গোল্লা বদর, হায় বদর-কামরুল হাসান বাদল কবিও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 27/11/2014-06:28pm:    এ্যাক আড়ি ধান’র দুই আড়ি কুড়া, গোল্লা বদর দিতু মানুষ কুড়া-গোল্লা বদর, বদর, হায় বদর। আমি জানি না সমগ্র চট্টগ্রামে এই শ্লোগানধর্মী শ্লোকটি পরিচিত কিনা। তবে আমাদের গ্রামের বাড়ি রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামে ছোটবেলায় শোনা এ শ্লোকটি এখনো আমাকে অতীতমুখী করে তোলে। স্বাধীনতাপূর্ব ও উত্তরকালে অর্থাৎ গত শতকের ’৬০ দশকের শেষে ও ’৭০ দশকে যখন গ্রাম এলাকায় আজকের মতো এতো বেশি ইরি ধান চাষের প্রচলন হয়নি অথবা হলেও একটু উঁচু ধরনের ধান ক্ষেতে পানি সেচের ভালো ব্যবস্থা হয়নি তখন হেমন্তের শেষে থেকে কোথাও কোথাও ইরি চাষের পানি জমিতে না আসা পর্যন্ত এবং কোথাও কোথাও বর্ষা না আসা পর্যন্ত গ্রামের মাঠে বা ক্ষেতে সন্ধ্যার পরপর এই শ্লোগান শোনা যেত। চট্টগ্রামে এক সময় প’র খেলার বেশ প্রচলন ছিল। প’র খেলাটি অনেকটা দাড়িয়াবান্দা খেলার মতো হলেও তা দাড়িয়াবান্দা খেলা নয়। এ খেলাটি সম্পূর্ণ চট্টগ্রামের লোকজাত, দেশের অন্য কোনো জেলায় এ খেলার প্রচলন আছে বলে শুনিনি। দাড়িয়াবান্দা খেলায় নির্দিষ্ট কোট থাকে। আয়তাকার ক্ষেত্রে লম্বায় দুদিকে সিঙ্গেল লাইন এবং পার্শ্বে অর্থাৎ ঊর্ধ্বমুখী ডাবল লাইন থাকে, সাধারণত মাটি কেটে লম্বা লাইন করা হয়। অন্যদিকে প’র খেলায় এমন লাইন থাকে না তবে ছোট ছোট অগভীর গর্তের মাধ্যমে সীমানা চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। দাড়িয়াবান্দার সব খেলোড়ার একই মর্যাদার থাকে কিন্তু প’র খেলায় দু দলে দুজন ‘মইল্যে’ অর্থাৎ ক্যাপ্টেনের মতো থাকে। পুরো মাঠে যার দৌড়ে গিয়ে ছুঁয়ে দেওয়ার ক্ষমতা থাকে। একটি সময়ে গ্রাম বাংলায় বিনোদনের তেমন কোনো ব্যবস্থা ছিল না। কিছু কিছু গ্রামে যাত্রা-পালা, কবিগান, মারফতি গান, গরুর লড়াই, কুস্তি প্রতিযোগিতা হতো। খেলাধুলার মধ্যে সামান্য ফুটবল ছাড়া ছিল গ্রাম্য নানা ধরনের খেলা। তবে গ্রামীণ খেলার মধ্যে মেয়েদের খেলাই ছিল বেশি। ছেলেরা টাকার অভাবে ফুটবল কিনতে না পারলে ডাংগুলি, মার্বেল, সাতচারাসহ অন্য খেলাধুলা করতো। তবে হেমন্তে আমন ধান কাটার পর জমিগুলো যখন অনাবাদি পড়ে থাকতো তখন এসব জমিতে চলতো নানাবিধ খেলাধুলা। এই শুষ্ক মৌসুমে শুক্লপক্ষে সন্ধ্যার পর পর গ্রামের বা পাড়ার নির্দিষ্ট একটি মাঠে কিশোর-তরুণরা একত্রিত হতো। নিজেরা জমায়েত হওয়ার পর অন্যদের শামিল করতে তারা অভিনব এই োগানটি দিত। একজন উচ্চ কণ্ঠে শ্লোগানের মতো ধরতো-এক আড়ি ধান’র দুই আড়ি কুড়া, গোল্লা বদর দিতু মানুষ কুড়া। তারপরে সমবেত কণ্ঠে অন্যরা বলতো- গোল্লা বদর-বদর। তখন স্কুল পড়ণ্ডয়া ছিল সংখ্যায় কম, থাকলেও আজকালের মতো এত চাপও ছিল না, অন্যরা যে যেখানে থাক এই শ্লোগান শুনে ছুটে যেতো তার উৎসমূলে। সবাই যে খেলতে যেত তা নয়, অনেকে খেলা দেখতেও যেত। পূর্ণিমার কয়েকদিন আগে-পরে এই খেলা চলতো বেশ রাত অবদি। সে এক অসাধারণ দৃশ্য। চাঁদের আলোয় খোলা মাঠে এক দল তরুণ প্রবল শীতকে উপেক্ষা করে খেলছে। তাদের ঘিরে প্রচুর দর্শক। চাঁদের আলোয় প’র খেলার ‘মইল্যা’র ক্ষিপ্রতায় মুগ্ধ দর্শক। কখনো কখনো খেলোয়াড়দের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি, সামান্য বাকবিতণ্ডা। এসব খেলায় মাঝে মধ্যে চা ও বেলা বিস্কুটের ব্যবস্থাও হতো। তরুণরা চাঁদা তুলে তার ব্যবস্থা করতো। কোনো কোনো দিন কারো গাছের খেজুর রস চুরি করে কাঁচা রস দিয়েই চালের পায়েস করা হতো। মাঠের মধ্যেই নাড়া’র আগুনে (ধান কেটে ফেলার পর মাটিতে থাকা ধান গাছের অঙ্গ) এই পায়েস রান্না হতো। কখনো কারো ক্ষেত থেকে খিড়া, তরমুজ, কারো গাছ থেকে ডাব-নারকেল, পেঁপে ইত্যাদিও পেরে এনে খাওয়া হতো। কী যে স্মৃতিময়-মধুময় সে দিনগুলো। তখন দেশে বা গ্রাম বাংলায় অভাব ছিল, দারিদ্র্য ছিল কিন্তু প্রাণের সতেজতা ছিল, আনন্দ ছিল, শান্তি ছিল। আজকের মতো আলোই ঝলোমল ছিল না গ্রাম, এত দালান, এত বৈভব ছিল না এত আধুনিকতা, এত প্রযুক্তি, এত বিনোদন ছিল না তখন, তবুও কত বাসযোগ্য, কত আন্তরিক আর আনন্দময় ছিল গ্রামের দিনগুলো। আজও আমি গ্রামে যাই, খুঁজে ফিরি শৈশবের সেই গোল্লাবদরকে, পাই না। এখনকার ছেলেদের কাছে ডাকি, তাদেরকে বলি, তারা জানে না গোল্লা বদর কাকে বলে। অনেকে প’র খেলাও চেনে না। ওরা এখন ক্রিকেট খেলে নতুবা মোবাইল ফোন নিয়ে, ফেসবুক নিয়ে, টেলিভিশনের শতাধিক চ্যানেল নিয়ে সময় পার করে। ওরা খোয়াতিভাত চেনে না, কানামাছি খেলা চেনে না, কুত কুত খেলা চেনে না, ডাংগুলি বোঝে না। এখন কোনো খোলা মাঠ নেই, উদ্যান নেই। আমন ধান কাটার পর পর জমিতে চলে আসে সেচের পানি তাই খোলা বা খালি জমিও নেই। তাই খেলাও নেই, জ্যোৎস্না রাতে পাগল করা আলোয় প’র খেলা নেই, গোল্লা বদরও নেই। এখন গ্রামেও বিদ্যুৎ, টেলিভিশন দেশি-বিদেশি চ্যানেল, মোবাইলে হাজারো অপশন, এখন গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে। ‘শিলা কি জাওয়ানি’ ‘ধূম মাচালে’ কালচার চলে ধুন্ধুমার। এখন গ্রাম আর গ্রাম নেই। অতিথি আপ্যায়নের জন্য লেবুর শরবত নেই, ডাবের পানি নেই। হাতে বানানো পিঠা নেই। এখন সেখানেও বহুজাতিক কোম্পানির পানীয়, বেকারির চিকেন পেটিস, বিদেশি নানা ধরনের ফলমূল। এখন ভোরে ঘরে ঘরে নতুন ধানের পিঠা তৈরির ধূম পড়ে না, নতুন ধানের মোয়া-মুড়িও কেউ খায় না। দেশীয় পিঠা কেউ খায় না। গ্রামের লোকজন এখন সকালে দোকানের নানরুটি-পরটা-ভাজি ও চনার ডাল দিয়ে নাস্তা করে। ঘরে ঘরে হাঁস-মুরগি পালনের রেওয়াজ নেই। ফার্মের বয়লার মুরগি, ফোন করলেই ঘরে পৌঁছে দেয়। এখন অবস্থাপন্ন পরিবারেতো আছেই এমনকি একটু সচ্ছল পরিবারেও ঘরের ভেতর বাথরুম। নলকূপ বা গভীর নলকূপের মাধ্যমে তারা আধুনিক গোসল করেন। পুকুরে গোসল করার সংখ্যাও গ্রামে কমে যাচ্ছে। আগে প্রতিটি বাড়ির পেছনে আরেকটি পুকুর থাকতো থাকে বলা হতো- ‘বারিছে ফইর’- বা পেছনের পুকুর। বাড়ির নারীরাই ওই পুকুর ব্যবহার করতো। আগে গ্রামে গেলে ছাউনি দেওয়া পুকুরঘাট দেখা যেত যা ব্যবহার করতো নারীরা। এখন পুকুরে পাকাঘাট ও ছাউনি দেওয়ার সামর্থ যাদের আছে তারা ওই টাকা দিয়ে ঘরের মধ্যে বাথরুম বানিয়ে নেন। ফলে পুকুরের ব্যবহার কমে যাচ্ছে। বাড়ির পেছনের পুকুরটি এক সময় হেজে-মজে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ছে। যাদের সংস্কারের সামর্থ্য আছে তারা করে না যাদের সামর্থ নেই তারা অন্যের বা সরকারি নলকূপ ব্যবহার করে। এভাবে গ্রামে পুকুরের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। যেগুলো আছে তার অধিকাংশের পানি শুকিয়ে যায় শুষ্ক মৌসুমের মাঝামাঝিতে। কিছু কিছু বড় পুকুর টিকে আছে তবে তার অর্থনৈতিক স্বার্থে। এসব পুকুরে মাছের চাষ হয়। লিজ দেওয়া এসব পুকুরে নিরাপত্তার কড়া ব্যবস্থা থাকায় সাধারণ ব্যবহারও কমে গেছে এসব পুকুর বা দীঘির। কোনো কিশোর বা তরুণের একটি সাঁতারের সুযোগ নেই আর এসব দীঘিতে। আগে ধানি জমিতে, জলাশয়ে, খালে-বিলে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। শত শত নামের, নানা স্বাদের বৈচিত্র্যময় এসব দেশি মাছের অনেকগুলো এখন হারিয়ে গেছে। অনেক মাছ যা আমরা ছোট বেলায় খেয়েছি-দেখেছি তার মধ্যে অনেক মাছ লুপ্ত হয়ে গেছে। অধিক পরিমাণে সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে খালে-বিলে-নদীতে মাছের বংশ বিস্তার কমে গেছে। তেলাপিয়া ও নাইলোটিকা ‘মাছে-ভাতে বাঙালির’ ঐতিহ্য কিছুটা ধরে রেখেছে। এখন ফার্মে চাষ হচ্ছে মাছের। ঐতিহ্যগত সে স্বাদ এখন আর পাওয়া যায় না মাছে। আসলে এখন গ্রাম থেকে গ্রামীণ ঐতিহ্যগুলো হারিয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের পেট্রোডলার ও আধুনিক চাষাবাদ গ্রামীণ অর্থনীতির চেহারা পাল্টে দিয়েছে। তবে সে পাল্টানোর মধ্য দিয়ে আমূল বদলে গেছে আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও পরম্পরা। মধ্যপ্রাচ্যের টাকার সাথে সাথে সে দেশের সংস্কৃতির প্রভাবও পড়েছে আমাদের গ্রামীণ সমাজে। মূল্যবোধের পরিবর্তন সাধিত করার পাশাপাশি কিছু পারিবারিক, সামাজিক অবক্ষয়ও সমস্যা তৈরি করেছে। (আগামী পর্বে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবো) ই-মেইল [email protected]

সর্বশেষ সংবাদ