সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন-ট্র্যাকে ফিরছে বিএনপি? কবিও সাংবাদিক কামরুল হাসান বাদল

পোস্ট করা হয়েছে 02/04/2015-12:37pm:    দিকশূন্য, নেতৃত্বশূন্য, লক্ষ্যহীন বিএনপি পুনরায় ট্র্যাকে ফিরে আসছে বলে মনে হয়। লেখাটি যখন লিখছি তার একটু আগে টেলিভিশনের সংবাদে জানলাম বিএনপি সমর্থিত শত নাগরিক কমিটির প্রধান অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে একটি দল গুলশান অফিসে দলনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করে সাংবাদিকদের বলেছেন, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন থেকে বিএনপির সরে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য যদি সত্যি হয় এবং শেষ পর্যন্ত যদি বিএনপি নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে তবে তা একটি ইতিবাচক ঘটনা বলে ধরে নিচ্ছি। আমার মতো অনেকেই মনে করছে বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে গত প্রায় তিনমাস ধরে চলতে থাকা ধ্বংসাত্মক রাজনীতির অবসান হতে পারে। যদিও গত কয়েকদিন ধরে দেশবাসীর সাথে আমিও লক্ষ্য করছি বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুলশান কার্যালয়ে সকালে শত নাগরিক কমিটির লোকজন দেখা করেন বিকেলে দেখা করতে যান বিএনপি সমর্থিত পেশাজীবী পরিষদ নেতৃবৃন্দ। শুধু তাই নয় এ দুই সংগঠন ইতিমধ্যে বিএনপির নীতি নির্ধারক হিসেবে নিজেদের কর্তৃত্ব নিয়ে কলহে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। রাজধানীর দুটি এবং প্রধান বন্দরনগরী চট্টগ্রামের একটিসহ তিন সিটি কর্পোরেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন নিয়ে দলের হাই কমান্ড অথবা বিএনপির নীতিনির্ধারণী কমিটির নিষ্ক্রিয়তা এবং সে বিষয়ে অস্তিত্বহীন শত নাগরিক কমিটি ও সদ্য সংগঠিত পেশাজীবী পরিষদের রশি টানাটানি আর নির্বাচন নিয়ে তাদের বক্তব্যে যে কারও মনে হতে পারে যে, বিএনপি কার্যত নেতৃত্বহীন এখন। কারণ এমন গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন নিয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত ছাড়া বা সিনিয়র নেতাদের বাদ দিয়ে এমাজউদ্দিন সাহেবের মতো অরাজনৈতিক ব্যক্তিরা কেন সিদ্ধান্ত দিতে যাবেন! বিএনপি দাবি করছে তার দলের প্রায় নেতাদের নামে মামলা আছে, গ্রেফতার ও রিমান্ডের ভয়ে তারা দলীয় বা চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আসেন না। আর যাদের নামে মামলা নেই তারা নতুন করে মামলায় জড়ানোর ভয়ে এড়িয়ে যাচ্ছেন। বিএনপির এই অভিযোগ যে সত্যি নয় তা দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে চোখ বোলালেই বোঝা যায়। এঁদের অনেককে ভারতীয় দূতাবাস থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে দেখা গেলেও তারা থাকেন না শুধু দলীয় কর্মসূচিতে। ঢাকাতে নয় চট্টগ্রামের অবস্থাও তাই। দলীয় প্রার্থী হিসেবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সদ্য পদত্যাগী মেয়র মনজুর আলমের মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় আবদুল্লাহ আল নোমান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা উপস্থিত থাকার সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কাজেই বিএনপির কোনো নেতাই জন সম্মুখে আসতে পারছেন না কথাটি পুরোপুরি সত্য নয়। তবে এ কথা ঠিক নাশকতার অভিযোগে বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের অনেক নেতা গ্রেফতার হয়েছেন, অনেকে গ্রেফতারের ভয়ে আত্মগোপনে আছেন। তাই বলে বিএনপির মতো অন্যতম একটি বৃহৎ দলে নেতার অভাব ঘটবে তা কষ্ট কল্পনার বিষয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি-বিএনপিতে তাই ঘটছে। বিএনপি এখন কার্যত নেতৃত্বশূন্য। দিকভ্রান্ত ও লক্ষ্যহীন। বিএনপি প্রকৃতপক্ষে কী চায় তা কর্মী সমর্থকতো দূরের কথা খোদ চেয়ারপারসনও বোধ হয় জানেন না। কারণ গত প্রায় তিন মাস জুড়ে আন্দোলনের নামে যেভাবে নিরীহ মানুষ হত্যা করা হয়েছে এবং এরপরেও অবরোধ হরতালের মতো ব্যর্থ ও অকার্যকর কর্মসূচি অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হচ্ছে তা দেখে মনে হয় এই আন্দোলনের নাটাই খালেদা জিয়ার হাতে নয়- অন্য কারো হাতে। কারণ বিএনপির মতো নির্বাচনমুখী একটি দল নির্বাচন বয়কট করে পরবর্তীতে আন্দোলনের নামে পেট্রোলবোমায় যেভাবে সাধারণ মানুষ হত্যা করেছে তা দেখে দলটি একটি সন্ত্রাসবাদী দল হিসেবেই মনে হয়েছে। গণতন্ত্র, নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন এসব কোনো কিছুর প্রতিই এই দলের আস্থা আছে বলে মনে হয়নি। এসএসসি পরীক্ষার সময়ে হরতাল ডেকে, পরীক্ষাকেন্দ্র ও প্রশ্নপত্রবাহী যানবাহন জ্বালিয়ে বিএনপি দেশে চরম নৈরাজ্যকর ও ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। শত শত মানুষকে পুড়িয়ে হাজার হাজার মানুষের স্বপ্ন-সাধকে পুড়িয়ে দিয়েছে। দেশের অগ্রযাত্রাকে চরমভাবে ব্যাহত করেছে। আসলে রাজনৈতিক আদর্শে তালগোল পাকানো এই দলটি প্রথম থেকে লক্ষ্যহীন। কিছু ডান-বাম ও অতি বিপ্লবীর সমন্বয়ে গড়ে তোলা দলটি জন্মের পর থেকেই যখন যে অবস্থা সেভাবেই চলেছে। নির্দিষ্ট আদর্শ-লক্ষ্য নিয়ে কখনো রাজনীতি করেনি। গত সাধারণ নির্বাচনেও আগে আগে উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিলেও সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেয়নি। সাধারণ নির্বাচনে অংশ না নিলেও এই সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। বর্তমান সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করলেও তারা এই সরকারের কাছে সাত দফা দাবি পেশ করে এবং শেষে গত জানুয়ারি থেকে লাগাতার অবরোধ ও সপ্তাহে পাঁচদিন হরতাল আহ্বান করে কার্যত নিজেদের দেউয়ালিত্বকে প্রকট করেছে মাত্র। গত কিছুদিন আগে দৈনিক কালের কণ্ঠসহ অন্যান্য প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংবাদে বিএনপি নেতাদের মালিকানাধীন বিভিন্ন ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার সংবাদে প্রমাণিত হয়েছে বিএনপির ডাকা হরতাল অবরোধ তাদের লোকরাই পালন করে না। তারপরেও বিএনপির বোধোদয় ঘটেনি। তাদের যুগ্ম সম্পাদক বরকতউল্লাহ বুলুর নামে পাঠানো বিবৃতিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম বাদ রেখে আবারও হরতালের ডাক দেওয়া হয়েছে। একটি খুব সাধারণ মানের প্রশ্ন রাখা যেতে পারে জনগণের পক্ষ থেকে। আর তা হলো গত প্রায় তিন মাসের আন্দোলন সংগ্রামের নামে যে নির্মম নাশকতা চালানো হয়েছে নিরীহ মানুষ হত্যা করা হয়েছে তাতে জনগণের কী দাবি সন্নিবেশিত ছিল। জনগণের কী স্বার্থ যুক্ত ছিল অথবা এই আন্দোলনের দ্বারা কার কতটুকু কী অর্জিত হয়েছে? বিএনপি এত সমালোচনার পর আমি জানি এর প্রতি সহানুভূতিশীল যে কেউ আহত হবেন। দেশের অন্যতম একটি বৃহৎ দল এটি। দেশে এর কয়েক কোটি সমর্থক আছে। তারা ক্ষুব্ধ হবেন। আমি তাদের কাছে বিনয়ের সাথে জানাতে চাই যে আমি কিংবা আমার মতো যারা বিএনপির সমালোচনা করছি তার মানে এই নয় যে সবাইকে বিএনপি ত্যাগ করে আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত হতে বলছি। এটি কোনোদিন সম্ভব নয় এবং একটি গণতান্ত্রিক দেশেতো সম্ভবই নয়। একটি উদার-গণতান্ত্রিক দেশে বহুদল, বহুমত, বহুপথ থাকবে। সবার মত প্রকাশের স্বাধীনতাও থাকবে। বাংলাদেশেও হাজারটি দল থাকবে। সবারই রাজনীতি ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। তবে মৌলিক কিছু বিষয়কে স্বতসিদ্ধ করতে হবে। মনে রাখতে হবে কারো দয়া কিংবা হস্তক্ষেপে এ দেশ স্বাধীন হয়নি। ত্রিশ লাখ শহীদ, চার লাখ নারীর সম্ভ্রম আর অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে এদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। কাজেই এ দেশে যারাই রাজনীতি করুক দেশের ওই মৌলিক বিষয়গুলোকে সম্মান ও স্বীকার করে নিতে হবে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে বিএনপি জামায়াত বা তাদের সমমনা দলগুলো এসব স্বীকার না করেও তো দিব্যি রাজনীতি করছে এবং তাদের সমর্থকও তো কম নয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখা দরকার জনসমর্থন থাকা আর সঠিক ও কল্যাণের পথে থাকা এক নয়। উদাহরণ হিসেবে বলি, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় জার্মানরা নিজেদের বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে মনে করতো। এবং তারা বিশ্ব থেকে ইহুদিদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। সে সময় অর্থাৎ হিটলারের উত্থানের প্রাথমিক অবস্থায় জার্মানদের অধিকাংশ হিটলারের পক্ষে ছিল। তাই বলে কি কেউ হিটলারকে ভালো বলবে? এখন ইসরাইলের অধিকাংশ জনগণ মুসলিম দেশের প্রতি বৈরী তাই বলে কি তা বিশ্ববাসী মেনে নেবে? ডেমোক্রেটদের চেয়ে রিপাবলিকানরা অধিকতর যুদ্ধবাদী তৃতীয় বিশ্বের জন্য কি তা কল্যাণকর। অথবা এখন যদি ফ্রান্স আমেরিকা, অস্ট্রোলিয়াসহ পশ্চিমা অনেক দেশে গণভোটে তাদের অধিকাংশ জনগণ তাদের দেশ থেকে মুসলিমদের বিতাড়িত করার পক্ষে মত দেয় তা কি শান্তি ও সভ্যতার পক্ষে যাবে। অর্থাৎ আমি বলার চেষ্টা করছি কখনো কখনো কোনো কোনো দেশে বিভিন্ন কারণে অধিকাংশ জনগণ সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুলও করতে পারে। সংখ্যাগরিষ্ঠর সিদ্ধান্তটা সব সময়ে কল্যাণকর নাও হতে পারে। যাক যা বলার চেষ্টা করেছিলাম প্রথমে। গত ছয় বছরের ভুল রাজনীতি থেকে বিএনপি বেরিয়ে আসুক এটাই এখন দেশের সচেতন মানুষের প্রত্যাশা। গত প্রায় তিনমাসের জ্বালাও-পোড়াওর মতো ধ্বংসাত্মক রাজনীতি থেকে বিএনপি নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পন্থায় ফিরে আসুক তাতেই দেশের মঙ্গল। তাদের সহিংস রাজনীতির পথ ধরে দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান হলে তার সম্পূর্ণ দায় ওই দলকেই বহন করতে হবে। আমি বোধ হয় ভুল বললাম দেশে জঙ্গিবাদ প্রতিষ্ঠিত হলে এই দলের অস্তিত্ব কোথায় থাকবে? [email protected]

সর্বশেষ সংবাদ