লাঞ্ছিত নারী : বিভক্ত জাতি / কামরুল হাসান বাদল কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 23/04/2015-10:58am:    পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বেশ কজন নারী লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনায় সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় বইছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের এই জোয়ারেও প্রতিদিন গণমাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এ সংক্রান্ত বিভিন্ন সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটারসহ নানা ক্ষেত্রে ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে বিষয়টি। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তা শালীনতার মাত্রাও অতিক্রম করছে। বাংলাদেশে সাধারণত যা ঘটে তার মতই এই ঘটনা নিয়েও সম্পূর্ণ বিভক্ত জাতি। একটি অংশ এই ন্যক্কারজনক ঘটনার নিন্দা জানিয়ে অপরাধীদের দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠছে। অন্যপক্ষ এ ঘটনার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত নারীদেরই দায়ি করছে এবং ঘটনাকে লঘু করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। শুধু তাই নয় এ ঘটনা নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ একটি সংবাদ প্রচার করায় একাত্তর টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি ফারজানা রূপাকে সপরিবারে হত্যার হুমকিও দিয়েছে। অর্থাৎ এ ধরনের একটি নিন্দনীয় জঘন্য কাজের বিচারের ক্ষেত্রেও জাতি বিভক্ত মতামত দিচ্ছে। সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কয়েকজন কর্তাব্যক্তি ‘যদি’, ‘তবে’, ‘বোধহয়’, ধরনের আশ্বাস বাণী ব্যক্ত করছেন। বিষয়টিকে প্রথম থেকে বিশ্লেষণ করা যাক। পহেলা বৈশাখের একটি উৎসবে সবাই যোগ দেবে। এটাই স্বাভাবিক। কাজেই এ উৎসবে যোগ দিতে আসা নারীরা কেন অনিরাপদ থাকবে এটিই মুখ্য প্রশ্ন। তা-ও আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠানের চত্বরে। রাতে বা অন্ধকারে নয়। আলোকোজ্জ্বল দিনের বেলা হাজার হাজার মানুষের মধ্যে নারীদের অপমান করার সাহস অর্জন করল তারা কীভাবে? তারা যদি বহিরাগত হয় তবে এখানে তারা এ দুষকর্ম করার সাহস পেল কীভাবে! তারা কি নিশ্চিত ছিল এত মানুষের মধ্যেও তাদের বাধা দেওয়ার কেউ নেই। তবে কি তারা সংগঠিত ছিল। তা-না হলে ঘটনার প্রতিবাদকারী নন্দীর হাত ভাঙলো যারা তারা কারা? অন্যায়ের প্রতিবাদকারীদের যারা আক্রমণ করে তারাতো নিশ্চয়ই অন্যায়কারীদের সহযোগী। তার মানে তারা কি সংখ্যায় অধিক ছিল। শুধু সংগঠিত নয়, বলতে হবে সুসংগঠিত ছিল? কাছে পুলিশ থাকা সত্ত্বেও তারা নির্ভার থাকলো কী করে? পুলিশ অপরাধী দুজনকে ছেড়ে দিল কেন? এদের প্রতি পুলিশের প্রশ্রয় কী কারণে? নারীদের উত্ত্যক্ত করতে যারা গেছে তারা কি শুধু উত্ত্যক্ত করতেই গেছে না কি অন্য সুদূর প্রসারী কোনও লক্ষ্য আছে তাদের। পহেলা বৈশাখকে টার্গেট করে অনেকে মোবাইলে ছবি তুলেছে। কোন উদ্দেশ্যে ছবি তুলেছিল? বিষয়টি কি এমন কোনো একটি পক্ষ এ ধরনের অনুষ্ঠানে নারীদের অংশগ্রহণে বাধাগ্রস্ত করতে চায় এবং পক্ষান্তরে এ ধরনের উৎসবকে বন্ধ করে দিতে চায়। এ প্রসঙ্গে বাঁধনের কথা মনে পড়ল। সম্ভবত ১৯৯৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে থার্টি ফার্স্ট নাইটে তাকে লাঞ্ছিত করা হয়েছিল। এ ঘটনার তেমন বিচার না হলেও থার্টি ফার্স্ট নাইটের অনুষ্ঠানকে সংকুচিত করে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এখন এ রাতে কড়া পুলিশ প্রহরা থাকে শহরে। যদিও আমি এ রাতের বাড়াবাড়ি ধরনের আচরণকে সমর্থন করি না। কোনও পক্ষ কি এমন ভেবেছে যে, এক বাঁধনে থার্টি ফার্স্ট নাইট উৎসব বন্ধ করা গেলে কয়েক বাঁধনে পহেলা বৈশাখ বন্ধ করা যাবে? এ ঘটনার পর সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্নজনের বক্তব্যের সাথে ‘তেঁতুল হুজুর’ বলে পরিচিত মাওলানা শফির বক্তব্যের প্রতিধ্বনি পাওয়া যাচ্ছে। যারা নারীর অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে চায়, নারীর সম-অধিকার ও নারীর ক্ষমতায়নকে ঠেকাতে চায় তারাই এ ক্ষেত্রে দোষ চাপাতে মরিয়া নারীর ওপর। নারী কেন উৎসবে যাবে, নারী কেন প্রকাশ্যে যাবে ইত্যাদি ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন করছে তারা। প্রশ্ন হলো এই ধরনের প্রশ্ন উত্থাপনের জন্যেই কি তবে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছিল? ঘটনা ঘটার পরপরই এর জন্য ছাত্রলীগকে দায়ী করেছেন অনেকে। বাংলাদেশের প্রচলিত প্রবণতা হচ্ছে সবকিছুর জন্যই সরকার বা সরকারি দলকে দায়ী করা। ঘটনার পর এখন পর্যন্ত তেমন কোনও প্রমাণ বা সূত্র পাওয়া না গেলেও অনেকের ভাবতে হয়ত ভালো লাগছে ঘটনার সাথে ছাত্রলীগকে জড়িত করে। একাত্তর টেলিভিশন প্রচারিত ফারজানা রূপার রিপোর্টটি প্রচারের পর একটি উগ্র জঙ্গি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে তাকে সপরিবারে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এখানেও প্রশ্ন হলো ছাত্রলীগই যদি ঘটনা ঘটায় তাহলে আনসারুল্লাহ বাংলা নামের ওই জঙ্গি সংগঠন কেন হত্যার হুমকি দেবে? তবে এ ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের ভূমিকা সন্তোষজনক তো নয়ই, চরম হতাশাজনক সেকথা মানতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রকটরের সীমাহীন দায়িত্বহীনতা আর পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে দোষীদের রক্ষা করার চেষ্টা নিন্দনীয়। সিসিটিভি বসানো হয় সাধারণত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। এ ক্যামেরা মনিটরিং করে কোথাও কোনও অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখলে তা নিয়ন্ত্রণ করা। শুধু মাত্র ভিডিও ফুটেজ দেখে অপরাধী শনাক্ত করা নয়। ফারজানা রূপার রিপোর্টে যে বয়স্ক দাড়িওয়ালা লোকটিকে সন্দেহজনকভাবে দেখা যাচ্ছিল তা কি কন্ট্রোলরুমের কেউ খেয়াল করেনি। কিংবা নারীদের যখন লাঞ্ছিত করা হচ্ছিল তা ক্যামেরার মাধ্যমে কন্ট্রোলরুম পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল। পুলিশ তা সত্ত্বেও ব্যবস্থা নিল না কেন? ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরই পুলিশ আসে’ধারণাটিকে সত্যি প্রমাণ করার জন্য? আসলে কথাগুলো লেখার জন্য লেখা। মূল সমস্যা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা পুলিশ নয়। মূল সমস্যা আমাদের মানসিকতা, প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা এবং পুরুষের ‘মাইন্ড সেট’। নারী যে মানুষ তার নিজের মতো জীবনযাপনের অধিকার যে আছে, তা মেনে নিতে না পারাটাই সমস্যা। শুধু যে মৌলবাদী, ধর্মান্ধ ও জঙ্গিরা নারী প্রগতির বিরুদ্ধে তা নয়। যারা নিজেদের আধুনিক, উদার ও মুক্তচিন্তার বলে দাবি করছেন তাদের মধ্যে অনেকেই এ ক্ষেত্রে চরমভাবে অনুদার। মাঝেমধ্যে বেফাঁস কথায় তাদের আসল চরিত্র বেরিয়ে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা যখন বলেন, ‘রাত নয়টার পরে মেয়েদের বাইরে থাকার দরকার কী’ তখন বুঝতে হবে এ কথাটি তাঁর একার নয়- অনেক পুরুষের কথা। ভদ্রতা ও আধুনিকতার মুখোশের কারণে প্রকাশ করতে পারেন না শুধু। প্রশ্ন তুলেছিলাম অনেক আগে। নারীর মুক্তি ও নিরাপত্তা আসলে কোথায়? আমিতো কোথাও দেখছি না। এক পক্ষ নারীকে নগ্ন-অর্ধনগ্ন করে পণ্যের মতো বিক্রি করছে অন্যপক্ষ তাকে ক্রীতদাসির মতো ঘরের কোণে রেখে ব্যবহার করছে। দুপক্ষই নারীকে দেখছে পণ্য বা ভোগের সামগ্রী হিসেবে, মানুষ হিসেবে নয়। এ দু’পক্ষই আবার নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন নিয়ে বলে থাকে। তবে পুতুল নাচের মতো তার সুতো থাকে কোনও সুনিপুণ কারিগরের হাতে। এখনও নারীর যেটুকু ক্ষমতায়ন তা পুরুষ কর্তৃক নির্ধারিত। মূলত পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষের দেয়া বৃত্তের মধ্যে নারীর অগ্রগতি ও ক্ষমতায়ন বন্দি। একজন নারীর পক্ষেই বলা বা অনুধাবন করা সম্ভব নারীর অসহায়ত্বের কথা। তা কোনও পুরুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ পুরুষতো তাকে পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখেনি- কখনও। এমন একজন নারী কি পাওয়া যাবে যিনি কোনও না কোনও সময়, কোনও না কোনওভাবে কোনও না কোনও পুরুষ কর্তৃক অপমানিত, লাঞ্ছিত হননি? কাজেই নারীমুক্তির জন্য নারীদেরই এগিয়ে আসা উচিত এবং তা সম্পূর্ণ নিজেদের মতো করেই। এক পক্ষের যৌনতার প্রতীক অন্যপক্ষের যৌনজিহাদি না হয়ে নিজেদের মুক্তির পথ নিজেদের তৈরি করে নিতে হবে। নিজেদেরই প্রথমে ‘মানুষ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, নারী হিসেবে নয়। একজন নারী প্রধানমন্ত্রী বা বিরোধীদলের নেত্রী নারী হলেই যে নারীর ক্ষমতায়ন হয়ে গেল তা কিন্তু নয়। আধুনিক পোশাক পরলেই যে একজন নারী আধুনিক হয়ে উঠবে তা কিন্তু নয়। পোশাক বা সাজসজ্জাই যদি আধুনিকতা বা প্রগতির মাপকাঠি হতো তাহলে খালেদা জিয়ার চেয়ে বড় উদারতো এ দেশে থাকার কথা নয়। পোশাকে নয় মানুষ প্রকাশিত তার চিন্তা ও মননে। এখানে পরিবর্তন আনতে না পারলে কার্যত কিছুই হবে না। যেমন বিশ্বের অধিকাংশ নারীই থাকতে চায় পুরুষের অধীনে। কারণ লক্ষ বছর ধরে সমাজ, ধর্ম ও রাষ্ট্র তাকে এ শিক্ষা ও পরিবেশ দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে শুধু নয়। নারী নিগৃহিত ও অপমানিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত, প্রতিটি ক্ষেত্রে। ঘর থেকে বাইরে। স্বামী, সন্তান থেকে শুরু করে সমাজের সর্ব পুরুষের কাছ থেকে। এটিকে যতদিন পর্যন্ত নিয়তি হিসেবে মেনে নেবে ততদিন নারীর মুক্তি অর্জিত হবে না। [email protected]

সর্বশেষ সংবাদ
এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।  তথ‌্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি মহোদয়ের শুভ জন্মদিন আজ করোনায় পোশাক কারখানায় ৫৫ শতাংশ কাজ কমে গেছে: রুবানা হক