সম্পাদকের পদত্যাগই সমস্যার সমাধান নয়-কবি ও সাংবাদিক।

পোস্ট করা হয়েছে 04/03/2016-10:39pm:    যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ প্রতিনিধিঃ ---- একজন সম্পাদক তার পদ থেকে পদত্যাগ করতে পারেন। কিন্তু তাতে কি সমস্যাগুলোর সমাধান হয়? না- হয় না। বিশ্বের মিডিয়াহাউসগুলোর ইনসাইড স্টোরি সাক্ষ্য দেয়- নেপথ্যের নীতিনির্ধারকরাই মূলত অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করেন। বিষয়টি ওপেন সিক্রেট। তা রাষ্ট্রপক্ষেরও না জানার কথা নয়। কখনও কখনও রাষ্ট্রপক্ষও সংবাদ মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করেন। যেমনটি জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার পর বাংলাদেশে ঘটেছিল। যেমনটি ‘প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক’রা করেছিলেন।
জেনারেল জিয়া, জেনারেল এরশাদ তাদের গোয়েন্দা প্রধানদের দিয়ে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করতেন- তা কারও অজানা নয়। বাংলাদেশে ওয়ান ইলেভেন এসেছিল। এই ওয়ান ইলেভেন, বাংলাদেশের জন্য, বাঙালী জাতির জন্য অনেক দরজা খুলে দিয়েছিল। ওয়ান ইলেভেনের পথ ধরেই এদেশে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে।
আগেই বলেছি, সামরিক শাসক কিংবা উপশাসকরা সবসময়ই মিডিয়াকে ভয় পান। ফলে তারা তা নিয়ন্ত্রণ করতে চান নিজের মতো করে। ওয়ান ইলেভেনের পরও আমরা তেমনটি দেখেছিলাম। এ বিষয়েই কিছু দোষ স্বীকার করেছেন ডেইলী স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। আর তা বলেই তিনি মামলা, হুমকি ইত্যাদির মুখোমুখি হচ্ছেন। সন্দেহ নেই- ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবরা নতুন করে রাজনীতি সাজাতে চেয়েছিলেন। তারা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কে ভেঙে দিয়ে নতুন দল করতে চেয়েছিলেন। ‘জাগো বাংলাদেশ’ নামে একটি সামাজিক প্লাটফর্মও করতে চেয়েছিলেন তারা। ফেরদৌস আহমদ কোরেশী, ডঃ মুহামম্দ ইউনুস, সৈয়দ মুহম্মদ ইব্রাহীম, ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী এমন অনেকে নাম ছিল কিংস পার্টির প্রথম তলিকায়। ছিলেন প্রধান দুই দলের কিছু নেতাও। যারা ‘সংস্কারবাদী’ বলে খ্যাতি পেয়েছিলেন।
না- তারা কিছুই পারেননি। পারেননি, কারণ এটা প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল- বাংলাদেশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ ছাড়া আর বড় কোনো বিকল্প রাজনৈতিক দল নাই। এই পর্যায়ে এসে বিএনপি ছিল আত্মঅহংকারে বেশি বলীয়ান এক শক্তি। বেগম খালেদা জিয়া সেনানিবাসের বাসা ত্যাগ করুন- বিষয়টি তার কাছের অনেকেই চাইছিলেন। তিনি তা সহজে মানতে রাজী হননি। ফলে তার নিজ ঘরেই বেশ কিছু বিভীষণ তৈরি হয়েছিল। ২.
মাহফুজ আনাম ওয়ান ইলেভেন নিয়ে তার দোষ স্বীকার করেছেন। এ ছাড়া একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে তার আর কিছুই করার ছিল না। তিনি তাড়না থেকেই তা বলেছেন। দায় নিয়েছেন। বলতে বাধ্য হচ্ছি- অপরাপর সাংবাদিক ও সম্পাদকরা তো তা আজও স্বীকার করেননি। তারা কি তবে ধোয়া তুলসিপাতা? না- তা নয়। তা হলে তাদের শাস্তি কি? মাহফুজ আনাম স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় এসেছেন। তিনি বলেছেন- মাহফুজ আনামের পদত্যাগ করা উচিৎ। মাহফুজ আনাম তার ভুল স্বীকার করলেও ডেইলি স্টারের সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করে তার সাহস দেখাতে পারেননি। আত্মমর্যাদাবোধ থাকলে তার অবশ্যই পদত্যাগ করা উচিৎ।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এ ধরণের ভুলের জন্য আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী, ব্যবসায়ী এবং ছাত্র সমাজসহ সাধারণ মানুষকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। পত্রিকাটিতে প্রকাশিত এই ভুলের খেসারত আমি এবং আমার পরিবারকেও দিতে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন- সবই সত্য। কিন্তু বাংলাদেশে ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত সময়ে যে সামরিক জগদ্দল পাথর চেপে বসেছিল- তার একটা প্রভাব তো রয়েছেই। যে প্রভাব এই প্রজন্মের একটি ক্ষুদ্রতম অংশকে মিথ্যা ইতিহাস পড়িয়েছে। এরা ধর্মীয় মৌলবাদ, জঙ্গীবাদকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করেছে। আর বেদনার কথা হচ্ছে, এদের মদদ দিয়েছে বিএনপির মতো একটি রাজনৈতিক দল। তারা প্রকাশ্যে আলবদর-রাজাকারদের মন্ত্রী বানাবার ধৃষ্টতাও দেখিয়েছে একপর্যায়ে।
বাংলাদেশে একটি স্নায়ুযুদ্ধ চালাচ্ছে একটি মহল। এরা ‘গনতন্ত্র না মুক্তিযুদ্ধ’- এমন একটি স্লোগান তুলছে প্রায়ই বিভিন্ন সভায়-সেমিনারে। তারা বলছে স্বাধীন বাংলাদেশে এখন ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ আর বড় ব্যাপার নয়! বরং সকলের গণতন্ত্র চর্চা করে দেশ গঠন করাই হলো মূল কর্তব্য! কী ভয়ংকর কথাবার্তা! এভাবেই তো একদিন এদেশে আলবদরের গাড়িতে মন্ত্রীত্বের পতাকা উড়েছিল। এ বিষয়ে অনেক কথা বলা যাবে। অতি সম্প্রতি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু একটি বিষয় খোলাসা করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন- গণতন্ত্র নিয়ে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে। গণতন্ত্র বিরোধী শক্তির প্রতি নমনীয়তা প্রদর্শন, ছাড় দেয়া হয়েছে ও আপস মিটমাটের চেষ্টা করা হয়েছে।গণতন্ত্রের সুযোগ নিযেই বিরোধী শক্তিরা এর পিঠে ছোবল হেনেছে। তাই গণতন্ত্রে অগণতান্ত্রিক শক্তি, অপরাধী, খুনী, আগুন সন্ত্রাসীর সাথে মিটমাট হতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তিকে পাকিস্তানের রেখে যাওয়া জঞ্জাল বলে উল্লেখ করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্রকে নিরাপদ করতে- এগিয়ে নিতে এসব জঞ্জাল পরিষ্কার করার কোন বিকল্প নেই। যত নিমর্মই হোক জঞ্জাল পরিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
মন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশে ‘গণতন্ত্র’ বিষয়ে সকল পর্যায়ে প্রায় প্রতি মুহুর্তেই আলোচনা, তর্ক, গবেষণা, বিচার-বিশ্লেষণ হচ্ছে। কারণ বাঙালির ভাষার সংগ্রাম, স্বাধীকারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম মূলত গণতান্ত্রিক সংগ্রাম। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামেরই পরিণতি। স্বাধীন বাংলাদেশেও নির্বাচিত সরকারের স্বৈরাচারী প্রবণতা কিংবা সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধেও গণতন্ত্রের জন্য জাতি বার বার সংগ্রাম করেছে। তাই বাংলাদেশে গণতন্ত্র নিয়ে আলোচনা হবেই। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির অনাকাঙ্খিত বিভাজন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থেকে রাজনৈতিক বৈরিতা, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে অনুষ্ঠিত ১৯৭৩ সালের জাতীয় নির্বাচন দেশকে একটি সংসদ উপহার দিলেও গণতন্ত্রের পথ চলাকে শক্ত ভিত্তি দিতে পারেনি। জরুরী অবস্থা জারি, বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তন, সশস্ত্র বিপ্লবের পন্থা গ্রহণ কতটা সময়োপযোগী ছিল, কতটা সঠিক ছিল সেটা নিয়েও তর্ক করা যায়। সেটার বিচারের ভারও ইতিহাসের উপর ছেড়ে দেয়া উচিৎ বলে মন্তব্য করেন তথ্যমন্ত্রী।
এসব বিষয়গুলো আজ খুবই জরুরি। রাষ্ট্র যদি তাদের ইচ্ছে মতো সম্পাদক বসাবার দৃঢ়তা দেখায়- তাহলে সৃজনশীল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ব্যাহত হবে। না- আমি কোনো অপশক্তির পক্ষে ওকালতি করছি না। বরং এটাই বলতে চাইছি, রাষ্ট্রকে একটি কাঠামো তৈরি করতে হবে। যে কাঠামোর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ উদ্ভাসিত হবে। যে কাঠামো এই প্রজন্মকে জানাবে একাত্তরে তিরিশ লাখ শহিদ কোন চেতনা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। বাংলাদেশে সুশীল নামধারী কিছু বুদ্ধিজীবী যা করছেন- তার সিংহভাগই যাচ্ছে মৌলবাদী-জঙ্গীবাদী একটি শক্তির ঝুলোয়। তারা মানুষজনকে দেখাচ্ছে- এই দেখ অমুক কি বলছেন- তমুক কি বলছেন! এটা তাদের জন্য হাতিয়ার। মাহফুজ আনাম ও তার কিছু অনুসারী সেই ঢাল উত্তোলন করেই চলেছেন। এটা গোটা সমাজের জন্য একটি অশনি সংকেত।
মনে রাখা দরকার, পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে রেডিও-টিভিই ছিল রাষ্ট্রের প্রধান সংবাদ মাধ্যম। সে অবস্থা এখন আর নেই। সোশ্যাল মিডিয়া সহ ওয়েব মিডিয়া এখন বিশ্বব্যাপি বড় ফ্যাক্টর। তাই যাচাই বাছাইয়ের সুযোগও এখন অনেক অবারিত ।
নিউইয়র্ক / ৪ মার্চ ২০১৬

সর্বশেষ সংবাদ