নবনির্বাচিত তিন তরুণ মেয়রের প্রতিশ্র“তির সাথে আমাদের প্রত্যাশা-খন রঞ্জন রায়,

পোস্ট করা হয়েছে 19/05/2015-09:36pm:   

একটি প্রবাদ আছে, অরণ্যের স্রষ্টা বিধাতা আর নগরের স্রষ্টা মানুষ। এই মহাজগৎ নিয়ে বিধাতার হাতে বহুবিচিত্র কাজ থাকায় মহানগর তৈরির কাজটি তিনি মানুষের হাতেই ছেড়ে দিয়েছেন। অতীতে দীর্ঘ সময় ধরে সুষ্ঠু পরিকল্পনার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে এক একটি নগর। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রধান তিনটি কর্পোরেশন নগর হলো ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম। গত ২৮ এপ্রিল উক্ত তিনটি সিটির মেয়র নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সিটি কর্পোরেশনের মেয়র একটি ব্যবস্থাঘন (গধহধমবসবহঃ ওহঃবহংরাব) পদ। যেহেতু মেয়রের সিদ্ধান্তসমূহে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা প্রতিফলিত হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের অভিব্যক্তি অর্ন্তভুক্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়, সেহেতু জনগণের ভোটে এ পদ পূরণ করার রীতি চলে আসছে। সিটি কর্পোরেশন একটি বিরাট সংগঠন। নানা শাখা-প্রশাখা নিয়ে এর জটিল কাঠামো নির্মিত রয়েছে। এই কাঠামোর মাধ্যমে সিটি কর্পোরেশনের বিশাল কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। এসব কার্যপরিচালনার জন্য বিপুল কর্মীবাহিনী দরকার হয়। ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলররা গত ৬ মে শপথ নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তেজগাঁওয়ের কার্যালয়ে নবনির্বাচিত তিন মেয়রকে শপথবাক্য পাঠ করান। শপথ নিয়ে মেয়ররা নগরকে বাসযোগ্য হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার পূণর্ব্যক্ত করেন। নির্বাচনে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে আনিসুল হক, ঢাকা দক্ষিণে সাঈদ খোকন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে আ জ ম নাছির উদ্দিন নির্বাচিত হন। মেয়রদের আগে তিন সিটি কর্পোরেশনের সাধারণ ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডের ১৭৬ জন কাউন্সিলর শপথ নেন। তাঁদের শপথবাক্য পাঠ করান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।
নবনির্বাচিত নগরপিতা, আপনাদেরকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আপনাদের জন্য রইল আমাদের শুভ কামনা। সাফল্য ও ব্যর্থতার চুলছেঁরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে আপনারা আজ এই আসনে অধিষ্ঠিত। তাই আবারও প্রার্থনা করছি আপনাদের চলার পথ যেন সুগম হয়, আপনারা যেন আমাদের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারেন, আমাদের একজন হিসেবে সব সময় পাশে থাকেন। নির্বাচনে ভোট পড়েছে ঢাকা দক্ষিণ ৪৮.৫৭%, ঢাকা উত্তর ৩৭.২৯%, চট্টগ্রাম ৪৭.৮৯% তিন সিটির নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি দুই লাখ ৪১ হাজার পাঁচ ভোটের ব্যবধানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে জয়ী হয়েছেন মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। আর এক লাখ ৪৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে চট্টগ্রামে আ জ ম নাছির উদ্দিন এবং ঢাকা উত্তরে এক লাখ ৩৫ হাজার ৩৭ ভোটের ব্যবধানে আনিসুল হক তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়েছেন। বরাবরের মতো একবারের নির্বাচনে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মেয়র পদপ্রার্থীরা তাঁদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছেন। প্রার্থীদের কাছ থেকে প্রতিশ্র“তির বন্যা বইছে। গত সাড়ে চার দশকে যা হয়নি কিংবা করা যায়নি, তা পাঁচ বছরে করে ফেলা হবে- এমন কথার ফুলঝুরি নির্বাচনের সময় ঝরবেই। কিন্তু নির্বাচন গেলেই আবার সেই আগের চিত্র।
নগরকে নিয়ে ভাবার মানুষও আছেন কেউ কেউ। নগর নিয়ে তাঁদের মহৎ পরিকল্পনার অন্ত নেই। কেউ দেখতে চান এই নগরকে ‘তিলোত্তমা’। কেউ বানাতে চান এই নগরকে ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নগর’। নগরবাসীর জন্য কত কিছু যে তাঁদের করার পরিকল্পনা ও প্রতিশ্র“তি। তবে এই পৃথিবীতে সুবিধা এই যে কোনো মানুষই তার প্রতিশ্র“তি রক্ষা করতে বাধ্য নন। অথচ প্রত্যেক মানুষেরই যে কোনো প্রতিশ্র“তি দেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে।
দেশপ্রেমের অঙ্গীকার থেকে এখন নগর প্রেমের আকাক্সক্ষা প্রবল ভাবে নাড়া দিচ্ছে। নির্বাচনের আগে নির্বাচিত মেয়রগণ ভোটারদের যেসব প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন, আমরা আশা করি সেসব প্রতিশ্র“তি পূরণে তাঁরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতার পরিচয় দেবেন। আলাদাভাবে বলা যায় নির্বাচিত হলে চট্টগ্রামকে ‘আইডল গ্রিন মেগাসিটি হিসেবে গড়ে তোলার কথা ইশতেহার উল্লেখ করেছিলেন আ জ ম নাছির উদ্দিন। জলাবদ্ধতা রোধে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও বলেছিলেন তিনি। আ জ ম নাছির উদ্দিন নির্বাচনের আগে গত ২২ এপ্রিল ৩২ পৃষ্ঠার ইশতেহার ঘোষণা করেন। ইশতেহারে তিনি নগরের জলাবদ্ধতা দূর, পানি দূষণ ও পানি সংকট দূর, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বনির্ভরতা, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতকরণ, ডিজিটাল নগর গড়ে তোলা, যাতায়াত ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, আবাসন সংকট নিরসন, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, ক্রীড়া ও বিনোদন ব্যবস্থার উন্নয়ন, মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা, গণশৌচাগার উন্নয়ন, আয়বর্ধক প্রকল্প গ্রহণ, ফরমালিনমুক্ত বাজার ব্যবস্থাপনা, আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন।
যে জাতি মিথ্যা প্রতিশ্র“তি দিতে শুধু অভ্যস্ত নয়, মিথ্যা প্রতিশ্র“তি শুনতেও পছন্দ করে, তাঁর অগ্রগতি ও অবস্থার পরিবর্তন অসম্ভব। যে রাষ্ট্রের মানুষ ও শাসক যেমন, তাঁদের রাষ্ট্রটিও তেমন হবে। রাষ্ট্র জনগণকে সৃষ্টি করে না, জনগণই রাষ্ট্র সৃষ্টি করে। রাষ্ট্র যেমন হবে, তার নগরগুলোও সে রকম হবে। জার্মানি যেমন, বার্লিন, হামবুর্গ, মিউনিখও সে রকমই। ফ্রান্স যেমন, প্যারিস, মার্সাই, ষ্ট্রাসবোর্গ তেমনই। সুইজারল্যান্ড যেমন, জুরিখ, বার্ন, জেনেভাও তেমন। আফগানিস্তান যেমন, কাবুল, কান্দাহার, হেরাত সে রকম। সোমালিয়া যেমন মোগাদিসু ঠিক তা-ই। আমাদেরও দায়িত্ব আমরা কেমন নগর চাই। তার প্রতিফল আমাদের কর্মের মাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে।
২০১৪ সালের আগস্ট মাসে ইআইইউ যে সূচক প্রকাশ করেছে তাতে বসবাসের যোগ্যতার দিক দিয়ে ঢাকার চেয়ে এগিয়ে আছে সিরিয়ার দামাস্কাস, পাপুয়া নিউগিনির মোয়েসসি, নাইজেরিয়ার লাগোস ও পাকিস্তানের করাচির মতো শহরও। অথচ দামাস্কাসে নগরবাসীর ঘুম ভাঙে আইএস জঙ্গিগোষ্ঠীর বোমার শব্দে, পোর্ট মোয়েসসি দীর্ঘস্থায়ী সন্ত্রাসের শিকার, লাগোসবাগীও থাকে বোকো হারামের জঙ্গি হামলার হুমকিতে। আর পাকিস্তানের করাচিতে সন্ত্রাসের ভয় তাড়িয়ে বেড়ায় সবাইকে। কানাডা বহু আগে থেকেই উন্নত দেশ, তাই টরন্টোর সঙ্গে ঢাকার তুলনা চলে না। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতি একসময় সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার সমকক্ষ ছিল। স্বাধীনতার চার দশকে ঢাকা যতটুকু এগিয়েছে এর চেয়ে অনেক দ্রুত এগিয়েছে সিঙ্গাপুর সিটি ও কুয়ালালামপুর। বাংলাদেশিরা এখন সিঙ্গাপুর গেলে চকোলেটের খোসা পকেটে রেখে দেয়। রাস্তায় ফেললেই নিশ্চিত জরিমানা। যানজট ছাড়াই প্রতিদিন ৬৩ লাখ মানুষ সিঙ্গাপুর সিটির গণপরিবহনে যাত্রা করে। গাড়ি কেনার আগে সেখানে উচ্চমূল্যের নিবন্ধন সংগ্রহ করতে হয়। তাই এর বদলে স্বস্থিকর গণপরিবহনে যাতায়াত করতে সিঙ্গাপুরবাসীর কোনো অসুবিধা নেই। কুয়ালালামপুরও এখন ঢাকার চেয়ে অনেক ভালো শহর।
টরেন্টো, করাচি, সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুরের মেয়রগণ এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে প্রযুক্তি শিক্ষার মাধ্যমে। তাদের দেশে ডিপ্লোমা শিক্ষার হার মোট শিক্ষিতের ৬০-৭০ শতাংশ। ডিপ্লোমা নার্স সকাল-বিকাল হাসপাতাল রোগীর সেবা করছেন। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নির্ভূলভাবে রোগ নির্ণয় করছে। ফার্মাসিস্ট ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোন ঔষধ বিক্রি করছে না, জড়িত হয়না মাদকদ্রব্য বিক্রির সাথে।
প্রতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষিত ড্রাইভার যত্রতত্র পার্কিং করে না। মাছ, মাংস বাজারজাত করার সময় গরমে, রোদ্রের তাপে যাতে গুণাগুণ নষ্ট না হয় সেই প্রশিক্ষণ তাদের থাকে। স্যানিটারি ইন্সপেক্টরগণের সদা সজাগ থাকেন। রাস্তায় থুথু ফেললে তার শাস্তি ব্যবস্থা করেন। বর্জ্য প্রযুক্তিবিদরা আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ করে গ্যাস, বিদ্যুৎ, জৈবসার উৎপাদন পুনঃ প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়। মূল্যবান ধাতব, রাসায়নিক দ্রব্য প্লাস্টিক সংগ্রহ করা হয়। এই সব দেশগুলোতে বর্জ্য হলো, খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে মূল্যবান। তাদের দেশে মেয়র ও কাউন্সিলরদের মধ্যে অধিকাংশই প্রযুক্তি জ্ঞানধারী । আমাদের নির্বাচিত মেয়রের হাতে কি আলাদিনের চেরাগ আছে? যা দিয়ে প্রযুক্তি জ্ঞানহীন জনবল ও কাউন্সিলরদের মাধ্যমে তাদের নগরকে স্বপ্নপুরী বানাবেন। চিরকাল তরুণেরাই উন্নয়নে এগিয়ে এসেছে, এই দেশের তরুণেরাই দৃঢ় কণ্ঠে বলবে, সময় বদলেছে, প্রেক্ষাপট বদলেছে, নগর প্রেম ও তাদের কন্ঠে মানায়। নতুনের আগমন মানে পুরনোদের প্রস্থান। রাজনীতিতে কথাটি তেমন খুব একটা গ্রহণযোগ্য নয়। প্রবীণরা বরং লড়াকু হয়। তবে এবারের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অনেক চেনা মুখ হারিয়ে গেছে কিছু নতুন মুখের আর্বিভাবে। এবারের নির্বাচিত সাধারণ কাউন্সিলরের মধ্যে অনেকেই নতুনভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। মেয়র তিনজন নতুন এবং তরুণ।
তরুণেরাই পারে সাফল্যের জয়গান গাইতে। প্রধান তিনসিটির দায়িত্ব তিন তরুণের হাতে ন্যাস্ত করে আমরা নির্ভার। আমরা আশান্বিত। রাশিরাশি প্রতিশ্র“তি আর অর্জন বর্জনের নির্বাচনী প্রত্যাশা পূরণে আসুন আমরা সকলে মিলে নগরপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হই।





সর্বশেষ সংবাদ
এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।  তথ‌্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি মহোদয়ের শুভ জন্মদিন আজ করোনায় পোশাক কারখানায় ৫৫ শতাংশ কাজ কমে গেছে: রুবানা হক