অ্যান অ্যাবসেন্ড মাইন্ডেড হেডমাস্টার---কামরুল হাসান বাদল-কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 19/05/2016-03:31pm:    আমার বাবা রেলে চাকরি করতেন। খুব উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন না। ভাবুক ও দার্শনিক ধরনের এই মানুষটি তাঁর সন্তানদের উচ্চ শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন। আদর্শ ও নীতিবোধের দ্বারা পরিচালিত করতে চেয়েছিলেন। সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। বাবা যেমন চেয়েছিলেন তেমন করে আমরা কেউ হতে পারিনি। বাবা বেঁচে থাকলে আমাদের দেখে হতাশ হতেন নিশ্চয়ই। বাবা পড়াতে বেশ ভালবাসতেন। বিশেষ করে ইংরেজি। আমি তাঁর পুত্রদের মধ্যে কনিষ্ঠ। আর সবার মধ্যে দ্বিতীয় কনিষ্ঠ। কাজেই আমার ছেলেবেলায় বাবাকে পেয়েছি প্রায় বৃদ্ধ বয়সের। বাবাদের সময়ে ৫০ পার হলেই মানুষকে বৃদ্ধ ভাবা হতো। তাঁরাও চিন্তা, পোশাক আশাক ও চালচলনে বয়স্ক ভাব নিতেন। আমার বুদ্ধি হওয়ার পর বাবাকে অনেকটা এমনই দেখেছি।
আমার বাবা ইংরেজি পড়াতে ভালোবাসতেন। আর তাঁর পড়ানোর পদ্ধতিও ছিল বেশ দারুণ। কোনো একটি শব্দের অর্থ থেকে শুরু করে এর আদ্যপান্ত শিখিয়ে দিতেন। ভুল উচ্চারণ করে বাবার বকুনি শুনতে হবে বলে বাবা বাসায় থাকলে আমরা কেউ উচ্চস্বরে ইংরেজি পড়তাম না। তবে বাবা পড়ানোর সময় পেতেন খুব কম। প্রাথমিক স্তর থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাবার কাছে পড়েছি, তবে মাঝেমধ্যে। এ সময় তিনি ইংরেজি র‌্যাপিড রিডার পড়াতেন বিভিন্ন ক্লাসের। র‌্যাপিড রিডারের অনেক মজার মজার গল্প পড়েছি সে সময়। ‘অ্যান অ্যাবসেন্ড হেডমাস্টার’ নামে বেশ কিছু মজার মজার গল্প পড়েছিলাম সে সময়। ইংরেজি মজার গল্পগুলো ‘অ্যান অ্যাবসেন্ড মাইন্ডেড প্রফেসার ; হিসেবেও পরিচিত।
নিজের বাবার কথা বলতে হলো এ কারণে যে, বাবা প্রায় সময় বলতেন, পারিবারিক কারণে তিনি রেলওয়ের চাকরি না নিলে শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে নিতেন। এমনকি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরও তিনি অনেকবার অন্তত প্রাইভেট পড়ানো যায় কিনা সে চেষ্টা করেছিলেন। এ কারণে হয়তো তিনি শিক্ষকদের অত্যন্ত ভক্তি করতেন। বাবা পীরে বিশ্বাসী ছিলেন না তবে শিক্ষদানকারীদের তিনি পীরের চেয়েও মহৎ বলে মানতেন। শিক্ষকের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের শিক্ষাও তার কাছ থেকে পেয়েছিলাম।
গত কয়েকদিন ধরে দেশে দুটো ঘটনা বেশ তোলপাড় তুলেছে। বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক চট্টগ্রামের আসলাম চৌধুরীর সাথে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এক কর্মকর্তার বৈঠকের সংবাদ ও নারায়নগঞ্জ জেলার বন্দর উপজেলার পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে প্রকাশ্যে কানধরে ওঠবস করানোর সংবাদ। প্রধান শিক্ষককে অপমান করার এই সংবাদটি দেশের প্রচলিত গণমাধ্যম ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আলোচনার তুঙ্গে আছে এখনো। গত মঙ্গলবার থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষককে কান ধরিয়ে ওঠবস করার প্রতিবাদ করছে তরুণরা অভিনব পদ্ধতিতে। তারা নিজেদের কান ধরে ছবি তুলে তা পোস্ট করছে ফেসবুকে। একটি দুটি করে এখন লাখ লাখ তরুণ এমন প্রতিবাদে অংশ নিচ্ছে। তরুণদের এই প্রতিবাদের সমাবেশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে প্রতিদিন। ঘটনা ঘটার কয়েক ঘন্টার মধ্যে তা গণমাধ্যমে প্রকাশ পায় এবং সে সাথে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আর বিক্ষোভে ফেটে পড়ে মানুষ। প্রতিবাদকারীদের মধ্যে অনেকে প্রধান শিক্ষকের ধর্মীয় পরিচয়টিকে মুখ্য করেছেন। অনেকে লিখেছেন ‘একজন হিন্দু শিক্ষক’। অনেকে এর প্রতিবাদ করে বলেছেন, একজন শিক্ষক তো শিক্ষকই। তার আবার হিন্দু-মুসলিম পরিচয় কেন? অনেকে লিখেছেন ‘একজন মানুষকে’ অপমান করা হয়েছে এইতো যথেষ্ট প্রতিবাদ করার জন্য।
লেখাটি যখন লিখছি তখন সংবাদ মাধ্যমে খবর এলো কয়েকটি কারণ দেখিয়ে ওই প্রধান শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তার আগে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সংবাদ পেয়েছি। এবং এই ঘটনা নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া দেখেছি-শুনেছি। শিক্ষামন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া! হিসেবে লাঞ্ছিত প্রধান শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে অনেকে মন্তব্যও করেছেন।
এই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী ছিল? এ পর্যন্ত যা জানা গেছে তা হলো তিনি দশম শ্রেণির কোনো এক ছাত্রকে শাস্তি দিতে গিয়ে নাকি ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটাক্ষ করেছেন। এরপরে ম্যানেজিং কমিটির মিটিং আছে এমন সংবাদ দিয়ে প্রধান শিক্ষককে স্কুলে আনা হয়। তিনি স্কুলে এলে ‘তিনি ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে কটুক্তি করেছেন’ মসজিদের মাইকে এমন ঘোষণা দিয়ে স্থানীয়দের জড়ো করা হয় ও তাদের উত্তেজিত করা হয়। জনতা প্রধান শিক্ষককে প্রহার করে এবং এক পর্যায়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের (জাতীয় পার্টি) নির্দেশে প্রধান শিক্ষককে কানধরে ওঠবস করানো হয়। প্রশ্ন হলো প্রধান শিক্ষক সত্যি কি ইসলাম ধর্ম নিয়ে কোনো বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন? একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান তিনি কি এতই বোকা যে বর্তমান বাংলাদেশে বাস করে তিনি ইসলাম ধর্ম বিরোধী কোনো মন্তব্য করবেন। এই পর্যায়ে একটি গল্প মনে পড়ছে, কিন্তু সঙ্গত কারণে তার উদ্ধৃতি দিতে পারছি না।’ মুসলমানই বাঁচে না তুমি কাফের মারতে বসে আছো’ এই গল্পটি যারা জানেন তারা তা স্মরণ করতে পারেন। প্রবল ইসলাম ধর্মানুভূতি প্রবণ দেশে একজন শিক্ষক প্রকাশ্যে শ্রেণিকক্ষে একজন মুসলিম ছাত্রের উদ্দেশ্যে ইসলাম অবমাননাকারী মন্তব্য করতে পারেন তা কতটা বিশ্বাসযোগ্য তা ভাবতে হবে। প্রশ্ন উঠতে পারে তবে এই অভিযোগ কেন? উত্তর হলো পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির বোনকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দেখতে চান সভাপতি স্বয়ং। কিন্তু কোনোভাবে বাগে আনা যাচ্ছিল না প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে। কাজেই ‘ধর্মানুভূতি’ নামের সবচেয়ে ধারালো অস্ত্রটি ব্যবহার করা হলো তার বিরুদ্ধে। তিনি হিন্দু বলে একটু বাড়তি সুবিধা হয়েছে। অবশ্য মুসলমান হলেও কোনো সমস্যা ছিল না। চাপাতিতো উদ্যত আছেই। ওই এলাকার সাংসদ নারায়নগঞ্জের প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান সেলিম ওসমান বলেছেন, জনরোষ থেকে বাঁচানোর জন্যই তিনি প্রধান শিক্ষককে কান ধরে ওঠবস করিয়েছেন। সেলিম ওসমানকে ধন্যবাদ এমন একটি ‘মহান’ কাজ করার জন্য। তাঁদের পরিবার নারায়নগঞ্জে এমন অনেক ‘মহান’ কাজের জন্য বিখ্যাত। তিনি ‘জনরোষ’ না বলে যদি বলতেন ‘চাপাতি’র কোপ থেকে বাঁচানোর জন্য তাহলেও আমাদের কীইবা বলার ছিল।
সমস্যা হলো অ্যান অ্যাবসেন্ড মাইন্ডেড হেডমাস্টার তাঁর অনড় অবস্থানের পরিণতি কী হতে পারে তা বুঝতে পারেননি। বাংলাদেশে প্রচলিত ব্যবস্থায় প্রতিটি স্কুলের পরিচালনা পরিষদ গঠিত হয় স্থানীয় এমপির নির্দেশে ও তার অনুগতদের দ্বারা। আর স্কুলগুলোর পরিচালনা এই স্কুলের শিক্ষকদের চাকরি থেকে শুরু করে সামাজিক মর্যাদা সবকিছু নির্ভর করে ম্যানেজিং কমিটি, তার চেয়ারম্যান পক্ষান্তরে স্থানীয় এমপির ইচ্ছার ওপর। শ্যামল কান্তি ভক্ত যে স্কুলের প্রধান শিক্ষক সে স্কুলেরও বাস্তবতা হলো তাই। জাতীয় পার্টির এমপি হলেও সেলিম ওসমান নারায়নগঞ্জের চরম প্রভাবশালী মানুষ। তার মনোনীত পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যানের বোন প্রধান শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন শ্যামল কান্তি বুঝতে পারেননি ওই ইচ্ছাতো যেকোনোভাবে বাস্তবায়িত হবে। এখন যা যা ঘটতে পারে বলে আমার মনে হয়। অন্যান্য ঘটনার মতো কয়েকদিন পর শ্যামল কান্তির ঘটনাটিও চাপা পড়ে যাবে। তদন্ত কমিটির রিপোর্টে শ্যামল কান্তি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছেন বলে প্রমাণিত হবে। এই কারণসহ নানা কারণে তাকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হবে এবং সবশেষে সবকিছু হারিয়ে শ্যামল কান্তি ভক্ত সপরিবারে দেশত্যাগ করে চলে যাবেন। গত সাড়ে চার দশকের অভিজ্ঞতা থেকে অনুমান করছি এবং ব্যতিক্রম খুব একটা হবে না। একজন শিক্ষকের এই অপমানে সারাদেশে ফুঁসে উঠেছে তরুণ শিক্ষার্থীরা। অথচ আমরা যারা বয়স্ক তারা প্রায়ই বলে থাকি এই প্রজন্মের সন্তানরা বড়দের মান্যগণ্য করে না। শিক্ষকদের সম্মান করে না। আমরা দেখলাম আজ দেশ জুড়ে এই তরুণ শিক্ষার্থীরা যখন রাজপথে নেমেছে শিক্ষকদের মর্যাদার লড়াইয়ে তখন দেশের গোটা শিক্ষক সমাজ আশ্চর্য এক নীরবতা পালন করছে। কী আশ্চর্য এই শিক্ষকদেরই দেখেছি বেতন-ভাতা বৃদ্ধির জন্য দিনের পর দিন রাস্তায় আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন। শিক্ষকরা তাদের নানা ধরনের দাবি দাওয়া আদায়ের জন্য আন্দোলন করেন। প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনকে জিম্মি করেও দাবি আদায়ে অনঢ় থাকেন সেই শিক্ষকরাই একজন শিক্ষকের নির্মম-নির্দয় অপমানেও নীরব নিশ্চুপ থেকে যাচ্ছেন।
শ্যামল কান্তি ভক্তের এই ঘটনা থেকে আরও একটি শিক্ষা বোধহয় অর্জন করলাম আমরা। আর তা হলো যে কোনো ব্যক্তিকে শায়েস্তা করতে বেকায়দায় ফেলতে, বিপদে ফেলতে খুব সহজভাবে ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ ব্যাপারটিকে ব্যবহার করা যাবে। খুব প্রমাণের দরকার নেই। অতীতে পাথরঘাটার জেলেপাড়ায়, হাটহাজারীর নন্দীরহাটে, রামুতে সাঈদীর রায়ের পরে বিভিন্ন ঘটনা থেকে এই শিক্ষাটা অর্জন করে চলেছি।
তবে মনে রাখতে হবে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে এই আধুনিক ও মানবিক রাষ্ট্রে এই বিপজ্জনক ‘ধর্মীয় অনুভূতি’র পাগলা ঘোড়াটার রাশ টেনে ধরতে হবে। একে এখনই থামাতে হবে। নইলে আজ যারা নিজেদের নিরাপদ ভাবছি তাদেরও একদিন এই ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হয়ে জীবন দিতে হবে। যারা এই অনুভূতিকে নাড়ছেন ও নাড়াচ্ছেন তারাও কেউ রেহাই পাবে না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এখন আওয়ামীলীগের হাতে। এই দলের মনে রাখা দরকার নারায়নগঞ্জের একটি পরিবারের চেয়ে দল বড়। আর দলের চেয়ে দেশ ও আদর্শ বড়।
Email [email protected]

সর্বশেষ সংবাদ