মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে মৃৎশিল্প

পোস্ট করা হয়েছে 09/07/2015-05:44pm:   
শাহাদাত হোসেন/লেখক ও সাংবাদিক ।। মীরসরাই
একেকটি শিল্পের বিস্তারের পেছনে রয়েছে একেকটি দেশ বা জাতির অবদান। তেমনই একটি শিল্প হচ্ছে মৃৎশিল্প। বাঙালীর শত বছরেরর পুরনো ঐতিহ্য মৃৎশিল্প। মৃৎশিল্প” শব্দটি ”মৃৎ” এবং ”শিল্প” এই দুই শব্দের মিলত রূপ । ”মৃৎ” শব্দের অর্থ মৃত্তিকা বা মাটি আর ”শিল্প” বলতে এখানে সুন্দর ও সৃষ্টিশীলতাকে বোঝানো হয়েছে ।। এজন্য মাটি দিয়ে দিয়ে তৈরি সব শিল্পকে কর্মকেই মৃৎ শিল্প বলা যায়। প্রাচীনকাল থেকে বংশনুক্রমে গড়ে ওঠা গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎ শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। যারা মাটি নিয়ে কাজ করে পেশায় তারা কুমার বা পাল । দিন দিন যে ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে তাতে তারা পেশা নিয়ে বেশ চিন্তিত । তারপরও দেশে এমন এলাকা বা এমন গ্রাম আছে যেখানে এখনো বাংলার ঐতিহ্য তারা ধরে রেখেছে। এমনি একটি গ্রাম হচ্ছে মীরসরাই উপজেলার ১০ নং মিঠানালা ইউনিয়নের পূর্ব মলিয়াইশ কুমার পাড়া । পুরানো একটি ছোট পাড়া। এ পাড়ায় বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা শতাধিকের উপরে। শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা কম হলেও কর্মঠ মানুষের সংখ্যা বেশি । ঐ পাড়ার সবাই হিন্দু ধর্মাবলম্বী । বাড়ির ভেতর ঢুকে দেখা গেল প্রায় সব ঘর গুলোই মাটির তৈরী। বাড়ির সামনে ছোট্ট উঠান। উঠানজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কাদামাটির তৈরি হাঁড়ি, পাতিল, কড়াই, কলস, দইয়ের বাটিসহ ছোট-বড় নানা রকমের পাত্র। তাদের শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মান অনুন্নত। আধুনিকতার প্রবল স্রোতে বাংলার প্রাচীন এই শিল্পের সাথে সাথে হারিয়ে যেতে বসেছে এই শিল্পের সাথে বহু বছর ধরে জড়িত মানুষগুলোও।বর্তমান সভ্যতার সাথে পেরে উঠছেনা এই মাটির কারিগররা। আগে মাটির বাসন কোসন সহ বিভিন্ন মাটির তৈরী দ্রব্যাদি ব্যবহার হলেও মেলামাইন,এ্যালুমুনিয়াম ও প্লাস্টিকের ব্যাপক ব্যাবহারের ফলে এসব আজ কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তারা এই পেশা ছেড়ে এখন অন্য পেশায় নিয়োজিত হয়েছে ব্যপক হারে। আধুনিকতার নির্মম স্পর্শে এই শিল্পের কদর দিন দিন কমে যাচ্ছে। বলতে গেলে বিলুপ্তির পথে এই শিল্প। এবং এই শিল্পের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা আজ অসহায় ও নি:স্ব হয়ে পড়ছে। তারা হারাতে বসেছে তাদের নিপুণ শৈল্পীক গুণাবলী। একসময় এসব মাটির সামগ্রীগুলো গ্রাম বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে দেখা যেত কিন্তু এখন এসব সামগ্রী সমাজের গুটি কয়েক উচ্চবিত্তদের ঘরে শোপিচের মধ্যেই সীমাবদ্ব। এতকিছুর পরও অনেকে শত কষ্টের মাঝেও বাপ-দাদার ঐতিহ্য ধরে রাখার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মলিয়াইশ কুমার পাড়ার একজন বয়োজৈষ্ঠ কুমার মনমোহন পালের সাথে কথা হলে উনি কুমারদের বর্তমান অবস্থার কথা জানান।কথা বলে জানা যায়,বহু আগে তার দাদার দাদারা এ গ্রামে এসেছিলেন । তখন থেকে এখানে হিন্দু পাল বংশের আর্বিভাব। পালদের আনা হয় প্রতিমা, মুর্তি ,হাড়ি পাতিল বানানোর কাজের জন্য তবে শুধু রাজা -জমিদারদের জন্য। কিন্তু রাজা- জমিদারদের প্রথা উঠে যাওয়ার পর কুমার পল্লী গ্রামের কুমাররা বেকার হয়ে যায়। পরে তারা নিজেরা মাটির বাসন তৈরি করে নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন বাজারে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতে শুরু করেন। এ নিয়ম চলে আসছে অনেক বছর ধরে নিখুঁত হাতের ছোঁয়ায় মাটির বাসন কোসন বানানো সম্পর্কে তিনি বলেন ছোট বেলা থেকে চেষ্টা সাধনা করলেই এমন কাজ সহজে পারা যায়। তা ছাড়া এ বংশে যারা জম্ম গ্রহন করে ঈশ্বর প্রদত্ত ক্ষমতা তাদের মধ্যে থেকে যায় এসব তৈরিতে। বর্তমানে মলিয়াইশ কুমার পাড়ায় প্রায় আড়াইশত কুমার রয়েছে।বিগত ১০/১২ বছর আগেও সবাই এই পেশায় থাকলেও এখন এই পেশা থেকে সরে গিয়ে বিদেশ যাত্রাসহ বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে জড়িয়ে পড়ছে। তিনি নিজেও আগে এই পেশায় জড়িত থাকলেও বর্তমানে তিনি এই কাজ করেন না। এই কুমার বাড়ীতে ঢুকলে চোখে পড়বে হাড়ি আর মাটির তৈরির বাসন। কোনগুলো কাঁচা ,অর্থাৎ পোড়ানো হয়নি আবার কিছু শুকিয়ে রাখা হয়েছে, কিছু পুড়িয়ে রং করে বিক্রির জন্য তৈরী করা হচ্ছে। আরেক পুরানো কুমার কৃষ্ণ দেব পালের সঙ্গে কথা হয়, তিনি জানান, “এসব মাটি পুকুর বা জমিন থেকে নিয়ে পরিষ্কার করে রাখা হয়।এসব মাটি দিয়ে তরি হয় নানা ধরনের মাটির তৈজসপত্র।প্রাথমিক অবস্থায় কাঁচা মাটির সামগ্রী গুলো প্রথমে রোদে শুকানো হয় তারপর আগুনে পোড়ানো হয়। যে স্থানে এগুলো পোড়ানো হয় তাকে বলা হয় “মইলা”। মাটির নিচে সুড়ঙ্গ কাটার পর তার উপর খড়ের ভেতর মাটির তৈরী শুকনো কাঁচা সামগ্রী গুলো ভাঁজ করে রেখে নিচে আগুন দেয়া হয়।খড়ের উপরের অংশটি মাটির প্রলেপ দিয়ে ঢেকে দেয়া হয় এবং ঐ প্রলেপের উপর বাঁশের কঞ্চি দিয়ে অনেক গুলো ফুটো করে দেয়া হয় যেন ধোঁয়া বের হয়ে যেতে পারে। সামগ্রী গুলো পোড়ানো হলে পরবর্তীতে এগুলো রং করা হয় এবং বিক্রি করার জন্য প্রস্তুত করা হয়।”তবে মজার কথা হচ্ছে, মাটির সামগ্রী পোড়ানোর আগে অর্থাৎ কাঁচা অবস্থায় হাজার টাকা দিলেও কোনভাবেই বিক্রি করেন না। এতে তাদের ক্ষতি হতে পারে। শেলী রানী পাল বলেন, “মাটির এসব কাজ আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য। আমাদের কয়েক পুরুষ এ কাজ করে আসছে। আমরাও করছি। মাঠ থেকে মাটি এনে পণ্য তৈরি করে বিক্রি পর্যন্ত প্রায় সব কাজই করি। স্বামীও আমার সঙ্গে কাজ করেন। আর এ কাজ করেই আমাদের সংসার চলে। এ কাজ করতে ভালোই লাগে। আর সারা বছরের তুলনায় পূজা, ঈদ বা বৈশাখের সময় কাজের চাহিদা বেশি থাকে।” যুগ এখন অনেক পাল্টে গেছে। দিন দিন এই শিল্প এখন অবহেলার পাত্র হয়ে গেছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় এই শিল্প এখন হারিয়ে যাচ্ছে। এখন গৃহস্থালী কাজে প্লাস্টিক, সিলভার, পিতল ও অত্যাধুনিক বিভিন্ন জিনিস এর তৈরি জিনিস পত্র বেশি ব্যবহৃত হয়। জ্বালানি কাঠ ও রঙের দামও বেশি। তাই এখন মাটির কাজ করে তেমন লাভ হয় না। এসব কুমার পল্লীর কুমাররা মনে করেন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক সংস্থার সহযোগিতা পেলে নিজেদের স্বাবলম্বী করা সহ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাঙালীর পুরনো ঐতিহ্য ধরে রাখা সম্ভব হবে। অন্যথায় অচিরেই এই পেশায় নিয়েজিত কুমারগোষ্ঠী সহ ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি হারিয়ে যাবে।

সর্বশেষ সংবাদ