ডিজিটাল ভর্তি পদ্ধতির আড়ালে বেকারত্ব শিক্ষার রূঢ় বহিঃপ্রকাশ | খন রঞ্জন রায়

পোস্ট করা হয়েছে 28/08/2015-10:54am:    ডিজিটাল বাংলাদেশে সব কিছু ডিজিটালাইজড হওয়াই স্বাভাবিক। এতে সময় এবং অর্থের অপচয় রোধ হওয়ার পাশাপাশি জন-দুর্ভোগ এবং বিড়ম্বনাও কমে। কমে দুর্নীতির সুযোগ। বাড়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরিধি। এই কারণে এই বছর কলেজে ভর্তির সনাতনী পদ্ধতি ছেড়ে অনলাইনে ভর্তি পদ্ধতি চালু করার ঘোষণায় সচেতন শিক্ষার্থী-অভিভাবক আনন্দিত হয়েছিল। কলেজে কলেজে দৌড়াদৌড়ি করে, পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি জটিলতা নিরসন করতেই নতুন এই প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট এডমিশন সিস্টেম ব্যবস্থার প্রচলন। এ চিন্তা ও উদ্যোগকে আমরা অবশ্যই স্বাগত জানাই।
প্রসঙ্গত এবছর কলেজ ভর্তিতে অনলাইনে আবেদন শুরু হয়েছিল ৬ জুন শেষ হয় ২১ জুন। প্রথম দফায় ২৫ জুন ফল প্রকাশের কথা থাকলেও কারিগরি ত্র“টির কারণে চার দফায় পিছিয়ে তা প্রকাশ করা হয় ২৮ জুন। একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য চতুর্থ বা শেষ দফায় মনোনীতদের তালিকা ২৩ জুলাই প্রকাশ করে ভর্তি কমিটি। এই তালিকা প্রকাশের পর ভর্তি সংক্রান্ত বড় ধরনের সকল জটিলতা দূর হয়। আন্তশিক্ষা বোর্ড সূত্র থেকে জানা যায় প্রথম মেধাতালিকার জন্য আবেদন করেছিল ১১ লাখ ৫৬ হাজার শিক্ষার্থী। তাদের মধ্য থেকে মনোনীত করা হয়েছিল ১০ লাখ ৯৩ হাজার শিক্ষার্থীকে। সেখান থেকে ভর্তি হয় ৯ লাখ ২৩ হাজার শিক্ষার্থী। ফলে প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েও ভর্তি হয়নি।
আমাদের দেশে অনেক ভালো মানের কলেজের সমস্যা রয়েছে। কলেজগুলোতে ভর্তি- বাণিজ্য স্বাধীনতা পূর্ব থেকে চালু হয়ে আসছে এবং তার সঙ্গে ‘ছাত্রনেতারা’ জড়িত। শিক্ষকদের একটি অংশও এ অনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের যুক্ত করে ফেলেছেন। অনেক প্রতিষ্ঠানে দেখা যায়, একটি চক্রের কাছে ভর্তি প্রক্রিয়া জিম্মি। দিন দিন পরিস্থিতি জটিল হয়েছিল। আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে ভর্তি প্রথা চালু থাকলে দরিদ্র ও নিুবিত্ত পরিবারের সন্তানরা বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় তাদের কেউই ভালো কলেজে পড়ার সুযোগ পায় না। এর সহজ সরল প্রতিভাদীপ্ত সমাধান ডিজিটাল ‘স্মার্ট এডমিশন সিস্টেম’।
এই ভর্তির নীতিমালা তৈরি করা হয় অনেক ভেবে চিন্তে। প্রতিবছর একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হতে হলে মূল ট্রান্সক্রিপ্ট লাগে। কিন্তু এবার তা বাতিল করা হয়। কারণ বোর্ডের বিতরণ করা ট্রান্সক্রিপ্টে অসংখ্য ভুল ধরা পড়ে। শিক্ষার্থীদের বোর্ডের ওয়েবসাইট থেকে ফলাফল শিট ডাউনলোড করে ভর্তির সময় জমা দিতে হয়। মফস্বল পৌর উপজেলা এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেশন চার্জসহ সর্বসাকূল্যে এক হাজার টাকা, পৌর জেলা সদর এলাকায় দুই হাজার টাকা এবং ঢাকা ছাড়া অন্য মেট্রোপলিটন এলাকায় তিন হাজার টাকা বেশি ফি নেওয়ার বিধান রাখা হয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় এমপিওভূক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঁচ হাজার টাকার বেশি নিতে পারেনি। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় আংশিক এমপিওভূক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন এবং এমপিও-বর্হিভূত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা দেওয়ার জন্য ভর্তির সময় মাসিক বেতন, সেশন চার্জ ও উন্নয়ন ফি বাবদ বাংলা মাধ্যমে ৯ হাজার এবং ইংরেজি মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছিল সরকার। এতকিছু আইনকানুন নিয়মনীতিও সর্তকতা অবলম্বন করার পরও প্রথমবার হওয়ায় কিছু ত্র“টি ধরা পরে।
এ দেশে স্বাধীনতার সাড়ে চার দশকে ছোট বড় অনেক উত্থান-পতন, ঘটনা অঘটন ঘটেছে। এইসব ঘটনায় বহু নিরীহ মানুষ শারীরিক মানসিক কষ্ট ভোগ করেছে। ঘটেছে জীবনহানি। দায়িত্বশীল কোন মন্ত্রী বা সচিব কোন ঘটনা দুর্ঘটনা দায় স্বীকার করে জাতির কাছে দুঃখ বা ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। এক্ষেত্রে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ‘স্মার্ট এডমিশন সিস্টেমে’ শিক্ষার্থীদের সাময়িক কষ্টের জন্য জাতির সামনে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে ক্ষমা চান। আমাদের দেশে একটি নতুন সংস্কৃতি চালু করলেন। এতদিন এসএসপি পাস শিক্ষার্থীরা ছিল অভিবাবকহীন, তাদের কোন অভিবাবক ছিল না। রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করায় রাষ্ট্র তাদের অভিভাবকদের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন এখন সন্তানদের শুধু সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ঢাকাসহ সারা দেশে সব মিলিয়ে মোটামুটি ভালমানের কলেজ আছে প্রায় ১৬০ টি। এতে সবমিলিয়ে ৬০ থেকে ৬৫ হাজারের মতো আসন আছে। অথচ গেল এসএসসি পরীক্ষায় ১০ বোর্ডে শুধু জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১১ হাজার ৯০১ জন। স্বীকৃত ভাল কলেজের বাইরে অনেকে মেধাবী ছাত্রকে অন্য কলেজে ভর্তি হতে হয়েছে।
এবার অনলাইনে ভর্তি কার্যক্রম শুরু করায় দেশের প্রায় ১ হাজার ৩০০ কলেজের দৈন্য বেরিয়ে এসেছে। এগুলোর মধ্যে ১৩৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও ভর্তি হওয়ার আগ্রহ দেখায়নি। ১ হাজার ২৬১ কলেজে ১ থেকে ১০ জন মাত্র ভর্তির জন্য আবেদন করেছিল। কর্তাব্যক্তিরা একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনুমোদন করে গেছেন এর আগেও দেখা গেছে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিয়েও পাস করতে পারনি। পাসের হার শূন্য। তার পরও রহস্যজনক কারণে কর্তৃপক্ষ নামমাত্র কাগুজে সতর্ক করে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে। এতে সংশ্লিষ্টদের কোনো ক্ষতি না হলেও ফি বছরে খেসারত দিতে হচ্ছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থীকে। যে শিক্ষা জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে, সেই শিক্ষা নিয়ে এ ধররে জোচ্চুরি বা ফাঁকিবাজি চলতে পারে না। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার নূন্যতম মান নিশ্চিত করতে পারে না, সেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বাতিলের পাশাপাশি অনুমোদনকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থার নেওয়ার সময় এসেছে।
‘স্মার্ট এডমিশন সিস্টেম’ ভর্তি ব্যবস্থা থেকে জাতির সামনে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা দৈন্য দশার চিত্র বেরিয়ে আসে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সচিব থেকে উপজেলা, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান এমনকি কেরানি পর্যন্ত শিক্ষাকে ডিপ্লোমা নির্ভর করার গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। এক্ষেত্রে দৈনিক সংবাদপত্রগুলোতে ভাবগাম্ভির্য সম্পাদকীয়, কলাম লেখকদের ক্ষুরধার লেখনিতে ডিপ্লোমা শিক্ষার কুচকুচানি প্রাধান্য পায়। মিড নাইটে টিভি চ্যানেলগুলোতে বুদ্ধিজীবীদের ঝাল-মিষ্টি-টক মিশ্রিত আলোচনায় জ্ঞান পিপাসুদের রাত্রের ঘুম হারাম করে দেয়। এত আয়োজনের মাধ্যমে ডাক-ঢোল পিটিয়ে আমাদের দেশে ডিপ্লোমা শিক্ষার ব্যবস্থার কোন পরিবর্তন ঘটেনি। সকলেই বেকার তৈরির ক্ষেত্র কলেজ শিক্ষার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেন।
সার্কভূক্ত দেশগুলোর ডিপ্লোমা শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষা গড় হার ৬২ শতাংশ। ২০১৫ সালে বাংলাদেশে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় ১২ লক্ষ ৮২ হাজার ৬১৮ জন শিক্ষার্থী। সার্কভূক্ত দেশগুলো পাশ্ববর্তী দেশগুলোর ডিপ্লোমা শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষা নীতি অনুসরণ করলেন ৭ লক্ষ ৯৫ হাজার ২১৩ জন শিক্ষার্থীকে ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির নীতিমালায় আনার প্রয়োজন ছিল। অথচ কলেজেই ভর্তি হয়েছে ১১ লক্ষ ৫৬ হাজার ২১৭ জন। ভর্তি হয়নি ১ লক্ষ ২৬ হাজার ৪০১ জন। এসএসসি পরীক্ষার পরই ইতিমধ্যে অনেক তরুণী বিয়ের পিড়িতে বসে বরের গলায় মালা ঝুলিয়ে দিব্যি ঘর সংসার করছেন।
এই ২০১৫ সালে ‘স্মার্ট এডমিশন সিস্টেম’ ভর্তি থেকে লক্ষ্য করা যায় এই দেশে এখনও বেকারমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। এই ব্যর্থতা রাষ্ট্রের আমলানির্ভর নীতিনির্ধারকদের। সাথে রয়েছে ডিপ্লোমা শিক্ষা নিয়ন্ত্রণকারী ৭টি প্রতিষ্ঠানের চরম ব্যর্থতা। বাংলাদেশের জনসংখ্যা, মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর শিক্ষা ব্যবস্থা আলোচনা, পর্যালোচনা গবেষণা করে প্রয়োজনীয়তার তাগিছে ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউটের সংখ্যা ও আসন বিন্যাস করতে পারেনি। নতুন কোর্স চালু করে এ দেশের শিক্ষার্থী অভিভাবকদের ডিপ্লোমা শিক্ষা গ্রহণে আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ পেতে হলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পার্শ্বেই বিভাগীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেই বোর্ড সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের সাথে প্রয়োজন নিরিখে ডিপ্লোমা শিক্ষা বৃদ্ধির সৃজনশীল প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হবে।

খন রঞ্জন রায়, মহাসচিব ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ।

সর্বশেষ সংবাদ