মুক্তিযুদ্ধের -মিমাংসিত ও স্বীকৃত বিষয় নিয়ে বিতর্ক কেন -কামরুল হাসান বাদল-কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 24/12/2015-08:43am:   
প্রতিটি জাতির কিছু অহংকারের বিষয় থাকে। কিছু কিছু জাতির বীরত্বের ইতিহাস থাকে। মুক্তিযুদ্ধও তেমনি বাঙালির অহংকারের বিষয় ও বীরত্বের ইতিহাস হাজার বছরের বাঙালির জেগে ওঠার কাল, বীরত্বের কাল, অহংকার ও গৌরবের কাল-১৯৭১। ইতিহাস সাক্ষী দেয় বাঙালির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্রের নাম বাংলাদেশ। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে বাঙালির প্রথম সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭১ সালেই। কোনো জাতি তার অহংকার ও গৌরবের ইতিহাসকে বিতর্কিত করে না। বাঙালিরা করে, তবে তা সমগ্র বাঙালি করে না বাঙালিত্ব নিয়ে যাদের ঝামেলা আছে, শুধু তারাই করে।
চার হাজার বছর আগেও এ অঞ্চলে জনবসতি ছিল। তবে তারা কোন ভাষায় কথা বলত এবং তাদের জাতিসত্তা কী ছিল তা পরিষ্কার নয়। তবে সে জনবসতি থেকে কালের পরিক্রমায় হাজার বছর ধরে এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছে একটি জাতি, বাঙালি যার নাম। তবে সে বাঙালির যুগে নির্দিষ্ট রাষ্ট্র ছিল না। অবশ্য সে সময় এ অঞ্চলে রাষ্ট্র ভাবনারও উদ্ভব ঘটেনি। রাজা-বাদশা-জমিদার- নৃপতিদের দ্বারা বাঙালি শাসিত হয়েছে। শাসিত হয়েছে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন নৃপতি বা শাসক দ্বারা। বাঙালি স্বশাসিত হয়েছে একমাত্র ১৯৭১ সালে দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রাম ও ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যম একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দ্বারা। সে রাষ্ট্রের নাম হয়েছে বাঙালির মাতৃভাষার নামে বাংলাদেশ মানবসভ্যতার শুরুর দিনক্ষণ কখনো নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কারণ সভ্যতা অগ্রসর হয় অত্যন্ত ক্ষীণগতিতে। সভ্যতার ইতিহাস কখনো নির্দিষ্ট করা সম্ভব নয় যতক্ষণ না তা দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়েছে। তেমনি বাঙালির দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের সূচনাক্ষণটিও উল্লেখ করা সম্ভব নয়। তবে কোনো কোনো ঘটনাকে উল্লেখযোগ্য মনে করা যেতে পারে। সে হিসেবে এ দেশের বাঙালির প্রথম প্রতিবাদ ও বিদ্রোহ ভাষা আন্দোলনকে একটি মাইলফলক ধরে নিয়ে আমরা বলতে পারি সেদিনে সে ঘটনা বাঙালির সুপ্ত মনে স্বাধীনতার বীজ রোপণ করেছিল। কারণ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন শুধুমাত্র ভাষা আন্দোলন ছিল না, তা ছিল একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনও। কারণ ভাষা হচ্ছে সংস্কৃতির একমাত্র বাহন। ভাষা না থাকলে যে সংস্কৃতির শেকড় থাকে না এই বোধ থেকে সেদিন এ দেশের জনগণ ভাষা রক্ষার সংগ্রামে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছিল। পাকিস্তান যে বাঙালির শেষ ঠিকানা নয় তা নির্ধারিত হয়েছিল ভাষা আন্দোলন সফল হওয়ার মাধ্যমে এবং এর জন্য খুব বেশি বছর অপেক্ষা করতে হয়নি। ৫২ থেকে ৭১ মাত্র ১৯ বছরের ব্যবধানে বাঙালির একমাত্র ঠিকানা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। ’৫২ থেকে ’৭১ এই ঊনিশ বছরের বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরতে গেলে আমার আজকের লেখার মূল বিষয়ে পৌঁছাতে পারব না। কাজেই মুক্তি সংগ্রাম কীভাবে মুক্তিযুদ্ধে পরিণত হলো তার পূর্ণ বিবরণ এখানে তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। তবে ইতিহাসের মাইফলকগুলো তুলে ধরছি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের বিজয় লাভ এবং সে সরকারের মন্ত্রিসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। ১৯৬৫ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এরপর পাকিস্তান সরকার তাঁকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেফতার করে। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি জেল থেকে ছাড়া পান। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সমগ্র পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অধিকার লাভ করেন। পাকিস্তানি শাসকরা বঙ্গবন্ধুকে ৬ দফার প্রশ্নে ছাড় দিয়ে প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দেয়। বঙ্গবন্ধু তা ফিরিয়ে দেয় এবং ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক ঐতিহাসিক ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ’৫২ থেকে ’৭১ এই ঊনিশ বছরের পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাস পাঠ করেন সেখানে মুখ্য চরিত্রে শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুকে পাওয়া যায়। আর অন্যরা সেখানে পার্শ্বচরিত্র মাত্র। অথবা কোন এক সময় প্রধান চরিত্রে থাকলেও তার স্থায়িত্ব অত্যন্ত কম বিধায় এই দীর্ঘ ইতিহাসের পাতায় একটিই উজ্জ্বল নাম আর তা হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে সেদিন সংসদে যাওয়া, ইয়াহিয়ার প্রস্তাবে রাজি হওয়া সর্বশেষ স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার অধিকার এবং যোগ্যতা ছিল একমাত্র বঙ্গবন্ধুর। ঘটেছেও তা। তাঁর ঘোষণাতেই মুক্তিযুদ্ধ শুধু হয়েছে এবং তাঁর অবর্তমানে ১৯৭১ এর নয় মাস ব্যাপী মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে।
উপরোক্ত কথাগুলো নতুন কিছু নয়। আমি যেরূপ সংক্ষেপে বললাম বা যতটুকু বললাম সুধী পাঠকরা নিজেরাই এর চেয়ে বেশিও ভালো জানেন। তারপরেও আমি লিখলাম কারণ গত ২১ ডিসেম্বর বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম জিয়া এমন কিছু বিতর্কিত কথা বলেছেন তার জবাব দিতে গিয়ে একটি ভূমিকার প্রয়োজন ছিল বলে।
বেগম খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গে লেখার আগে সেদিন তিনি কী বলেছিলেন তা একটু উল্লেখ করা যাক। গত ২১ ডিসেম্বর রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে, আজকে বলা হয় এত লক্ষ লোক শহীদ হয়েছে, এটা নিয়েও অনেক বিতর্ক আছে।’ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি, তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলে মুক্তিযুদ্ধ হতো না।’
বেগম খালেদা জিয়া এসব কথা কেন বলছেন তা বলার আগে তাঁর অভিযোগগুলো খণ্ডন করি আগে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নয় মাসে কত লোক শহীদ হয়েছিলেন তা আওয়ামী লীগ বা তৎকালীন বঙ্গবন্ধু সরকারের একার হিসাব নয়। যুদ্ধকালীন অবস্থায় ও যুদ্ধশেষে দেশ স্বাধীন হলে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সংস্থার হিসাব থেকে প্রাপ্ত তথ্যই সন্নিবেশিত হয়েছে আমাদের ইতিহাসে। এই দাবি শুধু আওয়ামী লীগ একাই করেছে তা নয়। গণহত্যা নিয়ে তদন্ত ও গবেষণা করে এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময়ে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে এ হিসাব উত্থাপন করেছে। বেশি পড়াশোনা করার দরকারও পড়ে না। অন্তত ১ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় যে সব বিদেশি পত্র-পত্রিকা ও গ্রন্থের উল্লেখ করা হয়েছে তা দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হতো। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণহত্যা নিয়ে গবেষণা করেছেন দীর্ঘদিন থেকে, লিউ কুপার, তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ’ঐণভমডধঢণ’ (গণহত্যা) নামক গ্রন্থের প্রচ্ছদেই লিখেছেন, ১৯১৫ সালে গণহত্যায় নিহত হয় ৮ লাখ আর্মেনিয়ান, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ৬০ লাখ ইহুদিকে হত্যা করা হয়। ১৯৭১ সালে ৩০ লাখ বাংলাদেশি ও ১৯৭২ থেকে ’৭৫ পর্যন্ত এক লাখ হুতু জনগোষ্ঠী। লিউ কুপারের সাথে আওয়ামী লীগের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গণহত্যা বিশেষজ্ঞ। বিশ্বের নানা দেশে গণহত্যা বিষয়ে তাঁর বইটি সাড়া জাগানো দলিল। এছাড়া স্যামুয়েল টটেন সম্পাদিত, ‘ইন সেঞ্চুরি অব জেনোসাইড’ গ্রন্থে নিহত সংখ্যা ত্রিশ লাখ বলা হয়ছে। এ ছাড়া ‘ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফি’ ও কমাটন্স এনসাইক্লোপেডিয়া’য়ও এই সংখ্যা ৩০ লাখ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে এখন প্রশ্ন তুললেও বেগম জিয়ার প্রায় সাড়ে দশ বছরের শাসনামলে এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়নি। সরকার ও দলীয় বিভিন্ন বক্তব্যে তিনি ও তাঁর দলের নেতারা মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহীদের কথাই বলেছেন। বেগম জিয়ার শাসনামলে জাতীয় ও দলীয় অনুষ্ঠানের পেপার কাটিং বের করলে তা পরিষ্কার হবে। শুধু খালেদা জিয়া নন, যে জিয়াউর রহমান ঘোষণা না দিলে মুক্তিযুদ্ধ হতো না বলে দাবি করেন তিনি সে জিয়া, তাঁর স্বামীও জীবিতকালে কখনো এমন দাবি করেননি। বাংলাদেশে এই বিতর্কের সূত্রপাত করেন প্রথম ড. কামাল হোসেনের জামাতা ডেভিড বার্গম্যান। আর আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কাতার ভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আল জাজিরা। কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় ঘোষিত হলে সেদিনই আল জাজিরা টিভি বাংলাদেশের ওপর একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। আল জাজিরার ঢাকা প্রতিনিধি মেহের সাত্তারের পাঠানো রিপোর্টে যে ফুটেজ দেখানো হয় তা বাংলাদেশের নয় বলে অভিযোগ আছে। ওই রিপোর্টের উৎস হিসেবে যে লিংকের কথা বলা হয়েছে তা বিতর্কিত সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের। যিনি বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে মানবাধিকার বিষয়ে কথা বলে থাকলেও যুদ্ধাপরাধ নিয়ে নীরব থাকেন সেই সারা হোসেনের স্বামী। একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার সাথে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্কের একটি আপাত যোগসূত্র আছে। অর্থাৎ এই বিচার প্রক্রিয়া শুরু হতে হতে বিভিন্ন স্থান থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে বিতর্কিত ও বিব্রতকর মন্তব্য শুরু হতে থাকে। এই বিচার প্রক্রিয়াকে ভণ্ডুল করতেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আপত্তিকর তথ্য উপস্থাপন বলে মনে করে অনেকে।
সেদিনের সেই বক্তব্যে বেগম খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগকে আক্রমণ করে বলেছেন, এই দলটি মুক্তিযুদ্ধ করেনি। এটি একটি সস্তা রাজনৈতিক ও আক্রোশমূলক বক্তব্য। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাথে আওয়ামী লীগের নামটি এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে কোনোভাবেই তা মুছে ফেলা সম্ভব নয়। এটি আরোপিত কোনো বিষয় নয়। ইতিহাস স্বীকৃত সত্য। অন্যদিকে বেগম জিয়া এই কৃতিত্ব আওয়ামী লীগকে না দিয়ে নিজের স্বামীকেই সবটুকু দিতে চান। এটিও খুব বেশি দোষের নয়। কারণ বিএনপির ওই একটিমাত্র বিষয় আছে যা নিয়ে গর্ব করতে পারে। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধকে জড়িয়ে তিনি ও তাঁর দল জেনারেল জিয়াকে মহিমান্বিত করতে চান। অথচ এই অদূরদর্শি নেত্রী আওয়ামী লীগকে আক্রমণ করতে গিয়ে সেই মুক্তিযুদ্ধকেই বিতর্কিত ও খাটো করতে চাইছেন। পরশ্রীকাতরতা একজন মানুষকে কতটা নিচে নামাত পারে এটি হতে পারে তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
মুক্তিযুদ্ধ সব জাতি করতে পারে না। সে সুযোগ সব জাতির ইতিহাসে আসে না। স্বাধীনতা দিবস থাকলেও সব জাতির বিজয় দিবস থাকে না। বাঙালি সে অনন্য গৌরবের অধিকারী। বেগম জিয়া একদিকে স্বাধীনতার ঘোষকের স্ত্রীর দাবি নিয়ে বড়াই করেন অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের মিমাংসিত ও স্বীকৃত বিষয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করে সে গৌরবকে খাটো করেন। তিনি দাবি করেন আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ করেনি। তার দাবি অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা চাননি, অন্যদিকে আওয়ামী লীগকে আক্রমণ করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের বিষয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করে প্রমাণ করলেন আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
আওয়ামী লীগ কী ভাবে তা দেখার বিষয় নয় দেশের সচেতন মানুষ জানে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হলেও তাতে সব দলের অংশগ্রহণ ছিল (সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল ছাড়া) সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে সে যুদ্ধ হয়ে উঠেছিল জনযুদ্ধ। কাজেই আওয়ামী লীগের বিরোধীতা করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করা এক প্রকার কাণ্ড জ্ঞানহীন কর্মকাণ্ড।
অবশ্য খালেদা জিয়া তাঁর অবস্থান থেকে ঠিক আছেন। পাকিস্তান, জামায়াতে ইসলাম, দেশের বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠী, যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় নিয়োজিত পেইড সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান যে ভাষায় কথা বলে, যে ভাষায় মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করে দেখতে চায়, বেগম জিয়া সে ভাষাতেই কথা বলেছেন। কারণ তিনি সেই আদর্শেরই রাজনীতি করেন। মুক্তিকামী মানুষের নতুন প্রজন্মের সন্তানদের সমর্থনের আশায় তিনি মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেন এবং সে যুদ্ধে তাদের অবদান তুলে ধরতে গিয়ে জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণার প্রসঙ্গটি তোলেন। অন্যদিকে তা করতে গিয়ে যখন আওয়ামী লীগের পাহাড় সমান কৃতিত্বে খড়কুটোর মতো ভেসে যান তখন আওয়ামী লীগকে আক্রমণ করতে গিয়ে তাঁর স্বামী কর্তৃক ঘোষিত! মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করে তোলেন। এবং এর দ্বারা প্রমাণ করেন যে, বিএনপি’র রাজনীতি মূলত স্বাধীনতাবিরোধী রাজনীতি, পাকিস্তানপন্থী রাজনীতি, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাত্তরের মানবাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে দেশে জামায়াতে ইসলামী ও তার সমমনা দলগুলো এবং বিদেশে জামায়াতের অর্থে নিয়োগকৃত লবিস্ট প্রতিষ্ঠাগুলো সুকৌশলে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রচার প্রপাগাণ্ডা শুরু করে। এবং তখন থেকেই মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যার মতো বিষয়কে বিতর্কিত করে তোলার অপচেষ্টা শুরু করে। আর এই ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার পর থেকে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান প্রমাণ করে তারা প্রকৃতপক্ষে একটি পাকিস্তানপন্থী দল। বেগম খালেদা জিয়ার এসব মন্তব্য আসলে তাঁর সন্তান তারেক রহমানের বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি। যার রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার কারণে বিএনপির রাজনীতির বর্তমান দৈন্যদশা। লন্ডনে অবস্থান করে তারেক রহমান এতদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ভীষণ আপত্তিকর মন্তব্য প্রদান করতেন। এবার সে সব কথা বেগম জিয়া উচ্চারণ করছেন। কিন্তু ইতিহাসতো বড়ই নির্মোহ। ইতিহাস বলে, বঙ্গবন্ধু জন্ম দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের আর মুক্তিযুদ্ধ জন্ম দিয়েছে জিয়াউর রহমানের।
[email protected]

সর্বশেষ সংবাদ