সামাজিক অপরাধ বনাম মনোজাগতিক সংকট---কামরুল হাসান বাদল কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 25/05/2015-07:32pm:   
হঠাৎ করে খুন-খারাবির মতো ভয়াবহ ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে দেশে। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত সংবাদপত্রে কিংবা টেলিভিশনে এ ধরনের সংবাদ দেখতে-দেখতে, শুনতে-শুনতে সাধারণ মানুষের মনেও সৃষ্টি হচ্ছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। সারাদেশের কথা বাদ দিলাম শুধু চট্টগ্রামের কথাই ধরি। গত কয়েকদিনের ঘটনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি-ব্যাংক ডাকাতির চেষ্টাকালে গার্ডকে, ঘরের ভেতরে মা-মেয়েকে ও বেড়াতে আসা সতীনকে হত্যা, পিতা কর্তৃক তিন শিশু কন্যাকে হত্যা, গৃহকর্তা ও কর্ত্রী কর্তৃক গৃহকর্মী নির্যাতন, গৃহকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যু ইত্যাদি। আর সামান্য কারণে আত্মহত্যার প্রবণতাতো বৃদ্ধি পেয়েছে বেশ আগে থেকেই। এছাড়া সামান্য কথা কাটাকাটি বা জমি-জমা নিয়ে সংঘাত, মারামারি এবং এর ফলে মৃত্যুর মতো ঘটনাতো আকসার ঘটছে।
একটু সুস্থ মাথায় চিন্তা করলে পরিষ্কার হবে যে, পূর্বের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন সমাজে নিষ্ঠুরতা, অমানবিকতার মতো আচারণ বৃদ্ধি পেয়েছে। নারী নির্যাতন তথা নারীদের যৌন হয়রানি নিয়ে তো এখন উত্তপ্ত অবস্থা বিরাজ করছে সামাজিক-রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সে সাথে টেলিভিশনের আলোচনা অনুষ্ঠানগুলোয়ও। বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে সবাইকে। সাধারণ মানুষ থেকে বিশেষ শ্রেণি পর্যন্ত। শেষ পর্যন্ত ভাবনাটি আর ভাবনায় নয় উদ্বিগ্ন করে তুলেছে সবাইকে। সমাজে হঠাৎ এমন নিষ্ঠুরতা বৃদ্ধি পেল কেন? এর কারণ ব্যাখ্যা করতে হলে আমাদের দেখতে হবে আমাদের বর্তমান সামাজিক অবস্থাটা কী।
সমাজ যদি সুস্থ, স্বাভাবিক ও মানবিকবোধ সম্পন্ন হয় তবে সে সমাজে বসবাসকারীদের আচরণও নিশ্চয়ই তা হবে। একটি কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, অন্যের আচরণ দ্বারা শুধু শিশুরা প্রভাবিত হয় তা নয়; বড়দের বেলায় এর অন্যথা হয় না। অর্থাৎ বড়রাও প্রভাবিত হয়। অনেক মনোবিজ্ঞানী, মনোবিশ্লেষক ব্যভিচারের মতো ঘটনার বহুল প্রচারের বিরোধিতা করেন এই কারণে যে, তাতে অন্য কেউ উৎসাহিত হতে পারেন। বিষয়টি মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির অংশ। মানুষ যখন একটি অন্যায় করে তার পর থেকে সে মানসিক একটি যন্ত্রণা ভোগ করে। যাকে বিবেকের দংশনও বলা যেতে পারে। যাদের নার্ভ ভীষণ কঠিন তারা বিবেককেও শাসাতে পারেন আর যারা কিছুটা কোমল তারা মাঝে মধ্যে বিবেকের কাছে হেরে যান। তাই কেউ কেউ অপরাধ জগতে থেকে যান, কেউ কেউ ফিরে আসেন। নিজেকে সংশোধন করে নেন। মানুষ যখন কোনো একটি অন্যায় করে আর বিবেকের দংশনে ভোগে ওই সময় সে তার সপক্ষে কোনো একটি যুক্তি দাঁড় করাতে চায়। যখন কোনো ভাবে সে জানতে পারে এ ধরনের অপরাধ সে একা করেনি তার আগে পরে অনেকেই এমন করেছে কিংবা এর চেয়েও বেশি কিছু করেছে তখন সে তার জেগে ওঠা বিবেককে দমাতে পারে। অনুশোচনা থেকে রেহাই পায় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অধিক উৎসাহে অপরাধ পুনরায় শুরু করে। আমরা স্মরণ করার চেষ্টা করব, ইউরোপসহ পশ্চিমা কিছু দেশে যখন সামাজিক কোনো অপরাধ সংঘটিত হয় তখন তারা এর গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করে দ্রুত। এবং অপরাধী যে মানসিকভাবে অসুস্থ তা সহসাই প্রচার করতে পারে। এর ফলে সমাজে সবার কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয় যে, অপরাধী মানসিকভাবে অসুস্থ বলেই এমন ঘটনা ঘটিয়েছে। কোনো সুস্থ মানুষ এমন নিষ্ঠুর নির্মমতা প্রদর্শন করতে পারেন না। সত্যিকারভাবে অপরাধী মানসিক ভারসাম্যহীন ছিল কি না তা আদালতে প্রমাণ করার বিষয়। যে কারণে পরবর্তী ঘটনাগুলো সংবাদমাধ্যমে তেমন করে আসে না।
তবে হ্যাঁ, পশ্চিমা দেশে এ পর্যন্ত সামাজিক অপরাধের সাথে জড়িতরা বেশিরভাগই মানসিক বিকারগ্রস্ত বলে প্রতীয়মান হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত কিছু জঙ্গিবাদী ঘটনাও তদ্রƒপ। বাংলাদেশে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোও সামাজিক অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সমাজে যখন সুস্থ মানবিক চর্চা হয় না সে সমাজে অমানবিক কর্মকা- বেশি ঘটতে বাধ্য। এই সামাজিক অস্থিরতার কারণ বিশ্লেষণের আগে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। তা হলো কিছু কিছু ঘটনা যেমন মা-মেয়েকে হত্যা, সতীনের হাতে খুন হওয়া বা পিতা কর্তৃক তিন শিশুকন্যা হত্যার মতো ঘটনাগুলো আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতিকে নির্দেশ করে না। নির্দেশ করে সামাজিক ও পারিবারিক নিষ্ঠুরতার। তবে হ্যাঁ আইনশৃংখলা রক্ষাবাহিনীর দায় আছে এক্ষেত্রে। তা হলো অপরাধীদের দ্রুত চিহ্নিত করা ও গ্রেফতার করে সঠিক বিচারের মুখোমুখি করা।
বাংলাদেশে সামাজিক অস্থিরতা বা সমাজকে অমানবিক করে তোলার জন্য দায়ী কিন্তু রাজনীতি। বাংলাদেশের মতো দেশ যেখানে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মানবাধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত নয়, যেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুসংগঠিত নয় সেখানে সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয় রাজনীতি দ্বারা। আর বাংলাদেশের রাজনীতি হচ্ছে প্রতিপক্ষকে বিনাশের রাজনীতি। এখানে এক পক্ষ ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রীয় মূলনীতিও পরিবর্তিত হয়ে যায়। যে কারণে একে অপরকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চায়। এর প্রতিক্রিয়ায় রাজনীতি হয়ে ওঠে সহিংস। আর এর প্রতিক্রিয়া পড়ে সমাজ থেকে পরিবারে পর্যন্ত।
বেশি অতীতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। গত ৬ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি, বিএনপি নেতৃতাধীন ২০ দলীয় জোটের ৯২ দিনের অবরোধ হরতাল চলাকালে প্রায় ২০০ মতো লোকের প্রাণহানি ঘটেছে। আহত হয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে তার দ্বিগুণ। আর্থিক, সামাজিক, পারিবারিভাবে পর্যুদস্ত হয়েছে কয়েক লাখ মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পরিবহন সেক্টর। অর্থনীতি ধ্বংস হয়েছে দেশের। রাজনৈতিক কর্মসূচি বা আন্দোলন-সংগ্রামের নামে পেট্রোলবোমায় দগ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে সাধারণ ও খেটে খাওয়া মানুষদের। টানা তিন মাস শিশু-থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত প্রতিদিন অবলোকন করেছে এই হত্যা, জ্বালাও, পোড়াও, নিষ্ঠুরতা, বীভৎসতা আর বার্নইউনিটে ভুক্তভোগীদের আহাজারি। সমাজে প্রচলিত এই নিষ্ঠুরতা দেখতে দেখতে তা মানুষের মানসজগতে ভয়াবহ এক অনুভূতি তৈরি করেছে।
বিষয়টি এভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। প্রথম কয়েকদিন যখন পেট্রোল বোমায় দগ্ধ হচ্ছিল মানুষ তখন তার ব্যাপক প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা গেছে সমাজে। কিন্তু শেষের দিকে ব্যাপারটি ক্রমেই যেন সহনশীল হয়ে উঠছিল সবার কাছে। গা সওয়া হয়ে উঠেছিল তা। এবং সে সাথে এই নিষ্ঠুর কর্মকা-ে সমর্থন জানিয়ে কারো কারো বক্তৃতা বিবৃতি বা টকশোতে মন্তব্য প্রদান এই নিষ্ঠুরতা বর্বরতাকে স্বাভাবিক করে তুলেছিল কারো কারো কাছে।
মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। কাজেই একটি সামাজিক পরিস্থিতিই নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে ওই সমাজে বাসবাসকারীদের। দেশের বুকে ঘটে যাওয়া দীর্ঘ প্রায় তিন মাসের অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতার একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে সমাজে। সমাজে বাসবাসকারী মানুষের মধ্যে। তারাও হয়ে উঠেছে নিপীড়ক, নিষ্ঠুর। মনোজাগতিক পরিবর্তনের কারণে মানুষের আচরণ হয় উঠেছে অমানবিক।
আন্দোলনের নামে এ ধরনের পৈশাচিক কর্মকা-ে মানুষের ক্ষয়ক্ষতি দেখে অনেকে সরকারকেও দায়ী করেছেন। তারা দাবি জানিয়েছেন জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে। অন্যদিকে সরকারও জনগণের নিরাপত্তার কথা বলে ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর। এর ফলে পুনরায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গণতন্ত্র। দেশ হয়ে উঠেছে পুলিশি রাষ্ট্র।
প্রশ্ন হলো, পুলিশ হয়ত আইনশৃংখলা রক্ষা করল কিন্তু পারিবারিক ও সামাজিক এই নিষ্ঠুরতা বন্ধ করবে কী ভাবে। মানুষের মনোজগতে যে একটি দীর্ঘ নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়েছে তা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? পুলিশতো প্রতিটি পরিবারে গিয়ে সবার নিরাপত্তা বিধান করতে পারবে না। গুরুতর এ সমস্যার সমাধান খুব যে সহজে হবে তা ভাবার অবকাশ নেই। মনে রাখতে হবে কৌশলে ক্ষমতায় থাকা যাবে বটে কিন্তু সমাজকে পরিবর্তন না করে সে ক্ষমতায় থেকেও তো আখেরে লাভ হবে না। সমাজের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে চর্চা হচ্ছে অপসংস্কৃতি, ধর্মান্ধতা, কূপম-ূকতা, অমানবিকতার। এর থেকে সমাজকে দ্রুত বের করে আনাও সহজসাধ্য নয়। সমাজে মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা আগের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি শক্ত অবস্থানে আছে।
২০১৩ ও ২০১৫ সালে বাংলাদেশের বুকে ঘটে যাওয়া অমানবিক কর্মকা-গুলো সমাজকে নিষ্ঠুর ও অমানবিক করে তোলার পেছনে অন্যতম একটি কারণ হিসেবে কাজ করেছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বের নানা দেশে বিশেষ করে মুসলিম দেশসমূহে যুদ্ধ-গৃহযুদ্ধ-আরোপিত যুদ্ধ ও অবরোধের নামে সংঘটিত অমানবিকতা ও আন্তর্জাতিক ইসলামী জঙ্গিদের চরম নিষ্ঠুরতাও একটি কারণ। বর্তমান সময়ে বিশ্বের অনেক দেশে যুদ্ধ বিগ্রহে মানুষ মৃত্যুবরণ করছে, অনেক দেশ থেকে সাধারণ মানুষকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে, জীবন বাঁচাতে অন্য দেশে পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতিদিন মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে অগণিত মানুষ এসবই আমাদের সমাজে একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে মানুষ। মারমুখী হয়ে উঠছে। কথা বলার আগে তর্ক করছে, তর্কের আগে আঘাত করছে এবং অধিকাংশ সময় সে আঘাত হত্যার উদ্দেশ্যে করছে। বাংলাদেশের এই সংকট বিচ্ছিন্ন নয়। তবুও বলতে হয় দেশের রাজনীতি যদি সভ্য হয়ে ওঠে, মানবিক হয়ে ওঠে তাহলে সমাজে তার প্রভাব পড়বে। সমাজও হয়ে উঠবে সহনশীল ও সভ্য। কাজেই বর্তমান এই দঃসময়ের জন্য আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিই মূলত অনেকাংশে দায়ী তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
লেখক : কবি, সাংবাদিক



সর্বশেষ সংবাদ
স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যেকোনো অনিয়ম দুর্নীতি অনুসন্ধান করা হবে: দুদক চেয়ারম্যান কক্সবাজার রেড জোন,শনিবার থেকে আবারো লকডাউন এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।