বাঙ্গালী তেজস্বী ছিল :বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

পোস্ট করা হয়েছে 12/03/2015-10:45am:    আলোর কণ্ঠ ডেস্ক : বাঙ্গালীর চিরদুর্বলতা এবং বাঙ্গালীর কলংকের কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ পাই নাই। কিন্তু বাঙ্গালী পূর্বকালে বাহুবলশালী, তেজস্বী ছিল, তাহার অনেক প্রমাণ পাই। (বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বাঙ্গালার কলংক, বঙ্কিম রচনাবলী, ২য় খণ্ড, রিফ্লেক্ট, পৃ ২৯২) খ. ঊনবিংশ শতাব্দীর বাঙ্গালীর চরিত্র সমালোচনা করিলে, (মেকলের) কথাটা কতকটা সত্য বলিয়া বোধহয়, তবে বলা যাইতে পারে, বাঙ্গালীর এ দুর্দশা হইবার অনেক কারণ আছে। মানুষকে মারিয়া ফেলিয়া তাহাকে মরা বলিলে মিথ্যা কথা বলা হয় না। কিন্তু যে বলে বাঙ্গালী চিরকাল দুর্বল, চিরকাল ভীরু, স্ত্রীস্বভাব, তাহার মাথায় বজ্রাঘাত হউক, তাহার কথা মিথ্যা। ( বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বাঙ্গালার কলংক, বঙ্কিম রচনাবলী, ২য় খণ্ড, রিফ্লেক্ট, পৃ ২৯১) ‘বাঙ্গালার ইতিহাস চাই। নহিলে বাঙ্গালী কখনো মানুষ হইবে না’। ‘বাঙ্গালার ইতিহাস সম্বন্ধে কয়েকটি কথা’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন বঙ্কিম। বাস্তবিক, বাঙ্গালী ভেতো কিন্তু ভীতু ছিল না, কোনো কালে। ক্লাইভ পলাশীর তথাকথিত যুদ্ধ বা ১৭৫৭-র শেষে ইউরোপিয়ান সৈন্যদের বিদ্রোহ দমন করেছিলেন বাঙালী অধ্যুষিত লাল পল্টন এর সাহায্যে। আলেকজান্ডার বাঙলা আক্রমণ করতে সাহস করেনি গঙ্গারিডি জাতির পরাক্রমের জন্য। ১৮৫৭-য় ইংরেজদের তিনটি বাহিনীর মধ্যে বেঙ্গল রেজিমেন্ট-ই প্রথম বিদ্রোহ করে। ১৮৫৭-র যুদ্ধ জিতে বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙ্গে দেয় ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদীরা। বাঙালী সৈন্যদের সহায়তায় সিরাজ কলকাতা দখল করেছিলেন। খাঁটি ইংরেজ সৈন্যদের পরাজিত করে। অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় লিখেছেন, বাঙালী অস্ত্রবহন করত। ১৮৫৭-র সিপাহী বিদ্রোহ তথা ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের পর বাঙালীদের অস্ত্র বহন নিষিদ্ধ করে সাম্রাজ্যবাদী সরকার। উনিশ শতকে ইংরেজি শিক্ষার প্রসারের ফলে ‘বাবুস ক্লাসে’ ইংরেজি শিখে চাকর মনোবৃত্তি জেগেছিল একদল বাঙালীর মধ্যে। কৃষক, শ্রমিক, গাড়োয়ানরা বিদ্রোহ করেছে। অস্ত্র ধরেছে। বাঙালী মধ্যবিত্ত প্রথম দিকে পারেনি। বোধহয় চায়ওনি। ইংরেজদের বাণিজ্যিক সংস্কৃতি আর শিক্ষা সংস্কৃতি—দুইয়ের প্রভাবে জাত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় ছিল ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদীদের ‘স্বাভাবিক সহযোগী’। উনিশ শতকের পঞ্চাশ-ষাটের দশক থেকে কাব্য-নাটক-কবিতায় স্বাধীনতার আকাঙ্খা প্রকাশ–বিশ শতকের গোড়ায় এসে স্বাধীনতার জন্য অস্ত্রধারণ। মানসিকভাবে অস্ত্রধারণ শুরু হয়েছে ১৮৫০-র দশক থেকেই। বিদ্যাসাগর ‘রেভুলিউশান’ শব্দের পরিভাষা ‘রাজবিপ্লব’ তৈরি করছেন, শিশুতোষ পাঠ্যপুস্তক ‘বর্ণপরিচয়’-এ ‘নিশান’-এর বদলে ‘পতাকা’ শব্দ সংযোজন। ‘কলোনিয়াল’এর পরিভাষা নির্মাণ করছেন ‘ঔপনিবেশিক’। ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ রচনায় মার্শম্যান-এর ভাষ্য পুরোপুরি মানছেন না, পরিবর্তন করছেন ভাষ্য। প্যারীচাঁদ মিত্র ‘আলালের ঘরের দুলাল’-এ মেকলে প্রবর্তিত শিক্ষাধারায় কালুস সাহেব, সরবোর্ণ সাহেব দের স্কুলগুলিকে ব্যঙ্গে ধুইয়ে দিচ্ছেন। হুতোম প্রণেতা ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে সিপাহী বিদ্রোহের বিরুদ্ধে আয়োজিত সভায় যোগ দিচ্ছেন ১৭ বছর বয়সে, আর তার কয়েক বছর পরই ব্যঙ্গে বিদ্ধ করছেন ইংরেজ স্তাবকদের। চন্ডীচরণ সেন হিন্দু ধর্ম ও সমাজ –দু’পক্ষকেই শিক্ষিত করতে চাইছেন উপন্যাস লিখে। বঙ্কিম তার যাবতীয় দ্বিধাদ্বন্দ্ব সত্ত্বেও ইংরেজিয়ানার প্রবল বিরোধী। ‘আনন্দ মঠ’ এর প্রথম সংস্করণে ইংরেজ রাজত্ব ও শাসনের বিরোধিতা না করে পারছেন না। আমরা ‘ইংরেজদের দ্বেষক নই’ বলেও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের শিকার রামা কৈবর্ত ও রহিম শেখের পক্ষ নেন। বঙ্কিম চাইছেন বাঙালী মধ্যবিত্তের নবনির্মাণ করতে। চাইছেন তারা আত্মনির্ভর, মাতৃভাষাপ্রেমী, সাহসী ও গরিব এবং কৃষক দরদী হোক। জানুক ইতিহাসকে। ইংরেজ রচিত ও ইংরেজ প্রকল্পিত মেকলে শাবক না হয়ে বাঙালী সিংহ শাবক না হোক অন্তত ভীরু কাপুরুষ যেন না হয়। মনে না করে ইংরেজরাই বাঙালীর সর্বস্ব। তার মতে ইংরেজ বাঙালীর সর্বনাশও বটে। ইংরেজদের ‘মেটিরিয়াল প্রস্পেরিটি’র ধারণার তীব্র বিরোধী বঙ্কিম। আর তথাকথিত নবজাগরণের ঢেউ যারা তোলেন তাদের উদ্দেশে তার সতর্কবাণী: ক. পলাশীতে যুদ্ধ হয় নাই। একটা রং তামাসা হইয়াছিল।[১] খ. আদালত এবং বারাঙ্গনার মন্দির তুল্য; পয়সা নহিলে প্রবেশের উপায় নাই। [২] গ. এই দুই শতাব্দীতে (পঞ্চদশ ও ষোড়শ খ্রিষ্ট শতাব্দী) বাঙালীর মানসিক জ্যোতিতে বাঙালীর যে রূপ মুখোজ্জ্বল হইয়াছিল, সে রূপ তৎপূর্ব্বে বা পরে হয় নাই। [৩] ঘ. বাঙালী রাজগণ অনেক সময় উত্তর ভারতে বৃহৎ সাম্রাজ্যের অধীশ্বর ছিলেন। [৪] বঙ্কিম ছোটগল্প লেখেননি। লিখেছেন কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, রম্যরচনা, নাটিকা। আর এ সবের মধ্য দিয়ে শোনাতে চেয়েছেন নিজের বাণী। ‘যশের আকাঙ্ক্ষা কর, পরের অনুরাগ লাভ করিবার জন্য, জন সমাজের হৃদয়কে তোমার হৃদয়ের সঙ্গে মিলিত করিবার জন্য।

সর্বশেষ সংবাদ