কালুরঘাট ব্রিজ; একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনার অপেক্ষায় কি? কবি ও সাংবাদিকঃ কামরুল হাসান বাদল

পোস্ট করা হয়েছে 06/01/2015-01:33pm:   

কালুরঘাট ব্রিজ; একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনার অপেক্ষায় কি? প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মা (বর্তমানে মায়ানমার) ফ্রন্টে সৈন্য সমাবেশ ও তাদের পরিচালনার সুবিধার জন্য চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণাঞ্চলে যেতে রেল লাইন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয় তৎকালীন ব্রিটিস সরকার। তার জন্য কর্ণফুলী নদীতে একটি ব্রিজ নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেয়। সে সময় মটরযানের তেমন চল না থাকায় মূলত ট্রেন চলাচলের জন্য ব্রিজটির নির্মাণ শুরু হয় গত শতকের ২০ দশকের শেষের দিকে এবং ১৯৩১ সালে ব্রিজটি ট্রেন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয় অর্থাৎ চালু করা হয়। এরপর আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পুনরায় বার্মা ফ্রন্টে সৈন্য পরিবহনের সুবিধার্থে মোটরযান চলাচলের জন্য ডেক বসানো হয়। তবে দেশ বিভাগের পর তা তুলে ফেলা হয়। পরে ১৯৫৮ সালে মোটরযান চলার উপযোগী করা হয় ব্রিজটিকে। এই ব্রিজটির নাম কালুরঘাট ব্রিজ। এক সময়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাথে রেল ও সড়ক যোগাযোগের একমাত্র সেতুবন্ধন। এর অনেক বছর পরে কর্ণফুলী নদীতে আরও দুটি সেতু নির্মিত হয়েছে শাহ আমানত সেতু ১ ও ২। শাহ আমানত সেতু বিশেষ করে নতুন সেতুটি নির্মিত হওয়ার পর দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাথে সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি হয়েছে সন্দেহ নেই। কালুরঘাট ব্রিজটি নির্মিত হয়েছিল আপতকালীন ও জরুরি ভিত্তিতে। আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগে এ অঞ্চলে লোক সংখ্যাইবা কত ছিল আর তার মধ্যে ট্রেনে বা গাড়িতে ভ্রমণের সংখ্যাওবা ছিল। এ সংখ্যা এখন হাজার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। লোক সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে জীবনযাপন পরিবর্তনের ফলে এই সেতু দিয়ে যাতায়াতকারী লোক ও যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও বিন্দুমাত্র বাড়েনি এই সেতু পারাপারের সুবিধা। ফলে বোয়ালখালীসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের লাখ লাখ মানুষের দৈনন্দিন দুঃখ-কষ্টের নাম হয়ে আছে কালুরঘাট ব্রিজ। পূর্বেই উল্লেখ করেছি সেতুটি নির্মিত হয়েছিল মূলত ট্রেন চলাচলের জন্যে, পরে এটিকে যানবাহন বা মটরযান চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে। ফলে সেতুটি অপ্রশস্ত। দুটি গাড়ি পাশাপাশি চলতে না পারার কারণে এটি একমুখী সেতু অর্থাৎ একদিক থেকে গাড়ি আসলে অপরদিকে গাড়ি বন্ধ রাখতে হয় আর ট্রেন চলাচলের সময়ে দুদিকেই গাড়ি বন্ধ থাকে। এসব কারণে কালুরঘাট ব্রিজকে কেন্দ্র করে সারা দিনই যানজট লেগে থাকে। নারী-শিশু ও অসুস্থদের জন্য চরম ভোগান্তি ও কষ্টকর হয়ে উঠেছে এই যানজট। এই সেতুটির সক্ষমতার সময় অতিক্রান্ত হয়েছে অনেক আগে। মেয়াদোত্তীর্ণ এই সেতুটি মেরামতের নামে বারবার জোড়াতালি দিয়ে চালু রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। একেকবার মেরামতের সময়ে মাসের পর মাস সেতুর ওপর দিয়ে যানচলাচল বন্ধ থাকে। দূরা বিকল্প হিসেবে ফেরি দিয়ে চলাচল অব্যাহত রাখা হয়। তখন জনগণের বিড়ম্বনা বৃদ্ধি পায় বহুগুণ। এই সেতুর ওপর দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে দুর্ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে আশঙ্কাজনকহারে। দুর্ঘটনার কারণে মৃত্যুসহ পঙ্গুত্বকে বরণ করে নিতে হয়েছে অনেককে। এতসব কারণে বোয়াখালীবাসীসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এখানে একটি নতুন সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন দীর্ঘ বছর ধরে। কিন্তু তাদের সে দাবি শোনার বোঝার অনুধাবন করার সময় হয়নি এখনও সংশ্লিষ্ট মহলের। মনে হয় মেয়াদোত্তীর্ণ লক্কর ঝক্কর এই সেতুর কোনো মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটার জন্য অপেক্ষা করছে কর্তৃপক্ষ। কারণ বাংলাদেশে সাধারণত: তাই ঘটে থাকে। বেশি দাম দিয়ে, খুব ত্যাগের বিনিময়েই আমাদের প্রাপ্তির ডালা ভরে। ২০১০ সালেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম-ঘুমদুম পর্যন্ত সম্প্রসারিত রেল লাইন প্রকল্পের কাজের উদ্বোধন করেন। সে হিসেবে জমি অধিগ্রহণসহ বেশ কিছু কাজ শুরু করে প্রকল্প কমিটি। মাঝখানে অর্থাভাবে কাজের গতি শ্লথ হয়ে যায়। কয়েকদিন আগে একটি দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে ২০২০ সালের আগে চট্টগ্রাম-ঘুমদুম রেল যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হবে না। অথচ পূর্বমুখী সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা সংযোগের ক্ষেত্রে এই রেল লাইন বা রেল যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার কথা। ট্রান্স রেলওয়ে ছাড়াও দেশের পর্যটন শিল্প ও পণ্য পরিবহনে এই রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। আসলে কার গোয়ালে কে ধোঁয়া দেবে। চট্টগ্রামকে নিয়ে বলার, চট্টগ্রামের অধিকার, বঞ্চনা ও অপ্রাপ্তির কথা যথাস্থানে তুলে ধরার তেমন যোগ্য নেতাও কোথায় চট্টগ্রামে। এক সময় এম.এ আজিজ, জহুর আহমদ চৌধুরীরা চট্টগ্রামে অবস্থান করেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা হয়ে উঠেছিলেন। এম এ আজিজের একক প্রচেষ্টা, সাহস ও উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু ৬ দফা নিয়ে প্রথম প্রকাশ্য জনসভা করেছিলেন লালদীঘির মাঠে। তখন এত আধুনিক সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না। এত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ি, আন্তঃনগর টেন, আর আধুনিক প্রযুক্তির টেলিফোন যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকলেও চট্টগ্রামে অবস্থান করে তাঁরা তাদের দল পরিচালনা করেছেন। আজ তেমন কোনো প্রভাবশালী নেতা নেই যার কথা বা পরামর্শ ভীষণ গুরুত্ব দেবে কেন্দ্র। শুধু বর্তমান সরকার বলে নয়, বিএনপি সরকারের ৮/৯ জন মন্ত্রী ও সমপর্যায়ের ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রামের প্রকৃত উন্নয়ন করাতে পারেননি। চট্টগ্রামের বঞ্চনা ও অপ্রাপ্তির কথা তুলে ধরতে পারেননি। কালুরঘাট ব্রিজের উন্নয়ন বা নতুন আরেকটি ব্রিজের জন্য ওই এলাকার জনগণ দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন সংগ্রাম করলেও তাতে সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। জনগণকে আস্বস্ত করা যায়নি। এমন আচরণ নতুন নয়। এ প্রসঙ্গে আমি পদ্মা সেতু বনাম ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের উন্নয়ন নিয়ে এই কলামে একটি লেখা লিখেছিলাম। সে লেখাতেই আমি উল্লেখ করেছিলাম পদ্মা সেতু নির্মিত হলে যা ঘটবে অর্থাৎ সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন ছাড়া আমাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে যে পরিমাণ অবদান রাখবে তারচেয়ে বেশি অবদান রাখবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অন্তত ছয় লেন বিশিষ্ট হলে। আমি চট্টগ্রামের অর্থনীতিবিদদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছিলাম এ হিসাবটা কাগজে কলমে তুলে ধরার জন্যে। দুঃখিত তেমন কোনো সাড়া বা কারও উদ্যোগ অন্তত আমার চোখে পড়েনি। লেখার অপেক্ষা রাখে না ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাড়কের অবস্থা এখনও কী অবস্থায় আছে। আসলে এটি শুধু এই মহা সড়ক বা কালুরঘাট ব্রিজ নিয়েই নয়। স্বাধীনতার পর থেকে আমরা লক্ষ্য করছি প্রশাসন বা নীতি নির্ধারকদের মধ্যে যে কোনো কারণে চট্টগ্রাম বিদ্বেষী একটি শক্তি সদা সক্রিয়। চট্টগ্রাম উন্নয়নের কথা বললেই এদের গা-জ্বালা করে ওঠে। চট্টগ্রামকে বঞ্চিত করার ভেতরেই যেন এদের সুখ। এমন ঘটনার ফিরিস্তি দিতে গেলে তা একখণ্ড মহাভারতে পরিণত হবে। এক সময়ে আলাদা করে চট্টগ্রাম উন্নয়নের কথা বলতে আমার বাধতো। ভাবতাম সাারদেশেই সমদ্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন। কিন্তু একটি সময়ে অনুধাবন করেছি চট্টগ্রাম তার প্রাপ্য অধিকার পায়নি এবং দুর্ভাগ্য আমাদের খুব কম সংখ্যক রাজনৈতিক নেতা এ ব্যাপারে সোচ্চার। নানাবিধ উন্নয়নের নামে জনগণের টাকার যথেষ্ট শ্রাদ্ধ করা হয় কিন্তু কালুরঘাট সেতুর মতো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এই কাজটি দীর্ঘদিন থেকে হয় না। অথচ আমাদের চোখের সামনে এই নগরে এমন কিছু প্রকল্পের কাজ চলছে বা সম্পূর্ণ করা হয়েছে তার প্রকৃত প্রয়োজন ছিল কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে শহরে বেশ কয়েকটি ওভারপাশ নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বহদ্দারহাট ও দেওয়ানহাট ওভারপাশ যান চলাচলের জন্যে খুলে দেওয়া হয়েছে বেশ আগেই। কিন্তু বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী এসব ওভারপাশ দিয়ে সারাদিন ধরে চলাচল করে মাত্র কিছু বেবি ট্রেক্সি ও দুএকটি ট্রাক। তারপরেও আরও ওভারপাশের কাজ চলছে এবং প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে মুরাদপুর থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত উড়ালপথের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই অপচয় ও পরিকল্পনহীনতা নিয়ে ইতিমধ্যে বিভিন্ন সংগঠন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। নগর পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে অনেকে এসবকে শুধু শুধু অর্থের অপচয় বলে চিহ্নিত করেছেন। অর্থাৎ যেখানে যেভাবে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করার কথা সেখানে তা যথাযথভাবে হচ্ছে না। তার মানে একটি সমন্বয়হীনতা কাজ করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বহুবার বলেছেন, চট্টগ্রামের উন্নয়নের দায়িত্ব তিনি তাঁর কাঁধে নিয়েছেন। একবার চট্টগ্রামে এসে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র ও কালুরঘাট ব্রিজ নিয়ে তাঁর পিতা বঙ্গবন্ধুর সাথে কিছু স্মৃতির কথাও বলেছিলেন। তাই এবার বলতে চাই চট্টগ্রামে এমন কোনো নেতা কি আছেন এই কালুরঘাট ব্রিজের কথা, দক্ষিণ চট্টগ্রামের লাখ লাখ জনগণের দুর্দশার কথা প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনবেন? কারণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া এই কাজটিও হবে বলে মনে হয় না।

সর্বশেষ সংবাদ