"আন্দোলনে বিএনপির কী অর্জিত হলো" - কামরুল হাসান বাদল কবি ওসাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 10/04/2015-01:33pm:    এই মাটির এক আশ্চর্য ও অসাধারণ গুণ আছে। এ মাটি একদিকে রক্তস্পৃহ অন্যদিকে সর্বংসহ। এ দেশে আজ পর্যন্ত বিনা রক্তপাতে বড় কোনো দাবি অর্জিত হয়নি এবং এ মাটিতে জেগে ওঠা কোনো যৌক্তিক দাবিও আদায় না হয়ে থাকেনি। প্রতিবার রক্ত দিয়ে স্নাত করে এ ভূমিকে পবিত্র করে নিতে হয়। তাই এ মাটিতে জন্ম নেওয়া জাতি বাঙালির চরিত্রেও এর লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমরা ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাই ১৭৫৭ সালে কিছু বাঙালির বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাজত্ব করার সুযোগ লাভ করে। যার ফলে ১৯০ বছর ভারতকে ব্রিটিশের গোলামী করতে হয়। আবার অন্যদিকে ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনে সমগ্র ভারতের মধ্যে অবিভক্ত বাংলা বা বাঙালিরা ছিল সর্বাগ্রে। মাস্টারদা সূর্য সেন ও নেতাজী সুভাষ বোস, শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানীসহ অনেকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছেন। বাংলায় ব্রিটিশ নীলকরদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, কৃষক বিদ্রোহ, সন্ন্যাস বিদ্রোহ, ফকির বিদ্রোহের মতো অনেক বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়েছে এ বাংলায়। এসব বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছেন ভবানী পাঠক, তিতুমীর, ফকির মজনু শাহ ও নুরুলদীনের মতো খুব সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা মানুষরা। গত শতকের চল্লিশ দশকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে তরুণদের মধ্যে ছাত্রাবস্থায় নেতাজীর অনুসারী শেখ মুজিবের অবদানও উল্লেখ করার মতো। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক থাকার সুবাদে বঙ্গবন্ধু অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভূমিকা রাখতে পেরেছিলেন। বাঙালির ভুল বা বিশ্বাসঘাতকতার সুযোগে যে ব্রিটিশরা ভারত বর্ষ শাসন ও শোষণ করেছিল তার ঐতিহাসিক দায় মোচনের জন্যই হয়ত ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে বাংলা বা বাঙালির অবদান অন্যান্যের তুলনায় বেশি। নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন ছাড়াও সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সূর্য সেন- নেতাজীও ইতিহাসে অমরত্ব হয়ে আছেন। শুধু রাজনীতিতে নয় শিক্ষা-সাহিত্য, সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও বাংলার স্থান তৎকালীন ভারতের শীর্ষে ছিল। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জয়নুল আবেদীন, সুকান্ত ছাড়াও বাংলার স্বভাব কবিরা অজস্র গান, পদ্য ইত্যাদি রচনা করেছেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। তারপরে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার নামে দেশভাগ। এর পরপরই বাংলাদেশে সংঘটিত হয় মহান ভাষা আন্দোলন। সে থেকে আজ অবধি এ দেশের সকল আন্দোলন সংগ্রামকে সফল করে তুলতে এদেশের মানুষকে রক্ত দিতে হয়েছে। রক্ত দিয়েই প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে নিজেদের দাবিকে। শুরুতেই বলেছিলাম, ‘যৌক্তিক আন্দোলন’। অর্থাৎ যে আন্দোলনের প্রয়োজন আছে, যে আন্দোলনে জন সম্পৃক্ততা আছে। তেমন আন্দোলন ব্যর্থ হয়নি কখনো। তাই আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে গত তিন মাস ধরে বিএনপি বা ২০ দলীয় জোটের লাগাতার আন্দোলনের পরিণতিটা কী হলো তবে? আন্দোলনটি কি ব্যর্থ? তবে তা কি অযৌক্তিক ছিল? আমার এক বন্ধু যিনি ঘোরতর বিএনপি সমর্থক। তাঁকে ক’দিন আগে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা তোমাদের দাবি যেন কী ছিল। কিছুক্ষণ ভাবলেন তিনি। তারপর বললেন, কেন তত্ত্বাধায়ক সরকারের দাবি। তুমি জান না না কি? আমি বললাম হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে। তবে তোমাদের নেতাদের মুখে সরকার পতনের আন্দোলন এ কথা শুনতে শুনতে গুবলেট করে ফেলেছিলাম। বন্ধুটি তৎক্ষণাত বললেন, সরকার পতনের আন্দোলনইতো। আমি বললাম ঠিক আছে। সরকার পতনেরই আন্দোলন। তবে সরকারের পতন কীভাবে হবে। সরকার মানে কি ছাত্রাবাস? রাতারাতি হল খালি করে চলে যাবে একদল, অন্যদল এসে লাঠিসোটা নিয়ে উঠে যাবে হলে? বন্ধুটি বললেন তা কেন? আমাদের নেত্রী বলেছেন, সংসদে ওরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাশ করিয়ে পদত্যাগ করুক। তর্কটা জমে যাচ্ছে দেখে বললাম, বেশ, তা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা কী হবে? আগের সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্ত করেছিল যারা তারাইতো এখন ক্ষমতায়। তারা কেন আবার এ বিল পাশ করতে যাবে। বন্ধুটি উত্তেজিত হয়ে উঠছেন, ‘না মানলে আন্দোলন হবে।’ বললাম- ‘আন্দোলনতো করলে ফল কী হলো।’ ‘আন্দোলনতো করলে ফল কী হলো’ এটি এখন শুধু আমার প্রশ্ন নয়। এটি এখন দেশবাসীর প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে নিয়ে ভাবেন তাদের প্রশ্ন এখন একটিইণ্ড ফল কী হলো। বেগম খালেদা জিয়াতো শেষ পর্যন্ত আদালতে হাজিরা দিলেন। তিন মাস পর রাজনৈতিক অফিস ছেড়ে বাসায় ফিরে গেলেন। সন্তানের কবরে গেছেন, সন্তান শোকে কেঁদেছেন। অন্যদিকে ঢাকা চট্টগ্রামে তাঁর দলের সিনিয়র নেতারা মেয়র নির্বাচনকে সামনে রেখে জনসংযোগ করছেন। পথে পথে সাধারণ মানুষকে জড়িয়ে ধরে ভোট চাইছেন। প্রশ্ন হলো বিএনপিতো সে নির্বাচনের পথেই গেল, নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতেই গেল- কিন্তু মাঝখানে যে প্রায় দেড় শত লোকের প্রাণ গেল বোমা-পেট্রোল বোমায়, অনেকের জীবন যে পঙ্গু হয়ে গেল, অনেকের জীবন যে ধ্বংস হয়ে গেল, অনেকের স্বপ্ন যে ভেঙে গেল সে বিষয়ে কী ব্যাখ্যা দেবে বিএনপি। আজ যে সাধারণ মানুষদের কাছে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করছে বিএনপি, গত তিনমাস ধরে এদেরইতো নির্বিচারে টার্গেট করেছে তারা। গতকাল বুধবার দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় একটি হৃদয় বিদারক ছবি ছাপা হয়েছে। ছবিটির ক্যাপশনে লেখা হয়েছে- ‘পেট্রোলবোমায় দগ্ধ ছেলে নিরঞ্জন সিংহকে অস্ত্রোপচারের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ছেলের বিছানায় মাথা রেখে কাঁদছেন বাবা বাবু সিংহ। গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট থেকে তোলা ছবি। ‘দগ্ধ তিনজনের অবস্থা শঙ্কাজনক, ২০ জন চিকিৎসাধীন-অবরোধ-হরতালে-পেট্রোল বোমা হামলা’ শীর্ষক শিরোনামের সংবাদের ইন্ট্রোতে লেখা হয়েছেণ্ড ‘অবরোধ-হরতালে-পেট্রোল বোমায় দগ্ধ ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. খোকনকে (২২) দুই হাতের সব আঙ্গুল হারাতে হয়েছে। নষ্ট হয়ে গেছে একটি চোখও। পুড়ে গেছে শরীরের বিভিন্ন স্থান। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন।’ একই পত্রিকায় একই তারিখের তৃতীয় পৃষ্ঠায় আছে “পেট্রোল বোমায় নিহত নূর হোসেনের বাবার স্নেহমাখা স্পর্শ কখনোই পাবে না নীলা।” এই শিরোনামের সংবাদের ইন্ট্রোতে লেখা হয়েছে ‘সদ্যজাত নীলা কোনোদিনই খুঁজে পাবে না তার বাবাকে। পাবে না বাবার আদর ভালোবাসা। কিংবা স্নেহমাখা স্পর্শ। নীলা পৃথিবীতে আসার আগেই ‘রাজনীতির’ পেট্রোল বোমা কেড়ে নিয়েছে তার বাবা ট্রাকচালক নূর হোসেনকে।” গত ৬ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া বিএনপির লাগাতার অবরোধ হরতালে এমন ঘটনা প্রতিদিন অনেকবার ঘটেছে। কাজেই এই দুটি শিরোনাম নতুন কিছু নয়। যেহেতু নতুন নয় সেহেতু আজ আমার পাঠকদের খুব বেশি আহত করবে তেমন কিছু নয়। কারণ এই অনুভূতিও গত তিন মাসে ভোতা করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন মানুষকে পুড়তে দেখে, জ্বলতে দেখে, মৃত্যু দেখে, আগুন দেখে, বার্ন ইউনিটে সাধারণ মানুষের আর্তনাদ শুনতে শুনতে এ দেশের মানুষের মানবিক বোধও ভোতা হয়ে গেছে, কারও কারও লুপ্ত হয়ে গেছে। অবশেষে ঘরে ফিরে গেলেন খালেদা জিয়া, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে তার দল। কিন্তু মাঝখানে এত মানুষের মৃত্যু। এত মানুষের ঘর যে পুড়লেন, ভাঙলেন, হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট করলেন, দেশকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করলেন, এসএসসি পরীক্ষার্থীদের শত বিড়ম্বনা আর দুর্গতি দিলেন, শিক্ষা ব্যবস্থাকে হ য ব র ল করলেন, কয়েক হাজার মানুষকে পঙ্গু করলেন। তার কী হবে? এত হত্যা, ক্ষতির বিনিময়ে কী অর্জিত হলো বিএনপির, কী অর্জিত হলো জাতির? গত সপ্তাহের লেখায় বলেছিলাম সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশ। এখানে সবকিছুই সম্ভব। গত প্রায় তিনমাস নির্বিচারে সাধারণ মানুষ হত্যা করার পরেও একটি দলের প্রধান বা শীর্ষ কোনো ব্যক্তি জাতির কাছে লজ্জিত হন না, এমন কি দুঃখ প্রকাশও করেন না। তারা পুনরায় খুব স্বাভাবিকভাবে রাজনীতি করতে পারেন। তাদের কথায় অনেক লোক বিশ্বাসও করে। তাদের এমন কর্মকাণ্ডে সমর্থন জানান কিছু সুশীল শ্রেণিও। তবে এই মাটির একটি বিশেষ গুণের কথা শুরুতে উল্লেখ করেছিলাম। লিখেছিলাম এ মাটিতে কোনো যৌক্তিক দাবিই আদায় না হয়ে থাকেনি। বিএনপির আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। তাদের দাবি পূরণ হবে না। কারণ দাবি যৌক্তিক নয় এবং এ আন্দোলনের চরিত্রও বিগত কোনো আন্দোলনের মতো ছিল না। বিগত আন্দোলনে আন্দোলনকারীদের হত্যা বা নির্যাতন করতো সরকার। আর এ-ই প্রথম একটি আন্দোলন যেখানে আন্দোলনকারীদের টার্গেট সাধারণ মানুষ। তারা নির্বিচারে হত্যা করেছে সাধারণ মানুষকে। সরকারকেই আন্দোলনকারীদের হাত থেকে জনগণকে রক্ষার দায়িত্ব নিতে হয়েছে। বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে অনেকে তিন জোটের রূপরেখা নিয়ে বলতে শুরু করেছেন। এ কথা ঠিক ১৯৯০ এর তিনজোটের রূপরেখা বাস্তবায়িত হলে বর্তমান সংকটগুলো অনেককটাই তৈরি হওয়ার সুযোগ হতো না। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে কীভাবে এই রূপরেখাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং গণতন্ত্রের অভিযাত্রাকে ব্যাহত করেছিল তারও আলোচনা করা উচিত। বর্তমান কলামের কলেবর বৃদ্ধি হবে বলে আগামী সপ্তাহে লেখার ইচ্ছে রইল। [email protected]

সর্বশেষ সংবাদ