রাসেল থেকে রাজন: বর্বরতার ধারাবাহিকতা / কামরুল হাসান বাদল কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 20/07/2015-01:22pm:   
শিশু রাজনের হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে। মানুষের মনে গভীর রেখাপাত করেছে শিশুটির ওপর নির্যাতনের চিত্র। প্রতিদিন এ নিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধন হচ্ছে। দল-মত নির্বিশেষে সবাই এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানানোসহ খুনীদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারের দাবি জানাচ্ছে। মানুষের ক্ষোভের চরমতম প্রকাশ দেখা যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। অনেকে দোষীদের রাজনের মতই অর্থাৎ রাজনকে যেভাবে অত্যাচার করে হত্যা করা হয়েছে সেভাবে হত্যা দাবি করছে। অনেকে এদের খোলা ময়দানে প্রকাশ্যে ফাঁসির দাবি করছে।
জনগণের এই প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক নয়। রাজন হত্যার এই ঘটনাটিকে বর্বরতার কোন সংজ্ঞায় ফেলা যায় তা নির্ণয় করা যাচ্ছে না। কোনো আদিম সমাজের সাথে হয়তো এর তুলনা করা যেতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা কি তবে সে আদিমকালে ফিরে যাচ্ছে, না হলে এমন ঘটনা ঘটছে কীভাবে? সমাজে এমন নির্মমতা, এমন আদিমতা, এমন বীভৎসতার জন্ম হলো কী করে। মানুষ এমন অসহিষ্ণু, আক্রমণাত্মক, জিঘাংসাপ্রবণ হয়ে উঠছে কেন? মানুষের আচরণ থেকে মানবতাবোধ হারিয়ে যাচ্ছে কেন? মানুষ কেন এমন হত্যাকাণ্ড এমন অন্যায়, এমন পাশবিকতা দেখেও প্রতিবাদ করছে না। রোবটের মতো অনুভূতিহীন হয়ে পড়ছে কেন মানুষ। রাজনকে হঠাৎ বা আকস্মিকভাবে হত্যা করা হয়নি। কমপক্ষে তিনঘণ্টা নির্যাতন করে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। শুধু তাই নয় এই নির্মম পাশবিক ঘটনার ভিডিও করা হয়েছে যা পরে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বেশ কিছু লোক এ দৃশ্য দেখেছে! দেখেছে না বলে বলা উচিৎ ছিল উপভোগ করেছে। এরাতো নয়-ই আশেপাশের কেউ এই ঘটনা চলাকালীন প্রতিবাদ করেনি। অন্য কাউকে সংবাদও দেয়নি, পুলিশেও খবর দেয়নি। এমন ঘটনা সত্যি বিরল। ভাবতে অবাক লাগে তিনঘন্টার মধ্যেও প্রতিবাদ করার বাধা দেওয়ার কোনো লোক সেখানে ছিল না। (এখন অবশ্য ওদের অনেকে খুনীদের বিচার দাবি করছে) এই ঘটনার আরেকটি মারাত্মক দিক আছে। তা হলো ঘটনার ভিডিও করিয়েছে খুনীরা এবং ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়েছেও তা তারাই। সাধারণত মানুষ কোনো অপরাধ করলে তা লুকাতে চায় গোপন করতে চায় এবং তার কোনো সাক্ষী রাখতে চায় না। এক্ষেত্রে একটি হত্যাকাণ্ডকে তারা ভিডিও করে তা প্রচার করার মধ্য দিয়ে কী বার্তা দিতে চেয়েছিল, কী বোঝাতে চেয়েছিল? এটি কি দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি সমাজের প্রতি প্রশাসনের প্রতি একটি তুচ্ছতা প্রদর্শন? আমরা এমন ঘটনা ঘটাতে পারি আর সমাজ বা রাষ্ট্র আমাদের কিছুই করতে পারবে না? তারা কি হিরো বা ডন হতে চেয়েছিল? বোম্বের ছবির গডফাদার চরিত্রের মতো? একটি রাষ্ট্র বা সমাজের অপরাধচিত্রের স্তর কতটা নিম্নমুখী হলে এমন ঘটনা ঘটানোর সাহস পায় কেউ। সমাজে খুনীরা সমাদর পায় দেখে তারা কি সে সমাজে নিজেদের সাহসী খুনী হিসেবে পরিচিত করার চেষ্টা করছিল?
রাজনের ঘটনাটির নির্মমতা ও সে নির্মমতার চিত্র প্রকাশ হওয়ার কারণে বেশি ক্ষুব্ধ ও আহত করেছে মানুষকে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এমন ঘটনা বাংলাদেশের কোথাও না কোথাও প্রতিদিনই ঘটছে। একাধিক ঘটনা ঘটছে।
কোনো কোনো ঘটনা হয়ত এর চেয়ে ভয়াবহ ও নৃশংস। প্রতিদিন চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি ছিনতাই ঘটনার সাথে খুনের ঘটনাও ঘটছে যা দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাথে সম্পৃক্ত। কিন্তু পারিবারিক নৃশংসতা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ভয়ানকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে সাম্প্রতিককালে। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতা খুললেই, কিংবা টেলিভিশন খুললেই এমন নির্মম, নৃশংস ঘটনার সংবাদ পাচ্ছি। পিতার হাতে পুত্র বা পুত্রের হাতে পিতা খুন, স্বামীর হাতে স্ত্রী বা স্ত্রীর হাতে স্বামী খুন। বাবা-মার হাতে সন্তান খুন। চাচার হাতে ভাতিজা বা মামা মামীর হাতে ভাগ্নে খুন যেন নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে উঠেছে। গৃহ পরিচারিকার খুন হওয়াতো প্রায় স্বাভাবিক ঘটনার পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনে নির্যাতন ও যৌন হয়রানির ঘটনা এত বেশি ঘটছে যে তা এখন অনেক সময় আলোচনায়ও আসে। যেন ছাত্রীদের যৌন নির্যাতনের শিকার হতেই হবে এটাই স্বাভাবিক।
বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে এসব ঘটনাকে অতি অস্বাভাবিক বলে মনে হবে। কারণ বাঙালি প্রকৃতই শান্ত জাতি। কলহ বিবাদ হলেও খুন খারাবির ঘটনা এ অঞ্চলে খুব কমই ঘটেছে। আর আমাদের দীর্ঘকালের সামাজিক যে বন্ধন ও সংস্কৃতি তার সাথে এসব ঘটনা একেবারেই বিপরীত। প্রশ্ন হলো তাহলে বর্তমানে আমাদের সমাজ এমন অমানবিক হয়ে উঠল কেন? এর উত্তর খুঁজতে গেলে একটু পেছনে ফিরতে হবে। মনে করতে হবে জাতির কিছু কলঙ্কময় স্মৃতিকে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। বিশ্ব সভ্যতার সকল রীতিনীতি ভঙ্গ করে একটি জাতির জনককে, একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাকে, একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে সপরিবারে হত্যা করা হলো। তখনো সূর্য উদিত হয়নি। ভোরের আলো ফোটেনি। একটি শিশু প্রত্যক্ষ করলো কিছু ঘাতক তাদের বাড়িতে ঢুকে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করছে। উন্মত্ত হত্যালীলায় মেতে উঠেছে ঘাতকরা। শিশুটি এ দৃশ্য দেখে চিৎকার করে কাঁদছে। বারবার বলছে, ‘আমি মায়ের কাছে যাব।’ শিশুটি তখনো জানে না। এই ঘাতকরা মাত্র কিছুক্ষণ আগে তার পিতা, বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও তার স্ত্রী, যিনি ছিলেন তাঁর সকল প্রেরণার উৎস, তাঁকেও হত্যা করেছে। শিশুটির আবদার শুনে এক ঘাতক এগিয়ে এসে বলল, ‘মায়ের কাছে যাবে? এসো ! বলে সে শিশুকে বঙ্গবন্ধু যার নাম রেখেছিলেন তাঁর প্রিয় দার্শনিক রাসেলের নামে। গুলি করে ঘাতকরা। এর পরের ইতিহাস চরম বর্বরতা, পৈশাচিকতা ও অমানবিকতার ইতিহাস। সেদিনের সে নির্মম হত্যাকাণ্ডের নিন্দাতো দূরের কথা এই হত্যাকান্ডের বিচার হতে না পারার জন্যে ‘ইন্ডেমনিটি বিল’ও পাশ করেছিল খুনী মোশতাকচক্র। এই নৃশংসতার নিন্দাতো দুরের কথা এই বর্বরতম দিনে, বাঙালি জাতির শোকের দিনে সভ্যতার কলঙ্কের দিনে আজও জন্মদিনের কেক কেটে উৎসব করে দেশের একটি বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নেত্রী। এবং তাতে কোনো প্রকার গ্লানিবোধ করে না এক শ্রেণির শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী ও সুশীল বলে পরিচিত লোকেরা। এদেশে বর্বরতার শুরু, অমানবিকতার শুরু, হত্যা ও নির্যাতনের শুরুতো তখন থেকেই। এবং এরপর থেকে অবিরাম শুরু হয়েছে সমাজ থেকে মানবতাবোধ, শুভবোধ ও শালীনতাকে দূর করার প্রক্রিয়া।
এর কয়েকমাস পরে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরে জেলের অভ্যন্তরে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে। জেল বা কারাগার হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ স্থান। যেখানে একজন বন্দির পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান করে সরকার। যেখানে একজন কয়েদিকে হত্যাতো দূরের কথা কোনো কয়েদি আত্মহত্যা করারও সুযোগ পায় না। এই ঘৃণ্য, নৃশংস ঘটনাকেও স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে বাধ্য করা হয়েছিল সমাজকে। এরপরে হত্যার ইতিহাস আরও প্রলম্বিত হয়েছে। যুক্ত হয়েছে নব নব নারকীয়তা। ভোতা হয়েছে জনগণের আত্মমর্যাদা, আদর্শ মূল্যবোধ ও শুভবোধ। প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে আওয়ামী লীগ নেতা ময়েজউদ্দিনকে। প্রকাশ্যে জনসভায় হত্যা করা হয়েছে, আহসানউল্লাহ মাস্টার, এ, এ, এম এস কিবরিয়ার মতো পরিচ্ছন্ন রাজনীতিকদের। হত্যা করা হয়েছে জাসদ নেতা ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির অন্যতম উদ্যোক্তা কাজী আরেফ আহমেদকে। সন্ত্রাসবিরোধী জনসভায় বঙ্গবন্ধু অ্যাভেনিউর মতো স্থানে বঙ্গবন্ধু কন্যা ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড হামলা করা হয়েছে। শেখ হাসিনা সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের ২৭জন নেতাকর্মীকে। শরীরে আঘাত ও গ্রেনেডের স্প্লিন্টার নিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে শতাধিক নেতাকর্মীকে। গির্জায় বোমা হামলা নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলা, সিনেমা হলে বোমা হামলা, পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা, উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলা, সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলা ও আদালত ভবনে বোমা হামলায় শত শত মানুষকে হত্যা ও পঙ্গু করা হয়েছে। এক সাথে ৬৩ জেলায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। আর সর্বশেষ গত ২০১২ ও ১৩ সালে যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর রায়কে কেন্দ্র করে সারা বাংলাদেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল। ২০১৩- ১৪ ও ১৫ সালে আন্দোলনের নামে হেফাজত- জামায়াত ও বিএনপি বা হেজাবিরা যে হত্যা লীলা শুরু করেছিল তার নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার লাভ করেছে সমাজে। দিনের পর দিন পেট্রোল বোমায় নারী শিশুসহ নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে এ দেশের মানুষকে। অগ্নিদগ্ধ মানুষদের আহাজারীতে ভারী হয়ে ওঠা দৃশ্য দেখতে দেখতে দর্শকের মনোজগতে এক প্রকার নিষ্ঠুরতার জন্ম নিয়েছে। মানুষ হারিয়ে ফেলেছে তার বোধবুদ্ধি। মানুষকে, সমাজকে করে তোলা হয়েছে চেতনাহীন রোবটে। একটি দুটি মৃত্যু, দুর্ঘটনা, হত্যা, নৃশংসতা মানুষকে আর স্পর্শ করে না। শুধু বাংলাদেশে নয়। টেলিভিশন বা সংবাদপত্রে বিশ্বের কোথাও না কোথাও ঘটে যাওয়া এসব নিষ্ঠুর ঘটনা আমাদের প্রতিদিনই প্রত্যক্ষ করতে হয়। আমাদের শিশুরা তা অবলীলায় দেখছে। এবং এভাবে গত প্রায় ২ দশক ধরে একটি প্রজন্ম গড়ে উঠল সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক ও অমানবিক পরিবেশে। একদিকে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে অন্যদিকে এমন অধিকাংশ ঘটনার বিচার হয়নি। অপরাধীরা সমাজে দাপটের সাথে চলাফেরা করেছে। এই যে বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও দীর্ঘদিনের বিচারহীনতা এর ফলেও সমাজে অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরাধীরা পুনর্বার অপরাধ করার শক্তি সাহস পেয়েছে।
রাজনের এই ঘটনাই শেষ ঘটনা ভাবার কোনো কারণ নেই। রাজনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই উত্তেজনা অচিরেই স্থিমিত হয়ে যাবে। আরেকটি ঘটনা ঘটবে এবং আমরা সবাই আবার সে ঘটনার পেছনে দৌড়াতে থাকব। এ ধরনের হিংস্র অমানবিক ঘটনা সমাজে ঘটতেই থাকবে। যদি না আমরা সমাজে সভ্যতার চর্চা না করি। শালীনতা, ধৈর্য্য ও অন্যের মতামতকে সম্মান প্রকাশের প্রক্রিয়া ও চর্চা শুরু না করি।
গত ৪৫ বছরে বাংলাদেশের অর্জন কম নয়। অন্তত গত ৬/৭ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা বিস্ময়কর। শুধু যে সরকার দাবি করছে তাই নয়, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও স্বীকার করছে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে শিগগিরই। অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে সফলতা ও অগ্রযাত্রা অর্জিত হলেও সমাজের মধ্যে উদারতার চর্চা, আধুনিকতার চর্চা, মানবতা ও শুভবোধের চর্চার অপমৃত্যু হয়েছে। এর স্থান দখল করেছে চরম অসহিষ্ণুতা, মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ। জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িক শক্তি চায় সমাজে এমন অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করুক। এর মাধ্যমে তারা তাদের লক্ষ্য পূরণ করবে। তাদের সে লক্ষ্যটা কী? একটি শিশুর মনোজগত তৈরি হয় অর্থাৎ একজন মানুষ বড় হয়ে কী হবে তা নির্ধারিত হয়ে যায় তার প্রাথমিক দশ বছর বয়সেই। এই বয়স থেকে শিশুরা যদি কোনো হিংসাত্মক পরিবেশে বড় হয় তখন তার ভেতরেও জন্ম নেয় নিষ্ঠুরতা। তা ছাড়া প্রতিদিন যদি হত্যা, ধ্বংস, নৈরাজ্য আর মৃত্যুর দৃশ্য দেখতে হয় সে মানুষতো এমনিতেই মানসিক সুস্থতা হারাবে। আর এমন মানসিক সুস্থতা হারানো তরুণদেরই জঙ্গিবাদ সহজেই আকৃষ্ট করে বা করতে পারে। কাজেই রাজনের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হলেই যে এমন ঘটনা রাতারাতি বন্ধ হয়ে যাবে তা ভাবার কোনো কারণ নেই। এমন ঘটনা বন্ধ করতে হলে হাত দিতে হবে শেকড়ে। শিশু রাসেল হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যে বর্বরতার যুগে প্রবেশ করেছিল তা থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারছি না। মনে রাখতে হবে একটি হত্যাকাণ্ড আরেকটি হত্যাকাণ্ডের পথ প্রশস্ত করে। একটি অপরাধ আরেকটি অপরাধকে উৎসাহিত করে। বাংলাদেশে হত্যা করে পার পেয়ে যাওয়ার কিংবা হত্যাকারীদের পুরস্কৃত করার যে ধারা চালু করা হয়েছিল একদিন আজ তার খেসারত দিচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্র। ধর্মের নামে ধর্মান্ধতার চর্চা, ধর্মের লেবাসে অপরাধ সংঘটিত করার চেষ্টা সমাজকে প্রতিনিয়ত পেছনে ও অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। বঙ্গবন্ধু ও চারনেতা হত্যার বিচার হলে পরবর্তীতে জেনারেল জিয়ার হত্যাকাণ্ড ঠেকানো যেত। সে রাতের নারী শিশু হত্যার বিচার হলে দেশে নারী শিশু হত্যার প্রবণতা হ্রাস পেত। বিচারের সুস্থসংস্কৃতি চালু হতো।
প্রসঙ্গান্তরে আরেকটি কথা না বললে নয়। ২০১৩-১৪ ও ১৫ সালে হেজাবিরা সারা দেশে যে নৈরাজ্য, হত্যা ও ধ্বংসলীলা সাধন করেছে তখন সাধারণ মানুষ থেকেই দাবি উঠেছিল সরকার যেন জনগণের জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়। সরকার তা করতে গিয়ে প্রতিবারই ক্ষমতা বাড়িয়েছে পুলিশের। প্রতাপ বাড়িয়েছে সরকারি আমলাদের তাই কোনো কোনো ক্ষেত্রে এদের দৌর্দণ্ড প্রতাপে জনগণতো বটে খোদ সরকারি দলের নেতাকর্মীরাও অনেক সময় তটস্ত থাকেন। এটি কোনো শুভ লক্ষণ নয়। অন্যদিকে পুলিশের পদপদবি, সম্মান ও বেতন বাড়ানোর পরও ওই বিভাগে সামান্যতক দায়িত্ববোধ বাড়েনি তার প্রমাণ পাওয়া গেল রাজন হত্যাকারী কামরুলকে ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে সৌদী আরবে পালিয়ে যেতে সহায়তা করার অভিযোগ শুনে আমি ভাবছি সারা রমজান ও ঈদ উপলক্ষে পুলিশের তো বাড়তি আয়ের অভাব নেই। একটি নিরপরাধ শিশুর হত্যাকারীকে পালাতে সাহায্য করার বিনিময়ে সামান্য ১২ লাখ টাকা না নিলেই কি তাদের হতো না?
আসলে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের বিবেকের পূর্ণ প্রাণ ফিরে না আসা পর্যন্ত বোধহয় কোনো আশার বাণী নেই আমাদের জন্যে।
Email:[email protected]

সর্বশেষ সংবাদ