মহাসড়কে নিষিদ্ধ থ্রি হুইলার, সঠিক হলেও অপরিকল্পিত সিন্ধান্ত-কামরুল হাসান বাদল-কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 08/08/2015-10:17am:   
লেখাটি যখন লিখছি (মঙ্গলবার মধ্যরাত) সে সময়ও বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে দেখানো হচ্ছিল সারাদেশ জুড়ে সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও তিনচাকার গাড়িচালক ও মালিকদের প্রতিবাদ সমাবেশ এবং সে সাথে সাধারণ যাত্রীদের চরম দুর্ভোগের চিত্র।
মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে সরকার জাতীয় মহাসড়কে থ্রি হুইলার তথা সিএনজি চালিত অটোরিকশা, টেম্পু, নসিমন-করিমন-ভটভটি ইত্যাদি চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ২৭ জুলাই জারি করা প্রজ্ঞাপন প্রসাশন ১ আগস্ট থেকে কার্যকর করা শুরু করে। এদিন থেকে মহাসড়ক বিশেষ করে জাতীয় মহাসড়কে, যার আয়তন সরকারি ভাষ্যমতে তিন হাজার ৫৭০ কিলোমিটার, এ ধরনের ধীরগতির যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। সরকারের এই আকস্মিক ঘোষণায় এই সব যানবাহনের মালিক-শ্রমিকসহ সাধারণ যাত্রীরা ভীষণ বিপাকে পড়ে। শুধু যানবাহন সংকটই এর কারণ নয়। অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহন শ্রমিকদের অবরোধের কারণে অন্য যানবাহন চলাচলেও বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।
বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনা কবলিত দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক লোকের প্রাণহানি ঘটছে। বেঁচে গেলেও জীবনের জন্য পঙ্গুত্বকে বরণ করে নিতে বাধ্য হচ্ছেন তার চেয়েও বেশি মানুষ। জাতির অনেক বরেণ্য সন্তান অকালে প্রাণ হারিয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায়। সড়ক দুর্ঘটনার অনেক কারণের মধ্যে মহাসড়কে ধীরগতির যান চলাচলকে অন্যতম বলে মনে করে অনেকে। সে কারণে দীর্ঘদিন বিভিন্ন মহল থেকে মহাসড়কে ধীরগতির যান চলাচল বন্ধের দাবি করে এসেছে। মহাসড়কে তিনচাকার ধীরগতির এই সব যান চলাচল বন্ধের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয় জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের ২০১০ সালের এক বৈঠকে। যদিও এরপরে অপরিকল্পিতভাবে তিনচাকার অটোরিকশা ও টেম্পুর নিবন্ধন দিয়ে চলেছে সরকার।
বিশ্বের কোনো দেশে, কোনো মহাসড়কে এ ধরনের ধীরগতির গাড়ি চলতে পারে না বাংলাদেশে যে রূপ চলে। এ দেশের সব সড়কে তো বটেই মহাসড়কেও বড় বড় যানবাহনের পাশাপাশি রিকশা, অটোরিকশা, টেম্পু, করিমন, নসিমন, ভটভটি, সাইকেলও চলাচল করে। যে সড়কে ষোল বা বিশ চাকার ট্রাকলরি ও কন্টেইনার মুভার চলে, দেখা যায় তার পাশ দিয়ে ফাঁক গলে ঢুকে যাচ্ছে একটি অটোরিকশা বা ভটভটি। মহাসড়কে এমন কিছু হালকা যান চলে দ্রুতগতির কোনো গাড়ির বাতাসেও তা উল্টে যেতে পারে। এই যানবাহনগুলো শুধু যে দুর্ঘটনার কারণ তা নয়, এ ধরনের গাড়ির কারণে দ্রুতগতির গাড়ির গতিও সীমিত হয়ে পড়ে এবং প্রায় সময় যানজটের সৃষ্টি করে। পূর্বেও বলেছি বিশ্বের কোনো দেশের মহাসড়কে এমন গাড়ি নেই এবং সে সব সড়কে কোনো স্পিড ব্রেকারও নেই। আসলে মহাসড়ক বলতে যা বোঝানো হয় তেমন কিছুর অস্থিত্ব নেই বাংলাদেশে। জনবসতির ভেতর দিয়ে যাওয়া, দুপাশে হাট-বাজার, স্কুল-কলেজ সমেত এ গুলোকে খুব বেশি সড়ক বলা যায় মহাসড়ক নয়। এমনকি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক বলে যাকে অভিহিত করা হয় তা মূলত আন্ত উপজেলা সড়ক। একটির পর একটি উপজেলা পেরিয়ে যাওয়া শুধু।
যাক-শেষ পর্যন্ত সরকার এসব সড়ক বা মহাসড়ক থেকে ধীরগতির গাড়ি চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি এবং জনপ্রিয় দাবি পূরণ করতে গিয়ে সরকার বিপাকে পড়ছে কেন? কারণ সিদ্ধান্তটি সঠিক হলেও তার প্রয়োগটি হয়েছে ভুলভাবে। অর্থাৎ কোনো পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া, যাত্রীও এ ধরনের যানবাহনের জন্য বিকল্প চলাচলের ব্যবস্থা না করে এই ঘোষণার বাস্তবায়ন বাস্তবসম্মত হয়নি। ফলে জনভোগান্তির সাথে সাথে জন-অসন্তোষও বৃদ্ধি পেয়েছে দেশে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে সারাদেশের লাখ লাখ যাত্রীর জন্য বিকল্প পরিবহন তথা গণপরিবহনের ব্যবস্থা করা উচিৎ ছিল। গড়ে তোলা উচিৎ ছিল সড়ক-মহাসড়কে বিকল্প লেন তৈরি করা, যেখানে শুধু ধীরগতির গাড়িগুলোই চলবে।
বর্তমানে দেশে বৈধ অবৈধ মিলিয়ে তিনচাকার ধীরগতির গাড়ির সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ। যেগুলো আন্ত যোগাযোগ সড়ক ছাড়াও মহাসড়কে চলাচল করে থাকে। দেশের বিপুল সংখ্যক যাত্রী এ ধরনের যানবাহনে চলাচল করতে বাধ্য হয়। কারণ বহুবিধ। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে গণপরিবহন অর্থাৎ পর্যাপ্ত বড় গাড়ি তথা বাসের সুব্যবস্থা না থাকা। স্বাধীনতার পরে সড়ক পথে যাত্রী কয়েক’শ গুণ বৃদ্ধি পেলেও সে তুলনায় বিভিন্ন রুটে বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়নি। চট্টগ্রাম শহর থেকে বিভিন্ন উপজেলায় তো হয়-ইনি এমন কি শহর এলাকাতেও পর্যাপ্ত বাসের ব্যবস্থা নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মালিক সমিতিগুলোর এক প্রকার দৌরাত্ম্য ও সরকারি উদ্যোগের শিথিলতার কারণে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। স্বাধীনতার পরে জনগণের এমন দুরবস্থার কথা ভেবেই বঙ্গবন্ধু বিআরটিসি বাস সার্ভিসের প্রচলন করেছিলেন। একটি গণপরিবহন ব্যবস্থা সৃষ্টি ও সে সাথে বেসরকারি বাস মালিকদের একচেটিয়া কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না দেওয়ার উদ্দেশ্যেই বঙ্গবন্ধু এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু বিআরটিসির এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর কারণেও সরকারি তদারকির অভাবে এই প্রতিষ্ঠান আজ রুগ্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বাস মালিক সমিতির নানাবিধ চক্রান্ত। ফলে সড়ক পরিবহন আজ সম্পূর্ণভাবে বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। সমিতির সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো কিছু করা এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন রুটের মালিক সমিতির কারণে সড়কে নতুন বাস নামানোও এখন অনেকটা দুষ্কর একটি কর্ম।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। এত ঘনবসতিপূর্ণ দেশে সুষ্ঠু যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলাও কঠিন। আমি মহাসড়কের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনা দিয়েছি বটে কিন্তু তেমন মহাসড়ক গড়ে তোলার জন্য জনবিরল এলাকাও কোথায় বাংলাদেশে। একটি দেশে সুষ্ঠু যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য যে পরিমাণ সড়কের প্রয়োজন তার ২৫ শতাংশেরও কম বর্তমান বাংলাদেশে। ফলে এক জেলা থেকে কিংবা জেলা থেকে উপজেলা বা উপজেলা থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত সড়ক নেই, তার সাথে পর্যাপ্ত যানবাহনও নেই। যেহেতু গণপরিবহন ব্যবস্থা বা বড় গাড়ির জন্য প্রচুর পুঁজির দরকার এবং সে সাথে যেহেতু ঝুঁকিও বেশি তাই অনেকে ছোট ও ধীরগতির গাড়ি ব্যবসার দিকে ঝুঁকেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের মানুষ যেহেতু সামান্য পথও হাঁটতে চায় না বিশেষ করে নারীরা। ফলে দেশে ছোট গাড়ির জনপ্রিয়তা ও চাহিদা দিনদিন বেড়েছে। নারী ও বয়স্ক মানুষের যাতায়াত, জরুরি রোগী পরিবহন, জরুরি আসা-যাওয়া ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ছোট গাড়ির চাহিদা দেশে সব সময় থাকবে এবং সে সাথে কম ও মাঝারি দূরত্বের যাতায়াতের জন্য বিকল্প সড়ক না থাকায় মহাসড়ক দিয়ে যেতেও বাধ্য হচ্ছে অনেকে। উদাহরণ স্বরূপ বলি চট্টগ্রাম সিটি গেট থেকে কেউ যদি ভাটিয়ারি যেতে চায় তবে তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদ বৃষ্টি উপেক্ষা করে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হবে নতুবা টেক্সিতে টেম্পুতে ইত্যাদিতে যেতে হবে। তখন মহাসড়ক বলে ছোট গাড়ি বন্ধ থাকলে প্রতিদিন এমন হাজার হাজার যাত্রীদের পরিবহন করবে কে বা কারা? স্কুল বাস নেই, অফিস শেষে ফেরার জন্য যথেষ্ট বাস নেই। রোগী পরিবহনে যথেষ্ট অ্যাম্বুলেন্স নেই এই পরিস্থিতিতে মানুষ যাবে কোথায়? আমরা ২০/২৫ বছর আগেও দেখেছি গ্রাম থেকে ২০/২৫ মাইল পথ অতিক্রম করে মানুষ সকালে শহরে এসে সন্ধ্যায় বা রাতে গ্রামে ফিরে যেতে। কিন্তু বর্তমানে এদের অনেকেই যে করে হোক শহরে বাস করছে সপরিবারে। কারণ যথা সময়ে বাস না পাওয়া, মাঝপথে দীর্ঘক্ষণ যানজটে আটকে থাকা ইত্যাদি কারণেও অনেকে গ্রাম থেকে এসে শহরে পেশা সম্পাদন করতে পারছেন না।
ওবায়দুল কাদের একজন সত্যিকার রাজনীতিক। ছাত্রাবস্থা থেকে অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার পরে আজকের অবস্থানে এসেছেন। সড়ক যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে কয়েক বছর ধরে দায়িত্ব পালনকালে তাঁকে বেশ কর্মঠ, উদ্যমী, আন্তরিক বলে মনে হয়েছে। ঈদের আগে থেকে প্রতিদিন তাঁকে রাজপথে দেখা গেছে কোনো না কোনো সমস্যা মোকাবেলা করতে। রাজনীতিতে তাঁর অবদানও কম নয়। বর্তমান সরকারি এই সিদ্ধান্তটি মূলত তাঁরই সিদ্ধান্ত। তিনি জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করেছেন। এ জন্য তাঁকে ধন্যবাদ। তবে সবিনয়ে তাকে জানাতে চাই, তার এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার আগে উপযুক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিৎ ছিল। বিকল্প ব্যবস্থা না করে, হুট করে এমন ঘোষণার বাস্তবায়ন সুবিবেচনা প্রসূত হয়নি।
দেশের অধিকাংশ মানুষ চায় আমাদের সড়ক মহাসড়কগুলো নিরাপদ হোক। প্রতিদিন মানুষের আহাজারিতে যেন বাতাস ভারী হয়ে না ওঠে। এবং তার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। বর্তমান সিদ্ধান্তটি ভুল তা নয়, তবে তা অপরিকল্পিত বলে মনে করে অনেকে। ধীরগতির গাড়ি নিষিদ্ধের আগে যথেষ্ট বাসের ব্যবস্থা করতে হবে। বাস্তবতা ও চাহিদার কথা বিবেচনা করে সড়ক মহাসড়কের পাশে আলাদা লেন তৈরি করে দিতে হবে যাতে ছোট ও ধীরগতির গাড়ি চলাচল করতে পারে। মনে রাখতে হবে লাখ লাখ যাত্রীর বিড়ম্বনার সাথে সাথে ১৩ লাখ গাড়ির ওপর নির্ভরশীল অন্তত ৫০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার কথাও ভাবতে হবে সরকারকে। অনেক সময় প্রয়োগিক ভুলের কারণেও একটি ভালো সিদ্ধান্ত ব্যর্থ বা বিফল হতে পারে।
বিগত কয়েক বছর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ফেসবুক’ যোগাযোগ ও তথ্য আদান প্রদানের ক্ষেত্রে অন্যতম একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে। যেখানে এ ধরনের সামাজিক সমস্যাগুলো নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়ে থাকে। খুব সহজে ও বিনা সেন্সরে এখানে বিভিন্ন মন্তব্য করা যায় বলে তা অনেক সময় শালীনতার মাত্রা অতিক্রম করে থাকে। এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এক কথায় সবাই ওবায়দুল কাদেরকে তুলোধুনো করছেন। তবে একটি ব্যতিক্রম লক্ষ্য করছি এ ক্ষেত্রে অধিকাংশ পোস্টদাতারা এ ক্ষেত্রে সরকার প্রধান শেখ হাসিনাকে নয় দায়ী করছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে এবং এর মধ্যে অধিকাংশই মনে করছে জননেত্রী শেখ হাসিনার অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতেই কোনো কোনো মন্ত্রী এ ধরনের বিতর্কিত কাজ করছেন। অন্তত ওবাদুল কাদেরকে নিয়ে এমন কিছু ভাবতে আমার বিবেক সায় দেয় না। তবে এটুকু বলতে পারি শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার সবাই যদি তাঁর মতো বিচক্ষণ, ত্যাগী, দূরদর্শী ও আন্তরিক হতেন তাহলে এই সরকারের দেওয়া সুফল জনগণ আরও বেশি ভোগ করতে পারত।
সরকারের একটি ভালো সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র পরিকল্পনাহীনতার কারণে জনগণের কাছে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বিষয়টি ‘ভাত দেওয়ার মুরোদ নেই কিল মারা গোঁসাই’ এর মতো হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
[email protected]

সর্বশেষ সংবাদ