা নিয়মিত আড্ডা দিতেন তাদের অনেককেই আজকাল দেখা যায় না। তাদের স্থান দখল করে নিয়েছে আরেক দল তরুণ। এভাবে এখানে মুখেরও বদল হয়। আড্ডারুদেরও বদল হয়। কিন্তু বদল যাই-ই হোক এখানে প্রাণের জোয়ার থাকে সর্বক্ষণ, সারাবেলা। অনেকে চেরাগী চত্বরে আর দাঁড়াতে বা আড্ডা দিতে পছন্দ করেন না আজকাল। তাদের অভিযোগ এত গ্যাঞ্জাম আর ভীড়। ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলে কোনো বেয়ারা তরুণ। যাদের চোখে বয়োজ্যেষ্ঠরা এক প্রকার অপাংক্তেয়, গুরুত্বহীন।
এক সময় আড্ডা ছিল মুসলিম হল কেন্দ্রিক, শিল্পকলা কেন্দ্রিক। আজকাল অন্যান্য সকল আড্ডা ছাপিয়ে-ছাড়িয়ে চেরাগী পাহাড়ের আড্ডাই অন্যতম প্রধান হয়ে উঠেছে। শিল্প সাহিত্য-সংস্কৃতি অর্থাৎ সৃজনশীল কাজের সাথে যারাই জড়িত তাদেরকে কোনো না কোনো সময়ে চেরাগী পাহাড় আসতে হয়। দিনে একবার না এলে অনেকের নাকি ভাত হজম হয় না। অনেকে চেরাগী পাহাড়ের এই পরিবেশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ও অধুনা আজিজ সুপার মার্কেটের সাথে তুলনা করেন। এখানে আড্ডা হয় শিল্প সাহিত্য নিয়ে, সঙ্গীত নিয়ে, প্রকাশনা নিয়ে, বই-পত্র ও পত্রিকা নিয়ে। সন্ধ্যার পর পর শহরের নানা প্রান্ত থেকে তরুণরা ছুটে আসে এখানে। হাতে চায়ের কাপ নিয়ে মেতে ওঠে আড্ডায়।
আশেপাশের অনেকে বিরক্তও হন তাদের ওপর। কারণ একটি সময়ে এখানে চলাফেরাও মুশকিল হয়ে পড়ে। চেরাগী পাহাড়ের এই অংশকে ডিঙিয়ে যেতে হয় অনেককে তাদের বাসা-বাড়িতে। মাঝে-মধ্যে নারী ও শিশুদের কিছুটা বিড়ম্বনায়ও পড়তে হয়। এ নিয়ে দুয়েকবার অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া এই আড্ডার সুযোগে এখানে অসামাজিক কাজও চলে। মাদকের নীল বিষের ছোঁয়ায় এখানে বিপন্ন হয় তারুণ্য। অনেকে এর খপ্পরে পড়ে এক সময় হারিয়ে গেছে জীবনের এই উচ্ছ্বলতা থেকে। এখানে কবিতা হয়, গলা ছেড়ে গান গাওয়া হয়। শোনা হয় জন্ম বাউল আবদুল হামিদের দোতারা। এখানে তর্ক হয়, কখনো বা মারামারিও হয়। তারপরেও চেরাগী পাহাড়ের আড্ডায় ছেদ পড়ে না।
এখানে অনেক স্বপ্নবান তরুণ আসে। সমাজের অসাম্য বিভেদ, কুসংস্কার, কূপমণ্ডুকতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার। তারা প্রতিবাদ করে। তারা সংঘবদ্ধ হয় আর আমি স্বপ্ন দেখি চে’র মতো কোনো এক রাগী তরুণ একদিন ঠিক দাঁড়িয়ে বলবে, বন্ধ হোক এসব। এ নষ্ট রাজনীতি, এই লুটপাট, এই অসাম্য, এই ধর্মীয় অনাচার। মানুষ ডাক দিয়ে বলবে, “জাগো বাহে কোনঠে সবায়।”
আমি আশাবাদী মানুষ। সব সময় স্বপ্ন দেখি একদিন এই অন্ধকার ঠিক কেটে যাবে। ধর্ম-বর্ণ-ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার বাসযোগ্য একটি মাতৃভূমি ঠিকই প্রতিষ্ঠিত হবে। একটি শোষণহীন-বঞ্চনাহীন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যহীন বাংলাদেশ একদিন ঠিকই প্রতিষ্ঠিত হবে। অনেক অনিয়ম, অনেক অস্থিরতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিস্ময়করভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। একদিন কোনো এক সুন্দর সকালে একদল তরুণ দেবশিশুর মতো উঠে এসে বলবে, “আমার হাতেই নিলাম আমার নির্ভরতার চাবি।” আমরা বিস্মিত চোখে আমাদের সন্তানদের সে উত্থানপর্ব দেখব। নব বাংলাদেশকে দেখবো।
একদিন এ অঞ্চলে আলো ছড়িয়ে পড়েছিল এই চেরাগী পাহাড় থেকে। আজও সভ্যতার প্রধান বাহন সংবাদপত্র এই এলাকা থেকে ছড়িয়ে দিচ্ছে জ্ঞানের আলো। প্রগতিশীলতার আলো। সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে যেতে অনেক সংগঠনের কর্মীরা প্রতিনিয়ত “আলো হাতে চলিয়াছে” দেশে তরুণদের বিনোদনের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। খেলার মাঠ নেই, ভালো কোনো ছবি বা সিনেমা নেই, কোনো থিয়েটার নেই, নিঃশ্বাস নেওয়ার খোলা কোনো চত্বর নেই। নিরুপায় তরুণরা এখানে আসে। আমাদের মতো বয়স্করা মাঝে মধ্যে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ি বটে কিন্তু তারপরেও ভাবি এরা যাবে কোথায়। এই তরুণদের ভীড়ে মাঝে-মধ্যে দু’একজন বিভ্রান্ত বেপথু তরুণ অপ্রীতিকর ও অসামাজিক কিছু কাজও করে। তবে সংখ্যায় তারা অত্যন্ত নগণ্য। তারুণ্যের সহজাত প্রাবল্যে তাদের ভেসে যাওয়ার কথা।
তারপরেও চেরাগী পাহাড় জেগে থাক। প্রাণের স্পন্দনে, আলোর জোয়ারে।

সর্বশেষ সংবাদ
স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যেকোনো অনিয়ম দুর্নীতি অনুসন্ধান করা হবে: দুদক চেয়ারম্যান কক্সবাজার রেড জোন,শনিবার থেকে আবারো লকডাউন এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।