বিশ্বায়ন প্রতিযোগিতায় নারী সমাজ ও তাদের প্রস্তুতি | খন রঞ্জন রায়

পোস্ট করা হয়েছে 07/08/2015-06:05pm:    নারীর ক্ষমতায়ন, নারী স্বাধীনতা, নারীর সম অধিকার- এসব নিয়ে আমাদের সমাজে মাতামাতির শেষ নেই। সত্যিকার অর্থে নারী অধিকার বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। নারীকে নারী হিসেবে না দেখে মানুষ হিসাবে দেখার দিন শেষ হয়নি। আমাদের দেশে নারী এখনও অনেক পিছিয়ে। সময় এসেছে নারীকে এগিয়ে যাবার, নারীকে এগিয়ে নেবার। কারণ দেশের অর্ধেক নারীর হাতকে কাজের হাতে পরিণত করতে না পারলে দেশের কাক্সিক্ষত উন্নতি কখনও সম্ভব নয়।
আমাদের পরিবারগুলোতে দেখা যায় নারী পুরুষের বৈষম্য। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, বিজ্ঞান, বিনোদনের ক্ষেত্রে পুরুষের অগ্রাধিকার থাকে এবং নারীরা বরাবরই এসব বিষয়ে অগ্রাহ্যের শিকার হয়। বাংলাদেশের নারীদের বলা হয় দরিদ্রর মধ্যে দরিদ্রতম। জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দারিদ্রের বিভিন্ন মাত্রা নির্ধারণের ভিত্তিতে নারী পুরুষের সমতা, শিক্ষা ও টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বের সামগ্রিক উন্নতি ও অগ্রগতি সাধিত হযেছে নারী পুরুষের সমানুপাতিক ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে। এ পৃথিবীতে সৃষ্টিকর্তা মনুষ্যজাতির সূচনা করেছিলেন আদম ও হাওয়ার মাধ্যমে অর্থাৎ নারী ও পুরুষের যৌথ প্রয়াসেই সভ্যতার সূচনা হয়েছিল। দীর্ঘ সময়ের পরিধিতে তাদের যৌথ প্রয়াসে আজকের উন্নত সভ্যতার রূপটি গড়ে উঠেছে। সমাজ একটি দ্বিচক্রযানের মত, যার পৃথক দুটি চাকা নারী ও পুরুষ। নারীরা শুধু সভ্যতাই নির্মাণ করেনি, তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় প্রেরণা ও সমর্থন পেয়ে পুরুষরা তাদের কাজে সফলতা অর্জন করেছে।
ব্যয়বহুল এই সময়ে সংসারের খরচ একার পক্ষে চালানো অনেক কঠিন। তাই পরিবারের স্বাচ্ছন্দের জন্য ঘরের কাজের পাশাপাশি চাকরি করে বাড়তি উপার্জনের জন্য নানা কাজে যুক্ত হচ্ছেন নারীরা। এতে সংসারে আসছে উন্নতি আর নারীরা হচ্ছেন সাবলম্বী। উভয়ের যৌথ প্রচেষ্টার ফলেই পৃথিবী ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে ধাবিত হয়েছে। কোনো কিছুই কারও একক প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠেনি বরং সৃষ্টির প্রথম থেকে আজ অবধি প্রত্যেকে একে অন্যের কাঁেধ কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। প্রত্যেক দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী। তাদের প্রতি গুরুত্ব না দিলে জাতির উ্ন্নতি সম্ভব নয়। দেশের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের সাথে নারীদের সমঅংশীদার করেই একটি দেশ, একটি জাতি আত্মমর্যাদাশীল দেশ বা জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।
অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ক্যারিয়ারিষ্ট বা চাকরীজীবী নারীদের কর্মক্ষেত্রের পথটি তত সহজ বা মসৃণ নয়। প্রকৃতপক্ষে একজন নারীকে তার পুরুষ সহকর্মী বা প্রতিযোগীর চাইতে দ্বিগুণ ভালো হতে হয়। দেশের চাকরীজীবী নারীদের সামনে এখনও একটি কাচের দেয়াল দৃশ্যমান। যেটি নারীদের সম্ভাবনাকে আটকে রেখেছে। যেসব নারী এই কাচের দেয়াল টপকে বা অতিক্রম করে অগ্রসর হতে চান তাদের সামনে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা।
গার্মেন্টসসহ অন্যান্য শিল্পে এখনো মধ্যম পর্যায়ের ব্যবস্থাপনা কর্মীর অধিকাংশই বিদেশী। যে ধরণের জ্ঞান ও প্রযুুক্তিভিত্তিক সমাজ এখন তৈরি হচ্ছে সে ধরণের মানুষ আমাদের দেশে পাওয়া যায় না বলে বাইরে থেকে দক্ষ জনশক্তি আমদানি করতে হয় । একইভাবে চাহিদামত শিক্ষা প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তির জোগান যদি আমাদের হাতে থাকতো, তাহলে আমরাও বিশ্বপরিমণ্ডলের মতো নারীদের প্রত্যাশিত কাজ খুঁজে পাওয়া সহজ হতো। কর্মময় জীবনের বাইরেও পরিবারের দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করার ক্ষেত্রে একজন নারীকে একজন গবেষক, প্রশিক্ষক, সুষ্ঠু ক্রেতা, পথ প্রদর্শক ও সুষ্ঠু নাগরিকের ভূমিকা পালন করতে হয়। এ জন্য তার যে সব গুণ থাকা প্রয়োজন তা হলো- কাজের ক্ষমতা ও ইচ্ছে, মিত্যবয়িতা, ধর্যশীলতা, শিক্ষা, সুরুচি, দূরদর্শিতা, প্রফুল্লতা, এবং নিষ্ঠা উদারতা। গবেষণায় দেখা গেছে পেশা ও পণ্যভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা কোর্স অর্জনকারী নারীগণ এইসব গুণে গুণান্বীতা হন অধিক হারে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত, অবহেলিত গ্রামীণ মেয়েদের তাই এখন একশ একটা সমস্যা নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। মেয়েরা সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, মানবিক সব দিক থেকে শোষিত হচ্ছে শাসিত হচ্ছে, অসভ্যতার শিকার হচ্ছে। পারিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সব কিছু শোষণ করছে গ্রামীণ মহিলাদের। শিক্ষা প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করে গ্রামীণ নারীদের এগিয়ে চলার পথ দেখাতে হবে। দার্শনিকরা বলে গেছেন- গ্রাম না বাঁচলে শহর বাচঁবে না, রক্ষা পাবে না আমাদের সভ্যতা। আর এ জন্য বিশ্বজুড়ে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ চিন্তাভানা শুরু করেছিলেন কিভাবে বাঁচানো যায় গ্রামকে। গ্রামীণ নারীরা গ্রাম বাঁচিয়ে রাখার অন্যতম শক্ত্।ি তাদের কর্মপ্রচেষ্টার প্রতি স্বীকৃতি জানাতে ১৫ অক্টোবর বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবস হিসেবে পালন করা হয় । বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, শ্রবণ প্রতিবন্ধী, বিকলাঙ্গ এসব নারীরা সমাজে ও পরিবারে কতোটা অবহেলিত এসব আমরা চারপাশে একটু দৃষ্টি দিলেই দেখতে পাই।
সমাজের সব প্রতিবন্ধী শিশু রাজধানী শহর ঢাকা ও বিভাগীয় শহরের বাইরে শিক্ষা প্রশিক্ষণ গ্রহণের ক্ষেত্রে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। নানাভাবে ব্যাহত হচ্ছে তাদের শিক্ষার অধিকার। শিশু ও কিশোরী, বয়োবৃদ্ধ, প্রতিবন্ধীদের রক্ষণাবেক্ষণ, ভরণপোষণ, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা প্রদানে রয়েছে মারাত্মক অনিশ্চয়তা। প্রতিযোগীতাপূর্ণ এ বিশ্বে নারী শিক্ষায় কোন বৈষম্য থাকা বাঞ্ছনীয় নয়, যাবতীয় অর্থনৈতিক বিধি ব্যবস্থা ও কর্মকাণ্ডে নারীদের যত বেশি সম্পৃক্ত করা যাবে পরিবার, দেশ ও জাতি তত বেশি তার সুফল পাবে। উন্নত দেশগুলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশেষ করে তথ্য-প্রযুক্তির বৈপ্লবিক বিকাশে নারীদের সম্পৃক্ততা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। পরিবার, সমাজ ও সভ্যতা সৃজনে নর-নারীদের সম্পৃক্ত করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
বিশ্ব এবং বাংলাদেশ সবখানেই অর্ধেক জনসংখ্যা নারী । দেশের যথাযথ উন্নয়নে নারীর মেধাও শ্রমশক্তির প্রয়োগ আবশ্যক। দেশের অর্ধেক মানুষের মেধা ও শ্রম অলস পড়ে থাকলে বা অব্যবহৃত থাকলে দেশের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারীর আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন ও দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে নারীর মেধা ও শ্রম ব্যবহারের জন্যই নারী উদ্যোক্তা শিক্ষা প্রয়োজন। যেখানে অধিকাংশ নারী আধুনিক প্রয়োজনভিত্তিক শিক্ষায় শিক্ষিত হবে। দেশের শ্রমবাজারে ১৯৮৩ সালে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল শতকরা ৮ ভাগ। বর্তমানে তা ৩৬ ভাগের বেশি। শ্রমবাজারে নারী পুরুষের সমান অংশগ্রহণ ও প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনী নিশ্চিত করা গেলে দেশের জিডিপি কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব।
ধ্বংস নয়, সৃষ্টির উল্লাসে মেতে উঠুক নারী জাতি। নারীর ত্যাগ, সেবা, শিক্ষা জাতিকে গৌরবদীপ্ত মহিমা দিতে পারে। মান-সম্মান ও জীবন বাজি রেখে নারীকে সমাজের জন্য কাজ করতে হবে। ভেতরের তাড়না ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই নারীকে শিক্ষিত করে এগিয়ে যাওয়ার সুয়োগ দিতে হবে। সব নারী হবে সুশিক্ষিত, কর্মজীবী। এই সমাজের নারীর মর্যাদা হবে পুরুষের পাশাপাশি। স্বাবলম্বীকতাই নারীর সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির পূর্বশর্ত। ‘অর্থ’ হলো সব কিছুর নিয়ামক শক্তি। নারীর হাতে যদি ‘অর্থ’ না থাকে তাহলে তার কণ্ঠও জোরালো হবে না। সে কোন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারবে না। কোন বিষয়ে মত প্রকাশ করতে পারবে না। প্রতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা শিক্ষায় শিক্ষিত হয় মেধাও শ্রমের কল্যাণে নারীর অধিকার ও সুযোগ প্রশস্ত হবে। আমাদেরও প্রত্যাশা তাই।

সর্বশেষ সংবাদ
স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যেকোনো অনিয়ম দুর্নীতি অনুসন্ধান করা হবে: দুদক চেয়ারম্যান কক্সবাজার রেড জোন,শনিবার থেকে আবারো লকডাউন এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।