কোচিং নির্যাতনের যুপকাষ্ঠে প্রাথমিক ও নিন্ম মাধ্যমিক শিক্ষা

পোস্ট করা হয়েছে 04/09/2016-02:19pm:    খন রঞ্জন রায় লেখক ও প্রকাশক: বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের সাফল্যের খাতগুলোর মধ্যে শিক্ষাখাত অন্যতম। শিক্ষানীতি প্রণয়ন, বছরের শুরুতে সারাদেশে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ, পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষা পদ্ধতি প্রচলন, সময়মত সকল পরীক্ষা অনুষ্ঠান ও ষাট দিনের মধে পরীক্ষার ফলাফল একযোগে প্রকাশ করার কৃতিত্বের দাবীদার এই সরকার। দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার আওতা বাড়িয়ে পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে সরকার। শিক্ষার সার্বিক ইতিহাসে এটা গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। ২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতিতে বিষয়টি জোরালো উল্লেখ থাকলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে আসতে সময় লাগল ৬ বছর। শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছিল, ২০১৮ সালের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষাস্তর অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারিত হবে। দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়,এক্সপেরিমেন্টাল স্কুল, ইবতেদায়ি মাদরাসা, কিন্ডারগার্টেন, এনজিও স্কুল, কমিউনিটি স্কুল, হাইস্কুল ও হাই মাদরাসার সঙ্গে সংযুক্ত প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি, ব্রাক স্কুল, শিশু কল্যাণ প্রাইমারি স্কুল, অন্যান্য স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হয়। মোট প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ১ লাখ ৮ হাজার ৫৩৭ টি। শিক্ষক: ৪ লাখ ৮২ হাজার ৮৮৪ জন। শিক্ষার্থী: ১ কোটি ৯৫ লাখ ৫২ হাজার ৯৭৯ জন, মোট সরকারি প্রাথমিক স্কুল ৬৩ হাজার ৪১টি। শিক্ষক ৩ লাখ ১৯ হাজার ১১২ জন। শিক্ষার্থী ১ কোটি ৪৬ লাখ ৭১ হাজার ৯১৪ জন।
মোট মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১৯ হাজার ৬৮৪ টি। এর মধ্যে নিুমাধ্যমিক ২ হাজার ৪১২টি। মাধ্যমিক ১৬ হাজার ৩১৯টি। কলেজের সঙ্গে যুক্ত ৯৫৩টি। শিক্ষক ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৯৪ জন। শিক্ষার্থী ৯১ লাখ ৬০ হাজার ৩৬৫ জন। গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্তের ফলে এখন থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রমে বড় পরিবর্তন আসবে। পাঠ্যক্রম, কাঠামো, শিক্ষক, প্রশিক্ষণ, আয়োজন, জনবল, ব্যবস্থাপনা- সব কিছুই নতুন করে সাজাতে হবে।
এ সিদ্ধান্তের ফলে দেশে সরকারি-বেসরকারি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অষ্টম শ্রেণি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অষ্টম শ্রেণি এবং সমমানের শিক্ষার স্তরের দেখভালের দায়িত্ব প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে চলে গেল। এত দিন সাধারণ শিক্ষা বোর্ড ও মাদ্রাসার অধীনে থাকা স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংযুক্ত পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনেই পরিচালিত হয়েছে। এখন প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের অনুমতি, একাডেমিক স্বীকৃতি, বিষয় খোলা, বিভাগ খোলা, শ্রেণি-শাখা খোলা, এমপিওভূক্তি, নতুন শিক্ষাক্রম, পাঠ্যপুস্তক এবং শিক্ষক, নির্দেশিকাসহ সব শিক্ষা কার্যক্রম প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সম্পাদিত হবে। মন্ত্রণালয়ের অনুমতিপ্রাপ্ত দুই হাজার ৩৮১টি নিুমাধ্যমিক প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে চলে যাবে। এর মধ্যে এমপিওভূক্ত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে মাত্র ৫৫৩টি। এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা পাঁচ লাখ ১৭ হাজার ৫৫০ আর শিক্ষক সংখ্যা ১৯ হাজার ২৪০। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় বিষয় হচ্ছে পাঠ্যক্রম প্রণয়ন। জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত নতুন পাঠ্যবই প্রণয়নের কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায়ে তা হয়নি। দুই স্তরের পাঠ্যক্রমে সেতুবন্ধ রচনার করা হবে, নাকি ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির পাঠ্য পরিবর্তন করা হবে সে সিদ্ধান্ত হয়নি। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা কোন প্রক্রিয়ায় হবে তা নিয়ে সিদ্ধান্তের দোলাচলের মাঝে সময় পার হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রথম দিকের ভাবনায় ছিল, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হবে। সে লক্ষ্যে কিছুটা কাজও শুরু করা হয় ২০১৩ শিক্ষাবর্ষে। ওই বছর ৫০৩টি উপজেলা বা থানায় ৫০৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চালু হয় ৫৯৬ টি বিদ্যালয়ে। পর্যায়ক্রমে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণি খোলার মাধ্যমে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোয় এ বছর অষ্টম শ্রেণি খোলা হয়েছে। এগুলো থেকে শিক্ষার্থীরা গত জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু পরীক্ষার অনুমতি নিতে হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন শিক্ষা বোর্ডগুলো থেকে। এ নিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হয় সংশ্লিষ্টদের। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আর শিক্ষাজীবীদের চৈতন্য দৈন্যতার তাৎক্ষণিক খেসারত দিচ্ছে কোমলমতি ২ কোটি শিক্ষার্থী আর ৪ কোটি অভিভাবক। এক পক্ষ বাতিল করে অন্যপক্ষ নতুন করে চালু করে। এই নাট্যরঙ্গমঞ্চের কুশিলবদের সন্তানরা কিন্তু প্রত্যাশিত বিদ্যালয়ে গমন করে না। তাদের পছন্দ ও সামর্থ্য ইস্টার্ণ ওয়েস্টার্ণ। ২০০৯ সাল থেকে যখন প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা ২০১০ সালে মাদ্রাসায় এবতেদায়িতে সমাপনী শুরু হয় তখন কিন্তু তথাকথিত শিক্ষাজীবীরা সরকারকে বাহবা দিতে কার্পূণ্য করেননি। এই অল্পদিন অতিক্রম হওয়ায় তাদের বোধোদয় নতুন ক্ষেত্র, নতুন ইস্যু। সমন্নিতভাবে দীর্ঘমেয়াদি সৃজনশীল প্রাথমিক শিক্ষা স্তর ও সিলেবাস কি হবে তার রূপরেখা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারকে সর্বজন গ্রহণযোগ্য ড. কুদরত এ খোদার শিক্ষানীতির আলোকে ২০০৯সালে অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রণীত নীতি সুপারিশই বাস্তবায়ন পদক্ষেপে ধাবিত হতে হচ্ছে। আমাদের দাবী দেশের শিক্ষাব্যবস্থার যুযোপযোগী পরিবর্তন করতে হলে ১৯৭১ এর মার্চ বিপ্লবের মত একটি শিক্ষা-বিপ্লব ঘটাতে হবে। উন্নত দেশের কাতারে অবস্থান প্রত্যয়ে দেশের প্রতিটি মানুষকে আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রযুক্তিমুখী কর্মপ্রত্যাশী শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে বিভাগভিত্তিক ‘নিু মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ‘৮ম শ্রেণি পর্যন্ত সবার জন্য শিক্ষা’ স্লোগান নির্ধারণ করলে জাতির নিকট বর্তমানে সরকারের দায়বদ্ধতার স্স্পুষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাবে। নিন্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন প্রযুক্তিবিদের নিয়োগদান এবং দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদা প্রদান করা প্রয়োজন। শত সহস্র বছরের নিু মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার পুঞ্জিভূত সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য ৮টি বিভাগে ৮ জন নিু মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যানের নিকট দায়িত্ব প্রদান করলে অতি অল্প সময়ে জটিল সমস্যাগুলো সমাধান সম্ভব হবে। এর জন্য ঢাকা নিু মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রাম নিু মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, খুলনা নিু মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, রাজশাহী নিু মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, সিলেট নিু মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, বরিশাল নিু মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, রংপুর নিু মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ময়মনসিংহ নিু মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠা করার অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
এই ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলে জরুরি পদক্ষেপের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করবেন বলে আমরা আশা করি। আর তা হলে দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীদের গিনিপিগ বানানোর ধারাবাহিক সিদ্ধান্ত চলতেই থাকবে। আগের দিন প্রাণচাঞ্চলে ভরপুর স্কুল মাঠ, খেলার মাঠে দৌড়াদৌড়ি করবে। সিদ্ধান্ত হীনতার যুপকাষ্ঠে নিপতিত তার পরদিনই ফ্যাকাসে চেহারা নিয়ে কোচিং নির্যাতনের শিকার হতেই থাকবে।

সর্বশেষ সংবাদ