ছিটমহল’ অভূতপূর্ব সমাধান প্রাপ্তির আনন্দ হোক দীর্ঘস্থায়ী -খন রঞ্জন রায়

পোস্ট করা হয়েছে 15/06/2015-09:22am:   
শেষ পর্যন্ত ৬৯ বছরের অপেক্ষার অবসান হলো বাংলাদেশ ও ভারতের ছিটমহলের অধিবাসীদের। ১৯৭৪ সালের স্থল সীমান্ত চুক্তি ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হওয়ার পর ভারতের রাজ্যসভায় ও লোকসভায় সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয় গত মে মাসের ৭ তারিখ শেষ বিকেলে। ভারতের গণতন্ত্রের জন্য এটি ছিল একটি বিরল মুহুর্ত। কারণ মাত্র ৪৮ ঘন্টার ব্যবধানে রাজ্যসভা ও লোকসভায় সর্বসম্মতিক্রমে এই বিল পাস হয়েছিল। ৬ জুন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশ সফরের সময় দলিল হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সাত দশকের প্রতীক্ষা, মানবতাবোধ, মানবিকতা হীমন্মন্যতা আর সংকীর্ণ স্বার্থবাদিতার অবসান হয়েছে। চার দশক কিংবা দীর্ঘ সাত দশক পর হলেও চুক্তির চূড়ান্ত বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে উভয় দেশই নিজেদের সার্বভৌম সীমান্তের সীমানা রেখা চিহ্নিত করবে।
১৯৪৭ সাল থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত সমস্যার সমন্বিত সমাধানে পৌঁছার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৫৮ সালের নেহরু-নুন চুক্তি এবং ১৯৭৪ সালের সীমান্তচুক্তির মাধ্যমে সীমানা জটিলতার সমাধান খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে ওই দুই চুক্তিতে প্রায় ৬.১ কিলোমিটার অচিহ্নিত সীমান্ত, ছিটমহল বিনিময় ও অপদখলীয় ভূমির বিষয়ে কোনো সমাধান ছিল না। ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরকালে সই হওয়া ১৯৭৪ সালের সীমান্তচুক্তির প্রটোকলে সীমান্তে সব সমস্যার সমাধান ছিল। ওই প্রটোকলে সীমান্তে অচিহ্নিত অংশগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ছিটমহল এবং অপদখলীয় ভূমি সমস্যার সমাধান করে স্থায়ী সীমানা চিহ্নিত করা হয়েছে। এর আওতায় বাংলাদেশের ভেতর থাকা ভারতের ১১১টি ছিটমহল (১৭ হাজার ১৬০.৬৩ একর) বাংলাদেশকে দেবে ভারত। অন্যদিকে ভারতের মধ্যে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল (সাত হাজার ১১০.০২ একর) বাংলাদেশ দেবে ভারতকে। অপদখলীয় ভূমি বিনিময়ের ফলে ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে দুই হাজার ৭৭৭.০৩৮ একর জমি পাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে পাবে দুই হাজার ২৬৭.৬৮২ একর। সীমান্তচুক্তি বাস্তবায়নের ফলে দুই দেশের ছিটমহলগুলোর বাসিন্দাদের নাগরিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ হবে। ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির জনগণনা অনুযায়ী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় ১১১টি ছিটমহলের লোকসংখ্যা ৩৭ হাজার ৩৩৪; অন্যদিকে ভারতের ভেতর ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহলের লোকসংখ্যা ১৪ হাজার ২১৫। ছিটমহল বিনিময় হলেও এর বাসিন্দাদের বসতবাড়ি ছাড়তে হবে না। তাঁরা তাঁদের পছন্দ অনুযায়ী নাগরিকত্ব বেছে নিতে পারবেন।
রাজ্যসভায় ভারত বাংলাদেশ স্থল সীমান্ত চুিক্ত দুইবার পাশ হওয়ার আবারো প্রমাণিত হয় মানুষের জন্য আইন, আইনের জন্য মানুষ নয়। প্রধানমন্ত্রী মোদির সফরে দৃঢ়ভাবে প্রমাণিত হলো যদি দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্ব থাকেন তা হলে তাদের মধ্যে অনেক কঠিন সমস্যারই সহজ সমাধান সম্ভব। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে সর্বপ্রথম ১৯৪৮ সালের ৭-৯ ফেব্র“য়ারি কলকাতার আলীপুর সার্ভে বিল্ডিংয়ের তদানীন্তন পাকিস্তান-ভারত আন্তর্জাতিক সীমানা নির্ধারণে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় পশ্চিমবঙ্গের ডিএলআরপিআর দাসগুপ্ত ও তদানীন্তন পাকিস্তানের ডিএলআরএমএ মজিদের নেতৃত্বে দুই দেশের আন্তর্জাতিক সীমানা জরিপ ও জরিপকৃত স্থানের মানচিত্র তৈরির পদ্ধতি ঠিক হয়। এরপর শুরু হয় সীমানা নির্ধারণের কাজ। ওই সময় থেকেই অপদখলীয় এলাকা, ছিটমহল প্রভৃতি সমসা সবার নজরে আসে। ১৯৪৯ সালের ৩ ডিসেম্বর কলকাতায় এবং পরে ১৯৫০ সালের ১২ জানুয়ারি ছিটমহল বিনিময়ের পাশাপাশি সীমান্ত সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ও পাক প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নুন ছিটমহল ও অপদখলীয় জমি বিনিময় বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্ম হলে ১৯৭৪ সালের ১৬ মে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে এ বিষয়ে ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আর এ সাহসি উদ্যোগের কারণে ছিটমহলবাসী বারবার বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করছে গভীর শ্রদ্ধায়। বারবার উচ্চারণ করছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে।
আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে ছিটমহল বিনিময় হয়ে যাওয়ারকালে ওখানকার অপদখলীয় ভূমিতে মানবেতর জীবন যাপনের নাগরিকদের দ্রুতই মূল ভূখণ্ডের নাগরিকদের জীবনমানের সমান স্তরে নিতে হবে। তা করতে না পারলে ছিটমহলের নাগরিকরা রাষ্ট্র ও সমাজের বোঝা হবে। বন্যা, সাইক্লোন, ভূমিকম্প বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর আক্রান্ত এলাকাকে উপদ্রব অঞ্চল বিবেচনায় রাষ্ট্র যেরূপ ভূমিকা গ্রহণ করে, অনুরূপ জরুরিভাবে। ছিটমহরে উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রকে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
ছিটমহলবাসী পূর্বতন রাষ্ট্রকে পরিত্যাগ করে নতুন রাষ্ট্রের অর্র্ন্তভুক্ত হয়ে যদি আবারও অভাব, অভিযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানহীন থাকেন, তাহলে দ্রুতই তাদের আশাভঙ্গ হবে। ছিটমহল বিনিময় শুধু ভূখণ্ডের বিনিময় নয় বরং বিনিময়ের মূল উদ্দেশ্যে নাগরিকের বন্দিত্বে অবসান ও তার মানবিক উন্নয়ন। বাংলাদেশের যে সমস্ত ছিটমহল রয়েছে পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ইত্যাদি জেলা এমনিতেই দেশের অন্যান্য জেলা থেকে পিছিয়ে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে আরও পিছিয়ে পড়া একদল মানুষ। ছিটের এসব মানুষ মানসিকভাবেও দুর্বল চিত্তের। এদের মানসিক উন্নয়নসহ পুনর্বাসনের জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
ছিটমহলবাসীর কষ্ট স্বতন্ত্র, সমস্যাও স্বতন্ত্র। সে জন্য আমাদের এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজই হলো তাদের সমস্যা সমাধানে সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়ে তাদের কর্মক্ষম করা। আমাদের অবশ্যই স্মরণ রাখা দরকার ১৯৪৭ সালে যখন উপমহাদেশ স্বাধীনতা লাভ করেছিল, ঠিক তখনই ছিটমহলবাসী শুধু পরাধীনতার বেড়িতে আবদ্ধ হয়নি, বরং আজীবনের জন্য বন্দি হয়ে যায় নিজেদের ‘ছিটমহল’ নামক জেলখানায়। বঞ্চনা আর আর্তনাদ-নির্যাতনের নির্মম বাস্তবতাই ছিল তাদের জীবন। মিথ্যা দিয়েই তারা দৈনিক প্রয়োজন মেটাত ভিনদেশী ভূমিতে। কপাল মন্দ হলে প্রথমে ভিনদেশ, পরে পুশব্যাকের মাধ্যমে নিজ দেশের জেলের খাঁচায় থাকতে হতো। শুধু তাই নয়, ভারতে থাকা বাংলাদেশী ছিটমহলের নারীরা ভাড়াটে স্বামী জোগাড় করে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনাও বিরল নয়-অহরহ।
তাদের মধ্যে বুকের পাথরচাপা কষ্ট। সরকার ও সংশ্লিষ্টদেরও উচিত, তাদের জীবন মান উন্নয়নে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা। শুধু কথার ফুলঝুরি নয়, বাস্তবায়নই তাদের হৃদয়ের ক্ষত কিছুটা হলেও মুছতে পারে।
জটিল ভূরাজনীতি আজ দীর্ঘ অতীত। ব্রিটিশ কূটকৌশল আর বিভাজন নীতি, অনভিজ্ঞ র‌্যাডক্লিপ ও তার নেতৃত্বাধীন কমিশনের অসারতার কুফল এবং লোভী কুচ রাজা জগদ্বীপেন্দ্র নারায়ণের খলনায়কোচিত কর্মকৌশলের আজ অবসান হয়েছে। তাদের হীন চরিতার্থে দুর্বল ও পিছিয়ে পড়া এক বিরাট জনগোষ্ঠী এখন নাগরিকত্ব পেয়েছে।
এই শুভ দিনটির কামনায় ওদের কেটেছে ৬৮ বছর। দেশহীন, নাগরিকত্বহীন প্রতিটি মুহুর্তেই কেটেছে ওদের দুঃস্বপ্ন আর দুঃসহ যন্ত্রণায়। বিপুলসংখ্যক মানুষ, যারা ইতিহাসের উদ্বাস্তু হিসেবে দিন কাটাচ্ছিল, তাদের মৌলিক অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাই সমাজের বড় চ্যালেঞ্জ। সমাজনীতি নির্ধারণে বিজ্ঞজনেরা বলেন ‘মানুষকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করার প্রক্রিয়ায় প্রবাহমান ধারাকে অত্যাবশ্যকীয় স্বীকৃত কৌশলে পরিণত করাটাই রাষ্ট্রের কাজ।
বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান-বুদ্ধি, মনোগঠিত পরিবর্তন ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে জীবনের মান পরিবর্তনে সহায়তা করা সমাজের দায়িত্ব মানবেতর জীবন থেকে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত বিপুল জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ চিন্তায় প্রয়োজন তাদের শিক্ষা। উন্নত জীবন মান নিশ্চিত করে ডিপ্লেমা শিক্ষা-এটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। স্বীকৃত শিক্ষার কর্মধারা নিশ্চিত করে চলুন মুক্তির আনন্দে বিভোর জনগোষ্ঠীর শিক্ষা চেতনায় আঘাত করি। তবেই সার্থক হবে প্রাপ্তির আনন্দ, উল্লাস হবে দীর্ঘস্থায়ী।
খন রঞ্জন রায়, মহাসচিব ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ।

সর্বশেষ সংবাদ