ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের আনন্দঘন সাফল্য পরবর্তী হিসাবে নেই তাদের মূল্য-খন রঞ্জন রায়,

পোস্ট করা হয়েছে 17/03/2016-06:50am:    খন রঞ্জন রায়, মহাসচিব ডিপে¬ামা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ। ৪৭, মতি টাওয়ার, চকবাজার, চট্টগ্রাম।
বাংলদেশে ২০০৯ সাল থেকে জাতীয় পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা শুরু হয়েছে। প্রাথমিক পর্বের শিক্ষা শেষে এ পাবলিক পরীক্ষা পঞ্চম শ্রেণি পড়–য়া ছোট সোনামনিদের জন্য একটি আন্দময় মূল্যায়ন প্রতিযোগিতা। ছোটদের বড় সাফল্যের জয় গাথা কাব্য। এ বছর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় অন্যান্যবারের চেয়ে বেশি সাফল্য দেখিয়েছে পরীক্ষার্থীরা। দেশে সবচেয়ে বড় চার পাবলিক পরীক্ষা এই ফল আমাদের অভিভাবকদের সস্তুষ্ট করেছে। সন্তোষ প্রকাশ করার কারণও যে নেই তা নয়। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় এ বছর পাসের হার ৯৮ দশকি ৫২ শতাংশ। গতবারে ছিল ৯৭ দশমিক ৯২ শতাংশ। এই বছর মোট পরীক্ষার্থীর ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ জিপিএ-৫ পেয়েছে। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৭৫ হাজার ৯৮০ জন। গত বারের চেয়ে এই সংখ্যা ৫১ হাজার ৪৬৯ জন বেশি। জুনিয়ার স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় গত বছর জিপিএ-৫ কম পেলেও এ বছর আবার বেড়েছে। এ বছর ৯২ দশমিক ৩১ শতাংশ শিক্ষার্থী পাসের কৃতিত্ব দেখিয়েছে। এ বছর জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৫০২ জন। এ সংখ্যা গত বছরের চেয়ে ৫০ হাজার ৫৫৭ জন বেশি। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট বা (জেডিসি) সমাপনী পরীক্ষায় এ বছর পাসের হার ৯৫ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫ হাজার ৪৭৩ জন। সাতটি বিভাগের মধ্যে পাসের হারের দিক থেকে এগিয়ে রাজশাহী বিভাগ। এই বিভাগে পাসের হার ৯৯ শতাংশ। সবচেয়ে কম পাসের হার সিলেট বিভাগে, ৯৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ। অপর পাঁচটি বিভাগে পাসের হার ৯৮ শাতংশের কম-বেশি। জেলা হিসেবে এবারও সবচেয়ে ভালো করেছে মুন্সিগঞ্জ। এই জেলার সব শিক্ষার্থীই পাস করেছে। আর সবচেয়ে পিছিয়ে বরগুনা জেলা। ইউনেসকোর মতে, মানসম্পন্ন শিক্ষার অন্যতম শর্ত হচ্ছে শিক্ষার পরিবেশ। লেখাপড়ার জন্য ছেলেমেয়েদের একটি কক্ষে ঢুকিয়ে দিলেই হবে না, কক্ষটিকে হতে হবে সত্যিকারের শ্রেণিকক্ষ। প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য হল শিশুর সামাজিক, মানবিক, দৈহিক, আধ্যাত্মিক, নান্দনিক বিকাশ সাধনের মাধ্যমে ভবিষৎ সুন্দর স্বপ্নদর্শনে তাকে উদ্বুদ্ধ করা। কিন্তু আমাদের বিশাল অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠী প্রাথমিক শিক্ষায় প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে বঞ্চিত। শিক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্র নিলেও এর পরবর্তী স্তরের দায়িত্ব শহরাঞ্চলে রাষ্ট্র বহন করে না। ফলে, দারিদ্রের কারণে এ দেশের অনেক শিশুকেই প্রাথমিক স্তর শেষে লেখাপাড়া ইতি টানতে হয়। বেছে নিতে হয় ৫ম শ্রেণির পর অর্থনৈতিক প্রয়োজনে শ্রমিক জীবন। পরিসংখ্যানটি একটু ভয়াবহ। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীতে অংশ নিয়েছে ২৮ লাখ ২৯ হাজার শিক্ষার্থী। ৮ম শ্রেণিতে এই সংখ্যা নেমে গেছে ১৯ লাখ ২৯ হাজারে। প্রায় ১০ লাখ এখানেই ঝড়ে গেছে। হারিয়ে গেছে শিক্ষার বলয় থেকে। ঝড়ে পড়া প্রবণতার এই হারকে কোন মতেই স্বাভাবিক বলা যায় না। বছরে ১০ লাখ, ৩০ শতাংশ রোধ করার সার্বিক পদক্ষেপ এখনই নিতে হবে। প্রাথমিক স্তর শেষে যেসব শিশু শহরের বিভিন্ন স্কুলে আর্থিক অনটনের কারণে ভর্তি হতে পারে না তাদের দায়িত্ব নেয়া রাষ্ট্রের, সমাজের, সুধীজনদের ওপর বর্তায়। সমাপনী পরীক্ষা শেষে কয়জন শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি, তার খোঁজ রাষ্ট্রের নেয়া দায়িত্ব। দারিদ্র্য ও কুসংস্কারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আগামীতে এসব শিক্ষার্থীর উচ্চ শিক্ষার পথ সুগম ও পর্যাপ্ত সুযোগ নিশ্চিত করতে সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এখন থেকে সুদুরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করে এগোতে হবে। প্রথমেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে শিক্ষক নিয়োগ ক্ষেত্রে। মানসম্পন্ন শিক্ষক পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা শিক্ষণ প্রশিক্ষণ। নেপ পরিচালিত ১৮ মাস মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন অ্যাডুকেশন এবং ১ বছর মেয়াদি সিইনএড কোর্স কোথাও গ্রহণযোগ্যতা নেই। উন্নত বিশ্বে শিক্ষাব্যবস্থায় ৪ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন অ্যাডুকেশন প্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ বাধ্যতামূলক। মানসম্পন্ন শিক্ষক, যা বর্তমান ধারায় এগোলে আমরা কখনোই পাব না। ‘মানসম্পন্ন শিক্ষক না থাকলে মানসম্পন্ন শিক্ষা আশা করা বৃথা। আর এর জন্য চাই শিক্ষক প্রশিক্ষণ। সেটা হতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক। আগামী দিনের দেশের উন্নতি ও আগ্রগতি নির্ভর করছে শিশুদের ওপর। তারাই আমাদের আশা-ভরসা। সুশিক্ষার অভাবে তারা যদি গড়ে উঠতে না পারে, তাহলে বাংলাদেশ উন্নত দেশ হিসাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। পৃথিবীর কোথায় বাংলাদেশের মতো অগোছালো নিম্নমাধ্যমিক, প্রাথমিক শিক্ষা নেই। দেশে ১৩ ধরনের ভিন্ন মতাদর্শের বিদ্যালয় বিক্ষিপ্তভাবে গত শতাব্দীর পরিত্যক্ত ‘৫ম শ্রেণি পর্যন্ত সবার জন্য বাধ্যতামূলক শিক্ষা’ কর্মসূচি পরিচালনা করছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরকে ‘নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে’ রূপান্তরিত করে সরকারি, বেসরকারি, প্রাইমারি স্কুল, কিন্ডারগার্ডেনগুলোকে একটি জাতীয় পরীক্ষার মাধ্যমে প্রতিযোগিতা আনতে হবে। ‘৮ম শ্রেণি পর্যন্ত সবার জন্য শিক্ষা’ শ্লোগান নির্ধারণ করে সম্মিলিতভাবে এগোতে হবে। এই ব্যাপারে আমরা গত ২০ ডিসেম্বর ২০০২ দৈনিক আজাদী, ২৭ জানুয়ারি ২০০৩ দৈনিক পূর্বকোণ ৬ জানুয়ারি ২০০৭ দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় বিশেষ নিবন্ধ লিখে সরকারের দৃষ্টি আর্কষণ করেছিলাম। নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে গত ২৯ জানুয়ারি ২০০৯ তারিখ ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন বিরোধী দলীয় নেত্রী ছিলেন তখন ২৫ জুলাই ২০০৭ তারিখ নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠা বিষয়ে স্মারকলিপি প্রদান করেছিলাম। আশার কথা আমাদের নিয়মতান্ত্রিক দীর্ঘ আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বর্তমানে সরকার এই ব্যাপারে ইতবাচক মনোভাব পোষণ শুরু করেছে। আমাদের দাবি উন্নত দেশের কাতারে অবস্থান প্রত্যয়ে দেশে প্রতিটি মানুষকে আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রযুক্তি শিক্ষা প্রদান। এই লক্ষ্যে প্রতিটি বিভাগ ১টি করে নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ‘৮ম শ্রেণি পর্যন্ত সবার জন্য শিক্ষা’ শ্লোগান নির্ধারণ করলে জাতির নিকট বর্তমান সরকারের দায়বদ্ধতার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাবে। আমরাও সরকারের সেই নির্দেশনাটির অপেক্ষায় রইলাম।

সর্বশেষ সংবাদ