সত্যিই কালো তাজমহল!

পোস্ট করা হয়েছে 03/03/2015-06:20pm:    আন্তর্জাতিক ডেস্ক : তাজমহলকে ঘিরে থাকা নানা মিথের মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময় মিথটা হলো অসমাপ্ত দ্বিতীয় তাজমহলের গল্প। মোগল সম্রাট শাহজাহান নাকি যমুনা নদীর অন্য পারে কালো মার্বেল পাথরে তাজমহলের আরেকটা অনুকৃতি তৈরি করতে চেয়েছিলেন। শাহজাহান কেন আরেকটা তাজমহল তৈরি করতে চেয়েছিলেন? আর সাদা তাজমহলের অনুপম সৌন্দর্যের বদলে কেনই বা কালো তাজমহল? টাইমস অব ইন্ডিয়া এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে জানিয়েছে। সবাই জানেন সম্রাজ্ঞী আরজুমান্দ বানু বেগম বা মমতাজ মহলের প্রতি প্রেমের নিদর্শন হিসেবে সম্রাট শাহজাহান তাজমহল নির্মাণ করেন। তাজমহলের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৬৩১ সালে, শেষ হয় ১৬৫৩ সালে। কথিত আছে, স্ত্রী মমতাজ মহলের সমাধির কাজও শুরু করেছিলেন শাহজাহান নিজেই। কিন্তু ছেলে আওরঙ্গজেব তাঁকে আগ্রার দুর্গে বন্দী করে রাখায় সেই কাজ আর শেষ করতে পারেননি তিনি। দুর্গের জানালা দিয়ে দূর থেকে তাজমহল দেখতে দেখতে সেখানেই মারা যান শাহজাহান। ১৬৬৬ সালে মৃত্যুর পর শাহজাহানকেও স্ত্রী মমতাজ মহলের সঙ্গে একই সমাধিতে সমাহিত করা হয়। তাহলে দ্বিতীয় তাজমহল বা কালো তাজমহলের কথা এল কোথা থেকে? এই গল্পের শুরু ফরাসি পর্যটক জ্যঁ ব্যাপটিস্ট টাভারনিয়ারের ভ্রমণকাহিনিতে। ১৬৪০ ও ১৬৫৫ সালে মোগল রাজধানী আগ্রায় ভ্রমণ করেছিলেন টাভারনিয়ার। এই পর্যটক লেখেন, সম্রাট শাহজাহান যমুনার অপর পারে নিজের সমাধিক্ষেত্রের নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু নিজের ছেলেদের সঙ্গে লড়াই শুরু হওয়ায় তিনি তা শেষ করতে পারেননি। স্থানীয় লোককথায় এটাও বলা হয়ে থাকে যে শাহজাহান যমুনার ওপর একটি সেতু বানিয়ে নদীর দুই পারে নিজের ও স্ত্রীর সমাধিকে সংযুক্তও করতে চেয়েছিলেন। কালো তাজমহলের মিথ আরও ঘনীভূত হয় ১৯ শতকে এসিএল কারলেইলি নামের এক ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ যমুনার পারে একটি পুকুরে কালো মার্বেল খুঁজে পাওয়ার দাবি করার পর। গবেষকেরা জানিয়েছেন, সম্রাট শাহজাহান তাঁর প্রপিতামহ সম্রাট বাবরের তৈরি মাহতাব বাগকে সংস্কার করে তাজমহল কমপ্লেক্সের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে স্থপতিদের অনুরোধ করেছিলেন। বলা হয়ে থাকে, এটাই পরিকল্পিত দ্বিতীয় বা কালো তাজমহল নির্মাণের স্থান ছিল। এ ছাড়া তাজমহলের মধ্যে শাহজাহানের সমাধিটির অবস্থান বিবেচনা করলেও এই ধারণা বদ্ধমূল হয় যে তিনি স্ত্রীর সঙ্গে একই সমাধিতে সমাহিত হতে চাননি। কেননা, পুরো তাজমহলের নকশায় চূড়ান্ত রকমের প্রতিসাম্য থাকলেও শাহজাহানের সমাধিটি সমাধিঘরের পশ্চিম দিকের দেয়ালের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনভাবে বানানো। কিন্তু মমতাজ মহলের সমাধি ওই ঘরের ঠিক মাঝখানে। এটা দেখে মনে করা হয়, এখানে কেবলই মমতাজ মহলের সমাধিই হওয়ার কথা ছিল এবং শাহজাহানের সমাধিটি পরে যুক্ত করা হয়েছে। এসব তথ্য-উপাত্ত আর বর্ণনায় মনে হতেই পারে যে শাহজাহান আরেকটি কালো তাজমহল বানাতে চেয়েছিলেন নিজের সমাধির জন্য। কিন্তু ইতিহাসবিদেরা সেই সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। কেননা, কেবল ফরাসি পর্যটক টাভারনিয়ারের লেখা ছাড়া আর কোথাও এমন দাবির পক্ষে প্রমাণ মেলেনি। প্রত্নতাত্ত্বিক খননেও যমুনার অন্য পারে এমন কোনো নির্মাণ প্রকল্পের দেখা মেলেনি। আর ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদের কালো মার্বেল পাওয়ার দাবিও পরে নাকচ হয়ে গেছে। কেননা, গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে, মাহতাববাগের এক পুকুরে পাওয়া ওই মার্বেলগুলো আসলে সাদা মার্বেলই ছিল। কালের বিবর্তনে মাটির নিচে সেগুলো কালো দেখাচ্ছিল, এই যা। কিন্তু ইতিহাস যা-ই বলুক না কেন, কালো তাজমহলের ধারণাটি অনেক শিল্পীকেই অনুপ্রাণিত করেছে। যমুনার এক পারে সাদা মার্বেলের তাজমহলে মমতাজ মহলের সমাধি এবং অন্য পারে কালো মার্বেলে সম্রাট শাহজাহানের সমাধি! আর যমুনার ওপর দিয়ে একটা রুপালি সেতুতে এপার-ওপার যাতায়াত! এই চিত্রকল্প তাজমহলের মতো অনুপম স্থাপত্যের বিশালত্বের সঙ্গে যথার্থই মানানসই মনে হয়েছে অনেক শিল্পীর কাছেই। অনেক শিল্পীই কালো তাজমহলের ছোট্ট অনুকৃতিও বানিয়েছেন এই গল্পের অনুপ্রেরণা থেকেই।

সর্বশেষ সংবাদ