পথ হারাবে না বাংলাদেশ | কামরুল হাসান বাদল

পোস্ট করা হয়েছে 09/10/2015-11:28am:   
২০১০ সালে আমার একটি পুস্তিকা বেরিয়ে ছিলো। ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কেন চাই’ নামের বইটি মূলত লিখেছিলাম শিশু-কিশোরদের জন্যে। স্বাধীনতা অর্জনের প্রায় ৩৮ বছর পর দেশে যুদ্ধাপরাধীরে বিচারের প্রয়োজন কেন তা তুলে ধরাই ছিল মূখ্য উদ্দেশ্য। মূলত লেখাটি লিখতে শুরু করেছিলাম ২০০৮ সালের নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল শোনার পরদিনই। বই হিসেবে প্রকাশ করতে দেরি হওয়ায় এবং ততদিনে সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে ট্রাইবুনাল গঠন করে গ্রেফতার প্রক্রিয়া শুরু করায় শেষের অংশে যা যোগ করেছিলাম তার উদ্ধৃতি দিচ্ছি। বর্তমান সরকার বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের নেতাদের। আমরা মনে করছি এই সরকারের মেয়াদকালেই বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে। কিন্তু অপর পক্ষ মানে এসব ঘৃন্য অপরাধী ও তাদের মিত্ররা কি হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবে? কখনো না। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পরও যেমন তাদের ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা বন্ধ থাকেনি, এখনো থাকবে না। দেশে ও দেশের বাইরে তারা নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হবে এবং বিচার প্রক্রিয়াকে ভণ্ডুল করার অপচেষ্টা চালাবে। একজন সচেতন ও দেশ প্রেমিক নাগরিক হিসেবে এ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের সজাগ থাকতে হবে, ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং সে সঙ্গে সরকারকেও নৈতিক সমর্থন দিয়ে যেতে হবে। নতুবা ৩০ লাখ শহীদ ও আড়াই লাখ নির্যাতিতা মা-বোনের কাছে আমরা একটি অকৃতজ্ঞ ও অর্বাচীন প্রজন্ম হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবো।”
পাঁচ বছর আগের বই থেকে উদ্ধৃতি দিলাম এ কারণে যে, বর্তমানে বিশেষ করে গত এক সপ্তাহে বাংলাদেশে যা ঘটেছে তার জন্য বিচলিত হলেও আমি ঘটনার আকস্মিকতায় বা নির্মতায় হতাশ হইনি, বিস্মিত হইনি। ট্রাইব্যুনালে বিচার কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে এমন ঘটনার জন্য আমার মানসিক প্রস্তুতি ছিল। কারণ সে সময়ের সরকার ও বর্তমান সরকার বিশেষ করে শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নিয়ে যে প্রবল ঝুঁকি নিয়েছেন তার প্রতিক্রিয়ায় এমন ঘটনা ঘটাই যেন স্বাভাবিক। ২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত যাদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়েছে মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে তাদের ঠাঁই হবে কারাগারে এই বাস্তবতা ভাবতে পেরেছিল কেউ? সে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী এখন কনডেম সেলে মৃত্যুর প্রহর গুনছে আর অন্যজন বাঙলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে অমার্জিত, অশ্রীল, অবভ্য বলে পরিচিত যুদ্ধাপরাধী সালাহউদ্দিন কাদের, তারও মৃত্যুর কাউন্ট ডাউন শুরু হয়ে গেছে। এই অভাবনীয়, অকল্পনীয় বাস্তবতায় বাংলাদেশেতো কোনো না কোনোভাবে প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। যে প্রতিক্রিয়া এখন দেখছি তাতেও আমি হতাশ নই। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি সাঈদীর রায়ের পরে সারা বাংলাদেশে প্রায় ১০০ জনের মৃত্যু, এই বছরের প্রথম তিন মাসে প্রায় ১৫০ জনের মৃত্যুর পরও সরকার টলেনি, শেখ হাসিনা নমনীয় হননি। অত্যন্ত দক্ষতায় পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন। এবারও দেবেন তাতে কোনোরূপ সন্দেহ নেই।
শেখ হাসিনা যখন জাতি সংঘে প্রবলভাবে প্রশংশিত হচ্ছিলেন সে সময় ঢাকায় হত্যা করা হয় এক ইতালীয় নাগরিককে। এই খুনের কূলকিনারা পাওয়ার আগেই রংপুরে খুন করা হয় এক জাপানি নাগরিককে। এরপরে ঢাকায় এক সুফি সাধককে এবং হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করা হয় এক খ্রিষ্টান ধর্ম যাযককে। তবে একটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো যে তারা অর্থাৎ ঘাতকরা প্রতিবারই আক্রমণের কৌশল ও ভিকটিম পরিবর্তন করছে। সাঈদীর সময়ে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল চাঁদে তাকে দেখা গেছে। এবং সেবারের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিল আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িঘর, ব্যবসা-বাণিজ্য, পত্রিকা ও সরকারি অফিস আদালত। এ বছরের শুরু থেকে করা হয় পেট্রোল বোমবাজি। লক্ষ্যবস্তু সাধারণ জনগণ। গত দুবারের ব্যর্থতায় এবার তারা নতুন কৌশল নিয়েছে। সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে এবার বিদেশি নাগরিক হত্যঅর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্যনীয় যে, দু’বিদেশি নাগরিক হত্যার দায স্বীকার করে আই.এসের পক্ষ্যে বিবৃতিও দেওয়া হয়েছে। কাজেই এবার ব্যপকভাবে আলোচনা হচ্ছে দেশে আই.এসের অস্তিত্ব আছে কি-না তা নিয়ে। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশে আই.এসের কোনো অস্তিত্ব নেই বরে ঘোষণা দিয়েছেন। আই এসের অস্তিত্ব না থাকলেও দেশে যে ব্যপকভাবে জঙ্গি তৎপরতা আছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারো দ্বিমতও নেই। বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা ও যোগাযোগের শুরু ’৮০ দশকের শুরু থেকে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের চার খুনীদের দ্বারা গঠিত ফ্রিডম পার্টির কয়েক শ নেতা- নেতা হত্যা, সন্ত্রাস ও তাণ্ডব চালানোর উদ্দেশ্যে লিবিয়া থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছিল। জঙ্গি সংগঠন হুজি ও এমন কয়েকটি সংগঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রচুর তরুণ আফগান যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। সে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে তাদের সাথে আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীর যোগাযোগ গড়ে ওঠে। এরাই দেশে ফিরে এসে সংগঠিত হয়ে মিছিল করে শ্লোগান দিত ‘বাংলা হবে আফগান, আমরা হবো তালেবান’। বর্তমানে বাংলাদেশে জঙ্গি দল বা গোষ্ঠীর সংখ্যা কত তার প্রকৃত তথ্য কোথাও নেই। কারণ হুজি, জেএমবি, হিজবুত তাহরির আনসারুল্লাহ বাংলার টিম এমন কয়েকটি গোষ্ঠীর নাম বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এলেও আলোচনায় আসেনে এমন অনেক দল এখনো বিদ্যমান। তা ছাড়া বিভিন্ন মাদ্রাভিত্তিক ছোট ছোট গোষ্ঠী আছে যারা জঙ্গি ধ্যান-ধারনায় সংগঠিত হচ্ছে। সময় এলে দলে দলে এরাও যুক্ত হবে মূল জঙ্গি গোষ্ঠীর সাথে। আই এসের অস্তিত্ব সরাসরি না থাকলেও ‘কান টানলে মাথা আসে’ ফর্মুলায় এরা কোনো না কোনো ভাবে একে অপরের সাথে যুক্ত তাদের আদর্শিক ও রাজনৈতিক কারণে। শুধু তাই নয় বিশ্বের যে কোনো দেশের যে কোনো ধর্মের জঙ্গিদের মধ্যে একটি পারস্পরিক থাকে নিজেদের স্বার্থে। এ ক্ষেত্রে আমরা স্মরণ করতে পারি ভারতের উলফা জঙ্গি গোষ্ঠীর সাথে বিএনপি-জামায়াত সরকারের সখ্য ও আরাকানের জঙ্গিদের সঙ্গে বাংলাদেশের মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর সখ্যকে।
একজন মানবতাবাদী যেমন বিশ্বের যে কোনো স্থানের মানবতাবাদীকে বন্ধু, সমভাবাপন্ন মনে করে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল তেমনি বিশ্বের যে কোনো উগ্র, জঙ্গি নিজেদের সমগোত্রীয় বলে মনে করে। লিবিয়া ও আফগান ফেরতদের মাধ্যমে বাংলাদেশে যে উগ্র ও জঙ্গিবাদের প্রসার শুরু হয়েছিল তাকে পরিচর্যা করেছিল তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী সরকারগুলো। বিস্তারিত বললে বলতে হবে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির শাসনামলেই বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ও বিকাশপর্ব শুরু হয়েছিল। মুখে গণতন্ত্রের কথা বললে এ দু’দলের অস্থি মক্কায় বিদ্যমান ফ্যাসিইজম।
যারা নিজেদের নিজের মত ও আদর্শকে চূড়ান্ত, শ্রেষ্ঠ মনে করে ততে জোরপূর্বক, প্রয়োজন যুদ্ধ, হত্যা ইত্যাদির মাধ্যমে চাপিয়ে দিতে চায় তাকেই ফ্যঅসিজম বলে। কাজেই বর্তমান ইসলামী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ফ্যাসিবাদের কোনো পাথর্ক্য নেই। হিটলার এবং তার দল যেভাবে বিশ্বকে পদানত করে নিজেদের মত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল এবং ‘জাতিগত হত্যা’ শরু করেছিল আজ আই এসও অনেকটা তাই করছে। আই এস নামক জঙ্গি সংগঠনটি যে ভাবে অগ্রসর হচ্ছে তাতে বিশ্ব সভ্যতা হুমকির মুখে পড়েছে। আমার ধারণা চল্লিশ দশকে হিটলার মুসোনিনির ফ্যাসিমবাদ ঠেকাতে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর পরাশক্তি আমেরিকা-রাশিয়া অর্থাৎ মিত্র বাহিনী গঠিত হয়েছিল এখনো সে ধরনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে যে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো আই এস নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা। আফগান জঙ্গি তালেবা থেকে আল কায়েদা, আল কায়েদা থেকে আই এস এমন জঙ্গি গোষ্ঠী গঠনের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আজ অস্পষ্ট নয়। আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সৈন্য হটানোর কাজে মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্র পাকিস্তানের মাধ্যমে গড়ে তুলেছিল তালেবান জঙ্গি গোষ্ঠী। ঠিক একই কায়দায় সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদকে ক্ষতাচ্যূত করতে সৌদী আরব ও কাতারের মাধ্যমে অস্ত্র ও অর্থ নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে আই এস নামক নতুন এই জঙ্গি গোষ্ঠী। কাজেই আই এস বিরোধী যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলো আন্তরিক কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। অতি সম্প্রতি রাশিয়া বিমান হামলা চালিয়েছে সিরিয়ায়। রাশিয়ার আই এস বিরোধী প্রকৃত এই যুদ্ধে খুশি নয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশ। তারা রাশিয়া বিমানের আকাশসীমা লঙ্গণের অভিযোগ তুলেছে ও আর হামরা না চালাতে পরামর্শ দিচ্ছে। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যেভাবে হিটলার বিরোধী জোট গঠিত হয়েছিল এবং আমিও বর্তমানে আই এস বিরোধী তেমন একটি সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছিলাম তা কার্যত ভণ্ডুল হয়ে যাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিমুখী নীতির কারণে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বিমুখী নীতি বাংলাদেশেও বিদ্যমান। যে রাষ্ট্রটি ৪৪ বছর আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতাই চায়নি সে রাষ্ট্রটি বাংলাদেশে স্বাধীনতাপথের শক্তির মিত্র হয় কী করে। হতে পারে না বলে ১৯৭১ থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী যে কোনো দল, গোষ্ঠী আমেরিকার কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সরকারকে বাগে রাখার জন্য, চাপে রাখার জন্য মার্কিনীদের অর্থপুষ্ঠ দলগুলোই বারবার দেশে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়েছে।
১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে নিয়ে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ব্যঙ্গ করেছিলেন ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে। তার প্রায় চার দশক পরে তাদের আরেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেছিলেন ‘রাবিশ’ বলে। আমার ভীষণ গর্ব হয়েছিল অর্থমন্ত্রীর এমন উক্তিতে। অর্থমন্ত্রী বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ১৯৭২ সালের বাস্তবতা আর এখন নেই। আমি ভীষণ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি বর্তমান সংকটও কাটিয়ে উঠবে বাংলাদেশ। এই দেশের জন্ম হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতাকে আদর্শ হিসেবে ধারণ করে। যতদিন দেশ এ পথে থাকবে, পথ হারাবে না বাংলাদেশ।

সর্বশেষ সংবাদ