জাতীয় শোক দিবস আজ--কামরুল হাসান বাদল-কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 15/08/2016-05:39pm:   
আজ আমাদের শোকের দিন। জাতীয় শোক দিবস। আজ থেকে ৪১ বছর আগে এ দিনে সূর্য ওঠার পূর্বে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটি যে বাড়ি ১৯৬৬ সালের পর থেকে ক্রমান্বয়ে বাঙালির তীর্থে পরিণত হয়েছিল, জাতির জনক ও তার পরিবারের সদস্যদের পবিত্র রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল।
তখনো আলো ফোটেনি, পাখিরা সচল হয়নি, শ্রাবণের শেষ ধারায় সিক্ত পাতাদের শরীরে সূর্যের আলোকচ্ছটা স্পর্শ করেনি, তখন সে অন্ধকারে কাপুরুষের মতো এসে হায়েনারা উন্মত্ত হত্যালীলা সংঘটিত করে সহস্র বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক, রাষ্ট্রপতি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে। ঘাতকেরা সেদিন শুধু বাঙালির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্রের স’পতিকেই খুন করেনি, তারা একে একে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী, তাঁর সকল কাজে প্রেরণার উৎস বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেসা মুজিব, তাঁর সন্তান-শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামালকে। হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর অনুজ অসুস’ শেখ নাসেরকে। একই সময়ে তারা হত্যা করে ভগ্নিপতি তৎকালীন মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, ছেলে আরিফ, মেয়ে বেবি ও শিশু সুকান্ত বাবুকে। হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবনেতা, সাংবাদিক শেখ ফজলুল হক মনি, তাঁর অন্তঃস্বত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনিকে। এছাড়া আবদুন নাইম খান মিন্টু, কর্নেল জামিলসহ আরও ১৬ জনকে। এ সময় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে রক্ষা পান।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই হত্যাকাণ্ড সভ্যতার ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক দিন। বিশ্বের অন্যান্য জাতীয়তাবাদী নেতাকেও হত্যা করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে কিন’ একটি পরিবারের শিশুসহ সবাইকে হত্যা করার মতো এত নৃশংস ঘটনা বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথাও ঘটেনি। যিনি তাঁর জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে প্রথম একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিশ্বের দরবারে মর্যাদার আসনে অভিষিক্ত করেছিলেন তাঁকে হত্যা করা হয় স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে।
মূলত ঘাতকেরা শুধু একজন জাতির জনক বা নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করেনি, তারা তাঁর পরিবারের সদস্যেদেরই শুধু হত্যা করেনি, তারা হত্যা করেছিল বাঙালির অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী চেতনাকে, রাষ্ট্রের মৌলিক চার স্তম্ভকে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনাকে। তারা হত্যা করেছিল বাঙালির স্বপ্নকে।
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার একটি অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া শেখ মুজিব, নিজের সততা, মেধা, শ্রম, শিক্ষা, জ্ঞান ও ত্যাগ দিয়ে এ জাতির বন্ধু এবং পরবর্তীতে জনকে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি অভিষিক্ত হয়েছিলেন ‘পয়েট অব পলিটিক্স’ হিসেবে। ব্রিটিশের ১৯০ বছরের পরাধীনতা ছিন্ন করে বিভক্ত হওয়া পূর্ব পাকিস্তানে তিনি সহজেই বুঝেছিলেন পাকিস্তান নামক সাম্প্রদায়িক ও কলোনিয়াল রাষ্ট্রে বাঙালির প্রকৃত মুক্তি আসবে না। ফলে তিনি দেশ বিভাগের মাত্র ২৩ বছরের মধ্যে বিশ্বের মানচিত্রে আরেকটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম দেন যার নাম প্রিয় ভাষার নামে বাংলাদেশ।
যতকাল বাংলাদেশ থাকবে, বাঙালি থাকবে ততকাল ১৫ আগস্ট এলে বাঙালি তার সবচেয়ে কলঙ্কজনক রাতের কথা স্মরণ করে মর্মাহত হবে, শোকে মূহ্যমান হবে। তাদের কপালে আঁকা পরাজয় ও গ্লানির চিহ্ন মূছে ফেলার চেষ্টা করবে। শোককে শক্তিতে পরিণত করে জাতির জনকের স্বপ্নের শোষণহীন, বঞ্চনাহীন, ধর্মনিরপেক্ষ সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার শপথ নেবে। এবং এভবেই যুগযুগ ধরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাঙালির প্রেরণা ও সাহসের উৎস হয়ে ওঠেন কবিতার এই পংক্তির মতোই।

আমাদের পরিচয়হনীতায়
তুমি ছিলে উজ্জ্বল উদ্ধার
আমাদের বদ্ধ ঘরে তুমি ছিলে
পূবের খোলা জানালা
আমাদের একঘেঁয়ে অন্ধকারে
তুমি ছিলে অনন্ত সবুজ ভোর
তুমি আমাদের অন্তিম আশ্রয়
হে মহাসাগর।
সুপ্রভাত বাংলাদেশ, ১৫ আগস্ট ২০১৬

সর্বশেষ সংবাদ