কর্মক্ষম তরুণদের হাতেই আগামীর বাংলাদেশ - খন রঞ্জন রায়,লেখক ও সংগঠক

পোস্ট করা হয়েছে 08/06/2016-01:38pm:    দেশে মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষম ‘শেপিং দ্য ফিউচার : হার্ড চেঞ্জিং ডেমোগ্রাফিকাল পাওয়ার হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এই পরিসংখ্যান দেয়া হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যা সাড়ে দশ কোটিরও বেশি। আগামী ১৫ বছরে কর্মক্ষম জনসংখ্যা হবে প্রায় ১৩ কোটি। বর্তমানে দেশে মোট জনসংখ্যার ৪৯ শতাংশের বয়সই ২৪ বছর বা তার নিচে। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে ইউএনডিপির নিউইয়র্ক কার্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা। এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানব উন্নয়ন বিষয়ক প্রতিবেদনে ৪৫টি দেশের জনসংখ্যাভিত্তিক তথ্য পরিবর্তনের ধরন এবং করণীয় সম্পর্কে বিশদ বিবরণ প্রকাশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে যে পরিমাণ কর্মক্ষম মানুষ আছে সে পরিমাণ লোকই নেই অনেক উন্নত দেশে। আবার অনেক উন্নত দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমতে শুরু করেছে। তার বিপরীতে বাংলাদেশে আরও ১৫ বছর কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়বে। বর্তমানে কর্মক্ষম জনসংখ্যা ১০ কোটি ৫৬ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ। ২০৩০ সালে এটি বেড়ে দাঁড়াবে ১২ কোটি ৯৮ লাখে যা মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ। তরুণদের কাজে লাগানোর সহজ উপায় হলো প্রথমত তাঁদের উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা। দ্বিতীয়ত তাঁদের মেধা ও ডিপ্লোমা শিক্ষার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার। ইউরোপ, আমেরিকা, চীন ও জাপানসহ যেসব দেশ দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতি করেছে, তারা তাদের জনশক্তি ডিপ্লোমা শিক্ষার দ্বারা সদ্ব্যবহার করেছে দেশের ভেতরে ও বাইরে। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী ভারত ও শ্রীলঙ্কাও ডিপ্লোমা শিক্ষার ক্ষেত্রে বেশ সাফল্য দেখিয়েছে।
ইউরোপ অঞ্চলে জনমিতিক সুযোগ সৃষ্টি হতে সময় লেগেছিল ১০০ থেকে ১২০ বছর। কিন্তু এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এ সুযোগ তৈরি হয়েছে মাত্র ৩০ বছরে। আশা জাগানিয়া প্রতিবেদনটিতে ইউএনডিপি’র এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ও প্রতিবেদনটির প্রধান লেখক ‘থানজাভাল পালানিভাল’ জানিয়েছেন এ অঞ্চলের দেশগুলোতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ৬৮ ভাগ ও নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা ৩২ ভাগ। এই কর্মক্ষম ও নির্ভরশীল মানুষের বর্তমান হার সম্পর্কে তিনি বলেছেন এ অঞ্চলের দেশেগুলোতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি এবং ইতিহাসের যে কোনো সময়ের তুলনায় তাদের মধ্যে খুব কম সংখ্যকই নির্ভরশীল, যা প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সহায়তা করছে।
বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম মানুষ শ্রম বাজারে আসছে। জনমিতিক সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশের প্রয়োজন চামড়া, ওষুধ, টেক্সটাইলসহ রফতানিনির্ভর শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাংলাদেশ বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষায় লক্ষণীয় উন্নতি করেছে। তবে ডিপ্লোমা শিক্ষায় এখনও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আরও বেশি সম্পদ শিক্ষা খাতে ব্যয় করতে হবে যেন তরুণরা ডিপ্লোমা গ্রহণ করে ভবিষ্যতে আকর্ষণীয় চাকরি পেতে পারে। বাংলাদেশের যে বিশাল শ্রমবাজার তৈরি হয়েছে এবং হচ্ছে তা কাজে লাগানোর জন্য সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে দক্ষ জনগোষ্ঠী সৃষ্টিতে বিনিয়োগ এবং বহুমুখী শিল্পায়নের ওপর। এর মধ্যে রয়েছে- সর্বজনীন উচ্চমানের ডিপ্লোমা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, অধিকসংখ্যক মানসম্পন্ন চাকরি ও জীবিকার ব্যবস্থা, উৎপাদনশীল বিনিয়োগে আরও সঞ্চয়ের জোগান, নারীর সম অংশগ্রহণ অর্জন, তরুণদের বিদ্যালয় থেকে কর্মজীবনে প্রবেশের বিষয়টি সহজ করা, প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয়, নগরায়ণ নিশ্চিত করা।
বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম মানুষ যেমন আমাদের আশাবাদী করে, তেমনি রাষ্ট্রের দায়িত্বও বেড়ে যায়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে কর্মক্ষম মানুষকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো। উন্নতি ঘটানোর জন্য দরকার এসব মানুষের কর্মদক্ষতা বাড়ানো এবং যথাযথ কর্মসংস্থান করা। দক্ষতা আর মেধা থাকলে তুলনামূলক কমসংখ্যক মানুষ নিয়েও যে একটি দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে উঠতে পারে তা বহু নজির রয়েছে। দেশে যে হারে তরুণ জনসংখ্যা বাড়ছে সে হারে কর্মসংস্থান হচ্ছে না। চাহিদা অনুযায়ী ডিপ্লোমাপ্রাপ্ত মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে না। দেশের অর্থনীতি এখনও মূলত নিু দক্ষতার মানুষের কাজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আছে। সম্পদের তুলনায় জনসংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে শ্রম উদ্বৃত্ত দেখা দিয়েছে। এর ফলে কর্মহীন ব্যক্তির সংখ্যা বেড়েছে। জনবিজ্ঞানীরা আয়ুষ্কাল বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, যে সকল দেশের গড় আয়ু ৬৫ থেকে ৭০ বছর তাদের ক্ষেত্রে কর্মক্ষমতার ব্যাপ্তি ১৮ থেকে ৬০ বছর। এ সময় একজন লোক নিজ দেশে কর্মহীন থাকলে বা কাজ প্রাপ্তির সম্ভাবনা কম থাকলে তবে বিদেশে পাড়ি দিয়ে নিজ কর্মক্ষমতাকে ব্যবহার করে অধিক অর্থ উপার্জন করতে চায়। এ অবস্থায় সরকার বিভিন্ন দেশের সাথে চুক্তি করে আয়া, বুয়া, ঝাড়–দার, সুইপার, নির্মাণ শ্রমিক পদে ঐ সকল দেশে জনসংখ্যা প্রেরণ করে। এক্ষেত্রে ডিপ্লোমা শিক্ষায় দক্ষতা বাড়াতে পারলে প্রবাসেও দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ কয়েকশগুণ বাড়ানো যেতো।
আমাদের দেশে শিক্ষার হার বাড়লেও চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি গড়ে তুলতে পারিনি। আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা যুগের চাহিদা মেটাতে পারছে না বলেই বিশ্বে শিক্ষিত বেকারের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। প্রতিবছর বর্ধিত হারে যে তরুণেরা শ্রম বাজারে আসছেন, তাঁদের কাজে লাগাতে হলে শিক্ষাব্যবস্থায় যেমন বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে হবে, তেমনি বাড়াতে হবে কর্মসংস্থানের পরিধিও। বর্তমানে দেশে প্রতিবছর ছয় লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয় বলে পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। বছরে প্রায় ২৪ লক্ষ তরুণ থাকে দিকনির্দেশনাহীন। ফলে ২ কোটি পূর্ণ বেকার ১ কোটি অর্ধ বেকারের বোঝা জাতি বহন করছে।
শ্রমশক্তিকে পেশা ও পণ্যভিত্তিক ডিপ্লোমা শিক্ষায় শিক্ষিত করতে না পারলে জনসংখ্যাতাত্ত্বিক সুবিধা (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট) বোঝা হয়ে দেখা দিতে পারে। বর্ধিত কর্মশক্তির সুযোগ ও সম্ভাবনা কাজে লাগাতে চাই ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রসারের পরিকল্পনা এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন। বিংশ শতকে দুটো তাত্ত্বিক বিতর্ক মোকাবিলা করেছে বাংলাদেশ। একটির নাম উপনিবেশ থেকে মুক্তির লড়াই। সেটি সফল পরিণতি পেয়েছে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। দ্বিতীয় বিতর্কটি হলো উপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থা। বিংশ শতকে পৃথিবীর বহু দেশে রাষ্ট্র কাঠামো বিন্যস্ত করা হয়েছে ডিপ্লোমা শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে কয়টি দেশ সফলতার পরিচয় দিয়েছে, তার সবকটির শিক্ষাকে ডিপ্লামা নির্ভর করেছে।
ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রনেতৃত্ব যখন পরিচালিত হয়, এমন উন্নত চিন্তাধারা থেকে সত্যিকারের প্রগতির পথে যাত্রা শুরু হয়। আমাদের শুরু করতে হবে কর্মকেন্দ্রীক ডিপ্লোমা শিক্ষাকে নির্ভরশীলতার প্রতীক ভেবে। আমরা চাই, বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম জনসংখ্যাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর জন্য সরকার সচেষ্ট হবে। দেশের বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় কাজটি চ্যালেঞ্জিং। সরকার চ্যালেঞ্জটি দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করবে এটা আমাদের আশা। যথাযথ ডিপ্লোমা শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ পেলে এবং সঠিক সুযেগা দেওয়া হলে এ দেশের তরুণরা অনেক দুরূহ কাজও সমাধা করতে পারে তার নজির অনেক রয়েছে। আমাদের প্রয়োজন এমন প্রজন্ম যারা মেধা ও মননে দেশকে অগ্রগতির শীর্ষে নিয়ে যাবে। এই কাজটি সহজ করার জন্য পেশা ও পণ্যভিত্তিক অভিন্ন ডিপ্লোমা কোর্সের মেয়াদ (এসএসসি পাশের পর ৪ বছর) ও মানের তৃণমূলে ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট ও ডিপ্লোমা কোর্স চালু করতে হবে। আর তা হলে বর্তমানের মোট ২ কোটি শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ১ লাখ ৫০ হাজার শিক্ষার্থীই সরকারি-বেসরকারি ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তিব্যবস্থার জালে আটকে থাকবে। সংখ্যাভিত্তিক হিসাব করলে আমাদের প্রয়োজন বছরে ১৫ লাখ শিক্ষার্থীকে ডিপ্লোমা শিক্ষায় নিক্ষেপ করা। এই লক্ষ্যে উপনিবেশিক আমলে গড়া ডিপ্লোমা শিক্ষা নিয়ন্ত্রণকারী ৭টি প্রতিষ্ঠান যথা কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, আয়ুর্বেদীয় বোর্ড, হোমিওপ্যাথিক বোর্ড, নার্সিং কাউন্সিল, ফার্মেসি কাউন্সিল, রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি থেকে ডিপ্লোমা শিক্ষা কার্যক্রম পৃথক করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভাগভিত্তিক ‘ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আর তা হলেই নাগরিকের সার্বজনীন মৌলিক অধিকার ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠা পাবে। প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ ক্রমশ এগিয়ে যাবে বহুত্ববাদী পেশাভিত্তিক কর্মকেন্দ্রীক সমাজ বির্নিমানের দিকে।

সর্বশেষ সংবাদ
এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।  তথ‌্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি মহোদয়ের শুভ জন্মদিন আজ করোনায় পোশাক কারখানায় ৫৫ শতাংশ কাজ কমে গেছে: রুবানা হক