ইতিহাসে তাঁর মৃত্যু নেই, মানবতাবাদী সাধক রাজ্জাক দেওয়ান।

পোস্ট করা হয়েছে 07/03/2015-11:42am:    আন্তর্জাতিক ডেস্ক : আমরা যতই আক্ষেপ করি,নিয়তি চলে তার নিজস্ব নিয়মে। যদি তিনি আর ক’টা দিন, ক’টা বছর বাঁচতেন, আর একটু এগিয়ে দিয়ে যেতেন, আমাদের তাবৎ কর্মকাণ্ডে আর কয়েকটা বছর তাঁর পরামর্শ বা দিকনির্দেশনা থাকত, যদি নতুন সহস্রাব্দের প্রথম লগ্নে তাঁর আরও সান্নিধ্য পেতাম। কিন্তু না, এ সবই হচ্ছে মায়ার খেলা, মরীচিকা নির্ভর প্রলাপ। পৃথিবীতে কে কখন আসবেন, কতদিন থাকবেন, কী কী দেবেন, কী কী নেবেন, কত দিন তাঁর সক্রিয়তা আমাদের জন্য জরুরী, মেধা ও মননশীলতার নিরিখে তাঁর পরমায়ু কত বছর হওয়া উচিৎ এ সমস্ত ভাব-ভাবনার সমীকরণ নিয়তির কাছে অচল, অর্থহীন। বাস্তব হকীকতের কাছে স্বপ্ন কিংবা কঠিন বাস্তবের কাছে ইচ্ছা-বাসনা সব কিছুই এক স্থবির চিত্র বিশেষ, বলা যায় অসহায়। অতএব কথা একটাই— কি নিয়তি, কি ভবিতব্য তাদের কাছে ‘যদি’ বলে কিছু নেই। আমরা যতই আফসোস করি। সমাজ-রাষ্ট্রের প্রকৃত মূল্যবোধের অবক্ষয় যখন চরমে, মেধা যখন ভূলুণ্ঠিত, সম্ভ্রম যখন সংকটাপন্ন, বিবেক যখন জর্জরিত, সৃজন যখন পতনোন্মুখ, সত্য-সুন্দর যখন লাঞ্ছিত, নানা মতলববাজি যখন ঊর্ধ্বমুখী, মনোবিকাশের পথ যেখানে কুচক্রীমহল দ্বারা রুদ্ধ, ঠিক সে সময় একে-একে বিদায় নিচ্ছেন আমাদের মহীরুহগণ। কথাগুলো যার প্রসঙ্গে বলছিলাম তিনি প্রখ্যাত লোকগীতিকার, পরমতত্ত্বের রহস্যসন্ধানী, মানবতাবাদী সাধক মাতাল কবি রাজ্জাক দেওয়ান। শুধু ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান দ্বারা তাঁর সম্পর্কে ধারণা লাভ করা সম্ভব নয়। অতীন্দ্রিয় সত্ত্বার মাঝে যিনি নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে সমস্ত রিপুর তাড়নাকে জয় করে গুরুর চরণে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন, তিনিই বুঝতে পারবেন ভক্তি ও প্রেমবিনে এর কিঞ্চিৎ জ্ঞান লাভ করা সম্ভব নয়। এই ভক্তি ও প্রেম থেকেই আমি মাতাল কবি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হই। সাধারণের ধর্মসাধনের যা মূল লক্ষ্য আত্মমুক্তি আর স্বর্গপ্রাপ্তি; মানবতাবাদী এ সাধক কবি তার চেয়েও বড় লক্ষ্যের দিকে ধাবমান ও স্বক্রীয়। তিনি চেয়েছেন ধর্মের নামে ‘অধর্ম’ তথা অসত্যের-অসুন্দরের উৎপাটন, গণচেতনার জাগরণ এবং মানব সত্যের চিরন্তন পথে সকলকে টেনে আনতে। তার জন্য তীর্থগমন, ব্রতপালন, মসজিদ গমন নয়। সে মুক্ত স্বয়ম্ভর।মাতাল কবি তাঁর কালোত্তীর্ণ ভাবের মাধ্যমে মানুষকে আজব রহস্যের সন্ধান দিয়েছেন। তিনি নিজেও ছিলেন মহা রহস্যময়। তিনি কোনো জাত-ধর্ম-বর্ণ ও গোত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন নি। সকল ধর্মের সকল মানুষের কাছে তাঁর সমান জনপ্রিয়তা। তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না তাঁর, কিন্তু নিজ সাধনা বলে তিনি ধর্মশাস্ত্র সম্পর্কে গভীর জ্ঞানী ছিলেন। তাঁর রচিত গানের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক গভীরতা, শাস্ত্রজ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়। মাতাল কবির গান মরমী ব্যঞ্জনা ও শিল্পগুণে সমৃদ্ধ। সহজ-সরল ভাষায় অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ তাঁর গানে মানব জীবনের আদর্শ, মানবতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটেছে। তাই তিনি গেয়েছেন— “মন মানুষ হইতে চাও, জাতি ধর্ম ছাইড়া দিয়া সরল পথে যাও।” কবি রাজ্জাক দেওয়ান কোনো ব্যক্তির নাম নয়, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। জীবনের শেষ বেলায় তিনি লিখেছেন— “গানে-গানে সারাজীবন গন্ধ বিলাই ঘরের কোণে পড়ে আছি আমি ধূপ পোড়া ছাই।। গন্ধভরা গাঁও ছিল মোর গন্ধময় জীবন আদর-সোহাগ পাইতাম কত পাইতাম রে যতন ধূপদানীতে পোড়াইতে কত ডাক-ঢোল বাঝাই।। জলসা ঘরে ছিলাম আমি নাচেরই পুতুল নেচে গেয়ে মন মাতাইতাম গানেরই বুলবুল এখন দেখে তারে চিনতে নারে আমি আগের মত নাই।। কপালে ছিল বুঝি বিধিরও লিখন ভালবাসার বিনিময়ে গেল এ জীবন এখন শেষের সম্বল কম্বল গেল মাতালের আরতো কিছু নাই।” জীবনসায়াহ্নে এসে কবির শাশ্বত উচ্চারণ— “জানি জীবনে আমায় রাখিবে না মনে আমার এ গান নিশি অবসানে, খনিকের ফুল আমি খনিকের ভালবাসা খনিক সাজানো থাকি ফুলদানীতে।।২০০৩ইং সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারী আমাদেরকে এতিম করে, শোকসাগরে ভাসিয়ে তাঁর মাওলার কাছে চলে যান মরমী সাধক মাতাল কবি আব্দুর রাজ্জাক দেওয়ান। তাঁর জীবন ঘটনাবহুল, বৈচিত্র্যময়, মীথে ভরপুর, নানা রকম জীবন-ইতিহাস সমৃদ্ধ। গান, কথা স্পষ্ট, আরাধনা করেছেন মানুষ হতে; সবাইকে জানিয়েছেনও সে আহ্বান। আর এ জন্যেই তিনি পরম শ্রদ্বেয় হয়ে থাকবেন বহুকাল, মানুষের মাঝে, মানবতার জন্যে। ইতিহাসের মৃত্যু নেই, ইতিহাস মরে না ইতিহাসের মাতাল আরও দীর্ঘজীবী হয়।। তোমাকে প্রণাম করি জানাই হাজার সালাম মৃত্যুহীন দরদী আমার।।

সর্বশেষ সংবাদ