চামেলি, নাইবা যদি ফুটলি তবে...’--কামরুল হাসান বাদল-কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 18/03/2016-09:34am:    গলায় টিউব, নাকে টিউব, হাতে ক্যানোলা। লাইফ সাপোর্ট অর্থাৎ কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে তাকে। দীর্ঘ ছয় মাস ধরে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ২২ নম্বর ওয়ার্ডের আইসিইউতে মৃতবৎ পড়ে আছে মেয়েটি। মা-বাবার অনেক ডাকাডাকির পর কখনও হয়তো চোখ খোলে একটু।
নাম তার চামেলি, এখনও ফোটেনি সে। জীবনকে দেখার আগে, জীবনকে জানার আগে জীবনের সকল আনন্দ-বেদনা-কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন সে। সে যে একাই বিচ্ছিন্ন হয়েছে তাই নয়, বিচ্ছিন্ন করেছে পরিবারকে, নিঃস্ব, রিক্ত করে তুলেছে পরিবারকে। চামেলি জানে না, আর কখনও জানবে কিনা তাও জানি না তার জন্য আজ তার পরিবারের সবার জীবনধারাও পাল্টে গেছে। একটি দুর্ঘটনা একটি পরিবারকে কেমন নিঃস্ব আর রিক্ত করে দেয়।
২০১৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর। অন্যান্য দিনের মতো কলেজ থেকে ফিরছিলো চামেলি। একটি যাত্রীবাহী বাস নোয়াখালীর চাড়াভিটা এলাকায় বাগানবাড়ির সামনে তাদের বহনকারী সিএনজি চালিত অটোরিকশাকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। চামেলির সাথে একই গাড়িতে ছিল তার জ্যোঠাতো বোন সাইমা আদনান তান্নিও। গুরুতর আহত তান্নি তিনদিন পর মৃত্যুবরণ করে। আর চামেলি বেঁচে থেকেও এখনও মৃতবৎ।
চামেলির পুরো নাম রিহাম আফসানা। মাইজদীর নোয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের গণিত বিভাগে সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। মেধাবী এই মেয়েটি চরকাঁকড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি এস এস সিতে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছিল। এরপর সরকারি মুজিব কলেজ থেকে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছিল। সম্মান প্রথম বর্ষে সে প্রথম স্থান অধিকার করেছিল।
চামেলির মা-জান্নাতুল নেসা, বাবা-মিজানুর রহমান। তিন মেয়ে ও এক ছেলের সংসারে চামেলি মেজ। বড় মেয়ে চামেলির একই কলেজে স্নাতকোত্তর পড়ছে। ছেলে স্নাতকে পড়ে। ছোট মেয়েটি অষ্টম শ্রেণিতে। গত ছয়মাস যাবত মেয়ের পাশে থাকার কারণে মেয়ে দুটিকে তাদের নানার বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সর্বস্বান্ত পরিবারে আয়ের জন্য ছেলের পড়াশোনা বন্ধ করে তাকে ঢাকায় একটি দোকানে চাকরিতে পাঠানো হয়েছে। চামেলির বাবা মিজানুর রহমান দীর্ঘদিন মধ্যপ্রাচ্যে ছিলেন। আয় করে ব্যয়ের পর যা জমাতে পেরেছিলেন তা দিয়ে ২০০৯ সালে বাড়ির পাশে ছোটখাট ব্যবসা শুরু করেছিলেন। খেয়ে পরে মোটামুটি ভালোই চলছিল-৬ জনের এই পরিবার। গত ছয় মাসে প্রায় ৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছে চিকিৎসার পেছনে। ধার-দেনা করে এতদিন চললেও এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন চামেলির মা-বাবা। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনায় মস্তিষ্কে আঘাতপ্রাপ্ত হয় সে। বর্তমানে লাইফ সাপোর্টে থাকলেও অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে আগের চেয়ে। মা বলেন, দুর্ঘটনার পর পুরোপুরি অচেতন ছিল চামেলি। এ হাসপাতালে আনার এক মাস পর এক চোখ এবং তিন মাস পর অন্য চোখ খোলে চামেলির। ডাক্তাররা বলেছেন চামেলি ভালো হবে। তবে সময় লাগবে। সে আশায় গত ছমাস ধরে আমরা ওর মা-বাবা এই হাসপাতালে পড়ে আছি। কখন আবার মা বলে ডাকবে। একবার বাবা বলে ডাকবে। একবার দুচোখ খুলে দেখবে। এই সন্তানের জন্য অন্য সন্তানদের দেখভাল করতে পারছি না। আমার শিশুকন্যাটিকে পর্যন্ত দেখিনি দীর্ঘদিন। ওকে ওর বড় বোনের সাথে আমার বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। একমাত্র ছেলেটি পড়াশোনা বন্ধ করে তাকে চাকরির জন্য ঢাকায় পাঠিয়ে দিয়েছি। আর কতদিন এভাবে দিন কাটাতে হবে। সামনের দিনগুলোতে কীভাবে চিকিৎসা খরচ চালাবো। তেমন সম্পত্তিও তো আমাদের নেই।
একটি দুর্ঘটনা একটি পরিবারের সারাজীবনের কান্না। এটি এক চামেলির কথা বললাম শুধু। প্রতিদিন, প্রতিঘণ্টায় বাংলাদেশে কতজনকে চামেলিদের মতো পরিণতি বরণ করতে হয় তার সঠিক তথ্য জানা নেই কারো। সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর দেশে পরিণত হয়েছে আমাদের বাংলাদেশ। দেশের অনেক বরেণ্য সন্তানকে মেধাবীজনকে হারিয়েছি সড়ক দুর্ঘটনায়। দুর্ঘটনার পরপর নানা সতর্কবার্তা শোনা যায়। নানা আশ্বাস শোনা যায়। কিন্তু ক’দিন পরেই তার সবকিছু থিতু হয়ে যায়। আরেকটি দুর্ঘটনা ভুলিয়ে দেয় আগের দুঃখ স্মৃতি। এভাবেই বছরে কত প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। কত পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে তার হিসাব রাখি না। ক্রন্দন আর বিলাপের আহাজারী বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে; তা কান পেতে শুনি না। সরকারি হিসেবে গত দশ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ। বেসরকারি হিসেবে প্রতিবছর মারা যায় ২০ হাজারের ওপর। এতো শুধু মৃত্যুর হার। দুর্ঘটনায় কত মানুষকে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয় তার হিসাব কোথাও নেই। সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সি আইপি আরবি) নামে একটি গবেষণা সংস্থা ২০১১ সালে সাত লাখ লোকের ওপর একটি জরিপ চালিয়ে বলেছে, দেশে বছরে প্রায় ১২ হাজার ৮০০ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০০৯ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে মৃতের সংখ্যা ২০ হাজার ২৩ জন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে দু’ হাজার ২৪১টি সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়। এসব দুর্ঘটনায় মারা যায় দুই হাজার ৯৪০ জন। মারাত্মক আহত হয়েছে এক হাজার ১৮৬ জন। দুর্ঘটনার পর মামলা হয়েছে এমন হিসাব থেকে এ তথ্য পাওয়া। স্থানীয়ভাবে মীমাংসা হয়ে যাওয়া বা প্রত্যন্ত এলাকার অনেক দুর্ঘটনার খবর পুলিশের কাছে আসেও না। পুলিশও হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৯৯৪ সাল থেকে ২০১১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৭২ হাজার ৭৪৮টি। এতে মারা গেছে ৫২ হাজার ৬৮৪ জন। ২০০৪ সালে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলেছে, সড়ক দুর্ঘটনার ফলে বছরে চার হাজার ২০০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে যা তখনকার মোট দেশজ উৎপাদনের ১ দশমিক ৩ শতাংশ। সে সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ পাঁচ হাজার কোটি টাকা। ১২ বছর আগের এই হিসাবকে এখন দ্বিগুণ ধরতে হবে।
সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া অধিকাংশই কর্মক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় এর প্রভাব পরিবার ও সমাজে প্রকট হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় সড়ক গবেষণা ইনস্টিটিউট ২০০৯ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া মানুষের শ্রেণিবিন্যাস করে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। এতে দেখা যায়। দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩২ শতাংশের বয়সসীমা ১৬ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। ২৮ শতাংশ ৩১ থেকে ৪৫ বছর বয়েসী। ২০ শতাংশ শিশু যাদের বয়সসীমা ০ থেকে ১৫ বছর। ৪৬ থেকে ৬০ বছর বয়েসী মানুষ মারা যান ১৩ শতাংশ। এর বেশি বয়েসী মৃত্যুর হার সবচেয়ে কম। মাত্র ৭ শতাংশ।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) এর হিসাব অনুযায়ী ২০১৪ সালে সারা দেশে ২ হাজার ৭১৩টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণহানি ঘটেছে ৬ হাজার ৫৮২ জনের। আহত হয়েছে ১০ হাজার ৭৭০ জন।
সড়ক দর্ঘটনা নিয়ে, এর কারণ ও প্রতিকার নিয়ে দেশের পত্র-পত্রিকায় বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। কোনো দুর্ঘটনায় খ্যাতিমান কারো মৃত্যু হলে তা নিয়ে টিভি চ্যানেলে বিস্তর টকশো হয়েছে। বিভিন্ন দাবি, সুপারিশ প্রদান করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে নানা আশ্বাস ও পদক্ষেপের কথা শোনা গেছে কিন্তু পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় কিংবা টিভি চ্যানেলে অসংখ্য সড়ক দুর্ঘটনার খবর আসে। তাতে মৃত্যুর সংবাদ থাকে। খুব পরিচিত বা আপন কেউ না হলে আমরা উৎকণ্ঠিত হইনা। ব্যাকুল হইনা। প্রতিদিন কত চামেলি ফোটার আগে ঝরে যাচ্ছে। প্রতিদিন কত চামেলি আহত হয়ে হাসপাতালের বেড়ে মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে। প্রতিদিন কত চামেলির পরিবার স্বজনের চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে করতে নিঃস্ব হচ্ছে। প্রতিদিন কত চামেলি একবার চোখ তুলে তাকিয়ে মা বলে ডাকবে বলে মায়েরা রাত-দিন জেগে থাকে। প্রতিদিন কত চামেলির সম্ভাবনাময় জীবন ফুরিয়ে যাচ্ছে তার খবর আমরা রাখি না। মানে আমরাও জানি না আমি আপনি বা আমাদের কোন প্রিয়জন এমন ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন ঘর থেকে বের হই। সৌভাগ্যক্রমে আবার বাড়ি ফিরি। চামেলির একটি পরিবারের কথাই শুধু বললাম। এমন লাখ লাখ পরিবার আজ স্বজন হারিয়েছে। চিকিৎসা ব্যয় মিটিয়ে নিঃস্ব হয়ে রিক্ত হয়ে পথে বসেছে।
আমি চামেলির জন্য কিছুই করতে পারি না। আমি অর্থবান নই। আমার সমবেদনা কিংবা দুকলম লেখায় চামেলির কিছুই যায় আসে না। ওর বা ওর পরিবারের প্রয়োজন এখন অর্থের। চিকিৎসা ব্যয় মেটানোর। আমি তা দিতে পারি না। শুধু বিত্তবানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারি আর চামেলির জন্য শুভ কামনা করতে পারি।

সর্বশেষ সংবাদ
স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যেকোনো অনিয়ম দুর্নীতি অনুসন্ধান করা হবে: দুদক চেয়ারম্যান কক্সবাজার রেড জোন,শনিবার থেকে আবারো লকডাউন এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।