আমরা কি পারিনা মানুষকে জীবন বোধের বিচারে বিচার করতে? - বিজয় চক্রবর্তী-প্রকৌশলী ও সাংবাদিক।

পোস্ট করা হয়েছে 30/08/2015-04:36pm:    শুনেছি, ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরকে তখনকার সময়ের সবচাইতে সুন্দরি নারী বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বলেছিলো হে পণ্ডিত তোমার ওউরসে আর আমার পেটে যে শিশুর জন্ম হবে সে হবে দুনিয়াবি সবথেকে সুন্দর ও জ্ঞানী মনুষ্য, কারন তোমার জ্ঞান আর আমার রুপের সে অধিকারী হবে। বিদ্যাসাগর তাকে বিনয়ের সাথে প্রত্যাক্ষান করে বলেছিলো শিশুটি যদি তোমার জ্ঞান আর আমার রুপ/চেহারা নিয়ে জন্মায় তবে কি হবে একবার ভেবে দেখেছো? সারা পৃথিবীতে শিক্ষার হার বাড়ছে, মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে: শিক্ষার সুফল যেন সমাজ পাচ্ছে না। বিশ্ব সভ্যতা যান্ত্রিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, হারাচ্ছে মানবিকতা। ফলে ক্রমশই বাড়ছে সামাজিক বিশৃঙ্খলা, বাড়ছে অশ্লীলতা, নষ্ট হচ্ছে সামাজিক সম্পর্কগুলো, সমাজ হয়ে উঠছে অস্থির। মানব সমাজে পচন দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে এর বহি:প্রকাশ ঘটছে। অন্যদিকে বিশ্ব থেমে নেই, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, শিল্প, প্রযুক্তি, সভ্যতা, উন্নয়ন সবকিছুই এগিয়ে চলছে। কিন্তু সবকিছু কেমন যেন লক্ষ্যহারা হয়ে পড়েছে, যেন পথহারা পথিকের ন্যায় কোথাও ঐক্য ও সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গোটা বিশ্ব আমাদের সমাজ, মানব সমাজ। এ সমাজের অংশ হিসাবে আমাদের দেশ এবং সমাজও নানা সামাজিক অস্থিরতায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। মানব সমাজের সার্বিক পরিবেশকে দুটি অংশে পৃথক করা যায়। একটি সামাজিক পরিবেশ, আর অন্যটি প্রাকৃতিক পরিবেশ। এদুটোর একটিও আর সুস্থ ও স্বাভাবিক নেই, হয়ে পড়েছে ভারসাম্যহীন। একদিকে সামাজিক পরিবেশের ভারসাম্যহীনতার ফলে অযাচিত যুদ্ধ, হত্যা, ধর্ষণ, মারামারি, কাটাকাটি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, লুটতরাজ ইত্যাদি ব্যাধি সামাজিক পরিবেশকে অস্থির করে তুলেছে, অন্যদিকে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্টের ফলে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ-ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন, অগ্নুত্পাত, ভূমিকম্প, বন্যা, খরা ইত্যাদি সময়ে-অসময়ে অস্বাভাবিকভাবে মহাবিপর্যয় ডেকে আনছে, প্রকৃতি হয়ে উঠছে লাগামহীন ও চরম খেয়ালী। এখন, বিশ্ব মানবতার সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিচ্ছে, কোন আদর্শের প্রভাবে এমনটা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে সামাজিক ও প্রাকৃতিকভাবে পৃথিবীটা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে। এ উভয়বিধ সমস্যার প্রধানতম কারণগুলো মোটামুটি আমাদের সবার জানা-ভোগবাদী, বস্তুবাদী ও পুঁজিবাদী মানসিকতা, পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ আরো বহুবিধ। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অবশ্য বিশ্বব্যাপী অনেক কথা হচ্ছে, অনেক চুক্তি হচ্ছে, অনেক পরিবেশবাদী গ্রুপ কাজ করছে। বিশ্বমানবতার স্বার্থে ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কথা বিবেচনা করে টেকসই উন্নয়ন ও সবুজ অর্থনীতির উপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
কিন্তু আমাদের এ সামাজিক পরিবেশের ভারসাম্য, যার দ্বারা আমাদের মননশীলতা প্রভাবিত হয়, আমাদের সুস্থ মানসিকতা নিয়ে বেড়ে ওঠা যার ওপর নির্ভরশীল, তার কি অবস্থা? অনেক সমাধানও দেয়া হচ্ছে, নতুন নতুন আইন হচ্ছে, বিভিন্ন সামাজিক তত্ত্ব আসছে। এসব আইন ও তত্ত্ব আমাদের শোধরানোর রাস্তা দেখাতে পারে। কিন্তু শোধরাতে হবে আমাদের নিজেদেরই।
আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলো নষ্ট হচ্ছে। চাওয়া-পাওয়ার ব্যবধান হয়ে যাচ্ছে অনেক বেশি, ফলে আত্মহত্যা ও হত্যাসহ অন্যান্য অপরাধপ্রবণতা বেড়েই চলছে। মা-বাবা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সামাজিক সম্পর্কের এমন নির্ভেজাল জায়গাগুলোতে ফাটল ধরছে, ঢুকে পড়ছে অবিশ্বাস। ফলে সমাজ ছাড়া হচ্ছে সুখ-শান্তি।
এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য আমাদের নিত্য দিনের অনুষঙ্গ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও একটি বিয়ে। সে বিষয়ে পরে আসছি। তার আগে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আরেকটি ঘটনার অবতারণা করতে চাই। যা আমাদের সবারই মনে থাকার কথা।
কিছুদিন আগে এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটিতে জাতীয় লজ্জার মতো একটি ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশের তারকা ক্রিকেটার নাসির হোসেনের পোস্ট করা ভাই-বোনের একটি ছবিতে কুরুচিপূর্ণ এমন সব মন্তব্য করা হয় যা আমাদের জাতীয় লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষোভ প্রকাশ করে নাসির, মাশরাফি নিজেদের ফ্যানপেজও বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এরপর অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন, নিন্দা-প্রতিবাদের ঝড় উঠে। নিন্দা-প্রতিবাদের ঝড় উঠবে এটাই তো স্বাভাবিক, এটাই তো সামাজিকতা।
সমাজে এই সামাজিকতা যেমন বিদ্যমান, তেমনি আছেন আপত্তিকর, কুরুচিপূর্ণ ভাষার মন্তব্যকারীরা। তাই ঘটনার পরিসংখ্যান দিয়ে সামাজিকতা বা অসামাজিকতা নির্ণয় করাটা কোনোভাবেই ঠিক হবে না। কারণ শ্রেণিবিভক্ত সমাজে নানা আঙ্গিকে, নানা রূপে এসব অসামাজিকতা ছড়িয়ে আছে, লুকিয়ে আছে।
গত শুক্রবার বিয়ে করে নতুন জীবন শুরু করেছেন অভিনয়শিল্পী সুমাইয়া শিমু। বর নজরুল ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা রিলিফ ইন্টারন্যাশনালের কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত। ওইদিন সন্ধ্যায় ঢাকার গুলশানের একটি হোটেলে শিমুর বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। বিয়েটা পারিবারিকভাবে হয়েছে তা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন অভিনয়শিল্পী সুমাইয়া শিমু নিজেই।
অভিনয়শিল্পী সুমাইয়া শিমু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ থেকে এমএসএস করেছেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রামাটিকস বিভাগ থেকে পিএইচডি করছেন তিনি। নিউজিল্যান্ডের মেসি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএস করেছেন বর নজরুল ইসলাম।অভিনয়শিল্পী সুমাইয়া শিমু হলেন একমাত্র অভিনেত্রী যার পি এইচ ডি ডিগ্রী রয়েছে।তারকা হিসেবে শিমুকে আমরা কমবেশি সবাই চিনি, অনেকে হয়তো জানেনও। এখন নজরুল ইসলামকেও আমরা চিনি শিমুর বর হিসেবে। ফেসবুকে শিমু-নজরুলের বিয়ের সুন্দর একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে। আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডদের কেউ কেউ সে ছবিতে মন্তব্য বা লাইক দেওয়ায় ছবিটি আমার পেজেও আসে। তারকা হওয়ায় শিমুর বিয়ের ছবিটি পরিবার-পরিজন, ভক্ত-অনুরাগী, বন্ধুরা ছড়িয়ে দেবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু না, খেয়াল করে দেখলাম ছবিটি শেয়ার হচ্ছে অন্য একটি কারণেও। কারণটি খুবই জঘণ্য, নিন্দনীয়, লজ্জার এমনকি অপরাধমূলকও! মন্তব্যকারীদের দৃষ্টিভঙ্গী হলো, শিমু সুন্দর এ কারণে সে যোগ্যতাসম্পন্ন। শিমু লাস্যময়ী, ভোগ্য। অনেকে মন্তব্য করেছেন, টাকা দেখে বিয়ে করেছেন শিমু, তাই তাকে টাকাও অফার করেছেন অনেকে। আর গায়ের রঙ কালো হওয়ায় বর নজরুল ইসলাম কুৎসিত, অযোগ্য, খারাপ ইত্যাদি ইত্যাদি। টাকাওয়ালা হওয়ার কারণে শিমুর মতো মেয়েকে সে বিয়ে করতে পেরেছে। এসব মন্তব্যের কোনোটাই লিখে প্রকাশ করার মতো না।
এত নীচ আমরা, ছিঃ!
বিয়ে হলো ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার, সেখানে পাত্র এবং পাত্রীর নিজস্ব মতামত ছাড়া দুনিয়ার আর কারো মতামত বিবেচ্য নয়। আমাদের এরকম অসভ্য আচরণ প্রকাশ করে মানুষ হিসেবে আমাদের মন মানসিকতা। আমরা কেন যে সাদা কাল নিয়ে এত কথা বলি! আমরা কি পারিনা মানুষকে জীবন বোধের বিচারে বিচার করতে?
আমরা মানবিকতার চর্চা ছেড়ে দিয়েছি,সামাজিকতা ভুলতে বসেছি। অথচ স্বেচ্ছায় ও সানন্দে নীতি-নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ পালনের উৎসাহ ও নিদের্শনা মানুষ ধর্ম থেকে পেতে পারে। আজ মানুষের প্রয়োজনেই মানুষকে আবার মানবিকতার চর্চা করতে হবে, আর সুস্থ ধারার সমাজ গড়তে লালন করতে হবে নীতি-নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধগুলো। কেননা আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের সুস্থ ধারায় বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে ও বখে যাওয়া রোধ করতে হবে, এর বিকল্প নেই।
পরিশেষে, অনেকদিন পর লিখতে বসেছি তাই ভূলগুলো ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ আর আপনাদের (সুমাইয়া শিমু-নজরুল ইসলাম) দাম্পত্য জীবন সুখের হোক এই শুভকামনা রইলো। লেখকঃ প্রকৌশলী ও সাংবাদিক।

সর্বশেষ সংবাদ
স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যেকোনো অনিয়ম দুর্নীতি অনুসন্ধান করা হবে: দুদক চেয়ারম্যান কক্সবাজার রেড জোন,শনিবার থেকে আবারো লকডাউন এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।