উদ্যত চাপাতির নিচে বিপন্ন মানবতা -কামরুল হাসান বাদল-কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 13/11/2015-08:56am:   
প্রতিদিনের শত ব্যস্ততার মাঝেও মনের অবচেতনে শঙ্কা জেগে ওঠে এই বুঝি কারোও মৃত্যু সংবাদ পাবো। এই বুঝি ব্রেকিং নিউজে কারো হত্যার সংবাদ পাবো। এই বুঝি স্ক্রিনে কারো রক্তাক্ত, বীভৎস চেহারা দেখতে পাবো। ঘরে ফিরতে না পারার অজুত ঝুঁকি নিয়েও প্রতিদিন ঘর থেকে বের হই। প্রতিদিন কারো না কারো মৃত্যু হুমকির সংবাদ শুনতে শুনতে নিজেও ভীষণ সন্ত্রস্ত হই। প্রতিদিন মুখোমুখি হচ্ছি মৃত্যুর। প্রতিদিন অনুভব করছি অসহায়ত্ব। প্রতিদিন অপেক্ষা করছি একটি সর্বনাশের। প্রতিদিন ঘুম ভাঙে শঙ্কা নিয়ে। প্রতিদিন ঘুমাতে যাই শঙ্কা নিয়ে। প্রতিদিন প্রতিবেলা কাটাই মন খারাপের সংবাদ নিয়ে। পথ চলতে গিয়ে পাশের লোকটিকে দেখে হঠাৎ চমকে যাই। সন্ধ্যার পর পেছনে কারো পদশব্দে কেঁপে উঠি। এ যেন এক মৃত্যু উপত্যকা। এখানে প্রতিদিন অপেক্ষা করে মৃত্যুদূত। এখানে উদ্যত থাকে চাপাতি। এখানে চাপাতির নিচে বিপন্ন মানবতা।
গত মঙ্গলবার দেশের অন্যতম বুদ্ধিজীবী শিক্ষাবিদ ড. আনিসুজ্জামানকে মৃত্যু হুমকি দিয়ে এস এম এস পাঠানো হয়েছে। তাঁর আগে এমন হুমকি অনেককে দেওয়া হয়েছে। দেশের প্রগতিশীল, বরেণ্য কোনো বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাবিদ নেই যারা কোনো না কোনোভাবে এ ধরনের মৃত্যু হুমকি পাননি। গত এক বছরে পাঁচজন লেখককে হত্যা করা হয়েছে। মৃত্যুর উদ্দেশ্যে জখম করা হয়েছে অনেককে। শুধু লেখক প্রকাশককে নয়, পুলিশ চৌকিতেও হত্যা করা হচ্ছে পুলিশদের। আমরা সাধারণ মানুষ, নিজেদের জানমালের নিরাপত্তা চাইবো যে পুলিশের কাছে সে পুলিশও নিরাপদ নয়।
দেশের সচেতন মানুষ জানে এ ঘটনা কারা ঘটাচ্ছে, কেন ঘটাচ্ছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং আন্তর্জাতিক ইসলামী জঙ্গিবাদ মোকাবেলা করতে গিয়ে সরকার এখন ভীষণ চাপের মধ্যে আছে। বাংলাদেশকে একটি জঙ্গি রাষ্ট্র, একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র প্রতিপন্ন করে যারা বর্তমান সরকারকে বিদায় করতে চায় তাদের চেহারা, তাদের রাজনীতি, তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আমরা বেশ বুঝতে পারি। এবং কোন মামলার চূড়ান্ত রায় ও তা কার্যকর করাকে সামনে রেখে কোন শক্তি কোন উদ্দেশ্যে এবং কাদের অর্থে বর্তমানে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার চেষ্টা করছে তা সরকারের গোয়েন্দা দপ্তরই শুধু নয় সচেতন মানুষও তা ভালো বোঝে। সর্বশেষ দীপন হত্যাকান্ডের পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। ঘাতকদের বেপড়োয়া আচরণে স্তম্ভিত দেশের মানুষ। কিন্তু এ নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত ও মনোভাবে কোনোভাবেই আস্থা রাখতে পারছে না দেশের উদার ও প্রগতিশীল মানুষ। এতদিনে একটি হত্যাকান্ডেরও বিচার করতে না পারা, দোষীদের চিহ্নিত করতে না পারা, এমনকি দোষীদের কাউকে কাউকে জামিনে মুক্ত হতে দেওয়ার মতো ঘটনায় অনেকে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। চট্টগ্রামসহ ঢাকার বিশিষ্ট নাগরিকগণ বিবৃতির মাধ্যমে তাদের হতাশা, উৎকক্তা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার, ধর্মনিরপেক্ষ সরকার এবং সামগ্রিক অর্থে দেশের প্রগতিশীল ঘরানার পছন্দের সরকার। বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিরাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে এই সরকার তাতে কোনো দ্বিমত নেই। তবে লেখক ও মুক্তমনা নাগরিকদের হত্যা ও ঘাতকদের বিচারের বিষয়ে সরকারের ভূমিকা যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন না অনেকে। ঘাতকের বিচার না করে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো লেখকদের সতর্ক করার মধ্য দিয়ে পক্ষান্তরে ঘাতকদেরই এক প্রকার প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করেন অনেকে। সরকারের এই কৌশলটি যে ভুল তা প্রমাণিত হতে হতে যথেষ্ট ক্ষতি হয়ে যেতে পারে দেশের। ততদিনে অনেককে হয়ত চাপাতির নিচে প্রাণ দিতে হবে। যে শক্তি আজ এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে তারা কিংবা তাদের শরিক কোনো দল বা শক্তিই বর্তমান সরকার বা ক্ষমতাসীন দলের বন্ধু, স্বজন বা মিত্র হতে পারে না। এরা সুযোগ পেলেই ছোবল দেবে, সুযোগ পেলেই মুখোশ খুলে ফেলবে। এটি ভবিষ্যত বাণী দেওয়ার মতো কোনো বিচক্ষণতা নয়। অতীতের শিক্ষা থেকে বলছি।
আমার মনে হয় প্যারাসিটামল খেয়ে জ্বর সারানোর কৌশল বেশিদিন ইতিবাচক ফল দেবে না। জ্বরের কারণ বা উৎস চিহ্নিত করে চিকিৎসা করা প্রয়োজন। আজকের টিউমারটি আগামীতে ক্যান্সারে পরিণত হতে পারে। অবশ্য দোষটা দেবো বা কাকে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার চেয়ে বেশি কেউ তো মৃত্যু ঝুঁকিতে নেই। তাঁকে যতবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে বিশ্বের অন্য কোনো রাষ্ট্র নায়ককে করা হয়েছে কিনা জানা নেই। যে শক্তি এবং যারা শেখ হাসিনার মৃত্যু কামনা করে সারাক্ষণ তাদের প্রতি শেখ হাসিনা নমনীয় তা একজন পাগলও বিশ্বাস করবে না। কাজেই সরকারের বর্তমান ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের উৎকণ্ঠা আরও বেশি। অর্থাৎ সবকিছু প্রধানমন্ত্রীর নজরদারিতে আছে কিনা তা নিয়ে।
যে প্রশাসন বা যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আজ বিএনপি-জামায়াতকে বেদম পেটাচ্ছে ওরাইতো সাত-আট বছর আগে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পিটিয়েছিল। এরাই তো জামায়াত ও জঙ্গিদের সুরক্ষা দেয়ার চেষ্টা করেছিল। কাজেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যারা জঙ্গি দমন করবে, যারা তাদের গ্রেপ্তার করবে, যারা তাদের বিচারের মুখোমুখি করবে তাদের সবাই কি সত্যিই আন্তরিক। এমন কি বর্তমান সরকারের সব মন্ত্,রী এমপিও কি সত্যি সত্যি ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী? তারাও কি সত্যিকার অর্থে জঙ্গি দমন চায় বাংলাদেশে?
একটি গণতান্ত্রিক দেশ, প্রকৃত অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। গণতন্ত্রের অর্থই হচ্ছে পরমত সহিষ্ণুতা। গণতন্ত্র মানেই সব মানুষের সমান অধিকার। গণতন্ত্র মানেই হচ্ছে মত প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা। কাজেই বাংলাদেশকেও তাই হতে হবে। কেউ গণতন্ত্রের কথা বলবে আর ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করবে না, গণতন্ত্রের কথা বলবে আর জোর করে হত্যা করে, ধ্বংস করে নিজেদের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করবে তা হতে পারে না। বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক, উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিতে হবে। যুক্তিবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, লেখকদের কণ্ঠরোধ করে নয়। কোনো লেখকের লেখা কারো মত বা আদর্শের সাথে না মিললে তাকে হত্যা করতে হবে কেন? প্রয়োজনে পাল্টা যুক্তি দাঁড় করানো যেতে পারে। খুনের বদলে খুন না হয় মেনে নেওয়া গেল কিন্তু লেখনির বদলে খুন কেন? প্রতিটি নাগরিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দেওয়া সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। গুপ্ত ঘাতকের হাত থেকে বেঁচে থাকাও দীর্ঘদিন সম্ভব নয়। তবে সরকার যা করতে পারতো তা হলো ঘাতকদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারতো। তাতে জনমনে কিছুটা স্বস্তি ফেরার সাথে সাথে ঘাতকদের মনোবল ভেঙে দিতে পারতো।
ভীষণ, ভয়ানক পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছি আমরা। শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের মতো বৃহৎ গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ দেশেও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। শুধু ভারতেও নয় বিশ্বের অনেক দেশেই নতুন করে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এভাবে বাংলাদেশে মুসলিমরা হিন্দু-বৌদ্ধদের, ভারতে হিন্দুরা মুসলিমদের, মিয়ানমারে বৌদ্ধরা মুসলিমদের, মিশরে মুসলিমরা খ্রিস্টানদের, প্যালেস্টাইনে ইহুদিরা মুসলিমদের নির্যাতন ও হত্যা করতে থাকি তার ফল কী দাঁড়াবে? কার লাভ হবে? বিশ্ব সভ্যতা ও মানবতা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এতে সৃষ্টিকর্তারইবা কী লাভ হবে? এরচেয়ে সব পথ, সব মত, সব বিশ্বাসের প্রতি যথাযথ সম্মান জানিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে মানুষ বাস করতে পারে তাতে ক্ষতি কার? সৃষ্টিকর্তারই বা ক্ষতি কী তাতে?
এমন হলে প্রতিদিন উদ্যত চাপাতির নিচে আমরা কেউ বিপন্নবোধ করতাম না।
[email protected]

সর্বশেষ সংবাদ
স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যেকোনো অনিয়ম দুর্নীতি অনুসন্ধান করা হবে: দুদক চেয়ারম্যান কক্সবাজার রেড জোন,শনিবার থেকে আবারো লকডাউন এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।