‘সুজিতের দায়িত্ব নিতে হবে রাষ্ট্রকেই’ -কামরুল হাসান বাদল কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 19/06/2015-06:20pm:   
চট্টগ্রাম জেলার মীরসরাই উপজেলার হাইতকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৯৯৮ সালের এস.এস.সি পরীক্ষার্থী ছিল সুজিত। পুরো নাম সুজিত বড়ুয়া। বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী এ ছাত্রের রোল নং ছিল ২। দেশের কয়েক লাখ পরীক্ষার্থীর মতো বুকে অনেক স্বপ্ন নিয়ে জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছিল সে। কিন্তু বিধিবাম! সে বছর এস.এস.সি পরীক্ষার প্রায় সব প্রশ্ন পত্র ফাঁস হয়ে যায়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় গণিত পরীক্ষা পুনরায় গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলে সারাদেশে ছাত্ররা আন্দোলন শুরু করে। সে আন্দোলনের ঢেউ এসে লাগে মীরসরাইতেও। পরীক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মীরসরাই এলাকায় সড়ক অবরোধ করে। এক পর্যায়ে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে এবং সে সময় বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে অনেকের সাথে সুজিতকেও আটক করে। এরপরের ঘটনা হৃদয় বিদারক। আটকের আগের সুজিত আর পরের সুজিতের মধ্যে রচিত হয় বিস্তর ফারাক। সুজিতের জীবনে নেমে আসে এক নিকষ-অন্ধকার। স্মৃতি শক্তি হারিয়ে মৃতবৎ বেঁচে থাকে এক স্বপ্নবান মেধাবী তরুণ। কী ঘটেছিল সেদিন? এ বিষয়ে সুজিতের মা নিভা রানী বড়ুয়া ও বোন মুন্নি বড়ুয়ার উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে, “সুজিত খুব মেধাবী ছিল। সে পড়াশোনা ছাড়া আর কিছু চিন্তা করতো না। সেদিন সুজিত রাস্তা অবরোধ করেনি। সে সহপাঠিদের সাথে রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করে। নির্যাতন সইতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়ে সে। বছরের পর বছর চিকিৎসা চালিয়েও ভালো হয়নি সুজিত। গত তিন বছর ধরে একেবারেই স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে যাওয়ায় তার পায়ে শেকল পরিয়ে রাখা হয়।
এ তরুণ ও তার পরিবারের ভাগ্য বিড়ম্বনার এখানেই শেষ হয় নি। ২০০১ সালে সুজিতের বাবা জগদীশ বড়ুয়া মৃত্যুবরণ করলে পরিবারটি একেবারেই নিঃস্ব হয়ে পড়ে। উপায়ন্তরহীন বিধবা নিভা রানী চোখে অন্ধকার দেখেন। অথচ সুজিতের বাবা জগদীশ বড়ুয়া কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। এ দেশ যাদের শৌর্য-বীর্যে ও বীরত্বে স্বাধীন হয়েছে তেমন এক অকুতোভয় যোদ্ধা ছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতার পরে অনেকের ভাগ্যের চাকা বদলে গেলেও জগদীশের পক্ষে তেমন কিছু ঘটেনি। এমন কি তার সন্তানের প্রতি আইনশৃংখলা বাহিনীর অন্যায় অকথ্য নির্যাতনের বিরুদ্ধেও তিনি রুখে দাঁড়াতে পারেননি। একটি বাহিনীর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস ও শক্তি কোনোটাই ছিল না তার। ফলে নিজের জীবনবাজী রাখা যুদ্ধের বিনিময়ে যে দেশ স্বাধীন করেছিলেন সে দেশের পুলিশ বাহিনীর নিমর্মতার ক্ষত দেখতে দেখতে, সইতে সইতে জীবন থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন তিনি।
বর্তমানে সুজিতকে ঘরের মধ্যে খাটের সাথে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে।
তার পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে রাস্তায় বেরুলে সে অস্বাভাবিক আচরণ করে তাই। গত তিন বছর ধরে কোনো প্রকার ওষুধ খাচ্ছে না সুজিত। ফলে তার চিকিৎসা এখন বন্ধই বলা চলে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটানা তিনমাস চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল সুজিতকে। ডাক্তারদের একটি বোর্ডও গঠন করা হয়েছিল। তাতে কোনো ফল হয়নি। আর্থিক কারণে তার উন্নত চিকিৎসা প্রদান সম্ভব হচ্ছে না।
অসুস্থ হয়ে পড়েছে বলেই কি সুজিতকে মেধাবী বলছি? তবে হাইতকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. গিয়াসউদ্দিনের বক্তব্য দেখা যাক, একজন আদর্শ ছাত্রের সবটুকু ছিল সুজিতের। তার এমন পরিণতি দেখে শিক্ষক হিসেবে আমার খুবই খারাপ লাগে। এমন দুর্ঘটনা না হলে সুজিত দেশের সস্পদে পরিণত হতো। পাঠকরা দয়া করে একটু লক্ষ্য করুন। সুজিতের শিক্ষক মহোদয় সুজিতের এ ঘটনাকে ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আমি এ জন্যে শিক্ষক মহোদয়কে দায়ী করছি না। তিনি হয়তো পরিস্থিতি মেটাতে দুর্ঘটনা বলেছেন।
কিন্তু তাঁর এ বক্তব্যের বা এ শব্দটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বঞ্চিত ও অধিকারহীন মানুষদের অসহায়ত্বই যে ভেসে ওঠে তা লক্ষ্য করার মতোই।
সুজিতের অপরাধ কী ছিল? বরং সুজিত ও তার সহপাঠিরা একটি অসঙ্গত সিদ্ধান্তেরইতো প্রতিবাদ করেছিল, তাই না? শিক্ষা জীবনের পেছনে অন্তত দশ বছর ব্যয় করে সুজিতরা জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষার জন্যে প্রস্তুতি নিয়েছিল। প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় তারা নেবে কেন? সুজিতদের মতো ভালো শিক্ষার্থীরাতো চায় না ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র দিয়ে পরীক্ষা দিয়ে কৃতকার্য হতে।
কাজেই পুনঃ পরীক্ষা গ্রহণের প্রতিবাদতো তারা করতেই পারে। তবে প্রতিবাদের নামে কিংবা সড়ক অবরোধের নামে যানবাহন ভাঙচুর করা আইনের দৃষ্টিতে সমীচীন নয়। যুক্তির খাতিরে ধরে নিই সুজিত হয়তো এমন কাজে জড়িতও থাকতে পারে। এর জন্যে আইন আছে। আইনে তার সাজা হতে পারতো। তাই বলে শুধু থানায় নিয়ে নির্যাতন করে একটি কিশোরের জীবনকে পঙ্গু, অথর্ব এবং মৃতপ্রায় করে ফেলা কতটা সমীচীন?
এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? সুজিতের দায় এবং দায়িত্ব কে নেবে?
একটি রাষ্ট্রের পুলিশ এমন আচরণ কীভাবে করতে পারে একজন নাগরিকের সাথে। আদালততো অপ্রাপ্ত বয়স্ক বলে সুজিতের অপরাধের সাজা এতো নির্মমভাবে দিত না। পুলিশ সেদিন সুজিতকে আদালতে না দিয়ে এমন নির্মম নির্যাতন করলো কোন আইনের ব্যাখ্যায়? এ দেশেতো প্রতিদিনই অনেক ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ কতটা সক্রিয়? অথবা গত ৬ জানুয়ারি থেকে প্রায় তিন মাস ধরে চলা বিএনপি-জামায়াতের তাণ্ডবে যে এত এত নিরীহ মানুষ পেট্রোল বোমায় ঝলসে গিয়েছিল তখন এমন দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অ্যাকশন কতটা নির্মম ছিল?
বাংলাদেশে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে।
বর্তামনেও হচ্ছে। এ বাহিনীর দুর্নীতি নিয়ে জনমনে ক্ষোভ দীর্ঘদিনের।
ঔপনিবেশিক আমলের আইন দ্বারা পরিচালিত হয়ে এসেছে এতদিন এ বাহিনী। মুখে যা-ই বলুক কিংবা থানার সম্মুখে যত বড় করেই লেখা থাকুক না কেন ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’ কার্যত তা কখনো হয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু একটি দেশের স্বাধীনতার প্রায় অর্ধ শতকে এসে একটি নিয়মিত বাহিনীর এ ভাবমূর্তি কারও কাম্য নয়। ১৯৯৮ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারই ক্ষমতায় ছিল। তবে ১৯৯৮ সালের সরকার ও বর্তমান সরকারের মধ্যেও যেমন ফারাক আছে তেমনি ১৯৯৮ সালের পুলিশ বাহিনী আর ২০১৫ সালের এ বাহিনীর মধ্যেও কিছু পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে পুলিশ বাহিনী অতীতের যে কোনো সরকারের আমলের তুলনায় ভালো অবস্থানে আছে। পুলিশের অনেক পরিবর্তনের সাথে সাথে এ বাহিনীর সদস্যদেরও মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে। আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। অনেক শিক্ষিত তরুণ এ বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। থানায় গেলে পরিবর্তনগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বেতন ও পদ মর্যাদাও বৃদ্ধি পেয়েছে এ বাহিনীর সদস্যদের। ২০১৩ ও ২০১৫ সালে দেশব্যাপী বিএনপি-জামাত-হেফাজতের তাণ্ডব মোকাবেলায় এ বাহিনী দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। আহত নিহতও হয়েছেন অনেকে। কাজেই আমি আশা করব বর্তমান পুলিশ বাহিনীর ঊদ্ধর্তন কর্তৃপক্ষ সুজিতের বিষয়টি খতিয়ে দেখে দোষী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। এবং সে সাথে সুজিত ও তার পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা করবে। সে সাথে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে তার উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
দেশে অনেক ধরনের সংগঠন আছে যারা এমন অসহায় মানুষের পক্ষে আইনি সহায়তাসহ নানা প্রকার সাহায্য সহযোগিতা করে থাকেন। আমার নিবেদন থাকবে তারা যেন এ অসহায় পরিবার ও অসুস্থ সুজিতের পাশে এসে দাঁড়ায়। আমাদের সমাজ বা রাষ্ট্র ব্যবস্থা এমন অনেক প্রতিভাবান ও মেধাবী তরুণের স্বপ্নভগ্ন করে। এর প্রতিবাদ ও প্রতিকার করা সামর্থ্যবানদের কর্তব্য বলেই আমার মনে হয়।
সুজিতের বাবা মুক্তিযোদ্ধা জগদীশ এক অসাধারণ স্বপ্ন ও আদর্শ বুকে ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আর কখনো ফিরে আসা না হতে পেরে জেনেও এমন হাজার হাজার তরুণ ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধা জগদীশদের ত্যাগ ও বীরত্বে অর্জিত স্বাধীন দেশে তারই সন্তান সামান্য দোষে এমন নির্মম শাস্তি ভোগ করবে নিশ্চয়ই তা জগদীশ বড়ুয়া চাননি।
দেশের একজন নাগরিক হিসেবে একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে সুজিতের ওপর যে অন্যায় হয়েছে তা নিরসনে রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। সুজিতের দায় ও দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে। সুজিতের প্রতি অন্যায় ও নির্মম আচরণ করে পুলিশ যে অপরাধ করেছে তার জন্যে তাদের জবাবদিহি করতে হবে। ১৯৯৮ সালে এস.এস.সি পরীক্ষার্থী হিসেবে সুজিতের বয়স ছিল ১৬ বছর। সে হিসেবে বর্তমানে তার বয়স ৩৩ বছর। সুস্থ থাকলে এতদিনে সুজিতও নিশ্চয় দুয়েক সন্তানের পিতা হতে পারতো। কর্মজীবনে ভালো একটি অবস্থানে থাকতো। তার পরিবারের এ দুর্দশা থাকতো না। গভীর হতাশা আর দুঃখবোধ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা জগদীশকে মৃত্যুবরণ করতে হতো না।
সুজিতের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিয়ে রাষ্ট্র তার দায়িত্ব নিক। আমার স্বদেশ আমার প্রিয় মাতৃভূমির কাছে এমন একটি সভ্য ও মানবিক আচরণ আশা করছি। নিশ্চয়ই আমি অযৌক্তিক ও অতিরিক্তি কিছু দাবি করিনি।
[email protected]

সর্বশেষ সংবাদ
এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।  তথ‌্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি মহোদয়ের শুভ জন্মদিন আজ করোনায় পোশাক কারখানায় ৫৫ শতাংশ কাজ কমে গেছে: রুবানা হক