বাংলাদেশের পুলিশ কবে জনগণের বন্ধু হবে- কামরুল হাসান বাদল কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 21/01/2016-12:53pm:    মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর এক গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আছে- তা অস্বীকার করার উপায় নেই। অস্বীকার করার উপায় নেই গত কয়েক বছর ধরে চলা দেশে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে এই বাহিনীর কৃতিত্বের কথাও। তবে তার পাশাপাশি এই বাহিনীর দুর্নীতি ও অসদাচরণের ঘটনাও কম নয়। দুটি ঘটনা নিয়ে সম্প্রতি দেশে আলোচনা সমালোচনার ঝড় বইছে। পুলিশের ভূমিকা ও আচরণ নিয়ে দেশে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে প্রবল অসন্তোষ ও ক্ষোভ পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাতে এই বাহিনীর ভাবমূর্তি আবারও ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এই অংশটুকু পড়েই অনেক পাঠক মনে মনে আমাকে প্রশ্ন করা শুরু করেছেনণ্ড এই বাহিনীর ভাবমূর্তি ছিলই বা কবে? ভাবমূর্তি বলতে আপনি কী বোঝেন? এই বিতর্কে আমি নিজেকে জড়াবো না কারণ, পুলিশের পক্ষ নিলে নির্ঘাৎ আমি হেরে যাব। আমি শুধু একটি নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ দাঁড় করাতে পারি।
গত ৯ জানুয়ারি শনিবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা গোলাম রাব্বিকে আটক করে ইয়াবা ব্যবসায়ী সেবনকারী বানানোর ভয় দেখিয়ে পাঁচ লাখ টাকা আদায়ের চেষ্টা করেন মোহাম্মদপুর থানার উপ-পরিদর্শক মাসুদ শিকদারসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য। এরপর রাত ৩টা পর্যন্ত তাকে নিয়ে মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন রাস্তা ঘোরেন এবং তাকে মারধর করেন। এক পর্যায়ে তাকে বেড়িবাঁধে নিয়ে ক্রস ফায়ারে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন রাব্বি। এ ঘটনার পরদিন রবিবার সকালে এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন রাব্বি। ১১ জানুয়ারি অভিযুক্ত মাসুদকে প্রত্যাহার করা হয় এবং গত শনিবার তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এরপরে গত সোমবার রাব্বির করা লিখিত অভিযোগকে ‘এফ আইআর’ হিসেবে গ্রহণ করতে মোহাম্মদপুর থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট এবং সে সাথে হেফাজতে নিয়ে নির্যাতন কেন অসাংবিধানিক হবে না তা-ও জানতে চেয়েছে আদালত। হাইকোর্টের রুলে বলা হয়েছে, ‘ব্যাংক কর্মকর্তা গোলাম রাব্বিকে নির্যাতন করায় এসআই মাসুদ সিকদারকে সাময়িক বরখাস্ত নয়, তাকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা উচিত।’ এই ঘটনার কয়েকদিন পর গত শুক্রবার যাত্রাবাড়ি থানার এসআই আরশাদ হোসেনসহ কয়েকজন পুলিশের বিরুদ্ধে ডিসিসির পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা বিকাশ চন্দ্র দাশকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পরপর পুলিশের পক্ষ থেকে বিষয়টি ‘শ্রেফ ভুল বোঝাবুঝি’ বলে দাবি করা হয়েছে। বিকাশ ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের একজন পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা। শুক্রবার ভোরে কাজের তদারকি করতে গেলে এস আই আরশাদ হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশ দলটি তাকে ছিনতাইকারী ভেবে থামতে বলে আর অন্যদিকে সাদা পোশাকধারী পুলিশকে ছিনতাইকারী ভেবে মোটর সাইকেল ঘুরিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তার মাথায় আঘাত করে। পুলিশ অবশ্য মারধরের কথা স্বীকার করেনি। তবে ডিসিসি কর্মকর্তা বিকাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ২০৯ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আছেন। পুলিশের হাতে নিরীহ মানুষ হয়রানির এ দুটি সামান্য ঘটনা। রাব্বি ও বিকাশের ভাগ্য ভালো তাদের সংবাদ দুটি দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার হয়েছে বলে আপাতত তারা একটি বিচার বা সান্ত্বনা পেতে যাচ্ছেন। ব্যাংক কর্মকর্তা রাব্বির ভাগ্যতো আরও অনেক ভালো তাকে ‘ক্রসফায়ার’ দেওয়া হয়নি। দিলেই বা এমন কী প্রতিকার পাওয়া যেত। বাংলাদেশে এমন অনেক ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। পুলিশের হাতে নিগৃহিত হতে হচ্ছে অসংখ্য অসহায় মানুষকে। তাদের হাত থেকে এমনকি রেহাই পায় না সরকারি দলের অপেক্ষাকৃত দুর্বল নেতা-কর্মীরাও। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার পর ওই এলাকায় সবচেয়ে লাভবান হয় পুলিশ। ঘটনার পর গ্রেফতার বাণিজ্যে পুলিশের পোয়া বারো হয়ে থাকে। এ ধরনের অনেক অভিযোগই পুরনো। আসলে পুলিশ বাহিনীর সাথে ঘুষ, দুর্নীতি, অসদাচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদি অভিযোগগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সাধারণ মানুষের কাছে এই বাহিনীর ভামূর্তিটা অনেকটা এমনই।
গত মঙ্গলবার সাভারে পুলিশের মহাপরিচালক একেএম শহীদুল হক বলেছেন, পুলিশ জনগণের সেবক। আমরা শাসন করতে আসি নাই। আইন জনগণের স্বার্থে। আমরা আইন প্রয়োগ করে থাকি। কিন্তু আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে যদি প্রতিবন্ধকতা হয় তবে সেখানে বল প্রয়োগের ক্ষমতায় আইনেই দেওয়া হয়েছে। আমরা বল প্রয়োগ করতে চাই না। আমরা মানুষকে সচেতন করে আইন প্রয়োগ করতে চাই। আইজিপি সাহেবের কথা বেশ ভালোই। তবে তাঁর কথায় ‘সচেতন করে আইন প্রয়োগ’ করার পর অনেকেই আবার অচেতন হয়ে পড়েন। এটিই সমস্যা। গত সোমবার পুলিশদপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে অভিযুক্ত দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে বলা হয়, সাংগঠনিকভাবে নীতিগতভাবে বাংলাদেশ পুলিশ কোনো অপরাধ বা অপরাধীকে সমর্থন করে না। কোনো ব্যক্তির সখলন বা বিচ্যুতির জন্য পুলিশ বিভাগকে সামগ্রিকভাবে দায়ী করা অসমীচীন এবং অসংগত। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয় পুলিশের অধিকাংশ সদস্যই আইন মেনে কাজ করেন। তবে বিচ্যুত হন কেউ কেউ। ব্যক্তির বিচ্যুতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হয় না। বরখাস্ত, চাকরিচ্যুতি, বাধ্যতামূলক অবসর এবং ফৌজদারী আদালতেও বিচার হয়। ২০১৫ সালে কনেস্টেবল থেকে সাব ইন্সপেক্টর পর্যন্ত ৭৬ জনকে বরখাস্ত, চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক শহীদুল হক ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। ঢাকার ব্যাংক কর্মকর্তা রাব্বিকে পুলিশের নির্যাতন সম্পর্কে বলতে গিয়ে এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘পুলিশ তাকে (রাব্বিকে) তল্লাসি করতে চাইলে তিনি তল্লাসি করতে দিতে চাননি। কিন্তু নিয়ম হলো কোনো ব্যক্তি যদি পুলিশের কাজে বাধা দেয় তবে সেটা ফৌজদারি অপরাধ হয়। সেই অপরাধে তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। কিন্তু পুলিশ সবক্ষেত্রে ক্ষমতা দেখায় না।’ এখন প্রশ্ন হলো কোনো ব্যক্তি পুলিশের কাজে বাধা দিল কিনা তা-ও তো নির্ধারণ করে থাকে পুলিশ স্বয়ং। অর্থাৎ যে কোনো ব্যক্তিকে হয়রানির উদ্দেশ্য থাকলে পুলিশ তাকে ‘কাজে বাধা দেওয়ার’ অভিযোগ তুলতে পারে।
এক্ষেত্রে আমার সৈয়দ মুজতবা আলীর কথাটিই মনে পড়ে। ‘কুইনিন জ্বর সারাবে বটে কিন্তু কুইনিন সারাবে কে’। দেশের অপরাধ ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে যে বাহিনী সে বাহিনী নিজেই যদি অপরাধে জড়িয়ে পড়ে তবে তাকে সামলাবে কে? এর জন্য দায়ী ‘সিস্টেম’। কান টানলে মাথা আসার মতো বলতে হয় দেশের সামগ্রিক অবস্থাই দায়ী। একটি রাষ্ট্র যদি সভ্যতার পথে থাকে, সমাজ যদি সত্যতার পথে থাকে তবে তার সবকিছুই পরিচালিত হবে সভ্য ভাবে। এই পরিস্থিতির জন্য শুধু সরকারকে দায়ী করলে চলবে না। বরং এ বিষয়ে সব চেয়ে বেশি দায় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর যারা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নামে সারা দেশে নৈরাজ্য, ধ্বংস সংঘটিত করেছে। একটি রাষ্ট্রে যখন এ ধরনের অগণতান্ত্রিক ও নিষ্ঠুর আচরণ চলে তখন তা প্রতিরোধে কিংবা জনগণের জানমাল রক্ষার তাগিদে সরকার পুলিশ বাহিনীর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বেশি নির্ভর করে। আর সরকারের অতি নির্ভরতার এই সুযোগটি গ্রহণ করে থাকে ওই প্রতিষ্ঠানটি। যেমন বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ধরে আন্দোলন-সংগ্রামের নামে যে নৈরাজ্য করা হয়েছে তা প্রতিহতের জন্য সরকার পুলিশ বাহিনীর সহায়তা নিয়েছে। আর এভাবে পুলিশ বাহিনীও অনেকটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশে নয়। বিশ্ব পরিস্থিতিও আজ অনেকটা তাই। দেশে দেশে যেভাবে অন্তর্ঘাত, গুপ্ত হত্যা, সন্ত্রাসী তৎপরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে সেভাবে নিরাপত্তার নামে সে সব দেশে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার খর্ব হয়ে যাচ্ছে। নিরাপত্তার নামে সাধারণ মানুষের গোপনীয়তা বলেও কিছু থাকছে না। দুর্নীতি আজ ব্যাপক বিস্তৃত একটি বিষয়। পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধেই এই অভিযোগ উচ্চারিত হয় বেশি।
তবে গত কয়েক বছরে এ বাহিনীর বেশ কিছু পরিবর্তন হয়েছে বলে আমার মনে হয়। বর্তমান সরকার পুলিশের পদমর্যাদা বৃদ্ধিসহ বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করেছে। অনেক শিক্ষিত তরুণের চাকরির সুবাদে চিন্তা-চেতনায়, ব্যবহারে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। কিন্তু এর পাশাপাশি এই বাহিনী বিভিন্ন অপকর্মেও জড়িত হয়ে পড়ছে আশংকাজনকভাবে। গুম, খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজী এমন কি ইয়াবার মতো মাদক ব্যবসার সাথেও জড়িত থাকার অভিযোগ আছে অনেক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে। ১ লাখ ৬৯ হাজার সদস্যের এই বিশাল বাহিনীতে সব কিছুই নিয়মমাফিক চলবে তা বলা যাবে না। এর মধ্যে অনেক অঘটন ঘটতে পারে। তবে তার জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ জবাবদিহিতার। অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে যদি নিরপেক্ষভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হতো তবে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হতো। পুলিশের বিরুদ্ধে অপরাধের তদন্ত করে পুলিশ। চার্জশিট দেয় পুলিশ। কাজেই এসব কাজে পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। অনেক সময় দেখা যায় কারও অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে পুলিশ বিভাগ বা এই বিভাগের ঊর্ধ্বতন কেউ অন্য আরেকটি অপরাধ সংঘটিত করছেন।
কাজেই পুলিশের অপরাধ তদন্তের ভার পুলিশকে না দিয়ে অন্য তদন্ত সংস্থাকে দিলে ভালো হয়। আর সবচেয়ে ভালো হয় অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে সহায়তা করে ‘ব্যক্তির দায় গোটা বাহিনী নেবে না’ এই কথার মর্যাদা রক্ষা করা।
Email:[email protected]

সর্বশেষ সংবাদ
এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।  তথ‌্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি মহোদয়ের শুভ জন্মদিন আজ করোনায় পোশাক কারখানায় ৫৫ শতাংশ কাজ কমে গেছে: রুবানা হক