ইতিহাসের রাখালরাজা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব-মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

পোস্ট করা হয়েছে 17/03/2016-07:45am:    বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ অর্জন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে জড়িত আছে যাঁর নাম, তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির অল্প কিছুদিন পরেই স্পষ্ট হয়ে উঠে পাকিস্তানিদের বৈষম্য ও পরাধীনতার গ্লানি। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর সংগে এদেশের জনগণের দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠে। তখন থেকে শোষিত বাঙালির ভাগ্যাকাশে দুর্যোগের কালো মেঘ, এ সময় পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে আবির্ভাব ঘটে শেখ মুজিবুর রহমানের। ইতিহাসের রাখাল রাজা বঙ্গবন্ধু মুজিব ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ার পাটগাতি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা সায়রা খাতুন। টুঙ্গিপাড়ায় তার শৈশব কৈশোর কাটে। গিমাডাঙ্গাঁ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষাশেষে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এসময় তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেন। কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে ১৯৪৪ সালে আইএ এবং ১৯৪৬ সালে বিএ পাশ করেন। ১৯৪৬ সালে ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ দেশবিভাগের পর তিনি আইন পড়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৪৮ সালে গঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগের তিনি ছিলেন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৪৮ সালে ”সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ” গঠিত হলে তিনি এর সংগে যুক্ত হন। ১৯৪৯ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে হরতাল পালনের সময় তিনি গ্রেফতার হন। তখন থেকে শুরু হয় তার গ্রেফতার ও কারাবরণ। ১৯৪৭ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হলে তিনি যুগ্ম সম্পাদকের পদ লাভ করেন এবং ১৯৫৩ সালে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট প্রার্থী হিসেবে প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রিত্ব লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত হলে তিনি তার সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। এ সময় নিরাপত্তা আইনে তাঁকে বারবার কারারুদ্ধ করা হয়। তাঁকে আসামি করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা শুরু হয়। কিন্ত “১৯৬৯” এর গণঅভ্যুস্থানের প্রভাবে ২২ ফেব্রুয়ারি সে মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক ঢাকায় তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে নাগরিক সংবর্ধনা প্রদানের মাধ্যমে তাঁকে ‘‘বঙ্গবন্ধু’’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৭০ সালে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দকৃত ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন জয়লাভ করে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং পূর্বপাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের ৩৫০টি আসনের মধ্যে ২৯৮টি আসনে জয়লাভ করে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের গণমানুষের ম্যান্ডেট লাভ করেন। কিন্তু সরকার গঠনের সুযোগ না দিয়ে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত করলে এর প্রতিবাদে শেখ মুজিব ৩ মার্চ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে স্মরণকালের বৃহত্তম জনসভায় বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দেন “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী গণহত্যা শুরু করে। সেই রাতে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হন এবং গ্রেফতারের আগে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধ চলাকালীন ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তাঁকে রাষ্ট্রপতি করে গঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার যা মুজিবনগর সরকার নামে খ্যাত। দীর্ঘ নয়মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের বিজয় সূচিত হয় ১৬ ডিসেম্বর। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করে ঢাকা প্রত্যাবর্তন করে ১২ জানুয়ারি তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বগ্রহণ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনে জনগণকে সাথে নিয়ে আত্মনিয়োগ করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ যখন স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে যাচ্ছিল তখন পাকিস্তানিদের বশংবদ রাজনৈতিক এজেন্ট এদেশীয় কিছু বিপথগামী ও ক্ষমতালোভী সামরিক সদস্যের চক্রান্তে বঙ্গবন্ধু মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এটি আমাদের ইতিহাসে কালো অধ্যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বাধীন বাংলাদেশে বেশিদিন ক্ষমতায় থাকার সুযোগ না পেলেও যুদ্ধবিধস্ত দেশ পুনর্গঠনে দেশবাসীকে সাথে নিয়ে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর দক্ষ নেতৃত্বে ভারতীয় বাহিনী দেশত্যাগ করে এবং মুক্তিবাহিনী অস্ত্র সমর্পণ করে। বিশ্বের ১০৪টি দেশ বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বাংলাদেশ জাতিসংঘ জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন এবং ইসলামী সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে। ১৯৭২ সালের ১৪ ডিসেম্বর নতুন সংবিধান গৃহীত হয়। তিনি শিল্প কারখানা, ব্যাংকবীমা ইত্যাদি জাতীয়করণ করেন। তিনি বিশ্ব শান্তি পুরস্কার ‘জুলিও কুরি’ পদক লাভ করেন। ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলায় বক্তৃতা করে বাংলাকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করার চেষ্ঠা করেন। স্বাধীনতা পূর্ব সময় থেকে স্বাধীনতা লাভ পর্যন্ত একটি শ্লোগান ছিল “এক নেতার এক দেশ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ” একটি বিখ্যাত গ্রন্থ “ঞযব ঐঁহফৎবফংচ এ পৃথিবীর ১০০ জন বিশ্ববিখ্যাত ও বিশ্ববরেন্য ব্যক্তির জীবনী ও কীর্তিকাহিনী নিয়ে রচিত বইটিতে তাঁকে তুলে ধরে বাঙালিদের উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করে নিল। তাঁর চরিত্রে নেতাজি সুভাষ বসু, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজি নজরুল ইসলাম, একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মাওলানা ভাসানী প্রমুখদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্যণীয়। যুক্তরাজ্যের মানবতাবাদী আন্দোলনের প্রয়াত নেতা লর্ড ফেনার ব্রকওয়ে বলেছেন “জর্জ ওয়াশিংটন, মহাত্মা গান্ধী, ডি ভ্যালেরের চেয়েও শেখ মুজিব এক অর্থে বড় নেতা।’’ যুক্তরাষ্ট্রের নিউজ উইক পত্রিকা বলেছে “শেখ মুজিবুর রহমান রাজনীতির কবি’’ কিউবার অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছিলেন “আমি হিমালয় পর্বত দেখিনি, শেখ মুজিবকে দেখলাম। ব্যক্তিত্ব ও সাহসে এই মানুষটি হিমালয়। আমি হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম।” লেখক : প্রাবন্ধিক

সর্বশেষ সংবাদ