শিশু জিহাদের অপমৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিত ও আমাদের প্রস্তাবনা

পোস্ট করা হয়েছে 13/01/2015-10:30am:    খন রঞ্জন রায়, মহাসচিব ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ। গত ২৫ ডিসেম্বর বিকেল ৩ ঘটিকায় শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির মাঠে ওয়াসার পাইপের ভেতর পড়ে চার বছরের অজ্ঞাত জিহাদ হয়ে উঠেছিল ১৬ কোটি মানুষের সন্তান। ঘটনাটি রাজনৈতিক বা দলীয় ব্যাপার না হওয়ায় তাতে মানসিকভাবে জড়িয়ে পড়ে দল-মত-জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই। ঘটনার আবেগঘন পরিস্থিতি টেলিভিশনগুলোতে প্রচার হলে সারা দেশের উৎকন্ঠিত মানুষের মনে আশার আলো জেগে ওঠে। সকলে মেতে ওঠে প্রার্থনায়। দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা কৌতূহলী, উৎসুক, প্রার্থনারত মানুষের ঢল নামে ঘটনাস্থলের চারপাশে। শীতের রাতের তীব্র কাঁপুনি উপেক্ষা করে রাতভর মানুষের ভালোবাসার নিদর্শন মেলে শাহজাহানপুর কলোনিতে। বৈচিত্রময় রাজনীতির ভেদাভেদ ভুলে সকলে মিলিত হয় এক কাতারে, এক জিহাদে। উদ্ধারকাজ সংশ্লিষ্টরা গভীর রাতে পাইপের ভেতরে নামায় অত্যাধুনিক বোর হোল ক্যামেরা। বাইরে থাকা মনিটরে পাইপের ভিতরে নামানো ক্যামেরার ছবি দেখা যায়। ক্যামেরা যেখানে গিয়ে থামে সেখানে দেখা যায় ব্যাঙ, টিকটিকি আর একটি স্যান্ডেলের অংশবিশেষ। দীর্ঘ ২৩ ঘন্টার উদ্ধার অভিযান চালিয়ে উদ্ধার তৎপরতায় লিপ্তরা ‘শিশুটি পাইপে নেই’ বলে উদ্ধারকাজ পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। ছড়িয়ে দেয়া হয় গুজব, তার সঙ্গে যোগ হয় আরও নানাবিধ অভিকল্পনার ডালপালা। যেন শিশুটি কর্পূরের মতো উবে গেছে, যেন তার অস্তিত্বই ছিল না! শোকার্ত মা-বাবাকে দাঁড় করানোও হয় অপরাধীর কাঠগড়ায়। নিরাপত্তা দেয়ার কথা বলে বাবাকে করা হয় নির্যাতন। বলা হয় কোথায় লুকিয়ে রেখেছ, তাকে হাজির কর। দায়িত্বশীলদের ব্যর্থতার বোঝা চাপিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা চলল শিশুটির শোকার্ত স্বজনদের ওপর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতারা বার্লিনে যেভাবে চুক্তি স্বাক্ষর করে বিবৃতি দেন, একাত্তরের ষোলোই ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে মিত্রবাহিনীর জেনারেল আরোরা এবং পাকিস্তান বাহিনীর জেনারেল নিয়াজি যেভাবে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন, সেই ভঙ্গিতেই দমকল বাহিনী বা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান সংবাদ সম্মেলন করে তাঁর উদ্ধার অভিযান সাঙ্গ ঘোষণা করেন। নিয়াজির মতো দুনিয়ার লোককে জানিয়ে পরাজয় ঘোষণা। একাত্তরের মতোই বাংলার যুবসমাজ গর্জে ওঠে। শেষ দেখার সিদ্ধান্ত নেন এবং সফল হন। আমাদের দেশের তরুণেরা যে কী করতে পারেন, তার একটি বড় প্রমাণ ছিল এ উদ্ধার কার্যক্রম। ১০-১৫ জন উদ্যমী তরুণ-যুবকের একটি দলই কিন্তু টেনে তুলে আনে জিহাদের দেহ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শফিকুল ইসলাম ফারুক, আবু বকর সিদ্দিক, মনোয়ার হোসেন, কবির মুরাদ, নূর মোহাম্মদ, আবদুল মজিদ, শাহজাহান আলী, ইমরান, রাকিব, মুন ও রাহুল প্রমূখ। এই সমস্ত লড়াকু তরুণদের অভিনন্দন। একেকটি দুর্যোগ, দুর্ঘটনা এসে আমাদের দুর্বলতাগুলো ধরিয়ে দিয়ে যায়; জানিয়ে দিয়ে যায় শুধু উদ্ধার প্রক্রিয়ায় ত্র“টি থাকায় অনেক প্রাণ আমরা বাঁচাতে পারি না। অথচ তরুণদের সুযোগ দিলে তাঁদের সহায়তা করলে তাঁরা এ ধরনের কাজে প্রশিক্ষিত হয়ে সহযোগিতা করতে পারে। তরুণেরা যে প্রস্তুত, তা অতীত তো বটেই সাম্প্রতিক ঘটনায়ও প্রমাণ পাওয়া গেল। এখন প্রয়োজন তাঁদের শিক্ষা প্রশিক্ষণ সুযোগ বাড়ানো। যে কোন দুর্যোগ মোকাবেলায় আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করার পরীক্ষা-নিরীক্ষাও অব্যাহত রাখলে কী সুফল মিলবে তা জিহাদের উদ্ধারে আমরা প্রত্যাক্ষ করলাম। উদ্ধারকারী দলের আধুনিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরও বেশি থাকলে তারা অল্প সময়ে শিশুটির অবস্থান নির্ণয় করে অক্সিজেন ও আলোর ব্যবস্থাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারত। উদ্ধার কাজে ব্যবহৃত আধুনিক যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল না থাকলে আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও উদ্ধার কাজে কাক্সিক্ষত সুফল মিলবে না। অগ্নিকাণ্ড, ভূমিধস, দুর্ঘটনা ইত্যাদি মানুষসৃষ্ট দুর্যোগ ছাড়াও আমাদের সামনে বহুবিদ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এরকম একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হচ্ছে ভূমিকম্প। বিশ্বের ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলগুলোর মধ্যে ঢাকা অন্যতম। অবাকের বিষয় দৈব, জৈব ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সে কর্মরত ৫৮০৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দেশে কিংবা বিদেশে এ সংক্রান্ত প্রযুক্তিবিদ্যায় পূর্ব প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নেই। বাংলাদেশের ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্স যন্ত্রপাতিও সম্পূর্ণভাবে বিদেশ থেকে আমদানি নির্ভর। দেশের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স যন্ত্রপাতি তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইনস্ট্রুমেন্টমেকিং ও ম্যানটেইনেন্স প্রযুক্তিবিদ প্রশিক্ষণের কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। একটি উন্নত জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটাতে হলে নিজেদের নিরাপত্তা বলয় নিজেকেই সৃষ্টি করতে হবে। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স ব্যবস্থাপনায় এনালগ কর্মকাণ্ড বাতিল করে ডিজিটাল করতে হবে। এ ব্যাপারে ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ নিুোক্ত ৮ দফা সুপারিশ বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছে। ১. সরকারি, আধা-সরকারি, পুলিশ, সামরিকবাহিনী, বেসরকারি, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজিতে শিক্ষাপ্রাপ্ত টেকনোলজিস্ট নিয়োগনীতি প্রণয়ন ও নির্দেশনা প্রদান করা। ২. ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণবিহীন কর্মরত সকল চাকুরিজীবীদের বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করে ডিপ্লোমা ইন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজিতে ডিগ্রিপ্রাপ্তদের নিয়োগ নির্দেশনা প্রদান। ৩. চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ল্যান্ড ফায়ার সার্ভিস, রিভার ফায়ার সার্ভিস, এয়ার ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স ইনস্ট্রুমেন্ট মেকিং ম্যানটেইনেন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স চালু করা। ৪. সরকারি, সিটি কর্পোরেশন, বেসরকারি, উদ্যোগে, জেলা-উপজেলা, ইউনিয়নে একাধিক ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার সহযোগিতা ও নির্দেশনা প্রদান করা। ৫. তৃণমূলে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড ডিফেন্স ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা নীতি সহজ ও সরলীকরণের লক্ষ্যে ব্রিটিশ পাকিস্তানীদের বিচ্ছিন্ন মতাদর্শের ডিপ্লোমা শিক্ষা নিয়ন্ত্রণকারী ৭টি প্রতিষ্ঠান থেকে ডিপ্লোমা শিক্ষা কার্যক্রম পৃথক করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রশাসনিক বিভাগে স্বাধীন স্বতন্ত্র ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠা নির্দেশনা প্রদান করা। ৬. উন্নত বিশ্বের মতো ‘বিভাগীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড প্রদত্ত ডিপ্লোমা ইন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স ডিগ্রিপ্রাপ্তদের নিয়োগ এবং উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা নির্দেশনা প্রদান করা। ৭. উপজেলার বিসিক শিল্পনগরী, জেলা-বিভাগীয় ভারী শিল্পনগরী, ইপিজেড এ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স ইনস্ট্রুমেন্ট শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য ডিপ্লোমাধারীদের সহজ শর্তে প্লট বরাদ্দ ও ব্যাংক ঋণ প্রদানের নির্দেশনা। ৮. (ক) বাংলাদেশ প্রস্তুত ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স যন্ত্রপাতি অধিদপ্তর, শিল্প কারখানা, হাসপাতালে ব্যাপক সংযোগ ঘটানো। খ) বাংলাদেশের প্রস্তুত যন্ত্রপাতি বিদেশে রপ্তানি প্রদানে নির্দেশনা। উপরোক্ত দফাসমূহ বাস্তবায়ন করলে জাতির ট্র্যাজেডি উত্তরণ নির্ভাবনার প্রতীক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটবে। দুর্যোগ প্রশমনে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সেবা কার্যক্রম শিশু জিহাদের মৃত্যুর ঘটনাই শেষ ঘটনা হবে।

সর্বশেষ সংবাদ
এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।  তথ‌্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি মহোদয়ের শুভ জন্মদিন আজ করোনায় পোশাক কারখানায় ৫৫ শতাংশ কাজ কমে গেছে: রুবানা হক