জাতির জনকের ছবি, শোকের আবহ ও মেজবান--কামরুল হাসান বাদল-কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 19/08/2016-12:02pm:   
যে কোনো হোটেল-রেস্তোরাঁ বা মিষ্টির দোকানের প্যাকেটের মতই। ভেতরে বিরিয়ানি। ভিন্নতা শুধু এই, প্যাকেটের ঢাকনায় জাতির জনকের ছবি। জাতির জনকের ছবি সম্বলিত এমন লাঞ্চ বক্সে খাদ্য বিতরণ করা হয়েছে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে। ফেসবুকে আমার পোস্টে এমন একটি ছবি পাঠিয়েছেন এক বন্ধু। ‘আমি লজ্জিত হে জাতির পিতা’ লিখে। ‘বঙ্গবন্ধুকে আর কত নিচে নামাবেন’ বলে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন তিনি তাঁর মন্তব্যে। গত ১৫ আগস্ট ছিল এ জাতির শোক দিবস। বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসে দিনটি কলঙ্কজনক হিসেবে বিবেচিত। দলমত নির্বিশেষে যে কোনো মানবিকবোধসম্পন্ন মানুষ অন্তত এই একটি দিনে শোকার্ত হৃদয়ে জাতির জনক ও তাঁর পরিবারের নিহত অন্য সদস্যদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে থাকেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দিনটি জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
এখন রাষ্ট্রীয়ভাবে দিনটি পালিত হচ্ছে দেখে ভালো লাগে। কারণ তাঁকে হত্যার পর ঘাতক এবং তাদের সহযোগী শক্তিরা দীর্ঘদিন বঙ্গবন্ধুর নামটিও উচ্চারিত হতে দেয়নি। রাষ্ট্রীয়ভাবে মুছে ফেলার অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু ‘হৃদয়ে লেখা নাম’ মুছে যায়নি। বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বমহিমায় সতত সমুজ্জ্বল। ইতিহাসে তাঁর স্থান স্বর্ণাক্ষরে নির্ণিত হয়ে গেছে। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের সীমানা ছাড়িয়ে বঙ্গবন্ধু আজ বিশ্বনেতায় পরিণত হয়েছেন। বিশ্বে অনন্য নেতা হিসেবে বরেণ্য হয়েছেন। আমার মনে আছে গত শতকের সাত দশকের শেষ ও আট দশকের শুরুতে আমরা কয়েকজন বন্ধু ১৫ আগস্টে কালো ব্যাজ ধারণ করতাম। আমাদের এক বন্ধুর বড় ভাইয়ের কাপড়ের দোকান ছিল বিপণি বিতানে। আমরা কয়েকজন সকালে তার সেই দোকানে যেতাম আর আগে থেকে তৈরি করে রাখা ব্যাজ পরিয়ে দিতো সে আমাদের। এ নিয়ে অনেকে কটু মন্তব্যও করতেন, বিদ্রুপ করতেন। অনেক সময় চরম অপমানের হাত থেকে বাঁচার জন্য বুকে, যেখানে ব্যাজটি সাঁটানো, সেখানে হাত দিয়ে রাখতাম। ‘কেন পরেছি?’ প্রশ্নের উত্তরে যখন বলতাম তাঁরা বলতেন তাতে কী, তাই বলে কি কালো কাপড় পরতে হবে।’ দিন পাল্টালেও এখনও নিজের কিছু নীতি ও নিয়মের জন্য অন্যদের করা প্রশ্নে আহত যে হই না তা নয়। এখনও অনেকে প্রশ্ন করে তবে অন্যভাবে। এদিনে আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো আনন্দ-উৎসবে যোগ দিতে পারি না। ‘কেন পারি না’ তার উত্তর দিতে আমার ভীষণ অপমান বোধ হয়। অসহায়বোধও করি।
১৫ আগস্ট শোক দিবস দীর্ঘ বছর সরকারিভাবে পালিত হয়নি। অবশ্য পালন করার প্রশ্নও ওঠে না। কারণ যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে এবং যারা তাঁর মৃত্যুর বেনিফিশিয়ারি তারা কেন এবং কোন মুখে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদিবস পালন করবে। বরং এই শক্তির ‘সিম্বল’ বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিনই পালন করা শুরু হলো ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পরে জাতীয় শোকের দিনেই।
পূর্বেই বলেছি বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর অবিরাম অবিরতভাবে তাঁকে এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে। সরকারি সকল সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে অর্থ ও ক্ষমতার প্রলোভন দেখিয়ে, নতুবা গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে ভয় লাগিয়ে অন্যদল হতে নেতা ভাগিয়ে জিয়াউর রহমান একদিকে নিজের জাগদল পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠা করেছেন অন্যদিকে পুলিশ ও মাস্তান লাগিয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর অনুসারীদের তাড়া করেছেন। ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের হাল ধরার পর পরিস্থিতি কিছুটা পাল্টাতে থাকে। ১৯৭৫ সালের পর থেকেই কিন্তু ১৫ আগস্ট পালিত হতে থাকে। প্রথম প্রথম গোপনীয়ভাবে এবং কয়েকবছর পর ঘরোয়াভাবে। ৮০ দশকের মাঝামাঝি থেকে শোক দিবসের আয়োজন বৃদ্ধি পেতে থাকে। চট্টগ্রামসহ দেশের কিছু কিছু স্থানে ছোট আকারে কাঙালি ভোজের আয়োজন শুরু হয়। এখন তার পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে শুধু চট্টগ্রামেই কতগুলো মেজবান অনুষ্ঠিত হয় তা চট করে বলা মুশকিল।
মেজবান বা কাঙালিভোজ নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। মানুষ যাঁকে ভালোবাসে, ভক্তি ও শ্রদ্ধা করে তাঁর আত্মার মাগফিরাত বা শান্তির জন্য তারা ফাতেহা ও দোয়া দরুদের সাথে সাথে মিসকিন খাওয়াবে বা কাঙালি ভোজ দেবে তা দোষের নয়। কিন্তু জাতীয় শোক দিবসের দিন এই খানা-পিনা মুখ্য হয়ে উঠে শোক দিবসের ভাবগাম্ভীর্য যেন নষ্ট না করে সেটিই দেখতে হবে। যে কোনো ভালো খাওয়া-দাওয়া উৎসবেরই অংশ। সাধারণত মানুষ যে কোনো উৎসব আনন্দে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করে। কারণ আনন্দ ভাগাভাগি করার দুঃখ ব্যক্তিগতভাবে যাপন করার। এখন ১৫ আগস্টের শোক মেজবানের অঢেল খাওয়া-দাওয়ার উৎসবের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে।
মেজবান সংস্কৃতিটা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সাথেও মানানসই নয়। অনাড়ম্বর জীবনযাপনকারী বঙ্গবন্ধুর জীবনে বাহুল্য, অপচয় ও লোক দেখানো কোনো কিছুই ছিল না। প্রতি বছর শুধু মেজবানের পেছনে যে অর্থ ব্যয় হয় তার বদলে সে অর্থ দিয়ে মানুষের সরাসরি উপকার হয় এমন কোনো কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে। বঙ্গবন্ধুর জীবনী ও আদর্শ প্রচারে ব্যয় করা যেতে পারে। অথবা একটি ট্রাস্টে দেওয়া যেতে পারে যা দুস্থদের পড়াশোনা, চিকিৎসাসহ অন্যান্য কাজে ব্যয় হবে।
বঙ্গবন্ধুর ছবি ব্যবহারেও একটি নীতিমালা বা আইন করা দরকার। সে সাথে তাঁর বক্তৃতা প্রচারেও সতর্ক ও সংযমী হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। বর্তমানে দেশে চলছে পোস্টার-ব্যানার রাজনীতি। দলের জন্য, সমাজের জন্য, দেশের জন্য কোনো প্রকার ত্যাগ স্বীকার না করে, রাজনীতির কোনো শিক্ষা গ্রহণ না করে, কোনো শৃঙ্খলার তোয়াক্কা না করে শুধু পোস্টার ব্যানার ছাপিয়ে আজকাল অনেকে নেতা বনে যাচ্ছেন। ঈদ, পূজা ও জাতীয় দিবসসমূহকে সামনে রেখে এই উপদ্রব বৃদ্ধি পায়। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ক্ষুদ্র ছবির পাশে পছন্দের নেতা ও নিজের ঢাউশ ছবি দিয়ে ছাপানো ব্যানার-ফেস্টুন-পোস্টারে এলাকা ছেয়ে যায়। অনেক ব্যানার- পোস্টারে এত এত নেতার ছবি থাকে যে তাদের ভিড়ে জাতির জনক ও শেখ হাসিনার ছবি হারিয়ে যায়। ব্যানার রাজনীতি শুধু আওয়ামী লীগে নয়, প্রায় সব রাজনৈতিক দলেই আছে। তবে বর্তমানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন বলে এই দলের পাতি নেতাদের এই ধরনের নির্লজ্জ আত্মপ্রচারের প্রবণতা বেশি। জাতির জনকের ছবির সাথে দল বা অঙ্গ সংগঠনের এমন বিতর্কিত নেতার ছবিও জুড়ে দেওয়া হয় যে তা দেখে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ হন প্রকৃত বঙ্গবন্ধু প্রেমিরা। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রায় প্রতি মাসে নতুন করে একটি দলের জন্ম হচ্ছে যার আগে পরে বঙ্গবন্ধু ও লীগ শব্দটি যোগ করে দেওয়া হচ্ছে। ‘বঙ্গবন্ধু বয়স্ক লীগ’ থেকে শুরু করে ‘বঙ্গবন্ধু শিশু লীগ’ এর মাঝখানে যত ধরনের ‘লীগ’ করা যায় মাশাল্লাহ তা সম্পন্ন করা হয়ে গেছে। কোনো কোনোটির সাইন বোর্ডে প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে শেখ হাসিনার নামও আছে। এ ধরনের ভুঁইফোর ও ভুয়া সংগঠনের ব্যাপারে দলের নীতি নির্ধারকরা কী ভাবছেন আমরা জানি না, তবে এরা যে সরকার, শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধুকে হাসি- ঠাট্টার বস্তুতে পরিণত করছে তা দেখেও আহত হচ্ছেন প্রকৃত দলীয় সমর্থকরা।
গত বুধবার সচিবালয়ে আয়োজিত শোক দিবসের এক অনুষ্ঠানে সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বঙ্গবন্ধুর ছবি ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে উল্লেখ করেছেন। সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। জাতির জনকের সম্মানের কথা বিবেচনা করে তাঁর ছবি ব্যবহারে একটি সরকারি নীতিমালা বা আইন প্রণয়ন দরকার। পাড়ার মাস্তান থেকে শুরু করে টেন্ডারবাজ, চোর বাটপারদের ছবির সাথে জাতির জনকের ছবি বড্ড বেমানান, বেদনাদায়ক ও অসম্মানজনক। অচিরেই তা বন্ধ হোক।
১৫ আগস্টেতো বটেই অন্য যে কোনো জাতীয় দিবস ও দলীয় কর্মসূচিতে সকাল থেকে রাত অবধি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করা হয়। এই ১৫ আগস্টে ঘুম ভাংলো বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে। আমার বাসার পাশেই ১৫ আগস্টের সভা উপলক্ষেই তা বাজানো হচ্ছিল। আমি বেলা সাড়ে ১১ টায় সেখানে গিয়ে কিছু খালি চেয়ার ছাড়া আর কিছুই দেখলাম না। অথচ সারাদিনই বাজতে থাকলো বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। আওয়ামী লীগসহ তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের যে কোনো অনুষ্ঠানে এমনকি হরতালবিরোধী বিভিন্ন সমাবেশে ভাষণটি অনবরত প্রচারিত হয়। এতে আশে পাশে যারা থাকেন অর্থাৎ দোকানদার থেকে বসবাসকারী সবার কাছে তা চরম বিরক্তির কারণ হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ৭ মার্চের ভাষণ, যা বিশ্বের অন্যতম সেরা একটি ভাষণ, তা সাধারণ মানুষের বিরক্তির কারণ করে না তুললেই কি নয়? ১৯৭৫ সালের পর যখন একটু একটু করে বঙ্গবন্ধুর প্রচার শুরু হলো সে সময় এই বজ্রকণ্ঠ শুনেইতো রোমাঞ্চিত হয়ে উঠতাম। বহুল ব্যবহারে এই অমর পবিত্র বজ্রকণ্ঠটিকে অপমান না করলেই কি নয়। আমি মনে করি জাতির জনকের সম্মানের কথা বিবেচনায় নিয়ে তাঁর ভাষণ বাজানোর ক্ষেত্রেও একটি দিক নির্দেশনা ও নীতিমালা থাকা দরকার।
দল ক্ষমতায় বলে অনেক সুবিধাবাদী, মৌ-লোভী আজ ঘিরে আছে দল ও নেতা-নেত্রীদের। চাটুকারদের ভিড়ে, তাদের কনুইয়ের ধাক্কায় প্রকৃত সৎ, মেধাবী ও নিবেদিত কর্মীরা দূরে সরে গেছে। ১৯৭৫ সালেও দেখেছি- যে চাটুকাররা দলের সব সুযোগ-সুবিধাই ভোগ করেছে তারাই রাতারাতি ভোল পাল্টে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে নিয়ে, আওয়ামী লীগকে নিয়ে আপত্তিকর কথা বলেছে। আজকের এই অতি উৎসাহীরাই ভোল পাল্টাবে যদি আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারায়। একদিন যারা বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে প্রকাশ্যেই গালিগালাজ করেছে তারাই এখন বড় বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগপ্রেমিতে পরিণত হয়েছে। দলের এই অরাজকতা দেখে দেখে অভিমান ও অপমানে প্রকৃত ও ত্যাগী নেতা-কর্মীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। এই বর্ণচোরা, মুখোশধারীদের যদি চিহ্নিত করা না যায়, এদের যদি সময় থাকতে প্রতিরোধ করা না যায় তাহলে আওয়ামী লীগকে অনেক খেসারত দিতে হতে পারে যা পূরণ করা সম্ভব নাও হতে পারে।
Email:[email protected]

সর্বশেষ সংবাদ
এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।  তথ‌্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি মহোদয়ের শুভ জন্মদিন আজ করোনায় পোশাক কারখানায় ৫৫ শতাংশ কাজ কমে গেছে: রুবানা হক