কী ঘটতে যাচ্ছে দেশে । কামরুল হাসান বাদল কবিও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 15/01/2015-07:49am:    মঙ্গলবার সকালটা শুরু হয়েছিল একটি চমকপ্রদ ঘটনার মধ্য দিয়ে। একটি বেসরকারি টেলিভিশনে সকালের অধিবেশনে সঙ্গীত পরিবেশন করছিলেন দু বাংলায় সমান জনপ্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। সেদিন ছিল তাঁর জন্মদিন। অনুষ্ঠান চলাকালীন সরাসরি ফোন করলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছার উত্তর দেন বন্যা। ফোনে প্রধানমন্ত্রী অকুণ্ঠচিত্তে শিল্পীর প্রশংসা করলেন। তারপরে ফোন দিলেন তাঁর ছোটবোন শেখ রেহানাকে। তিনিও শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা জানালেন তাঁর স্কুল জীবনে এক বছরের সিনিয়র বন্যাকে। পশ্চিমা বিশ্বের জন্য এমন ঘটনা খুব স্বাভাবিক হলেও বাংলাদেশের জন্য তা বিরল একটি ঘটনা। প্রথমত বাংলাদেশের রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগের মধ্যে এটি একটি অন্যতম যে তাঁরা সংস্কৃতিবিমুখ। অবশ্য তা বর্তমান রাজনীতিকদের বেলায়। আর সে রাজনীতিক যদি ক্ষমতাসীন হন সেক্ষেত্রে অভিযোগ আরও শক্ত। এই ধারা ভঙ্গ করলেন প্রধানমন্ত্রী নিজে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রচন্ড ব্যস্ততায় থাকার পরও তিনি যে টিভি দেখেন বিশেষ করে সকালে কাজ শুরু করার প্রাক্কালে এবং তা একটি সঙ্গীতানুষ্ঠান তাতে আনন্দিত হওয়ার মতো কারণ আছে বৈকি। সবচেয়ে ভালো লাগলো তিনি একজন শিল্পীকে অনুষ্ঠান চলাকালীন জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে দেশের সকল শিল্পীদের সম্মানিত করেছেন পক্ষান্তরে। প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। কাজেই আমারও দিনটা শুরু একটু ফুরফুরে মেজাজ ও আনন্দে। কিন্তু সে আনন্দটি দীর্ঘস্থায়ী হলো না। রাত হতে হতেই সে আনন্দ ফিকে হয়ে গেল এবং এক সময়ে মনটাই বিষণ্ন হয়ে গেল। বাসায় ফিরে টিভি খুলতেই সংবাদটি পেলাম। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিয়াজ রহমানকে গুলি করে পালিয়ে যায় একদল দুর্বৃত্ত। শুধু তাই নয় গুলি করার পর পর তাঁর গাড়িতেও আগুন দেওয়া হয়। তাঁকে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ লেখাটি যখন লিখছি তখনও তাঁর বিষয়ে চিকিৎসকরা শংকামুক্ত নয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে বিএনপি আজ বৃহস্পতিবার ভোর ছটা থেকে শুক্রবার ভোট ছটা পর্যন্ত সারাদেশে হরতাল আহবান করেছে। ইতিমধ্যে আটদিন পেরিয়ে গেছে অবরোধের। জনজীবন বিশেষ করে দেশের উৎপাদন ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় স্থবিরতা নেমে এসেছে তার মধ্যে ২৪ ঘন্টার হরতাল মরার ওপর খাড়ার ঘা হিসেবে দেখা দেবে সন্দেহ নেই। ভাবছি কী হতে যাচ্ছে দেশে! কী হবে এরপর? কারা এসব অপকর্ম সংঘটিত করছে? কেন করছে? একজন রাজনীতিককে এভাবে প্রকাশ্যে গুলি করে দুর্বৃত্তরা কী হাসিল করতে চায়? এরা কারা? রিয়াজ রহমান বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা হলেও প্রকাশ্য রাজনৈতিক কার্যক্রমে তাঁকে খুব একটা দেখা যেত না। তাঁর মতো একজন ব্যক্তিকে কারা হত্যা করতে চায়। কোন উদ্দেশ্যে করতে চায়। রাজনীতি কি তবে প্রতিহিংসার চূড়ান্ত পর্যায়ে গেল? না কি কোনো স্বার্থান্বেষী মহল এভাবে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে কিছু একটা ঘটাতে চায়। কোনো অপশক্তিকে ক্ষমতায় আনতে চায় না কি এটি দেশি-বিদেশি কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ? চট করে বা সাদা চোখে যে কেউ বলতে পারেন যে, ঘটনাটি সরকারি দলের কেউ ঘটিয়েছে। কিন্তু সমগ্র পরিস্থিতি বিবেচনা করলে কি মনে হতে পারে তা? অবরোধ আন্দোলন নিয়ে সরকার এমনিতেই বিব্রতকর অবস্থায় আছে তারা কি পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে আরও আক্রমণাত্মক করে তোলার ঝুঁকি নেবে? কেন নেবে? পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলেতো সরকারেরই ক্ষতি। দেশে ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আরও অধিকতর চাপে পড়তে হবে সরকারকে। এত কাঁচা কাজ বর্তমান সরকারের পক্ষে করা সম্ভব বলে মনে হচ্ছে না। অন্তত গত এক দশকের আওয়ামী লীগের রাজনীতি ও কৌশল দেথে তা মনে করার কারণ নেই বলে মনে হয়। অনেক আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা আওয়ামীলীগের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন ঘটনার নজির নেই। এই দলটি যা-ই করুক এমন ষড়যন্ত্রের রাজনীতির সাথে আওয়ামীলীগের সম্পৃক্ততা কখনোই দেখা যায়নি। এটি আমার সামান্য অভিজ্ঞতা থেকে বললাম। আমার এসব বলার অর্থ এই নয় যে, ঘটনাটি যেহেতু আওয়ামীলীগ ঘটায়নি সেহেতু বিএনপি ঘটিয়েছে এমন সাধারণ ও ঢালাও মন্তব্য করার জন্য নয়। ঘটনাটির নিশ্চয়ই তদন্ত হবে। এবং আশা করি দোষীরাও শনাক্ত হবে। তাদের পরিচয় উদ্দেশ্যও প্রকাশ পাবে। তবে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য আমরা কাকে বা কাদের দায়ী করতে পারি। গত বছর ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পরে দেশের পরিস্থিতি একেবারে পাল্টে যায়। ৪ জানুয়ারি আর ও ৬ জানুয়ারির সে সময়ের পত্রিকা ও টিভি ফুটেজগুলো দেখলে বোঝা যাবে একটি নির্বাচন, তাকে নিয়ে যতই বিতর্ক হোক না কেন, নিমিশেই দেশের অরাজক পরিস্থিতিকে আমূল পাল্টে দিয়েছিল। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল দেশের জনগণ। প্রতিদিনের ধ্বংস, নৈরাজ্য, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ আর নিরপরাধ মানুষ হত্যার ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেয়েছিল দেশের জনগণ। সে কারণে দেশের বৃহত্তর একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী নর্বাচনে না গেলেও, সে নির্বাচনে দেড় শ’র অধিক বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হলেও দেশে-বিদেশে সে নির্বাচন নিয়ে তেমন জোরালো কোনো প্রতিবাদ বা সমালোচনা হয়নি। এবং টানা এক বছর বর্তমান সরকার বিনা বাধায় নির্বিঘ্নে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে। এই এক বছর বিএনপি ও তার নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট কার্যকর কোনো আন্দোলন সংগ্রামও জোরালো করতে পারেনি। তাদের এই ব্যর্থতা ঢাকার অপচেষ্টা থেকে লন্ডনে আইনের চোখে পলাতক থাকা অবস্থায় বিএনপির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তারেক রহমান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে কটাক্ষ করে বিভিন্ন বক্তব্য প্রদান শুরু করেন। তার এ ধরনের আপত্তিজনক বক্তব্যের কারণে দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয় এবং রাজনীতি ক্রমশ হিংসাত্মক রূপ নিতে থাকে। বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী পক্ষের বড় অভিযোগ হচ্ছে তাদের ভাষায়-সভা-সমাবেশ করতে না দেওয়া এবং তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পুলিশের বাধা প্রদান করা। এই অভিযোগটিও সাদা চোখে দেখতে গেলে সঠিক বলে মনে হবে তবে এই অভিযোগেরও যুক্তিযুক্ত খণ্ডন আছে বৈকি। কারণ গত ১ বছর ধরে বিএনপি’র প্রতিটি জনসভায় সামনের কাতারে অনেক অংশ জুড়ে দেখা গেছে জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের যাদের হাতে শোভা পেয়েছে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধি সাজাপ্রাপ্ত ফাঁসি ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামীদের মুক্তির দাবি সম্বলিত ব্যানার ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড। শুধু তাই নয় অনেক স্থানে বিএনপি’র জনসভায় জামায়াত-শিবিরের নেতাদেরও বক্তৃতা দিতে দেখা গেছে। যে দলটি নির্বাচনে জিতলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জয় লাভ করেছে সে দলটি যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও তাদের দল এবং সে দলকে আশ্রয়-প্রশ্রয়দানকারী অন্যদলটির সাথে সদ্ভাব রাখবে কী করে। যারা কথায় কথায় দু’দলের সমঝোতা ও সংলাপের দাবি তুলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে সর্বদা একই পাল্লায় মাপার চেষ্টা করে থাকেন তাদের কাছে সবিনয়ে জানতে চাই যে দলের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জাতির জনককে সর্বদা অপমান করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষের আবেগ ও ভালোবাসাকে অপমান করতে থাকেন তাদের সাথে উদার চিত্তে আলোচনা হয় কী করে। আমেরিকা বা সে দেশের মন্ত্রী বা রাষ্ট্রদূতের সমালোচনা করলে এ দেশে যাদের গায়ে ফস্কা পড়ে তারা এসব বলতে পারেন কোন মুখে। দু’দলের সমঝোতা ও সংলাপের পরিবেশ তো তারেক জিয়াই ব্যাহত করেছেন অনেক আগে থেকেই। যা হোক, যে কোনো বিষয় নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করার অধিকার আছে বিরোধী দলের। আন্দোলন-সংগ্রামের অংশ হিসেবে হরতাল-অবরোধ করার অধিকারও আছে তাদের। তবে একটি স্বাধীন দেশের আন্দোলন সংগ্রাম আর পরাধীন দেশে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের চারিত্রিক প্রভেদ কি থাকবে না? একটি গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের আন্দোলনের চরিত্রের সাথে বিচ্ছিন্নতাবাদী, উগ্র ও জঙ্গি তৎপরতার কি তফাৎ থাকবে না? বিএনপি নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সংগঠন কিংবা কোনো সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠন? তা-না হলে তাদের আন্দোলন সংগ্রামের চিত্র এত ভয়াবহ নিষ্ঠুর হয় কী করে? বিএনপি’র দাবির প্রতি দেশের জনগণের সমর্থন থাকলে তারা বিএনপি’র আন্দোলন কর্মসূচির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করবে। হরতাল, অবরোধে সাড়া দেবে। কিন্তু বোমা মেরে, আগুন দিয়ে, বাস পুড়িয়ে, রেল লাইনের ফিস প্লেট খুলে রেখে ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটিয়ে, মানুষ হত্যা করে, জনজীবন পর্যুদস্ত করে, প্রতিদিন হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান করিয়ে, দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে বিএনপি বা সমর্থক রাজনৈতিক দল যা করছে তাকে আর যাই বলা হোক গণতান্ত্রিক আন্দোলন বলা যাবে না। বিএনপি চাইছে দেশে একটি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সরকার পতন ঘটিয়ে নিজেরা যেতে না পারলেও অন্য কোনো শক্তিকে ক্ষমতায় আনা। বিএনপি’র এমন আচরণে একটি গল্প মনে পড়ল। তা দিয়েই আজকের লেখা শেষ করি। কর্মবিমুখ এক ব্যক্তি প্রতিদিন বউয়ের গঞ্জনা সইতে না পেরে মনের দুঃখে একদিন বনে চলে গেল। অনাহারে দু’দিন বনের অভ্যন্তরে কাটানোর পর সে দেখল হঠাৎ তার সামনে এক দীর্ঘকায় ব্যক্তি দাঁড়িয়ে তাকে বলছে ‘কী হয়েছে তোর?’ লোকটি তার দুঃখের কথা বলল। শুনে দীর্ঘকায় ব্যক্তিটি তাকে একটি চক ও শ্লেট দিয়ে বললেন, ‘তোর যা দরকার তা মনে মনে বলে এই চক দিয়ে শ্লেটে একটি আঁচড় দিবি সব পেয়ে যাবি। তবে মনে রাখবি এতে তুই যা পাবি তোর প্রতিবেশিরা পাবে তার দ্বিগুণ।’ লোকটি বললো, আলবৎ হুজুর। তাতেও আমার আপত্তি নেই। শ্লেট-চক নিয়ে বাড়ি ফিরে লোকটি দেখল- ঠিক তাই। সে যা চায় তা-ই পায়, কিন্তু মুশকিল হলো তার দ্বিগুণ পেয়ে যাচ্ছে তাদের প্রতিবেশিরা। তার নিজের বাড়ি দোতলা করলে প্রতিবেশির বাড়ি হয়ে যাচ্ছে চার তলা। এ নিয়ে লোকটির মনে দারুণ কষ্ট। ভাবে এমন বর পেলাম আমি আর লাভবান হচ্ছে প্রতিবেশিরা। দিন যায় সে বুদ্ধি বের করতে যাচ্ছে কী করে প্রতিবেশিদের জব্দ করা যায়। একদিন ঠিক ঠিক সে তা আবিস্কারও করে। বউকে ডেকে বলে দেখবে আজ কীভাবে ওদেরকে শায়েস্তা করব। বেটারা আমার চেয়ে দ্বিগুণ পায় দেখাচ্ছি মজা, এ বলে সে মনে মনে ইচ্ছে পোষণ করে শ্লেটে একটি আঁচড় কাটল, অমনিই তার একটি চোখ অন্ধ হয়ে গেল। আর প্রতিবেশীদের দুই চোখ। বিএনপি এখন নিজের এক চোখ কানা করে অন্যদের একেবারে অন্ধ করে দিতে চায় বলে মনে হয়। Email: [email protected]

সর্বশেষ সংবাদ