চলমান ইউপি নির্বাচন প্রযুক্তি চেতনার উন্মেষ প্রয়োজন - খন রঞ্জন রায়,লেখক ও সংগঠক,

পোস্ট করা হয়েছে 29/03/2016-09:39am:    মহাসচিব ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ
বাংলার ইউনিয়ন পরিষদকে লিটল রিপাবলিক (খরঃঃষব জবঢ়ঁনষরপ) বলেছেন কার্ল মার্কস। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রাচীন স্বনির্ভর গ্রাম এবং ক্ষুদ্র পরিসরে স্থানীয় শাসনের ঐতিহ্য বাংলাদেশে আমরা উত্তরাধিকার হিসাবে লালন করছি। তারই বিভিন্ন সময়কার সংস্করণ হিসাবে আমরা পেয়েছি গ্রাম পঞ্চায়েত, গ্রাম সরকার, ইউনিয়ন পরষিদ। বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ স্থানীয় সরকার কাঠামোর প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তর, যা সম্পূর্ণরূপে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ও আইন পরিষদের তৈরি একটি প্রতিষ্ঠান। এটি ঐতিহাসিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান পর্যায়ে রূপ লাভ করছে। ১৮৭০ সালের বেঙ্গল চৌকিদারি আইন প্রবর্তনের মাধ্যমে এর প্রথম সাংবিধানিক পরিচয় ঘটে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশে, ১৯৭৬ সালের স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশ, ১৯৮০ সালের স্থানীয় সরকার সংশোধন অধ্যাদেশ, ১৯৮৩ সালের স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) অধ্যাদেশ, ১৯৯৩ সালের স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) সংশোধন আইন, ১৯৯৭ সালের স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) সংশোধন আইন এবং ইউনিয়ন পরিষদ অধ্যাদেশ ২০০৮-এর মাধ্যমে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা বর্তমান পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার তৃণমূল পর্যায় হল ইউনিয়ন পরিষদ। এতে বিভিন্ন সময়ে সরকারের নেয়া নানা পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। বর্তমানে একটি ইউনিয়ন পরিষদে ৯টি ওয়ার্ড থেকে ৯ জন সাধারণ সদস্য এবং তিনটি ওয়ার্ড মিলে একজন নারী সদস্য নির্বাচিত হওয়ার নিয়ম রয়েছে। ১ জন চেয়ারম্যান, ৯ জন সাধারণ সদস্য এবং ৩ জন সংরক্ষিত নারী সদস্য মোট ১৩ জন সদস্য- এরা প্রত্যেকেই স্থানীয় ভোটারদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে থাকেন। আমাদের দেশের প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে ৮টি বিভাগ, ৬৪ জেলা এবং ৪৮৫ উপজেলা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ১১ সিটি কর্পোরেশন, ৩১৯ মিউনিসিপ্যালিটি, ৫৯৯টি থানা, ৪৫০০ ইউনিয়ন ও ৫৯২২৯ টি মৌজার কার্যক্রম তৃণমূলে সম্পৃক্ত। বর্তমানে দেশে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনী ডামাডোল চলছে। এক্ষেত্রে কেবল নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়। নির্বাচন হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রবেশদ্বার। নির্বাচন কিভাবে অনুষ্ঠিত হলো, কতটা অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা কতটা স্বাধীনভাবে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলেন, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ২০১০ সালের জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘আমরা স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ইউনিয়ন পরিষদকে গুরুত্ব প্রদান করবো। হয়তো একারণেই দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের সিদ্ধান্ত এসেছে। পৌরসভার মতোই ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিরাও নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন। ফলে কেন্দ্রীয় সরকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকেও সহজেই প্রভাবিত করার এক রকম পথ প্রশস্ত হয়েছে বলে মনে করা যায়। প্রথম ধাপে ৭৩৮ টি ইউনিয়ন পরিষদের তিন পদে ৩৯ হাজার ৪৩০ জন প্রার্থী নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এর মধ্যে ৭৩৮টি চেয়ারম্যান পদে ১৬টি দলের ৩ হাজার ৪৬৮ জন প্রার্থীও ছিলেন। প্রথম ধাপে ব্যাপক সহিংসতায় নির্বিচারে প্রাণহানী নির্বাচন ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সমাজবিরোধীরাও মাঠে নেমেছে। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত মামলার আসামিরাও আবির্ভূত হয়েছে চেয়ারম্যান ও মেম্বার নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে। হত্যা, চুরি, ছিনতাই, বোমাবাজি মামলাও রয়েছে কোনো কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে। দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে সুশিক্ষিত ও সুযোগ্য প্রার্থীর অভাব না থাকলেও পেশিশক্তি ও কালো টাকার বদৌলতে প্রার্থী হয়েছেন স্বাক্ষর জ্ঞান সর্বস্ব প্রার্থীরাও। অতীতে আমরা দেখেছি, অধিকাংশ জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার পর জনগণের কল্যাণের চেয়ে নিজের আখের গোছাতে বেশি সময় ব্যয় করেন। আগামী নির্বাচনেও ভোটারদের ভেবে দেখতে হবে, কাকে ভোট দিলে এলাকার উন্নয়ন হবে, বিপদের সময় সাড়া পাওয়া যাবে এবং ক্ষমতাহীন দরিদ্র মানুষের কল্যাণ হবে। আইনশৃঙ্খলা, অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন কর্মসূচি স্তর বিন্যাসের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সর্বস্তরে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে অধিকতর ক্ষমতাশালী ও দায়িত্বশীল করার লক্ষ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি করার ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের ঘোষণা এবং ২৯ জানুয়ারি (২০১৪) দশম সংসদের প্রথম অধিবেশনের সূচনার মধ্য দিয়ে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন সরকার জনপ্রতিনিধিত্বের গুরুত্বকে মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। গণতন্ত্রের সুবাতাস দেশের প্রত্যন্ত জনগণের মাঝে পৌছানোর এ প্রয়াস বর্তমান পরিস্থিতিতে খুবই তাৎপর্যবহ। আমরা আশা করি গণতন্ত্রের অভিমুখী সরকার দেশের উন্নয়নে সত্যিকারের অবদান রাখতে সক্ষম হবে। সার্ক, অ্যাশিয়ান, ইইউভূক্ত দেশগুলোতে ইউনিয়ন পরিষদ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, মৎস্য, পশুসম্পদ, পানি সম্পদ, ভৌত অবকাঠামো ইউনিয়ন এলাকায় দরিদ্র জনগণকে বিভিন্ন রকম উন্নয়নে সাহায্য সহযোগিতা করে থাকে। তরুণদের দ্বারা পরিচালিত ক্লাবগুলো খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডগুলো ইউনিয়ন পরিষদের নেতৃবৃন্দের নিবিড় তত্ত্বাবধানে সম্পাদিত হয়। স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশ ১৯৮৩ ইউনিয়ন পরিষদকে উন্নয়নমূলক কার্যাদি সম্পূর্ণ করার জন্য ১০টি বাধ্যতামূলক, ৩৮টি ঐচ্ছিক দায়িত্ব সম্বন্ধে প্রার্থীদের স্বচ্ছ ধারণা দেওয়ার বিধান রয়েছে। জনপ্রতিনিধিদের তাদের কর্মপরিধির অজ্ঞতার কারণে এদেশে পথে-ঘাটে-মাঠে-ময়দানে অলিতে গলিতে নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বেনিয়া এনজিও আগমনের পথ প্রশস্ত করে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধক স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি এ উপলদ্ধি করতে আমাদের আরো কিছু সময় লাগবে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এক অর্থে স্থানীয় সরকারের জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের শাসন কাঠামোর তৃণমূল পর্যায়ে গণ রায় প্রাপ্ত প্রায় ৫৮০০০ বৈধ ও আনুষ্ঠানিক নেতা ও নেতৃত্ব দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এ নেতৃত্বের আদর্শ ও কার্যকর ভূমিকার উপর সারাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, সামগ্রিক সামাজিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকখানি নির্ভরশীল। তাদের স্বনির্ভর শিক্ষা এবং আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনতে পারলে প্রযুক্তি যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে। শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। ডিপ্লোমা শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি উন্নতি লাভ করতে পারে না। যে জাতি ডিপ্লোমা শিক্ষায় যত বেশী শিক্ষিত, সে জাতি তত উন্নত। আজকের উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায় যেসব দেশের ডিপ্লোমা শিক্ষার হার যত বেশি সেসব দেশ অনেক উন্নত। আমাদের দেশে ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউটে আসন সংখ্যা সীমিত হওয়ায় সবার পক্ষে এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ হয় না। দেশের ডিপ্লোমা শিক্ষার হার বাড়াতে আমাদের দেশে সরকারিভাবে ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করার জন্য ডিপ্লোমা শিক্ষা নিয়ন্ত্রণকারি প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। বিভাগীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ডই আগামী দিনে জনগণের ভোটে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের কর্মসংস্থানকেন্দ্রীক স্বাবলম্বী ইউনিয়ন পরিষদ গঠনে ভূমিকা রাখবে। নির্বাচনী ডামাডোলের মধ্যেও প্রযুক্তি চেতনার উন্মেষ ঘটবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি।

সর্বশেষ সংবাদ