ধর্মীয় পোশাক! বনাম সর্বজনীন পোশাক -কামরুল হাসান বাদল-কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 28/11/2015-04:24pm:   
মানুষ কবে থেকে পোশাক পরিধান করা শুরু করেছিল তার সঠিক দিনক্ষণ উল্লেখ করা সম্ভব না। তবে অনেকে মনে করেন ৪০ থেকে ৭০ হাজার বছর আগে থেকে মানুষ নিজেদের আবৃত করতে শুরু করে। গাছের পাতা-বাকল ও পশুর চামড়াই ছিল মানুষের আদি পোশাক। শীত-তাপ থেকে বাঁচার জন্যই মানুষ কিছু একটা দিয়ে শরীর আবৃত করার পন্থা আবিষ্কার করে। লজ্জা নিবারণের জন্য পোশাকের উৎপত্তি হয়নি। কারণ আদি মানুষরা পরস্পরকে লজ্জা পাওয়ার অবকাশ পায়নি। সবাই যেভাবে চলছে সেখানে আলাদা করে লজ্জা পাওয়ার প্রয়োজনও পড়েনি।
একটি সময় মানুষ তুলা দিয়ে সুতা, সুতা দিয়ে বস্ত্র বুনন করতে শিখেছে তা-ও কয়েক হাজার বছর আগে। কালের বিবর্তনে পোশাকেরও বিবর্তন ঘটেছে। তবে অঞ্চলের জলবায়ু এবং উপকরণের সহজলভ্যতা বিবেচনায় পোশাক নির্বাচিত করেছে মানুষ। যেমন ভারতীয় সমাজ কৃষিপ্রধান ও এর জলবায়ু উষ্ণ ও বর্ষা প্রধান হওয়ায় এখানকার পোশাক হয়েছে সে উপযোগী। পুরুষেরা পরতো ধূতি, লুঙ্গি নারীরা শাড়ি বা থামির মতো দুখণ্ড কাপড়। মৌর্য যুগের (খ্রিস্টপূর্ব ৩ শতাব্দি) ভাস্কর্যে দেখতে পাই সে সময় ভারতীয় নারী পুরুষরা নিম্নাঙ্গে আয়তাকার একখণ্ড কাপড় জড়াতেন। শীত প্রধান দেশের মানুষের পোশাকের সাথে গ্রীষ্মপ্রধান দেশ এবং মরুভূমির দেশের মানুষের সাথে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের পোশাকের ভিন্নতা রয়েছে। মরু অঞ্চলের মানুষ, যেমন মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা এসব অঞ্চলের মানুষ পোশাক পরে লম্বা, ঢিলেঢালা, আলখাল্লা ধরনের। কৃষি কাজে সহায়ক ধূতি লুঙ্গি যেমন ভারতীয় সংস্কৃতির অংশ তেমনি লম্বা পোশাক মরু অঞ্চলের সংস্কৃতির অংশ। পূর্বেই বলেছি বর্ষা বা বৃষ্টি প্রধান দেশ হওয়ায় এখানকার মানুষ এমন কাপড় পরে যাতে তা সহজেই পরা যায়। জলমগ্ন হলে ওপরে তুলে ফেলা যায়। মরু অঞ্চলের মানুষ লম্বা ও ঢিলেঢালা কাপড় পরে কারণ তাপ থেকে যেন শরীর ঢেকে রাখতে পারে এবং পোশাকের মধ্য দিয়ে সহজেই বায়ু চলাচল করতে পারে। পোশাকের সাথে ধর্মের নয়, সংস্কৃতির যোগসূত্র আছে। আর সংস্কৃতি গড়ে ওঠে শতশত বছর ধরে, হাজার হাজার বছর ধরে। খ্রিস্ট ধর্মের সাথে যেমন কোট-টাইয়ের সম্পর্ক নেই, তেমনি লম্বা জোব্বার সাথে ইসলাম ধর্মেরও কোনো সম্পর্ক নেই। খ্রিস্ট ধর্ম নানাবিধ কারণে ইউরোপ তথা শীত প্রধান অঞ্চলে প্রসার লাভ করেছিল। আর শীত বা ঠাণ্ডা নিবারণের জন্য সে অঞ্চলের মানুষ টাই-কোট পরে থাকে। বর্তমানে সে সব দেশে যে মুসলিমরা বাস করে তারাও কোট-ওভারকোট পরে থাকে। ইসলামী পোশাক ভেবে সেখানে শুধু লম্বা জোব্বা পরলে ইউরোপ এতদিনে মুসলিম শূন্য হয়ে যেতো।
বাংলাদেশের একজন কৃষক যদি ইসলামী পোশাক ভেবে লম্বা জোব্বা আর পায়জামা পরে লাঙল নিয়ে ভরা বর্ষায় মাঠে নামে তাহলে বেচারার কী দশা হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।
গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের প্রচুর নাগরিক ভাগ্য অন্বেষণে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমিয়েছে। সেখানে গিয়ে তারা আরব সংস্কৃতির অংশ হিসেবে পুরুষের জোব্বা পরা দেখে ভেবে নিয়েছে তা-ই বুঝি ইসলামী পোশাক। অথচ ইসলাম প্রবর্তনের আগে থেকেই জলবায়ুর কারণে সেখানকার মানুষ লম্বা জোব্বা পরিধান করতো। আরবীয়দের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসীদের মাধ্যমে বাংলাদেশেও অধুনা হিজাব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে মুসলিম নারীদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি হিজাব পরিধান করছেন।
পূর্বেই বলেছি পোশাক হলো সংস্কৃতির একটি অংশ। তবে পোশাকের বিবর্তন আছে। কালে কালে এর পরিবর্তন হয়ে থাকে ফ্যাশন ও স্টাইলের কারণে। তবে পোশাকের একটি প্রভাব আছে মনোজগতে। শুধু নিজের মনোজগতের নয়, সমাজেও এর একটি প্রভাব পড়ে। এ ক্ষেত্রে আমরা শেখ সাদীর গল্পটি মনে করতে পারি।
এসব কথা মনে এলো একটি কারণে। কদ্দিন আগে জে.এস.সি পরীক্ষা শুরু হয়েছে। পত্রিকা ও টেলিভিশনে পরীক্ষা হলের দৃশ্য দেখতে গিয়ে দেখলাম পরীক্ষার্থী ছেলেদের মধ্যে অনেকের মাথায় টুপি। প্রশ্ন হলো টুপি মাথায় পরীক্ষা দিতে হবে কেন? তা-ও আবার মাদ্রাসার পরীক্ষা নয়। আমি টুপি পরার বিপক্ষে বলছি না। টুপি একটি মুসলিম ছাত্র পরতেই পারে। পরে আমি খবর নিয়ে জানলাম দেশের অন্যান্য স্থানের মতো চট্টগ্রামের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার্থীদের টুপি পরতে বাধ্য করা হয়। অথচ একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধর্মের শিক্ষার্থীরা শিক্ষা গ্রহণ করে। সেখানে মুসলিম ছাত্রদের টুপি পরিয়ে আলাদা করা হবে কেন? শিশু বয়স থেকেই তাদের মনে ধর্মীয় বিভক্তির বীজ রোপণ করা হবে কেন? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পোশাক হতে হবে সর্বজনীন। সব ধর্মের শিক্ষার্থীরাই যেন একই ড্রেস কোডের নিয়মে থাকে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হবে সব ধর্মের সব বর্ণের, সব লিঙ্গের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের সংগ্রাম সমান্তরাল চলে এসেছে। ড. কুদরত-এ খোদার শিক্ষা সুপারিশ বাস্তবায়নে দেশের সমস্ত ছাত্র সংগঠন সংগ্রাম করেছে। দেশ স্বাধীনের পরেও সে আন্দোলন সক্রিয় ছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশে এখনও সে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা যায়নি। এবং যায়নি বলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নানাভাবে বিভক্ত। শ্রেণিগতভাবে বিভক্ত। ক্যাডেট কলেজ, ইংরেজি মাধ্যম, সাধারণ বাংলামাধ্যম, কে.জি স্কুল, মাদ্রাসা, কওমী মাদ্রাসা, নূরানি মাদ্রাসা ইত্যাদি ভাগে বিভক্ত। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়া সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী অন্তত ত্রিশ বছর দেশকে একটি চরম মৌলবাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরের চেষ্টা করেছে। যার ফলে সমাজের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে পড়েছে বিপজ্জনকভাবে। বর্তমানে একটি ধর্মনিরপেক্ষ সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকলেও সমাজে রয়ে গেছে জামাতি সংস্কৃতির প্রভাব। এখন সমাজের অভ্যন্তরে গেড়ে বসা ধর্মান্ধ মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে বিতাড়িত করতে হলে সেখানে সংস্কৃতির প্রকৃত চর্চা করতে হবে। সকল নাগরিকের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা কূপমণ্ডুকতা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। আর তার জন্য চাই একটি উদার সংস্কৃতিবান প্রজন্ম। আর সে প্রজন্ম গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উদার প্রগতিশীল ও মানবিক আচরণ।
Email: [email protected]

সর্বশেষ সংবাদ