কাজী নজরুল আমাদের অহংকার - মোঃ ওসমান গনি/ সাংবাদিক,কলামিস্ট

পোস্ট করা হয়েছে 30/08/2015-11:23pm:   
কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধিঃ
বিদ্রোহী কবি, সাম্যের কবি, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের অহংকার। তার প্রতি রয়েছে পূর্বসুরি ও সমসাময়িক কবিদেরই শুধু নয় ,তার পরবর্র্তী প্রজন্মের কবিদের ও রয়েছে অসীম শ্রদ্ধা ও গভীর ভালবাসা।আমাদের এই জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের ৩৯তম মৃত্যুবার্ষিকী গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মধ্যে দিয়ে পালিত হয়ে গেল গত ২/৩দিন আগে ।১৩৮৩বঙ্গাব্দের ১২ই ভাদ্র (১৯৭৬সালের ২৯আগষ্ট)তারিখে আমাদের প্রানপ্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (তৎকালিন পিজি হাসপাতাল) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।আমাদের এই জাতীয় কবির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে প্রতি বছর সরকারি ও বেসরকারি ভাবে ব্যাপক কর্মসুচীর আয়োজন করা হয়ে থাকে।এবার তার কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি।আমাদের এই প্রিয় কবি জন্মেছিলেন ১৮৯৯ সালের ২৪ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত বর্ধমান জেলার আসনাসোল মহকুমার জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে। তিনি জন্মেছিলেন সম্ভ্রান্ত এক কাজী পরিবারে। কবির পিতার নাম কাজী ফকির আহমেদ এবং মায়ের নাম জাহেদা খাতুন।
বাল্য বয়সে আমাদের এই কবির দিন কেটেছে খুব দুরন্তপনার মধ্যে দিয়ে।তিনি বিভিন্ন সময়ে নিজেকে বিভিন্ন কাজে জড়িত রাখতে ভালোবাসতেন।বিভিন্ন দুরন্তপনার মধ্যে দিয়ে কবির দিন অতি বাহিত হলে ও তিনি মনের আয়েসে হউক আর দুঃখ যন্ত্রনা লাঘবের জন্য হউক বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কর্মকরেছেণ।দুঃখের মধ্যে অনেকটা সময় কাটিয়েছেন তার শৈশব কাল।যার কারনে ছোট সময়ে অনেকে কবিকে দুঃখ মিয়া হিসাবে জানত।এবং সবাই তাকে দুঃখ মিয়া হিসাবে ডাকত।কবির পিতা ও দুঃখ করে তাঁর নাম রেখেছিলেন দুখু মিয়া। এর পেছনে যুক্তি ছিল; কবি জন্ম নেওয়ার পূর্বে তাঁর কয়েকজন সন্তান মারা যায়। তিনি মনে করেছিলেন সেও বোধহয় মারা যাবে-তাই দুঃখ করে কবির নাম রেখেছিলেন দুখু মিয়া। কবির বাবা কবিকে মক্তবে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। ছাত্র অবস্থায় কবির প্রায় ৯ বছর বয়সে তাঁর পিতা মৃত্যুবরণ করেন।
তারপর শুরু হয় কবির সংগ্রামী জীবন। দশ বছর বয়সে নজরুল গ্রামের মক্তব থেকে নি¤œ প্রাথমিক পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হয়েছিলেন। কবি সেই বয়সেই মক্তবে শিক্ষকতা, এবং মস্জিদে মুয়াজ্জিনের কাজে নিযুক্ত হন। কবির পিতার অকাল মৃত্যুতে পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য ঐসব দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল। ইসলাম ধর্মের মৌলিক বিষয়সমূহ তিনি মক্তবে পড়া অবস্থায় আয়েত্ব করেছিলেন।যথা-পবিত্র কোরআন, নামাজ, রোজা প্রভৃতির সঙ্গে মক্তব ও মস্জিদে– বাল্যজীবনেই নজরুলের ঘনিষ্ঠ পরিচয়। পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যে ইসলামী ঐতিহ্যের সার্থক ব্যবহারে নজরুলের বাল্যজীবনের এই সমস্ত অভিজ্ঞতা খুবই ফলপ্রসু হয়েছিল। নজরুল ১৯১১ সালে বর্ধমানের মাথ্রুণ গ্রামের ‘নবীনচন্দ্র ইন্সটিটিউশন’-এ ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াশোনা করে থাকেন। সেই সময় স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন একজন কবি। তাঁর নাম কুমুদরঞ্জন মল্লিক (১৮৮২-১৯৭০)। কবি সেই সময় স্থানীয় লেটো দলের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। লেটো দলের জন্যে বাংলা-উর্দূ-ফারসি-ইংরেজি মেশানো ভাষায় কবিগান, পাঁচালি, প্রহসন,যাত্রা নাটক ইত্যাদি রচনা করেছিলেন। সেই সময় কবি কাজী বজলে করিমের কাছে ফারসি ভাষা-সাহিত্যের পাঠ গ্রহণ করেছিলেন। কাজী বজলে করিম সাহেব ছিলেন কবির চাচা। ১৯১২ সালে কবি আসানসোলের একটি হোটেলে স্বল্প বেতনে চাকরি করেছিলেন।হোটেলে চাকরির ফাঁকে ফাঁকে তিনি বিভিন্ন গান ও কবিতা রচনা করতেন। কবি পূর্ববঙ্গে প্রথম এসেছিলেন ১৯১৪ সালে। পরবর্তীতে আরও কয়েক বার পূর্ববঙ্গে আসেন। ১৯১৪ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশালে দরিরামপুর হাই স্কুলে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হয়ে বছর খানেক অবস্থান করেছিলেন। পরবর্তীতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সিয়ারসোল রাজ হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে দশম শ্রেণি পর্যন্ত এখানে পড়াশোনা করেন। সেই সময় কবি কবিতা চর্চাও ঠিকমত চালিয়ে যাচ্ছিলেন।তিনি তার জীবনে সাংবাদিকতাও করেছেন। তার সম্পাদনায় প্রত্রিকাও প্রকাশিত হয়েছে। পরবর্তীতে, দশম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে প্রথম মহাযুদ্ধের সূচনা পর্বে ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৪৯ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদান করেন এবং ১৯২০ সালের মার্চ মাস অবধি করাচি সেনানিবাসে সৈনিক জীবন-যাপন করেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবি ও কবি পরিবারকে স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন ১৯৭২ সালে এবং কবিকে জাতীয় কবির মর্যাদায় অভিষিক্ত করেন। কবি খুব ছোটকাল থেকেই লেখালেখি শুরু করেছিলেন। কবি কবিতা, নাটক, উপন্যাস প্রভৃতি রচনা করেন। তিনি প্রায় চার হাজারের মত গান রচনা করেন। ইতোমধ্যে নজরুল ইন্সটিটিউট ৩১৭৪ টি গান লিপিবদ্ধ করেছে। বাকীগুলো লিপিবদ্ধ করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁর লেখা গান আজও খুব জনপ্রিয়। আমাদের রণ সংগীত ‘‘ চল চল চল ’’ এর রচয়িতা তিনি। কবি বাংলা, উর্দূ, ফারসি এবং হিন্দি ভাষায় খুব দক্ষ ছিলেন।তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় এতটা এগোতে না পারলেও তার ওপর আমাদের সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমত থাকার কারনে তার লেখা গল্প, কবিতা, এখন আমাদের জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহে শিক্ষা স্তরের সর্বশেষ স্তর পর্যন্ত পড়ানো হচ্ছে।যেটা সারা বিশ্বের কাছে খুবই প্রশংসনীয় এবং গৌরবের বিষয়। কাজী নজরুল ইসলাম তার খুরদার লেখনীর মাধ্যম্যে আমাদের কে তিনি বিভিন্ন ভাবে সাহায্য সহযোগীতা করেছেন। এবং সাহস যুগিয়েছেন তিনি আমাদের যোদ্ধাদের মনে।
কবি সৈনিক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের সর্বক্ষেত্রে কম বেশী চেতনায় উজ্জীবিত ছিলেন।
কবির জীবনে বিরজা সুন্দরী দেবীর অনেকখানি প্রভাব ছিল। বিরজা দেবী ছিলেন কবি পত্মী প্রমীলা দেবীর কাকীমা। বিরজা দেবীকে কবি খুব শ্রদ্ধা করতেন। বিরজা দেবীকে কবি মা বলে ডাকতেন। একবার কবি অনশন করেছিলেন হুগলী জেলে। তাঁকে কেউ অনশন ভাঙ্গাতে পারছিলেন না। বিরজা দেবীর অনুরোধ কবি ৪০ দিনের অনশন ভেঙ্গেছিলেন। কবিকে বিরজা দেবী লেবুর শরবত খাইয়ে অনশন ভাঙ্গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে কবি তাঁর ‘সর্বহারা’ গ্রন্থটি বিরজা দেবীকে উৎসর্গ করেছিলেন।
কবি সবসময়ই শ্রেণিবিহীন সমাজ, ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী সমাজ গঠনের আদর্শে উজ্জীবিত ছিলেন। সমাজ থেকে কুসংস্কার বিতাড়িত করার জন্য তাঁর লেখনী ছিল খুব জোড়দার। তাঁর সৃষ্টিশীল জীবন ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ, কিন্তু সংক্ষিপ্ত
কবি শেষ জীবনে বেশ কিছুকাল সময় নির্বাক ছিলেন। সুখে ও দুঃখে তাঁর জীবন অতিবাহিত হলেও দুখু মিয়া আজ ও জগৎ বিখ্যাত – আমাদের বিদ্রোহী কবি এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।তিনি তার কর্মক্ষেত্রে যে অবদান রেখে গেছেন তার সে অবদানের জন্য বাংলাদেশ তথা সারা বিশ্ব যত দিন থাকবে ততদিন তার কথা স্মনর করবে শ্রদ্ধার সাথে।
লেখক- সাংবাদিক ও কলামনিষ্ট তাং ২৯.৮.১৫

সর্বশেষ সংবাদ