উচ্চ শিক্ষার পরিপ্রেক্ষিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বনাম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়! নাজিম উদ্দিন চৌধুরী এ্যানেল

পোস্ট করা হয়েছে 24/05/2015-10:56am:    জ্ঞান সম্পদই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তাই ব্যক্তি জীবনে সম্পদ অর্জনের চেয়ে জ্ঞান অর্জনই শ্রেয়। চোখের আলো নয় জ্ঞানের আলোয় আজকের এ পৃথিবী এতো আলোকিত হয়েছে। আজকের এই পৃথিবীর এতো রূপজুলুস সম্ভব হয়েছে উচ্চ শিক্ষার কারণে। উচ্চ শিক্ষা অর্জনের জন্য দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের নাম হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কম হলেও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাকম নয়! মুক্ত বাজার অর্থনীতি ও শিল্পবিপ্লবের কারণে এগিয়ে চলা বিশ্বে পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য এদেশের মানুষকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার বিকল্প নেই। বর্তমান বিশ্বে ঠিকে থাকতে হলে শিক্ষা অর্জন ছাড়া সম্ভব নয় তাই শিক্ষার প্রতি দিন-দিন আগ্রহ বাড়ছে মানুষের। কে ধনী, কে গরীব সবার লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষা অর্জন। তাই গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের সন্তানটিও উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে চায়। পিতামাতার আর্থিক সংকট থাকলেও সন্তানের উচ্চ শিক্ষায় অভাব রাখতে নারাজ দরিদ্র পরিবারগুলো। অনেকে জমিজমা বিক্রি করে খেয়ে না খেয়ে সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াচ্ছেন। বাংলাদেশের অন্য দশটির ক্ষেত্রে বড় সাফল্য না আসলেও শিক্ষা অর্জনে শির্ক্ষাথীদের এই জাগরণ শিক্ষাক্ষেত্রে বড় সাফল্য। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি অঙ্গনে এখন শিক্ষার্থীদের ভীড় পরিলক্ষিত হচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় এসেছে নানা পরিবর্তন। তবে শিক্ষার গুনগত মান উন্নয়নে সাফল্য এখনো অধরা রয়ে গেছে। তারপরও পিএসসি, জেএসসি, এইচএসসি, এসব পরীক্ষায় গণ সাফল্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই গণসাফল্য উচ্চ শিক্ষার দরজায় এসে থমকে যাচ্ছে। কারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সীমিত আসনে ভর্তির সুযোগ সবার কপালে জোটেনা। যে হারে সারা বাংলাদেশ থেকে শিক্ষার্থীরা উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করছে সে হারে উচ্চ শিক্ষা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়নি বাংলাদেশে। দেশের সরকারি পর্যায়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৬টি। ১৬ কোটি মানুষের দেশে বিশাল অংকের উচ্চাবিলাসী বাজেট থাকলেও শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ অপ্রতুল ছিল র্দীঘকাল। তবে ২০১৪ সালের সদ্য ঘোষিত বাজেটে শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই বিশাল বাজেটে প্রতি জেলায় ১টি করে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা উল্লেখ আছে। দেরিতে হলেও এই উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়ও কম নয়। মাত্র ৩৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কিভাবে ১৬ কোটি মানুষের দেশে উচ্চশিক্ষার যোগান দেবে? উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে এই সংকটকে সুযোগে রুপান্তর করে শিক্ষা বাণিজ্য বিস্তারে বাজার তৈরি করতে পেরেছেন দেশের বড় বড় বণিক ব্যবসায়ীরা! তাই উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর অধিকাংশই দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। শিক্ষাবাণিজ্যে দেশে কোচিং সেন্টারের চেয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গুলো দশ ধাপ এগিয়ে আছে। দেশে তাই এখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দিন-দিন বাড়ছে। বিগত মহাজোট সরকারের শেষ সময়ে এসে আরও নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিয়েছিল সরকার। যারা এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পেয়েছে তাদের সৌভাগ্যের শেষ নেই কারণ এসব বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পত্র পাওয়ার পরপরই বিক্রি হয়ে গেছে। উচ্চ শিক্ষায় দেশের মানুষের আগ্রহকে সুযোগ সন্ধানী ব্যবসায়ীরা শিক্ষাবাণিজ্যের উৎসব তৈরি করেছে। আমার এক ব্যবসায়ী বন্ধু একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিরেক্টর তার মুখে শুনেছি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় ৬ মাসে ৯ গুন! তাই যখন যেই দল ক্ষমতায় আসে সেই দলের বড় নেতাদের আগ্রহ বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগ মানেই লাভ আর লাভ! এই কারণেই হয়তো দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা নিয়ে টানাটানি। বাংলাদেশের এমন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল নাম আর অনুমোদন একটি হলেও ভিসি ও ক্যাম্পাস দুইটি! এছাড়া প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে ক্লাস ও পরীক্ষা ছাড়া সার্টিফিকেট বিক্রি অভিযোগ তো আছেই। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে শিক্ষার জন্য মনোরম পরিবেশ আর দৃষ্টি নন্দন ক্যাম্পাস প্রয়োজন হলেও দেশের অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এখনও ভাড়া বিল্ডিং এ। রাজধানী ঢাকার অলি-গলিতে অসংখ্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শোভা পাচ্ছে যার নিচে হোটের রেস্তোরা পাশে নালা নর্দমা। সিএনজি গ্যাস স্টেশন আর নালার উপরে চট্টগ্রামেও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের ভীড় থাকলেও শিক্ষার মান সম্মত পরিবেশ কতটা বজায় আছে তা প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষায় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যয় বেশি হলেও মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান অর্জন অনেকগুন বেশি। তারপরও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চবিত্ত পরিবারের আগ্রহ বেশি। কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক সহিংসতা, খুন, অপহরণ, আন্দোলন, ধর্মঘট, সেশন জট, পরীক্ষা বর্জন ও রাজনৈতিক চাপ ইত্যাদি সমস্যা লেগেই থাকে সেক্ষেত্রে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত হওয়ায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের অস্তির অসুস্থ ও সহিংস রাজনীতির কারণে দরিদ্র পরিবার গুলোর বাতিঘর খ্যাত সন্তানেরা দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রকে পাশ করার আগে লাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। দেশের অনাগত দিনের যোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অবদান অপরিসীম। যদিও দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলো ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ রয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রসংসদ নির্বাচন চালু করে ছাত্র রাজনীতি মুক্ত করা হলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সহ দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক সহিংসতা খুন, গুম, হামলা, মামলা বন্ধ হত। যার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে সস্থি ফিরে আসত। কালের অক্সর্ফোড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নষ্ট রাজনীতির কারণে ঐতিহ্য হারিয়েছে অনেক। তারপরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার আগ্রহ বাংলাদেশে সব শিক্ষার্থীর কিন্তু আসন সীমিত হওয়ায় স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে না। ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ সীমিত হওয়ায় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সুযোগ সন্ধানী হয়ে উঠেছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বনাম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল পুথিগত বিদ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ দেশের অধিকাংশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। জাতীয় ধর্মীয় দিবস সমূহের তেমন কোন গুরুত্ব নেই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনেক প্রতিষ্ঠানে। মহান একুশে ফেব্রুয়ারী, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবসসহ বিভিন্ন দিবস সমূহ প্রায় উপেক্ষিত থাকে অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে। এছাড়া সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডও তেমন নেই। আর যা আছে! তা বাংলাদেশের সংস্কৃতি নয় প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্যের অপসংস্কৃতি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গিলে খাচ্ছে। তাই দেশীয় সংস্কৃতির আবহে সংস্কৃতিমনা শিক্ষার্থী তৈরি হচ্ছে না প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে। পোষাকে আষাকেও এসব বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বাঙালিয়ানা নেই। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ, বিবিএসহ বিভিন্ন বিষয়ে পড়ানো হলেও বাংলাদেশের কোন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়ানো হয় না। যে দেশের ভাষার জন্য মানুষ সংগ্রাম করেছে, প্রাণ দিয়েছে, পেয়েছি অমর একুশে ফেব্রুয়ারী, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সেই দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়ানো হয় না, তা বিশ্বাস করতেও অবাক লাগে! যে দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলা সাবজেক্ট নেই সেই দেশে কেবল ব্যানার সাইনর্বোডে বাংলা লিখে কী সর্বস্তরে বাংলা চালু সম্ভব হবে? বাংলা ভাষার মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে ও বাংলায় উচ্চ শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে অবিলম্বে দেশের সব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। তা না হলে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রে বাংলা শিক্ষা ও বাংলা ভাষা অস্থিত্বের সংকটে পরবে। এমনিতেই দেশের উচ্চ ও মধ্যবিত্ত পরিবারে ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষা দিন-দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ইংরেজি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আছে তাই বাংলাকে বাদ দিয়ে নয়। লেখক, সংগঠক ও কলামিস্ট [email protected]



সর্বশেষ সংবাদ
স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যেকোনো অনিয়ম দুর্নীতি অনুসন্ধান করা হবে: দুদক চেয়ারম্যান কক্সবাজার রেড জোন,শনিবার থেকে আবারো লকডাউন এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।