শামসুর রাহমানের কবিতায় রাজনৈতিক প্রজ্ঞার আলো-ফকির ইলিয়াস : কবি ও সাংবাদিক।

পোস্ট করা হয়েছে 19/08/2016-11:26am:    যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ প্রতিনিধিঃ ======== তিনি ছিলেন নিভৃতচারী কবি; উচ্চকণ্ঠ ছিলেন না কখনও।কিন্তু তাঁর ধীশক্তিসম্পন্ন লেখনী আমাদের শাণিত করেছে বহুভাবে। বিশেষ করে বাঙালি জাতির প্রতিটি স্বাধীকার আন্দোলনে তাঁর কবিতা আমাদের সাহস যুগিয়েছে।
মনে পড়ছে, কবি শামসুর রাহমানকে প্রথম দেখি ডিআইটি এভিনিউ’র ‘দৈনিক বাংলা’ অফিসের সিঁড়িতে। সুদর্শন পুরুষ। তাঁর কবিতার ভক্ত ছিলাম আগেই। `বন্দী শিবির থেকে` প্রায় মুখস্থ করে ফেলেছিলাম। গিয়েছিলাম `সাপ্তাহিক বিচিত্রা`র
বার্ষিক গ্রাহক হতে। এই সুযোগেই কবির সাথে দেখা। আমি খুব ছোট মানুষ। কবির সাথে হাত মেলাই। তিনি মুচকি হেসে আশীর্বাদ করেন আমাকে।
এরপর বহুবার ক্ষণিকের আড্ডা হয়েছে ঢাকায়। তাঁর সাথে দীর্ঘ সময় কাটাবার সুযোগ হয় নিউইয়র্কে। রাহমানের বড় গুণ ছিল- তিনি যে কোনো কাব্যিক আক্রমণকে সহজে নিতে পারতেন। `স্বাধীনতা তুমি` কবিতাটি ফ্রান্সের কবি পল এলুয়ার্ডের `লিবার্টি` কবিতার ছায়া অবলম্বনে লেখা- এই আক্রমণটি তাঁকে করেন সেই সময়ের তুখোড় ছাত্র সলিমুল্লাহ খান। ১৯৮৭-এর এক দুপুরে ড. জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের নিউইয়র্কের ইয়র্ক এভিনিউযের বাসায় ছিল আমাদের আড্ডা। মধ্যমণি শামসুর রাহমান। কবি জানালেন, তিনি ওই কবিতা পড়েনই নি!
শামসুর রাহমান আমাদের স্বাধীনতাকে ধারণ করেছেন তাঁর কবিতায় প্রাঞ্জলতা দিয়ে। তিনি আমাদের দেখিয়েছেন যে বাংলাদেশ, তা আমাদের মননে দেখায় এক উজ্জ্বল বাঁকের ঝলক। তিনি লিখছেন :
‘স্বাধীনতা তুমি বটের ছায়ায় তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীর
শানিত কথার ঝলসানি-লাগা সতেজ ভাষণ।
স্বাধীনতা তুমি
চা-খানায় আর মাঠে-ময়দানে ঝোড়ো সংলাপ।
স্বাধীনতা তুমি
কালবোশেখীর দিগন্তজোড়া মত্ত ঝাপটা।
স্বাধীনতা তুমি
শ্রাবণে অকূল মেঘনার বুক
স্বাধীনতা তুমি পিতার কোমল জায়নামাজের উদার জমিন।
স্বাধীনতা তুমি
উঠানে ছড়ানো মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন।
স্বাধীনতা তুমি
বোনের হাতের নম্র পাতায় মেহেদীর রঙ।
স্বাধীনতা তুমি

বন্ধুর হাতে তারার মতন জ্বলজ্বলে এক রাঙা পোস্টার।
স্বাধীনতা তুমি
গৃহিণীর ঘন খোলা কালো চুল,
হাওয়ায় হাওয়ায় বুনো উদ্দাম।’
(স্বাধীনতা তুমি)
আমরা এই কবিতায় যে চিত্র পাই, তা আমাদের সবুজাভ বাংলার মৌলিক চাওয়া পাওয়ার আকুলতা। এভাবেই তিনি পৌঁছে গিয়েছিলে বাঙালি জাতির রাজনৈতিক চেতনায়-ভাবনায়। বলেছিলেন আপামর মানুষের মনের আকুতি। ১৯৭১ সালে কেমন ছিল এই বাংলা? কেমন ছিল এই ভূদেশের মানুষ? এর উপযুক্ত উপাখ্যান তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর পঙ্‌ক্তিমালায়।

‘বন্ধুরা তোমরা যারা কবি,
স্বাধীন দেশের কবি, তাদের সৌভাগ্যে
আমি বড়ো ঈর্ষান্বিত আজ।
যখন যা খুশি
মনের মতো শব্দ কী সহজে করো ব্যবহার
তোমরা সবাই।
যখন যে শব্দ চাও, এসে গেলে সাজাও পয়ারে,
কখনো অমিত্রাক্ষরে, ক্ষিপ্র মাত্রাবৃত্তে কখনো-বা।
সেসব কবিতাবলী, যেন রাজহাঁস
দৃপ্ত ভঙ্গিমায় মানুষের
অত্যন্ত নিকটে যায়, কুড়ায় আদর।

অথচ এদেশে আমি আজ দমবদ্ধ
এ বন্দী-শিবিরে
মাথা খুঁড়ে মরলেও পারি না করতে উচ্চারণ
মনের মতন শব্দ কোনো।
মনের মতন সব কবিতা লেখার
অধিকার ওরা
করেছে হরণ।
প্রকাশ্য রাস্তায় যদি তারস্বরে চাঁদ, ফুল, পাখি
এমনকি নারী ইত্যাকার শব্দাবলী
করি উচ্চারণ, কেউ করবে না বারণ কখনো।
কিন্তু কিছু শব্দকে করেছে
বেআইনী ওরা
ভয়ানক বিস্ফোরক ভেবে।
(বন্দী শিবির থেকে)
এক ধরনের বন্দী ছিলেন তিনি। তারপরও তাঁর কবিত্ব দাঁড়িয়েছে মজলুম মানুষের পক্ষে। তাঁর কাব্যের বুননে উঠে এসেছে একাত্তরের বুলেটবিদ্ধ হৃৎপিণ্ডের ছটফটানি। তিনি `স্বাধীনতা` নামক শব্দটিকে দেখেছেন বৃহৎ যানভাসে। `স্বাধীনতা` শব্দটিকে তিনি উচ্চারণ করেছেন দৃপ্ত কণ্ঠে। শহরের অলিতে, গলিতে, আনাচে-কানাচে, প্রতিটি রাস্তায়, বাড়িতে, সাইনবোর্ডে, পাখিতে, নারীতে ঝলকিত হতে দেখেছেন প্রিয় শব্দটিকে।
বিশ্বের কবিকূলকে ডেকে বলেছেন, তোমরা দেখে যাও একজন কবি হিসেবে আমি কেমন আছি। যেমনটি ছিলেন সেই সময়ে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি।
দুই. স্বাধীন বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময়ে কবি হয়েছেন উৎকণ্ঠিত। ভীত। ১৯৭৫ সালে জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার প্রতিবাদে তিনি লিখেছেন :
‘শ্রাবণের মেঘ আকাশে আকাশে জটলা পাকায়
মেঘময়তায় ঘনঘন আজ একি বিদ্যুৎ জ্বলে।
মিত্র কোথাও আশেপাশে নেই, শান্তি উধাও;
নির্দয় স্মৃতি মিতালী পাতায় শত করোটির সাথে।
নিহত জনক, এ্যাগামেনন, কবরে শায়িত আজ।

সে কবে আমিও স্বপ্নের বনে তুলেছি গোলাপ,
শুনেছি কত যে প্রহরে প্রহরে বনদোয়েলের ডাক।
অবুঝ সে মেয়ে ক্রাইসোথেমিস্‌ আমার সঙ্গে
মেতেছে খেলায়, কখনো আমার বেণীতে দিয়েছে টান।

নিহত জনক, এ্যাগামেনন, কবরে শায়িত আজ।
পিতৃভবনে শুনেছি অনেক চারণ্যের গাথা,
লায়ারের তারে হৃদয় বেজেছে সুদূর মদির সুরে।
একদা এখানে কত বিদূষক প্রসাদ কুড়িয়ে
হয়েছে ধন্য, প্রধান কক্ষ ফুলে ফুলে গেছে ছেয়ে।

নিহত জনক, এ্যাগামেনন, কবরে শায়িত আজ।’
(ইলেকট্রার গান)
তাঁর `আসাদের শার্ট` আরও একটি ঐতিহাসিক কবিতা। ওই কবিতায় তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন, স্বাধীনতাই বাঙালির প্রকৃত গন্তব্য। নির্যাতিত বাঙালির ঘুরে দাঁড়ানোর মন্ত্রের মতোই এই কবিতা শাণিত করেছে সেই সময়ের তরুণ প্রজন্মকে। তিনি লিখেছেন :

‘গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সূর্যাস্তের
জলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট
উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায়।

বোন তার ভায়ের অম্লান শার্টে দিয়েছে লাগিয়ে
নক্ষত্রের মতো কিছু বোতাম কখনো
হৃদয়ের সোনালি তন্তুর সুক্ষ্মতায়

বর্ষীয়সী জননী সে-শার্ট
উঠোনের রৌদ্রে দিয়েছেন মেলে কতদিন স্নেহের বিন্যাসে।
ডালিম গাছের মৃদু ছায়া আর রোদ্দুর-শোভিত
মায়ের উঠোন ছেড়ে এখন সে-শার্ট
শহরের প্রধান সড়কে

কারখানার চিমনি-চুড়োয়
গমগমে এভেন্যুর আনাচে কানাচে
উড়ছে, উড়ছে অবিরাম
আমাদের হৃদয়ের রৌদ্র-ঝলসিত প্রতিধ্বনিময় মাঠে,
চৈতন্যের প্রতিটি মোর্চায়।

আমাদের দূর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা
সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক;
আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।

(আসাদের শার্ট)
শামসুর রাহমান ছিলেন একজন আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক কবি। মৌলবাদের বিরুদ্ধে তিনি সবসময় ছিলেন সোচ্চার। এজন্য তাঁকে দৈহিক আক্রমণের শিকারও হতে হয়েছিল। তিনি নিষিদ্ধ ছিলেন বিভিন্ন জেলায়, মৌলবাদীদের দ্বারা। তাঁর জীবন ছিল খুব ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁর এই কবিতাটি জানিয়ে দিয়েছিল- কীভাবে এই দেশে ফুলে ফেঁপে উঠছে একাত্তরের পরাজিত শক্তি
আলবদর-রাজাকার চক্র।
‘হে দ্বীন ও দুনিয়ার মালিক, চোখের পলকে,
হে সর্বশক্তিমান, আপনি আমাকে
এমন তৌফিক দিন যাতে আমি
আপাদমস্তক মনেপ্রাণে একজন খাস রাজাকার
হয়ে যেতে পারি রাতারাতি। তাহলেই আমি সাত তাড়াতাড়ি
মঞ্জিলে মকসুদে পৌঁছে যাবো, এই চর্মচক্ষে
দেখে নেবো হাতিশালে হাতি আর
ঘোড়াশালে ঘোড়া আর আমার হাতে আমলকির মতো
এসে যাবে সব পেয়েছির দেশের সওগাত।
তবে সেজন্যে দাঁত কেলিয়ে হাসতে হবে, হাত
কচলাতে হবে অষ্টপ্রহর আর জহরতের মতো
পায়ের চকচকে জুতোয় চুমো খেতে হবে নানা ছুতোয় সকাল সন্ধ্যা
এবং মাঝে মাঝে শিন্নি দিতে হবে পীরের দরগায়।
না, না, এতে জিল্লতি নেই একরত্তি, বরং চোখ-ঝলসানো
জেল্লা আছে এই জীবনে। হে আলেমুল গায়েক, হে গাফফার,
আপনি আমাকে এক্ষুণি
একজন চৌকশ রাজাকার ক`রে দিন। তাহ`লেই আমি
চটজলদি গুছিয়ে নেবো আখের।

(একটি মোনাজাতের খসড়া)
স্বাধীন বাংলাদেশে গণমানুষের পাশে কবিতা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলে শামসুর রাহমান, যা তাঁর সমসাময়িক আর কোনও কবিই এতোটা সাহস নিয়ে পারেননি। সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তিনি রুখে দাঁড়িয়েছেন। লিখেছেন `বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়` এর মতো অমর কবিতা। এই তিনিই লিখেছেন `উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ`। কারণ তিনি জানতেন কোথাও কিছু ভুল হচ্ছে। শামসুর রাহমান ছিলেন রাজনৈতিক ভবিষ্যতদ্রষ্টা কবি। তিনি দেখেছেন তাঁর প্রজন্মের আগামী। এবং তা লিখেও গেছেন। বলা দরকার, জীবনানন্দ দাশ পরবর্তী সময়ে রাহমান-ই বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। তাঁর আসন এখনও কেউ দখল করতে পারেননি।
এই নিবন্ধে তাঁর কবিতাগুলোর আংশিক তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো বহুল পঠিত। যারা পড়তে চান- তারা পুরো কবিতাগুলো পড়বেন বলে আমি আশা করবো। আমার একটি দুঃখ আছে কবিকে নিয়ে। তাঁকে আমরা রাষ্ট্রীয় পতাকায় ঢেকে জানাতে পারিনি শেষ বিদায়। কারণ সেই সময়ের রাষ্ট্র শাসকরা তা করেননি। কেন করেননি? আমাকে এখনও বড় পীড়া দেয় এ প্রশ্ন।
তিনি থাকবেন। তাঁর কবিতাই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে। রাখবে এজন্য- তিনি প্রজন্মের হাতকে শক্ত করার শিখা জ্বালিয়ে গেছেন, রাজনৈতিক-সামাজিক ভাবনায়। তাঁর মৃত্যুদিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা।
নিউইয়র্ক, ১৫ আগস্ট ২০১৬

সর্বশেষ সংবাদ