১৯৭৪ আর ২০১৬ এক নয়, প্রিয় জনক -ফকির ইলিয়াস : কবি ও সাংবাদিক।

পোস্ট করা হয়েছে 14/08/2016-02:55am:    যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ প্রতিনিধিঃ ===

একটি কথা বার বার আমাকে ভাবায়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যদি বাংলাদেশের গণউন্নয়নের ধারাটি কিছুটা হলেও দেখে যেতে পারতেন! তিনি যদি এই মাটিতে স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করতে পারতেন! না তিনি পারেননি। আমি তাঁর শাসনামল দেখেছি। দেখেছি ১৯৭৪ সালে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ তৈরি করে কীভাবে বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা হয়েছিল। কারা তা করেছিল? কেন খাদ্যভর্তি জাহাজ ফিরিয়ে নেয়া হয়েছিল?
বাসন্তীকে জাল পরিয়ে ছবি তোলা হয়েছিল। এ নিয়ে অনেক কথা আছে। শেখ মুজিবের শাসনকে কলঙ্কিত করতেই এমনটি করা হয়েছিল। বিষয়গুলো ক্রমশ বেরিয়ে এসেছে। সেই ছবি তোলার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন একজন, তার নাম রাজো বালা। তিনি সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলেন। প্রকৃত দৃশ্য বর্ণনা করতে চান না। এখনো ভয় পান। তার মতে, ‘এসব বললে ক্ষতি হতে পারে। যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে, বলে আর লাভ কি। পরে অনেক আলাপ-আলোচনার পর রাজো বালা বর্ণনা করেন সেই দৃশ্য। ছলছল চোখে আনমনা হয়ে কথা বলেন তিনি। তার বর্ণনা থেকে জানা যায়, ১৯৭৪-এ যখন বাসন্তী-দুর্গাতিদের ছবি তোলা হয়, তখন ছিল বর্ষাকাল। চারদিকে পানি আর পানি। এমনি প্রেক্ষাপটে তিনজন লোক আসেন বাসন্তীদের বাড়িতে। এদের মধ্যে একজন ছিলেন তৎকালীন স্থানীয় রিলিফ কমিটির চেয়ারম্যান। তার নাম আনছার। অপর দুজনকে রাজো বালা চিনতে পারেনি। বাসন্তী-দুর্গাতিদের একটি কলাগাছের ভেলায় করে বাড়ি থেকে বের করা হয়। আর অন্য একটি ভেলায় রেখে তাদের ছবি নেয়া হয়। এ সময় পাশের একটি পাটক্ষেতে ছিলেন রাজো বালা। ছবি তোলার আগে আগন্তুকরা বাসন্তীদের মুখে কাঁচা পাটের ডগা দিয়ে বলে- এগুলো খেতে থাকো। এর বেশি আর কিছু জানাতে পারেননি রাজো বালা। বাসন্তীর কাকা বুদুরাম দাসের কাছে সেই ছবি তোলার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি কাঁচুমাচু করেন। এক পর্যায়ে অশ্রæসিক্ত নয়নে বর্ণনা করেন সেই ছবি তোলার নেপথ্য কাহিনী। শেষ পর্যায়ে তিনি ওই ঘটনাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং প্রতিকার চান।’
তিনি বলেন- ‘সঠিকভাবে দিন-তারিখ মনে নেই। একদিন বাসন্তী ও তার কাকাতো বোন দুর্গাতিসহ পরিবারের আরো কয়েকজন মিলে ব্রহ্মপুত্র নদের বাঁধের ওপর বসেছিলেন। তখন দুপুর গড়িয়েছে। এমন সময় ইউপি চেয়ারম্যান আনসার আলী ব্যাপারী (এক সময়ের মুসলিম লীগ ও পরে আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের নেতা) কয়েকজন রাজনৈতিক দলের নেতাসহ একজন সাংবাদিককে (আফতাব আহমেদ, আলোকচিত্রী, দৈনিক ইত্তেফাক) নিয়ে আসেন মাঝি পাড়ায়। তারা বাসন্তী ও দুর্গাতির ছবি তুলতে চান। এ সময় তারা বাঁধের ওপর মাঝিদের রোদে শুকোতে দেয়া জাল তুলে এনে তা বাসন্তীর ছেঁড়া শাড়ির ওপর পরিয়ে ছবি (১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় এই ছবি দু’টি ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়। সূত্র : ‘চিলমারীর এক যুগ’ মোনাজাত উদ্দিন) তোলেন। বুদুরাম এভাবে ছবি তুলতে আপত্তি জানিয়ে নিষেধ করেছিলেন। তবুও তারা শোনেননি। এ প্রসঙ্গে বুদুরাম দাশ তার ভাষায় জানায়, ‘চেয়ারম্যান সাব, ছেঁড়া হউক আর ফারা হউক একনাতো শাড়ি আছে উয়ার উপরত ফির জাল খান ক্যা পরান, ইয়ার মানে কি? (চেয়ারম্যান সাহেব, ছেঁড়া হোক একটা শাড়ি তো আছে, তার ওপর জাল কেন পরান; এর কারণ কি?) তখন সাইবদের মইদ্যে একজন কয় ইয়ার পরোত আরো কত কিছু হইবে। (তখন একজন সাহেব জানায়, এরপর আরো অনেক কিছু হবে…)’।
এভাবেই শুরু হয়েছিল ষড়যন্ত্র। ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বাসন্তীর ছবি সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘ওই ছবিটি প্রকাশের আগে থেকেই দেশের তৎকালীন অবস্থা নিয়ে জনগণ বিচলিত ছিলেন। দুর্ভিক্ষ-সৃষ্ট পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে বঙ্গবন্ধু সরকার তখন প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছিল। এ রকম একটা সময়ে বাসন্তীর ছবিটি ছাপা হয় এবং ছবিটি জনমনে ব্যাপক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। মানুষের ভাবনা ছিল, এত কষ্ট করে দেশ স্বাধীন হলো। অথচ স্বাধীন দেশে একটি যুবতী মেয়ের পরার মতো কাপড় নেই। এমনটা কেন হবে। পরবর্তীতে জানা যায় ছবিটি সাজানো ছিল এবং এ থেকে মানুষ আসল সত্য জানতে পারে। একটা সরকারের বিরোধী পক্ষ থাকবে। এটা খুবই স্বাভাবিক। তবে ওই আলোকচিত্রী যে কাজটি করেছিলেন তা সাংবাদিকতার কোনো নীতিমালার মধ্যে পড়ে না। এটা অন্যায়।’
কে ছিলেন এই আলোকচিত্রী আফতাব আহমেদ? ইতিহাস সাক্ষী দিচ্ছে- ১৯৯৮ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন তৎকালীন বিরোধী দলের নেত্রী খালেদা জিয়া ফটো সাংবাদিকদের কোনো একটি অনুষ্ঠানে চুয়াত্তরে দুর্ভিক্ষের বিশেষ করে বাসন্তীর মর্মস্পর্শী ছবিটি তোলার কারণে আলোকচিত্রী আফতাব আহমেদকে পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং সেই ঘোষণার পর ইত্তেফাকে বিবৃতি দিয়ে আফতাব আহমেদ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন খালেদা জিয়ার প্রতি। উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে একুশে পদক পেয়েছিলেন তিনি। আর সেই পুরস্কারটি দিয়েছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। ২০০৬ সালে আরেকটি ঘটনায় আফতাব আহমেদের রাজনৈতিক চরিত্রটি আরো স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে। সেই বছর ইসলামী ছাত্র শিবিরের একটি অনুষ্ঠানে তাকে বিশেষ পদক প্রদান করা হয়। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামীর হাত থেকে পদকটি গ্রহণ করেছিলেন হাস্যোজ্জ্বল আফতাব আহমেদ। এই আফতাব আহমেদ পরে আততায়ীর হাতে খুন হয়েছিলেন ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে।
একটি বিষয় খুবই স্পষ্ট, মুজিবের দেশপ্রেম ও অগ্রসরমানতাকে একটি মহল শুরু থেকেই মানতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু সবুজ বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। তিনি কৃষকের হাতকে শক্তিশালী করতে চেয়েছিলেন। দেশের কৃষি, কৃষক ও কৃষিবিদদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নিবিড় সম্পর্কের কথা কারো অজানা নয়। নির্বাচনী ডামাডোলের শত ব্যস্ততার মধ্যেও ১৯৭৩-এর ১৩ ফেব্রুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান মমতার টানে ছুটে গিয়েছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) সবুজ চত্বরে। ব্রহ্মপুত্রের তীরে সবুজ শ্যামল অঙ্গনে এটিই ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রথম ও শেষ সফর। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সেই সফর আজো কৃষিবিদদের মায়াবন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছে। কৃষিবিদ সমাজ ঐতিহাসিক এ দিনটির অপরিসীম গুরুত্ব ও মর্যাদাকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রতি বছর ‘কৃষিবিদ দিবস’ হিসেবে পালন করে থাকেন।
১৯৭৫-এর পর বাংলাদেশের উন্নয়ন ও সামাজিক জীবনে একটি খড়গ নেমে আসে। বিশেষ করে সামরিক জান্তারা তাদের গদি রক্ষার জন্য নানা রকম হত্যাকাণ্ড ঘটায়। নড়বড়ে হয়ে ওঠে দেশের গণতান্ত্রিক ধারা। বহু কষ্টে সেই বাংলাদেশ আজ ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে জাতির জনকেরই সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে। পরিসংখ্যান বলছে, বিভিন্ন ধরনের ফল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। বিবিএসের হিসেবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে মোট ফল উৎপাদিত হয়েছে প্রায় ১ কোটি টন। বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে দেশে বর্তমানে ৫০ প্রজাতির ফল বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন হচ্ছে। উৎপাদনে বিস্ময়কর সাফল্যই কেবল নয়, আলু এখন দেশের অন্যতম অর্থকরী ফসলও। কিছুদিন আগেও যেখানে বিশ্বের ২০টি দেশ থেকে বাংলাদেশকে আলু আমদানি করতে হতো, সেখানে গত বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলারের আলু রপ্তানি হয়েছে।
সরকার ঘোষিত রূপকল্প-২০২১ অনুযায়ী ২০১৩ সালের মধ্যে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। জনসংখ্যা বৃদ্ধি সত্ত্বেও বর্তমান জনগণবান্ধব সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। গত অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ১৩১৪ ডলার এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ (এযাবৎকালের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ) এবং আগামী অর্থবছরে যা ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের যত অর্জন আছে, তার মধ্যে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি সবচেয়ে উল্লেখ করার মতো। এটা বিশ্বের যে কোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য উদাহরণও বটে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যেসব সাফল্য অর্জন করেছে তা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশই করতে পারেনি।
গত বছর জাতিসংঘ পরিবেশ উন্নয়ন কর্মসূচি দেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য লিডারশিপ ক্যাটাগরিতে শেখ হাসিনাকে তাদের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়নস অব দি আর্থ-২০১৫’ পুরস্কারে ভূষিত করেছে। এসবই অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের মানুষের বিজয় হিসেবে। এই বিজয়কে ঠেকিয়ে দিতে অনেক প্রেতাত্মাই এখনো মাঠে। তারা কী করছে- আমরা সবই দেখছি। বলে নেয়া দরকার ১৯৭৪ আর ২০১৬ এক নয়। মানুষ এখন আর জাল দিয়ে ছবি তুলতে দেবে না। জাতির জনক ছিলেন মহান চিত্তের মানুষ। তার এই মহানুভবতাকে দুর্বলতা ভেবেই একটি মহল তাকে ঘায়েল করতে প্রয়াসী ছিল। তারাই তৈরি করেছিল ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের কালরাত।
বাংলাদেশ, জাতির জনকের স্বপ্নের পথ ধরেই এগিয়ে যাচ্ছে- যাবে। মানুষ এখন অনেক সত্য জানতে পারছে, বুঝতে পারছে। আর এই অনুধাবন জাগ্রত হবে বাঙালি সমাজে- সেটাই চেয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

সর্বশেষ সংবাদ