কিসের আশায় করছে তারা বরণ মরণ-যন্ত্রণাকে-কামরুল হাসান বাদল-কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 14/07/2016-07:57pm:    ১। নেশার নাম কি জঙ্গিবাদ
পোস্ট মর্টেমের জন্য লাশ কাটে যারা কিংবা চিতায় লাশ পোড়ায় যারা তাদের বলা হয় ডোম। সমাজে ভীষণ অচ্ছূত তারা। এরা জ্যান্ত মানুষ কাটে না বা পোড়ায় না। পেশার তাগিদে মৃত মানুষ কাটে বা পোড়ায় । যারা সামান্য খবরাখবরও রাখেন তারা নিশ্চয়ই জানেন, একাজও তারা স্বাভাবিকভাবে করতে পারেন না। কাজ শুরুর আগে তারা প্রচুর মদ্যপান করেন। নিজেদের সহজাত আবেগ ও সংবেদনশীলতাকে ভোঁতা করার জন্য। গত ১ জুলাই রাজধানী ঢাকার অভিজাত ও সবচেয়ে নিরাপদ এলাকা গুলশানের হলি আর্টিজান হলে জঙ্গি হামলায় ২২ জন নিরপরাধ মানুষের নির্মম হত্যাকাণ্ডের সংবাদের পর আমার বারবার মনে হয়েছে এটা কীভাবে সম্ভব। নিরাপরাধ নারী পুরুষকে গলা কেটে হত্যা করলো যে পাঁচ তরুণ তারা সেদিন কী নেশা পান করেছিল? কীভাবে তারা এত নিষ্ঠুর, নির্মম হয়ে উঠেছিল। মানুষ হত্যা করে এত স্বাভাবিক থাকলো কী করে তারা। সে রাতে রক্তে ভেসে যাওয়া রেস্তোরাঁয় তারা খাবার খেল কীভাবে । স্বাভাবিক থাকলো কী ভাবে? এই নেশার নাম কী? জঙ্গিবাদ?
২। ভয়ংকর এক ড্রাগ
এই ঘটনা ঘটার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে বিশ্বের নানা দেশে বিশেষ করে যেখানে আইএস জঙ্গি আছে বা যারা জঙ্গিবাদে ইন্ধন দিয়ে থাকে তারা কিংবা সে দেশের কিছু সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান সরব হয়ে ওঠে। আইএস এর দায় স্বীকার করে। বাংলাদেশের মানুষ এমন নৃশংস ঘটনায় হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা এবং তাদের সক্ষমতা দেখে অনেকে হতাশ হয়ে পড়েন। এমন ঘটনা বাংলাদেশে এর আগে কখনো ঘটেনি। রাজধানীর ডিপ্লোমেটিক জোনে একটি অভিজাত রেস্তোরাঁয় ১৮ জন বিদেশিসহ মোট ২২ জন হত্যার ঘটনা বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতার নতুন অধ্যায় শুরু করে। এতদিন জঙ্গিরা চোরাগুপ্তা হামলা চালাতো এবং ব্যক্তি বিশেষকে টার্গেট করে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করতো। এই বেদনার ক্ষত মুছতে না মুছতে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায়ও হামলা হয় এবং সেখানে পুলিশ, হামলাকারী ও এক গৃহবধূসহ মোট ৫ জন নিহত হন।
যে তরুণরা এসব হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তাদের বয়স কারো (২০/২২) বছরের বেশি নয়। অর্থাৎ তারা কেবল কৈশোর উত্তীর্ণ তরুণ। যাদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করেনি। এই বয়সের তরুণরা এখনো পরিবারে একান্ত শিশু হিসেবেই পরিগণিত। এখনো মায়ের ন্যাওটা হয়ে থাকার কথা। হত্যাকান্ড সংঘটিত করেছে তারা এতটা নিষ্ঠুরভাবে যে, তা বর্ণনা করতেও গা শিউরে ওঠে। ভারতীয় নাগরিক তারিশি জৈনকে গুলি করা ছাড়াও কোপানো হয়েছে। তাঁর দুই হাতসহ সারা দেহে চল্লিশটির মতো কোপ ও ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে। একজন খুনী কতটা অস্বাভাবিক, হিংস্র ও ভয়ংকর হলে এমন নৃশংসভাবে একজন নারীকে হত্যা করতে পারে তা ভাববার বিষয়। এছাড়া রেস্তোরাঁয় ৭ জনকে পেছন থেকে ঘাড়ে গুলি করা হয়। এদের মধ্যে ৪ জন ইতালির, ২জন জাপানের ও একজন ভারতীয় নাগরিক সেই তারিশি। এর বাইরে ১ বাংলাদেশি, ১ বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত মার্কিন নাগরিকসহ ১০ জনের ঘাড়ে ও গলায় চাপাতির কোপ আছে। তাদের কারো কারো দেহে বোমার স্প্লিন্টারও পাওয়া গেছে। এছাড়া বাংলাদেশি একজন নারী, ইতালির অন্তঃসত্ত্বা ১ নারী ও জাপানের ১ নাগরিকের মাথায় ভারী বস্তু দিয়ে আঘাতের প্রমাণ মিলেছে। তাদের মধ্যে জাপানের ১ জনকে হত্যার পর ডিপ ফ্রিজে রাখা হয়েছিল। তরুণদের এই নৃশংসতা দেখে ধারণা করা হচ্ছে হত্যাকাণ্ডের আগে তারা নেশাজাতীয় কোনো ড্রাগ গ্রহণ করেছিল।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ জানিয়েছেন নিহত জিম্মিদের মৃতদেহ পরীক্ষা করে ধারণা করছি রাত ১২ টার পর তাঁরা আর কেউ বেঁচে ছিলেন না। ৫ জন জঙ্গির পক্ষে ২০ জন (২ পুলিশ অফিসার ছাড়া) মানুষকে এভাবে খুন করা স্বাভাবিক বিষয় নয়। খুনের পর কিছু মৃতদেহকে তারা বিকৃত করেছে। এই তরুণরা বিশেষ কোনো ড্রাগ আসক্ত ছিল কিনা সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি আমরা। এ জন্য তাদের ভিসেরা পরীক্ষা করা হবে।
আইএস জঙ্গিরা যে বিশেষ একটি ড্রাগ সেবন করে তা এখন প্রকাশিত সত্য। বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে নানা সময়ে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। গত বছরের নভেম্বরে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয় ইরাক ও সিরিয়াভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের সন্ত্রাসীরা ‘ক্যাপটাগন’ নামের একটি ওষুধ সেবন করে। এই ড্রাগ গ্রহণের ফলে আইএস জঙ্গিরা দিনের পর দিন জেগে থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। এবং এ সময়ে তারা ঠান্ডা মাথায় খুন করাসহ যে কোনো হিংস্র কাজ সাবলীলভাবে করতে পারে।
এই ড্রাগ গ্রহণের ফলে মানুষের সহমর্মিতাবোধ ও সহনশীলতা লোপ পেয়ে থাকে। আইএসের খপ্‌পর থেকে পালিয়ে আসা কয়েকজন গত বছর এমন কিছু তথ্যও দিয়েছিলেন সংবাদ মাধ্যমে। তারা আইএসের নিষ্ঠুরতা সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে এসেছিলেন।
৩। পেন্টাগন থেকে ক্যাপটাগন?
ইসরাইলের জন্য হুমকি মনে করে সিরিয়ার আসাদ ও ইরানকে শায়েস্তা করার জন্য মধ্যপ্রাচ্য আইএস নামক মারাত্মক এই জঙ্গিগোষ্ঠী গড়ে তুলেছে স্বয়ং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই। এ কথা এখন প্রকাশ্য এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রমাণিত। ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের অস্ত্র, অর্থে গড়ে ওঠা আইএস। এর প্রধান বাগদাদী যিনি মার্কিনীদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মোসাদের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে তথ্য পরিবেশিত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক গোয়েন্দা কর্মী অ্যাডোয়ার্ড স্লোভেনের বরাত দিয়ে পশ্চিমা বেশ কয়েকটি সংবাদপত্র এমন তথ্য প্রকাশ করেছে। ইসরাইল তার নিরাপত্তার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের যে সব রাষ্ট্রকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছে সে রাষ্ট্রকেই ধ্বংস স্তুপে পরিণত করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিনীরা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের জন্য সিরিয়ার আসাদকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে। তাই তারা আসাদের অপসারণের জন্য আইএসকে অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করেছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ থেকে তুরস্ক এ কাজে আমেরিকা ও ইসরাইলকে সহযোগিতা করেছে। ন্যাটো ও আমেরিকাসহ বন্ধু রাষ্ট্রগুলো এখনো আইএসের চেয়ে আসাদকেই নিজেদের জন্য বড় বিপদ বলে মনে করে। যে কারণে মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে সিরিয়ায় রাশিয়ার আইএস বিরোধী অভিযানকে ভালো চোখে দেখছে না তারা। তুরস্কসহ মার্কিন সমর্থকরা সিরিয়ায় রাশিয়ার আইএস বিরোধী প্রকৃত অভিযানের বিরোধীতা করে আবার অন্যদিকে আইএস ও ইসলামী জঙ্গিবিরোধী অভিযানের নামে নানা দেশে নিজেদের আগ্রাসী ভূমিকা অব্যাহত রেখেছে। ঘটনা এখন এমন পর্যায়ে গেছে যে, কোনো দেশে আমেরিকা ঢুকে পড়তে চাইলে তার জন্য আইএস একটি ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে আইএস দমনের নামে মার্কিনীরা যেকোনো দেশে হামলা চালাতে পারে। এবং সে বিষয়ে তারা তাদের পার্লামেন্টের সমর্থন নিয়ে রেখেছে। যদিও বিশ্ববাসীর সমর্থনের কোনো তোয়াক্কা তারা করে না। তাই অনেকের প্রশ্ন ‘ক্যাপটাগন’ ড্রাগটিও পেল্টাগণ কর্তৃক সরবরাহকৃত কি না?
৪। ধন্যবাদ বাংলাদেশ সরকারকে
গত ১ বছর ধরে দেশে-বিদেশে একটি গোষ্ঠী অনেকভাবে চেষ্টা করছে বাংলাদেশে আইএস জঙ্গি আছে তা প্রমাণ করতে। যেখানে যে ঘটনাই ঘটুক সাথে সাথে তার দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিচ্ছে আইএস নতুনবা আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা জেএমবি। সাইট ইন্টেলিজেন্স নামে ইসরাইলি যে প্রতিষ্ঠানটি আছে, যারা নিজেদের জঙ্গি ও আইএসের তথ্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাবি করে তারা অন্তত এক বছর ধরে বাংলাদেশ আইএসের উপস্থিতি প্রমাণের চেষ্টা করছে। আর যতবারই বাংলাদেশে এই ধরনের ঘটনা ঘটে ততবারই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জঙ্গিবিরোধী সব ধরনের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশে তাদের লোক পাঠায়। বাংলাদেশ সরকার এবং দেশের সচেতন মহল খুব ভালো করেই বোঝেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইএসবিরোধী অভিযানের রূপ কী হতে পারে। এবং আইএসবিরোধী অভিযান চালানোর নামে আমেরিকা বাংলাদেশে কী ঘটাতে চায়। এবারও মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই ছুটে এসেছেন বাংলাদেশে যে কোনো সাহায্য প্রদানের আশ্বাস নিয়ে। আমেরিকা যার বন্ধু তার যে শত্রু লাগে না এ কথা এখনো স্মরণে আছে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর। কাজেই বাংলাদেশ সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে কারিগরি ও তথ্য সহযোগিতা ছাড়া আপাতত কিছু লাগবে না। তবে এর জন্য হয়ত আরও দাম দিতে হতে পারে বাংলাদেশকে। এ দেশে একটি রাজনৈতিক শক্তি, তাদের সমর্থিত লেখক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, বক্তা, যাঁরা এ দেশে আইএসের উপস্থিতি আছে প্রমাণের জন্য মরিয়া হয়ে আছেন তাদের সুবিধার জন্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আবার সাহায্যের হাত প্রসারিত করার সুযোগ লাভের জন্য জঙ্গি কর্মকাণ্ড আরও কয়েকটি ঘটতে কিংবা ঘটাতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই দৃঢ় মনোভাবের জন্য অকুণ্ঠ ভালোবাসা জানাই তাঁকে। তাঁর জঙ্গিবাদবিরোধী আন্দোলনের সফলতা কামনা করি।
৫. কিসের নেশায়, কিসের আশায়
তারপরেও প্রশ্ন হচ্ছে বিশ্বব্যাপী তরুণ-তরুণীরা এভাবে আইএসের প্রতি ঝুঁকছে কেন? আমরা আগে বলতাম অশিক্ষা-কুশিক্ষায় সাম্প্রদাদিকতা ধর্মান্ধতা, জঙ্গিবাদ জন্ম নেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা আমাদের সে ভুল অনেকটা ভেঙে দিয়েছে। ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশ থেকে যখন অনেকে পালিয়ে আইএসে যোগ দেয়। কিংবা বাংলাদেশের সচ্ছল, ধনী পরিবারের মেধাবী তরুণরা যখন জঙ্গি হয়ে ওঠে তখন আমাদের ভাবনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়। কেন, কিসের নেশায় তরুণরা এমন হিংস্র, নিষ্ঠুর আত্মঘাতী পথ বেছে নিচ্ছে। এর জন্য দায়ী কি শুধু সে বিপথগামী তরুণরাই? আমাদের কি কোনো দায় নেই? পিতা-মাতা আত্মীয়-পরিজন-প্রিয়জনকে ছেড়ে কেন একটি তরুণ এমন অন্ধকারের পথ, মৃত্যুর পথ, বিভ্রান্তের পথ বেছে নেবে? ওই সময়টিতো তার জন্য শিক্ষার, জ্ঞানের, ভালোবাসার, জীবনদানের জীবনহরণের নয়। এই তরুণরা জীবনের স্বর্ণালী সময়ে বিভ্রান্ত হলো কেন? এসব কেন’র উত্তর না খুঁজলে এবং সে বিষয়ে সচেষ্ট না হলে শুধু বাহিনী দিয়ে, গুলি করে, হত্যা করে জঙ্গিবিরোধী যুদ্ধে জয়লাভ করা যাবে না। লড়াইটা করতে হবে আদর্শিক, মগজ দখলের লড়াই।
এই বিভ্রান্ত তরুণদের সামনে একটি আদর্শ দাঁড় করাতে না পারলে দলে দলে আইএসে যোগদান এবং এমন অকাতরে আত্মঘাতী হামলা বন্ধ করা যাবে না। একটি সমাজে, রাষ্ট্রে বা বিশ্বে বিদ্যমান অন্যায়, অসঙ্গতি এবং কোনো রাষ্ট্রের একক আধিপত্য বজায় রেখে এই পথ থেকে তরুণদের ফেরানো যাবে না। ইসলামী জঙ্গিবাদ এখন একক কোনো রাষ্ট্রের সমস্যা নয়। এই সমস্যা বৈশ্বিক। একক কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।
ইসলামের নামে যে তরুণরা উগ্রবাদকে বেছে নিচ্ছে তাদের সামনে মানবিক কোনো আদর্শ উপস্থাপন করতে না পারলে তাদের রোখা যাবে না। এই বিভ্রান্ত তরুণরা জানেই না যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং তাদের আগ্রাসী যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদেরই সৃষ্ট ফাঁদে পা বাড়াচ্ছে তারা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদি বসতি ও ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠার জন্য ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করার মধ্য দিয়ে আমেরিকা যে ভুল ও এক গুঁয়েমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তার চূড়ান্ত প্রতিবাদ আজ ইসলামী জঙ্গিবাদ।
ইসরাইলকে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন করে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রভাব ও কর্তৃত্ব বজায় রাখার স্বার্থে যুগ যুগ ধরে ফিলিস্তিনিদের প্রতি যে অন্যায় আচরণ করা হয়েছে তার প্রতিক্রিয়ায় এই ইসলামী জঙ্গিবাদ। ইরাক, লিবিয়া, আফগানিস্তান আমেরিকা যে অন্যায় যুদ্ধ চালিয়ে এসেছে তার প্রতিবাদ এই ইসলামী জঙ্গিবাদ।
স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনকারীদের একটি ভরসা স্থল ছিল সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব তথা সোভিয়েত ইউনিয়ন। এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাতিন আমেরিকার বহু দেশের কোটি কোটি তরুণ সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ ও যুদ্ধবাজদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে প্রেরণা পেয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা সাম্যবাদী বিশ্বের। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর গত শতকের নয় দশক থেকে বিশ্ব হয়ে পড়ে এক কেন্দ্রিক ক্ষমতা নির্ভর। পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের মুখোমুখি দাঁড়ায় ইসলামী ইজম। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরাক, ইরান, লিবিয়া যারা সরাসরি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ভূমিকায় সোচ্চার ছিল আমেরিকা একটি একটি করে সেসব দেশ ধ্বংস করেছে। এবং ভবিষ্যতেও যেন দেশগুলো আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে না পারে তার জন্য সেখানে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে দিয়েছে। বিষয়টি এমন যে, ওসব দেশে সরকারের হাতে যে মার্কিন অস্ত্র সেখানে বিদ্রোহীদের হাতেও সেই একই মার্কিন অস্ত্র। শুধু বর্তমানে সিরিয়ার আসাদ সরকার ছাড়া। দশকের পর দশক ধরে মুসলিম বিশ্বের ওপর মার্কিন সরকারের অন্যায় আচরণের কারণে বিশ্বের মুসলিম দেশের তরুণদের মধ্যে যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে তা কাজে লাগাতে পারেনি কোনো দেশের রাজনৈতিক দলগুলো। ফলে এই তরুণরা উগ্রতার পথ বেছে নিয়েছে। অন্যদিকে মুসলিম তরুণদের এই ক্ষোভ, এই বিদ্রোহ যেন সত্যিকার অর্থে মার্কিনীদের বিরুদ্ধে যেতে না পারে তার জন্য সৃষ্ট হয়েছে আইএসের মতো জঙ্গি সংগঠন। যারা মূলত মার্কিন ও ইসরাইলের অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে মুসলিম বিশ্বের যে হাজার হাজার তরুণ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল যুদ্ধবাজদের বিপক্ষে পক্ষান্তরে তারা সেই যুদ্ধবাজদের পক্ষ হয়েই যুদ্ধবাজদের অস্ত্রের বাজার প্রসারিত করে দিচ্ছে। নতুন নতুন মুসলিম দেশ দখলের সুযোগ করে দিচ্ছে।
আমরা আমাদের দেশের পরিস্থিতির দিকেও যদি তাকাই তাহলে সেখানেও একই চিত্র দেখতে পাবো। ক্ষমতায় একটি ধর্মনিরপেক্ষ দল আছে বটে কিন্তু সমাজ চলে গেছে সাম্প্রদায়িক শক্তির হাতে। যেখানে মানবতা, ভ্রাতৃত্ববোধ শুভবোধের চর্চা হয় না বললেই চলে। সমাজে ধর্মীয় প্রভাবের সাথে সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে দুর্নীতি ও অনৈতিকতা। নীতি, আদর্শ, মূল্যবোধহীন বাবা-মা তার সন্তানকে রক্ষা করবেন কী দিয়ে। যেখানে তাঁর নিজের জীবন যাপনও শুদ্ধ ও ন্যায়ভিত্তিক নয়। অন্যদিকে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিকভাবে আমরাও ব্যর্থ হয়েছি তরুণদের সামনে একটি আদর্শকে তুলে ধরতে। আদর্শহীন, মূল্যবোধহীন রাজনীতি ও সমাজ বিদ্যমান রেখে এই অসংখ্য তরুণদের বিপথগামী হওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।
৬। বেহেস্তে কে কাকে নিয়ে যাবে
গুলশানে আক্রমণকারী পাঁচ জঙ্গির একজন কয়েক মাস আগে প্রায়ই নাকি তার মাকে বলতো, ‘মা তোমাকে আমি বেহেস্তে নিয়ে যাবো।’ বেহেস্তে যাওয়ার মতো এত বড় আশ্বাস পাওয়ার পর মায়ের মনে কি একবারও প্রশ্নের উদ্রেক হয়নি যে, এই কচি সন্তানটি কী করে তাঁকে বেহেস্তে নিয়ে যাবে? বেহেস্তের আরাম আয়েশের লোভে বিভোর মা যদি একবার ভাবতেন তার সন্তান বেহেস্তের টিকেকটি কীভাবে সংগ্রহ করছে? আমাদের সমাজে এটিও একটি সমস্যা। আমাদের সমাজের অধিকাংশ বাবা-মা সন্তান যখন তার বেতন বা বৈধ আয়ের চেয়ে কয়েক শ’গুণ বেশি অর্থ উপার্জন করে বাড়ি, গাড়ি করে সমাজের কেউকেটা হয়ে যায় তার জন্য সন্তানকে কোনোরূপ প্রশ্ন করে না তেমনি কিছু কিছু বাবা-মা সন্তানের রাতারাতি অতি ধার্মিক হয়ে যাওয়া এবং বেহেস্তের নিশ্চয়তা দেওয়ার পরও সন্তানকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করে না। সমস্যা হচ্ছে অধিকাংশ মানুষ প্রশ্ন করে না। করলে অনেক সত্য তারা জানতে পারতো।

সর্বশেষ সংবাদ
এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।  তথ‌্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি মহোদয়ের শুভ জন্মদিন আজ করোনায় পোশাক কারখানায় ৫৫ শতাংশ কাজ কমে গেছে: রুবানা হক