ষোড়শ শতাব্দীর এক অসামান্য জমিদারবাড়ি।

পোস্ট করা হয়েছে 04/03/2015-11:51am:    আলোর কণ্ঠ ডেস্ক: ষোড়শ শতাব্দীর এক অসামান্য দৃষ্টি নন্দন স্থাপত্য শৈলীর নিদর্শন হলো শ্রী ধর ভবন জমিদারবাড়ি। বর্তমান প্রজন্ম যাকে চেনে গাঙ্গাটিয়া জমিদারবাড়ি হিসেবে। কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর উপজেলার অবস্থিত এই গাঙ্গাটিয়া জমিদারবাড়ি।জমিদারবাড়ির প্রাসাদসম অট্টালিকা, বৈঠকখানা, দরবারগৃহ, অতিথি কক্ষ, সংগীত চর্চা কক্ষ, পুকুরঘাট ও মন্দিরগুলো বিশেষ স্থাপত্যের নিদর্শন হয়ে আজো কালের সাক্ষী বহন করছে।জানা যায়, গাঙ্গাটিয়া গ্রামে জমিদারি প্রথা শুরুর প্রাক্কালে জমিদারবাড়ির মূল ফটক থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে নির্মিত হয় একটি শিব মন্দির। মন্দিরটি ছাড়িয়ে একটু সামনে গেলেই বাড়ির সামনের মাঠ। সেখানে সাগরদিঘী খ্যাত জমিদারি আমলের বিশাল একটি পুকুর আছে। পাশেই আর একটি পারিবারিক শিব মন্দির।শ্রী ধর ভবনের মূল ফটক থেকে ৩০০ গজ দূরে অবস্থিত জমিদারবাড়ির মূল অংশ। মূল ফটকের সামনে থেকে প্রায় ১২ ফুট চওড়া আর দুপাশে নারকেল গাছের সারিবদ্ধ দৃষ্টিনন্দন রাস্তাটি পেরিয়ে যেতে হয় জমিদারবাড়িতে। এই বাড়ির সৌন্দর্য যে কারো ভালো লাগবে। এতো প্রাচীন সময়ে এতো সুন্দর করে বাড়িটির স্থাপত্য শৈলী নির্মিত হয়েছে, সেটা ভাবতেই অবাক লাগে।শ্রী ধর ভবন তথা গাঙ্গাটিয়া জমিদারবাড়িটি দেখতে প্রতিদিনই দেশি-বিদেশি পর্যটক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ ভিড় করে। তাদের জানার আগ্রহের শেষ নেই। এতো সুন্দর একটি বাড়িতে যাদের বাস ছিল তারা কেমন ছিলেন সেটা জানতেও কারো আগ্রহের কমতি থাকে না।সংক্ষিপ্ত ইতিহাস : গাঙ্গাটিয়া জমিদার বংশের পূর্ব পুরুষেরা রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণ গোত্রের ছিলেন। ভারতের উত্তর প্রদেশ থেকে জনৈক শাস্ত্রীয় পণ্ডিত খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে এ দেশে এসে বসতি স্থাপন করেন। তিনিই ছিলেন এ জমিদারদের প্রথম পুরুষ। সে সময়ে গৌড়ীয় রীতি অনুযায়ী বাড়ির পতিত ভিটায় পূজার্চণার জন্য একটি শিব মন্দির তৈরি করেন তিনি। এ শিব মন্দিরটিই এ বংশের প্রথম নির্মিত মন্দির।ব্রাক্ষণ্য ধ্যান-ধারণা, পূজা-পার্বণ, আচার অনুষ্ঠানে জমিদার পরিবার এ অঞ্চলে এক সময় বিশেষ প্রভাব প্রতিপত্তি অর্জন করেন। দীননাথ চক্রবর্তী প্রথমে এ অঞ্চলে জমিদারি প্রথার সূচনা করেন। তিনি অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে হোসেনশাহী পরগণার এক তৃতীয়াংশ ক্রয় করে জমিদারি তথা তালুকদারি শুরু করেন।পরবর্তীতে দীননাথ চক্রবর্তীর ছেলে অতুলচন্দ্র চক্রবর্তী ‘পত্তনি’ সূত্রে আঠার বাড়ির জমিদার জ্ঞানদা সুন্দরী চৌধুরাণীর কাছ থেকে আরো দুই আনা-অংশ ক্রয় করে গাঙ্গাটিয়া জমিদারির সঙ্গে অন্তর্ভূক্ত করে নেন। অতুল চক্রবর্তী তার ছেলের নাম করণে বাড়ির মূল ফটকের নামকরণ করেন ‘শ্রী ধর ভবন’। শ্রী ধর চক্রবর্তী ছিলেন জমিদার বংশের তৃতীয় বংশধর। পরবর্তীতে তার ছেলে চতুর্থ বংশধর ভূপতি চক্রবর্তী দীর্ঘদিন জমিদারি কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন।বর্তমান বংশধর : বর্তমানে শ্রী ধর ভবন তথা গাঙ্গাটিয়া জমিদারবাড়িতে ভূপতি চক্রবর্তীর বড় ছেলে মানবেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী চৌধুরী বসবাস করছেন। তার ছোট ভাই তপন কুমার চক্রবর্তী প্রায় দেড় বছর হয় পরলোকগমন করেছেন। তারা দুই ভাই বংশ পরম্পরায় পঞ্চম বংশধর। এ ছাড়া তাদের পরিবারের অনেক আত্মীয়-স্বজন বর্তমানে কলকাতায় বসবাস করছেন।বর্তমান চিত্র : কিশোরগঞ্জ সদর থেকে সড়ক পথে লতিবাবাদ ইউনিয়ন হয়ে ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ জমিদারবাড়িটি। জমিদারবাড়ির প্রায় এক কিলোমিটার দূরে নির্মিত এ বংশের প্রথম শিব মন্দিরটি বর্তমানে জরাজীর্ণ হয়ে বটবৃক্ষের শিকড়ে বাধা পড়েছে। তারপরই দেখা মেলে বিশালাকার একটি পুকুর, যার নাম ‘সাগরদিঘী’।গাঙ্গাটিয়া জমিদারবাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছেন গুরুচরণ দাস। তিনি রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘বর্তমান বংশধর মানবেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী চৌধুরী এখন এ বাড়িতে পরিবার পরিজন নিয়ে থাকেন। জমিদারি প্রথা চলে গেলেও এ অঞ্চলের গরিব মানুষদের জন্য জমিদারদের অনেক কিছুই করেছেন, এখনো করছেন।’

সর্বশেষ সংবাদ