পলিমাটি ও পলিটিক্স -ফকির ইলিয়াস / কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 19/08/2015-11:23pm:   
যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ প্রতিনিধি:
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চল্লিশতম শাহাদতবার্ষিকী পালন করলো বাঙালি জাতি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এই মহান নেতাকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। বেঁচে যান তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। যেদিন এ অবিসংবাদিত নেতাকে হত্যা করা হয়, আমি তখন একজন স্কুলছাত্র। উচ্চবিদ্যালয়ের উচ্চ শ্রেণিতে পড়ি। মুক্তিযুদ্ধ আমি দেখেছি। দেখেছি কীভাবে পাক হানাদার বাহিনী জ্বালিয়ে দিয়েছে আমার এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি। আমি রেডিওতে শুনেছি জাতির জনকের সাতই মার্চের ভাষণ। তাই এই নেতার প্রতি আমার যে অন্ধবিশ্বাসটি জন্মেছিল-তা হলো ইনিই এই জাতির পথের দিশারী।
মুজিব স্বাধীন দেশে ফিরে এসে প্রমাণ করেছিলেন তাকে কোনো ঘাতক আর হত্যা করতে পারবে না। এই বিশ্বাসও জন্মেছিল তার। তা বলেছেন বিভিন্ন ভাষণেও। সেই নেতাকে যেদিন হত্যা করা হয়, সেদিনও আমার ফিলিপস রেডিওটি অন ছিল। সকালবেলা রেডিও খুলে যখন শুনি-‘আমি মেজর ডালিম বলছি। দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে’, তখনও তা বিশ্বাস করতে পারিনি।
এই যে ‘দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থ’-তা মূলত কি ছিল। এই প্রশ্নের উত্তর আমি খুঁজেছি আমার কৈশোরে। আমার যৌবনে। উত্তর পেয়েছিও। এই বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব যারা মানতে পারেনি, এরাই মুজিবকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে সেই শোধ নিতে চেয়েছিল। শেখ মুজিবের শাসনামলের একাডেমিক আলোচনা চলতেই পারে। কিন্তু দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার যে নিঃস্বার্থ ভাবনা ছিল-তা তো এখনও প্রমাণ রেখে যাচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, শেখ মুজিব ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে যে মিথ্যা অভিযোগগুলো করা হয়েছিল, সেগুলো যে ছিল ষড়যন্ত্রমূলক-তা কালে কালে প্রমাণিত হয়েই
যাচ্ছে। কিছু পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশের অভ্যুদয় মানতে পারেনি। এরাই মুজিবকে হত্যার পর ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিয়েছিল।
১৯৭৫ সালে মুজিবকে হত্যার পর, শেখ মুজিবের মন্ত্রিসভার অনেকেই মীরজাফর মোশতাকের মন্ত্রী হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এমএজি ওসমানী প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টাও হয়েছিলেন। পরে তিনি জিয়ার সাথে নির্বাচনও করেন নিজের দল থেকে। বিদ্রোহ সেদিন চোখে পড়ার মতো ছিল না। আর এটাকেই অনেকে বলেছিল-মুজিব হত্যায় বাঙালি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি! বিষয়টা সেরকম ছিল না। সামরিক উর্দি পরা’রা মানুষের টুঁটি চেপে ধরতে চেয়েছিল। কথা বলতে দেয়নি। চাপিয়ে দিয়েছিল-‘হ্যাঁ’/‘না’ ভোট। সবকিছুই তো পলিমাটি ও পলিটিক্স
আমাদের চোখের সামনে দিয়ে ঘটেছে। জিয়া বলেছিলেন- আই উইল মেক পলিটিক্স ডিফিকাল্ট ফর দ্য পলিটিশিয়ানস। ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ বলে জিয়া শুরু করেছিলেন ছাত্ররাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতা। এগুলো সবই আমাদের চোখের সামনে। কিন্তু এর পরিণাম কি হয়েছে আজ বাংলাদেশে?
পলিমাটির দেশ বাংলাদেশে মুজিবকে হত্যা করে টুঙ্গীপাড়ায় শবদেহ পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। ঘাতকরা মনে করেছিল, ওখানে গিয়ে আর কে খুঁজবে তাকে! ওরা ইনডেমনিটি বিল করে খুনকে জায়েজ করেছিল। একাত্তরের পরাজিত শক্তিকে শুধু প্রশ্রয়ই নয়, রাষ্ট্রক্ষমতাও দিয়েছিল জিয়ার দল। সেই বাংলাদেশে আজ শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায়, এটা তারা ভাবতেই পারেনি। যে বিষয়টি না বললেই নয় তা হলো, তাই বলে ঘাতকরা কিন্তু বসে নেই। এরা এখনো সক্রিয় নানাভাবে। তারা মৌলবাদী রাজনীতির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ভিতকে নড়াবার জন্য সচেষ্ট আছে দীর্ঘ সময় ধরে।
আমরা দেখেছি, বাংলাদেশের পলিমাটিতে সেই পরাজিত শক্তি দেশকে মনেপ্রাণে ভালোবাসে না। যদি বাসতো, তাহলে সা.কা. চৌধুরীর মতো যুদ্ধাপরাধী বলতে পারতো না- ‘আমি পছন্দসূত্রে বাংলাদেশি’। এর অর্থ কি? অর্থ হচ্ছে, ভোগ করতে চাই এই মাটিকে। ভালোবাসি না। এ কাজটিই করে গেছে বিএনপি। এখনও এই বিএনপিতে যারা আছেন তারা তাদের জন্যই রাষ্ট্রক্ষমতা চান। গণমানুষের জন্য নয়।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে বেশ কিছু দরকারি কথা বলেছেন। তিনি ইংরেজিতে যা লিখেছেন তা বাংলায় তর্জমা করা যাক। তিনি লিখেছেন, ‘ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে কিন্তু বিভ্রান্ত কিছু মানুষ আমাদের আওয়ামী লীগ সরকারকে দোষারোপ করার চেষ্টা করছেন এই জন্য যে, সম্প্রতি আমাদের দেশে হত্যার শিকার হওয়া চারজন ব্লগারের বিষয়ে কিছুই করছি না। এই মানুষগুলো মনে হচ্ছে কিছুই বুঝতে চাইছেন না। আমরা কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছি এবং তদন্ত কার্যক্রম এখনো চলছে। আমরা বেশ কিছু তথ্য উন্মুক্ত করিনি যেন তদন্তগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। যেসব লোক তাৎক্ষণিক গ্রেফতার দাবি করেন তারা অবুঝ, বোকা। কাদের গ্রেফতার করা উচিত আমাদের? যাকে তাকে খেয়াল খুশিমত আমরা গ্রেফতার করতে পারি না।’
তিনি আরো লিখেছেন-এই মানুষগুলোই হয়তো ভুলে গেছেন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে সন্ত্রাসীরা কেমন অভয়ারণ্যে ছিল। আমাদের সরকার প্রতিমাসেই অস্ত্র এবং বিস্ফোরকসহ সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সবই ছিল ব্যাপক আকারে হত্যার পরিকল্পনা, যা আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় না থাকলে শুধু চারজন ব্লগারই নন, হয়তো এমন শত শত এমনকি হাজারও প্রাণ আমরা হারাতে পারতাম।’
জয় তার লেখায় বলেছেন-‘বাস্তবতা হচ্ছে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমাদের সফল যুদ্ধের কারণেই ব্লগারদের এই হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলো ঘটেছে। সন্ত্রাসীরা ব্যাপক আকারে হামলা চালাতে ব্যর্থ হয়েই এসব বিচ্ছিন্ন হামলা চালিয়েছে। এ ধরনের একক পরিকল্পনাগুলো উন্মোচন করাটা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য অপেক্ষাকৃত বেশি কঠিন। তাই যেসব অবোধ আওয়ামী লীগ সরকারের নিন্দা করছেন, আপনারা আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতা থেকে টেনে নামালে কী হবে? জঙ্গিদের হাত থেকে তখন কে আপনাদের বাঁচাতে পারবে?’
সজীব ওয়াজেদ জয় যা লিখেছেন, তা তার রাজনৈতিক বক্তব্য। কিন্তু একথাটি তো সত্য-আজ যদি আবার সেই পরাজিত শক্তি ও তাদের দোসররা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসতে পারে, তাহলে তারা দেশকে আবারো ‘বাংলাভাই’, ‘শায়খ রহমান’-এর সময়ের চেয়ে আরো জঘন্য ভূখণ্ডে পরিণত করবে। আর এটাই তো তাদের সেই ‘ডিফিকাল্ট পলিটিক্স’-এর স্বরূপ। যা তৈরি করে গেছেন একজন জিয়াউর রহমান।
বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে। জিএসপি সুবিধা পেলো কি পেলো না, সেটা বাংলাদেশের জন্য এখন আর খুব বড় একটা ফ্যাক্টর নয়। আর এ বিষয় তো প্রমাণিত হয়েই গেছে, পদ্মা সেতু ইস্যুতে বিশ্বব্যাংকের ভুল ছিল। পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ পূর্ণাঙ্গ তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত অর্থ না দেয়ার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল বলে এক প্রতিবেদনে স্বীকার করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ওই সিদ্ধান্ত নেয়ায় বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশ কিছু জটিলতা সৃষ্টি হয়। এতে বিশ্বব্যাংকও সমস্যায় রয়েছে। সে সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশে চলমান বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখাসহ নতুন অনেক প্রকল্পে অর্থলগ্নিতে আগ্রহী আন্তর্জাতিক এ প্রতিষ্ঠান। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, পদ্মা প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেদের ভুল বুঝতে পারে বিশ্বব্যাংক। বিষয়টি উপলব্ধি করার পরই বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সৃষ্ট দূরত্ব ঘোচাতে নানামুখী পদক্ষেপ নেয়া হয়।
বাংলাদেশের জন্য এখনো বড় সমস্যা ওই মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ। যারা সুযোগ পেলে কাউকেই ছাড়বে না। আমার ভাবতে খুব অবাক লাগে, এই দেশে মুক্তচিন্তাবাদী মানুষদের ধারাবাহিকভাবে খুন করার পরও দেশের কৃতী বুদ্ধিজীবীরা মুখে কুলুপ দিয়ে বসে আছেন। শুধুমাত্র ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ছাড়া আর কেউই জোর গলায় এর প্রতিবাদ করছেন না। এর কারণ কি?
আজ যারা ‘ব্লগার’ তকমা দিয়ে, হরেদরে ‘নাস্তিক’ আখ্যা দিয়ে মানুষ হত্যা করছে, তালিকা পাঠাচ্ছে, এরা কারা? এরা তারাই, যারা একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। যারা ১৯৭৫-এ জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার পর উল্লাস করেছিল। যারা এখনো পাকিস্তানের তাঁবেদারি ভালোবাসে। আমাদের সচেতন বুদ্ধিজীবীরা কি তাহলে খুব সূক্ষ্মভাবে সেই অপশক্তিকেও মদত দিচ্ছেন না? এতে লাভবান হবে কারা? আবারও বলি, পলিমাটির পলিটিক্সকে পাথর বানাবার অপচেষ্টা চলছে। যেভাবে আগেও হয়েছিল। এ বিষয়ে ক্ষমতাসীনদের সতর্ক থাকতে হবে। শুধু ভাগ-বাটোয়ারা আর নিজেদের মধ্যে হানাহানি জাতির জনকের আদর্শের অংশ ছিল না বিন্দুমাত্রও। যারা আমার কথা মানতে চাইবেন না, তারা তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি পড়ে দেখতে পারেন।
ফকির ইলিয়াস : কবি, সাংবাদিক ও লেখক-যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ প্রতিনিধি

সর্বশেষ সংবাদ